যোগেন চৌধুরীকে প্রথম চিনি শিল্পী হিসেবে নয়, তাঁর শিল্প নিয়ে একটি অসামান্য লেখার মধ্য দিয়ে। নব্বই দশকে ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল তাঁর ‘কী আঁকছি কেন আঁকছি’। সেই প্রথম কোনও ভারতীয় শিল্পীর কাছে ছবি আঁকার উদ্দেশ্য নিয়ে এক গভীর বিশ্লেষণমূলক লেখা পেলাম এবং ঋদ্ধ হলাম! এই লেখাটি তিনি তার অনেক বছর আগে প্যারিস থেকে ফিরে মাদ্রাজে থাকাকালীন লিখেছিলেন। সেই সময় তিনি বিদেশ থেকে ফিরে কোনও ছবি আঁকতে পারছিলেন না। ‘কী আঁকব কেন আঁকব’— এই প্রশ্নে অহরহ জেরবার হচ্ছিলেন। আজ মনে হয় যে, প্রত্যেক শিল্প-শিক্ষার্থীর বা শিল্পজিজ্ঞাসুর এই লেখা পড়া উচিত। কারণ শিল্পশিক্ষা তো শুধু কারিগরি শিক্ষা নয়, শিল্পের বোধকে প্রসারিত করতে গেলে এই ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াটা প্রত্যেক শিল্পীর খুব জরুরি!
এরপর যোগেন চৌধুরীকে শিল্পী হিসেবে আবিষ্কার করে লেডিজ স্টাডি গ্রুপ আয়োজিত বিড়লা অ্যাকাডেমিতে একটি চিত্রপ্রদর্শনীতে! সেখানে সোমনাথ হোড়, গণেশ পাইন, বিকাশ ভট্টাচার্য ও যোগেন চৌধুরীর ছবি ছিল। সেই প্রথম যোগেন চৌধুরীর ছবি স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতা হল এবং চমৎকৃত হলাম! প্রাইমারি রঙের বলিষ্ঠ ব্যবহার ও রেখার তীব্র চলাচলে ও আকুলতায় ভারতীয় ছবিতে যেন এক নতুন অভিযাত্রা শুরু হল।
এরপর যোগেন চৌধুরীকে পরিপূর্ণভাবে পেলাম ‘সিমা’ গ্যালারিতে তাঁর একক প্রদর্শনীতে। বর্ণের বিপুল সমারোহে আর রেখার সূক্ষ্ম ক্রস-হ্যাচিংয়ের মধ্য দিয়ে সেইসব ছবিতে এক নতুন প্রদেশ গড়ে উঠল, যা ভারতীয় দর্শক আগে দেখেনি।
আরও পড়ুন: যোগেনদা কখনও সাধারণের থেকে বিচ্যুত হননি! লিখছেন পার্থ দাশগুপ্ত…











তারপর শিল্পীসত্তার বাইরে যোগেন চৌধুরীর অসাধারণ সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় পেলাম তাঁর নেতৃত্বে কলকাতায় অনুষ্ঠিত শিল্পমেলার ভেতর দিয়ে। সেখানে সারা ভারত থেকে চিত্রশিল্পী ও চিত্রবোদ্ধারা এলেন যোগেন চৌধুরীর আমন্ত্রণে, অজস্র সেমিনার হল, সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মত তরুণ শিল্পীরাও ছবি প্রদর্শনের সুযোগ পেল। কলকাতা যে শিল্প-আন্দোলনের একসময় উৎসকেন্দ্র ছিল, তা আবার যোগেন চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন।
এরপর কলকাতায় একটি ঘরোয়া কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে যোগেন চৌধুরীকে প্রথম সশরীরে দেখলাম। সেখানে উৎপলকুমার বসু প্রমুখ কবিরা কবিতা পড়েছিলেন। যোগেন চৌধুরীর সেইদিন রাতেই প্যারিসে চলে যাওয়ার কথা, তবুও তিনি এসেছিলেন, কথা দিয়েছিলেন বলে। তাঁর এই কথা রাখার মানসিকতার পরিচয় পরে অনেক অনেকবার পেয়েছি ব্যক্তিগত অনুষঙ্গে।
এরপর কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আসবে শিল্পচর্চার বাইরে ব্যক্তি যোগেন চৌধুরীকে উপলব্ধি করার জন্য। রবীন্দ্রনাথের ছবি ও গানকে নিয়ে আমাদের প্রযোজিত একটি অনুষ্ঠান প্যারিসে আমন্ত্রিত হয়েছিল। তার স্পন্সরশিপ জোগাড়ের জন্য আমি যখন আপ্রাণ চেষ্টা করছি, তখন শিল্পী সমীর আইচ যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে আমায় যোগাযোগ করিয়ে দেন। যোগেনদা তার আগে আমায় চিনতেন না, কিন্ত শান্তিনিকেতন থেকে তিনি আমার সঙ্গে ফোন কথা বলেন দু-ঘণ্টা ধরে, স্পন্সরশিপ পাওয়ার বিভিন্ন উপায় নিয়ে বিশদে আলোচনা করেন। তিনি তখন কলাভবনের প্রিন্সিপাল এবং একজন অত্যন্ত ব্যস্ত ও প্রখ্যাত শিল্পী। তার মধ্যে এতটা সময় আমার জন্য ব্যয় করলেন ভেবে আমি তাঁর প্রতি আনত শ্রদ্ধায় নত হলাম।


