যোগেনদা যখন ক্যালকাটা পেন্টার্সের বার্ষিক প্রদর্শনীর জন্য ছবি পাঠাতেন, সেই সময় থেকে আমি ও শিল্পী গৌতম চৌধুরী— আমরা দু’জনেই যোগেনদার কাজের সঙ্গে পরিচিত। আমরা তখন থেকে ওঁর কাজের অনুরাগী, নিজেদের মধ্যে আমরা কথালাপ চালাতাম ওঁর কাজ নিয়ে। তখন থেকেই বোঝা যেত, যোগেনদার কাজ একেবারে অন্য ধারার, সময়ের থেকে এগিয়ে থাকা। যোগেনদার সঙ্গে পরিচয় যদিও হল ১৯৮৭-র পরে, যখন তিনি শান্তিনিকেতনে এলেন।
ওঁর কাজকে বেশ কয়েকটি পর্বে ভাগ করা যায়। তার মধ্যে ছাত্রাবস্থার কাজ আমরা অনেকটা পরে দেখেছি। কিন্তু দেখেই উপলব্ধি করা যায়, সেই কাজগুলো কতটা বলিষ্ঠ! প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিরিখে, গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের অত্যন্ত সুদক্ষ ছাত্র ছিলেন যোগেনদা। একই সঙ্গে, সেই সময়ের কাজগুলি থেকে দেখা যায়, কীভাবে নিজের ভাষা তৈরি করছিলেন যোগেন চৌধুরী। সব সময় ভাঙার, বা বলা ভাল ভেঙে গড়ার একটা প্রবণতা ছিল যোগেনদার কাজে। সেই প্রবণতা ওঁর আত্মপ্রতিকৃতিতেও দেখা যায়। ওঁর কাজ এক্সপ্রেশনিজম বা অভিব্যক্তিবাদের আভাস দিত সবসময়েই। ওঁর অবস্থান, যে সময়ে তিনি আছেন, ওঁর যাপন, ওঁর অস্তিত্ব— সেই সবকিছুই প্রতিষ্ঠিত হত তাঁর কাজে এবং সেই প্রকাশভঙ্গিও ছিল আশ্চর্য স্বতন্ত্র।
তারপর ওঁর বিদেশযাত্রা, মাদ্রাজে গিয়ে থেকেছেন। আর এই বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেকে ভাঙতে-ভাঙতেই এগিয়েছেন যোগেনদা। ওঁর আনুপূর্বিক কাজের ধারাবাহিকতা যদি লক্ষ করা যায়, তাতে দেখা যায় যে, যোগেনদা নিজেকে বারবার বদলেছেন। যে-সময়টায় দিল্লিতে ছিলেন, সেই সময়টার রাজধানী শহরকে, সেই শহরের রাজনীতি, রাজনীতিক— সবকিছুই কাছ থেকে দেখেছেন তিনি। সেই সময়ের কাজগুলো দেখলে মনে হয়, ওঁর ভেতরে সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে একটা বিবমিষা কাজ করছে। রাজনীতিবিদদের যে ছবিগুলি আঁকছেন, তা দেখে তা বোঝা যায়। ওঁর সেই সময়ের পুরুষপ্রধান ছবিগুলি দেখলে বোঝা যায়, পুরুষকে তিনি বিকৃত করেই আঁকতে চাইছেন, অন্তত দেখাতে চাইছেন, সেইসব পুরুষের আসল অন্তঃসার। তাই সেইসব ছবিগুলো দেখলে কেমন যেন গা শিউরে উঠত। কিন্তু মেয়েদের খুব সুন্দরভাবে আঁকতেন যোগেনদা। যদিও ভাঙচুর সেখানেও ছিল।

আরও পড়ুন: যামিনী রায়ের ছবি সংরক্ষণ করেছিলেন যোগেনদা! লিখছেন বিমল কুণ্ডু…
একটা জিনিস বারবার লক্ষ করা গেছে, পৃথিবীর ইতিহাস, তার ঘটনাবহুলতাকে যোগেনদা নিজের অস্তিত্বে, যাপনে জারিত করতেন এবং ছবিতে তার প্রকাশ ঘটাতেন। তাঁর স্টাইল বানিয়ে তোলা ছিল না, তাঁর নিয়ত চর্চা ও জীবনচর্যা থেকেই তা উঠে আসত। হয়তো খুব অল্প রং, চাপা আলো, অন্ধকার, ছায়া, ক্রিস-ক্রস করে পটকে ঢাকার শৈলী— এসবই তাঁর নিজস্ব অভিব্যক্তির অংশ ছিল।
আরও সহজ হল ওঁর রেখা, যখন তিনি চলে এলেন শান্তিনিকেতনে। রেখার সঙ্গে মিশত অল্প রং। শান্তিুনিকেতনের প্রকৃতির মধ্যে থাকতে-থাকতে একটা পরিবর্তন এল যোগেনদার মধ্যে। কালো রেখায় যে প্রকৃতি তিনি ফুটিয়ে তুলছেন, তার মধ্যে মিশে থাকছে তাঁর নিজস্ব দর্শন। পাতা মানেই তা ততটা সজীব নয়, ফুল মানেই তা ততটা সুন্দর নয়— ওঁর আঁকা থেকে সেই কথা বোঝা যেত। ফুলও দাঁতনখ বের করতে পারে হিংস্রতায়। দেখে মনে হত, কী সহজ এইসব ছবি আঁকা! অথচ, সাংঘাতিক চর্যা ছাড়া শিল্পের ওই স্তরে উন্নীত হওয়া যায় না।



দীর্ঘকাল ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে এঁকেছেন যোগেনদা। ওঁর শিল্পের প্রতিটি পর্বই যেন অসম্ভব তাৎপর্যপূর্ণ। যাঁকে বলে কর্মযোগী, যোগেনদা ছিলেন তাই। কেবলই তো ছবি আঁকেননি যোগেনদা! ছবি আঁকার পাশাপাশি ছাত্রছাত্রী, পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী, শিল্পানুরাগীদের কথা অবিরাম ভেবে চলতেন যোগেনদা। তাই ছবির ভাঙাগড়ার পাশাপাশি তৈরি করেছেন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি করেছেন কাজের পরিসর। আরও একটি দিক ছিল যোগেনদার। পশ্চিমবঙ্গের জন্য ওঁর একটা আশ্চর্য দরদ ও ভালবাসা ছিল। ভারতের সর্বত্রই তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, কিন্তু এই রাজ্য ছিল তাঁর কাছে প্রাণাধিক প্রিয়। ২০১১ সালে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পালাবদলের পর, যোগেনদা উদ্যোগ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলিতে আর্টকে বিষয় হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। কলকাতার পাঠভবনে চিরকালই শিল্প বিষয় হিসেবে গুরুত্ব পেয়ে এসেছে। পাঠভবনের শিল্পশিক্ষক হিসেবে গৌতম চৌধুরী ছিলেন ছাত্রবন্ধু। তাঁর সাহচর্য পেয়েছিলেন যোগেনদা। আমিও ছিলাম সেই দলে। আমার একটি লেখা, ‘স্কুলে রবীন্দ্রনাথ: গানের ভিতর দিয়ে’, যেখানে সামগ্রিকভাবে শিল্পমাধ্যম নিয়ে আমার কথা আমি বলেছি, তা পড়ে ওঁর এত ভাল লেগেছিল, ‘গাঙচিল’ থেকে যোগেনদারই উদ্যোগে তা বই আকারে প্রকাশ পায়। সব মিলিয়ে খুবই আগ্রহব্যঞ্জক উপায়ে শিল্পকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন যোগেনদা, প্রবলভাবে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু শেষাবধি সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। কারণ, মন্ত্রিসভার, বিশেষ করে অর্থ দফতরের সাহায্য ও অনুমোদন মেলেনি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের স্কুলগুলিতে সব মিলিয়ে ১৫,০০০ শিল্পশিক্ষক নিয়োগ করতে হত, যার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ তখন ছিল না।
যোগেনদা দীর্ঘজীবনের সিংহভাগটাই কাটিয়েছেন শিল্প ও শিল্পীর স্বার্থে। সব সময় চেষ্টা করতেন, কীভাবে মানুষকে শিল্প-অভিমুখী করা যায়। ওঁর তৈরি করা ‘চারুবাসনা’-য় নানা ধরনের অনুষ্ঠান হত। সেই সব উদ্যোগই ছিল সমাজ ও শিল্পকে একাত্ম করার প্রয়াস। সেখানে বহু বিশিষ্ট মানুষ এসেছেন, নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির জন্মদিন ১৫ এপ্রিল, আবার আমাদের নববর্ষের সূচনাও হত ওইদিন। এই দুই উপলক্ষকে মিশিয়ে যোগেনদা এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করতেন, আমরা তাতে শামিল হতাম।
যোগেনদা যেমন জীবন্ত ও প্রাণবন্ত মানুষ ছিলেন, ওঁর সঙ্গে মিশে আমাদের মধ্যেও সেই প্রাণশক্তি যেন সঞ্চারিত হত। আমার মনেই হয় না, যোগেনদা নেই। শেষ এক বছর যে ওঁর সঙ্গে দেখা করা হয়ে ওঠেনি, একথাও যেন মনেই হয় না। যতদিন সজাগ থেকেছেন, শিল্পের জন্য নিয়োজিত থেকেছেন। আমি বলব, মানবসভ্যতায় যোগেনদার মতো মানুষ বিরল। কারণ, ওঁদের অস্তিত্বময় উপস্থিতি জানান দেয়, জীবনের অন্ত নেই।
বিনোদ ভরদ্বাজ যোগেনদাকে নিয়ে একটি তথ্যচিত্র করেছিলেন। একদিন ‘চারুবাসনা’-য় তা আমাদের দেখানো হয়েছিল। সেই অনুষ্ঠানে বিনোদ ভরদ্বাজ নিজেও উপস্থিত ছিলেন। ওঁর সামগ্রিক জীবনের কাজ নিয়ে সেখানে কথা বলেছিলেন যোগেনদা। শেষ কথা হিসেবে বিনোদ ভরদ্বাজ প্রশ্ন করেছিলেন, আপনার কি কোনও আক্ষেপ রয়ে গেল? দু’টি কথা বলেছিলেন যোগেনদা, এক, জীবন আরেকটু বড় হল না কেন? আর হয়তো কিছু কাজ না করলে ভাল হত।
অগণিত শিল্পীদের মতো যোগেনদার চলে যাওয়া আমি কোনওদিনই মানতে পারব না। যোগেনদা আমাদের মধ্যে জীবিত হয়েই থাকবেন।