চিত্রকলার ওপর আমার বই উদ্বোধনের উদ্বোধক হিসেবে যখনই তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, তিনি আগে সেই বইয়ের পান্ডুলিপি চেয়ে নিয়েছেন। আর মাত্র দু-তিন দিনেই তিনি সেই পান্ডুলিপি সম্পূর্ণ পড়ে ফেলেছেন। তারপরে অনুষ্ঠানে এসে সেই বই নিয়ে নিজস্ব অনুভূতি খুব আন্তরিকভাবে উচ্চারণ করেছেন। এই উদাহরণ খুব কম উদ্বোধকের মধ্যে পেয়েছি!
একবার আইসিসিআর -এ আমাদের একটি গ্রুপ চিত্র প্রদর্শনীতে তিনি উদ্বোধক হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন। সেই সময়ে ওপরের গ্যালারিতে কমবয়সি ছেলেমেয়েদের একটি চিত্রপ্রদর্শনী চলছিল। তারা এসে যখন যোগেনদাকে তাদের প্রদর্শনীতে যেতে আমন্ত্রণ জানাল, তিনি রাজি হয়ে গেলেন। যদিও সেদিন তাঁর অন্য গ্যালারিতে যাওয়ার তাড়া ছিল, তবুও তিনি পূর্ব আমন্ত্রণ ছাড়াই সেখানে গেলেন এবং প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখলেন এবং আমার সঙ্গে আলোচনা করলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁকে আমার একটু জোরই করতে হল বেরিয়ে আসার জন্য, না-হলে ছোটরা আর তাদের বাবা-মা’রা তাঁকে নিয়ে ছবি তোলার জন্য হুড়োহুড়ি করছিল। যদিও তিনি নিজে তাতে এতটুকু বিরক্ত হচ্ছিলেন না!
‘চারুবাসনা’ থেকে যে পত্রিকা বেরত, তার মিটিংয়ে যখন আলোচনা হত, তিনি তার বিরুদ্ধ রাজনৈতিক মতবাদের ব্যক্তিকে দিয়েও লেখাতে চাইতেন, তাঁদের কথাও শুনতে চাইতেন। আমাদের ‘সংলাপ অবিরত’ পত্রিকা থেকে যখন তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম, তখন তিনি যে রাজনৈতিক দলের সাংসদ ছিলেন তারও অনেক সমালোচনা তিনি খোলামেলাভাবে করেছিলেন।
সাংসদ হয়েও তিনি কখনও কোনও পদের অপব্যবহার করেননি। একবার আমাদের রোটারি ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে তাঁর উদ্বোধন করার কথা ছিল। সেদিনই, তার ঠিক আগে, তাঁর রবীন্দ্র সদনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে একটি অনুষ্ঠান ছিল। সেদিন তাঁর চালক আসেননি। তিনি আমাদের সেটা জানাননি, তাঁর দলেরও কাউকে জানাননি। তিনি রবীন্দ্রসদন থেকে পুরোটা হেঁটে এসেছিলেন আমাদের অনুষ্ঠানে। অথচ তিনি চাইলে এমপি হিসেবেও সরকারি গাড়ি পেতে পারতেন সেদিন।


তাঁর বিপুল শিল্পসৃষ্টির পাশাপাশি তিনি অজস্র সময় ব্যয় করেছিলেন বিভিন্ন শিল্প সংস্থা গড়ে তোলার কাজে, যা সচরাচর আত্মকেন্দ্রিক শিল্পীরা করেন না! যেমন শান্তিনিকেতনে ‘SSVAD’ গড়ে তুলতে তিনি হুসেন প্রমুখ সারা ভারতের শিল্পীদের কাছে গিয়ে-গিয়ে ছবি চেয়েছিলেন, যাতে তার অর্থে তিনি সেই কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারেন। নিজের গড়া ‘চারুবাসনা’ তৈরির সময়েও দেখেছি তিনি কীভাবে তিলে-তিলে প্রচুর শ্রম আর অর্থ ব্যয় করে এই কেন্দ্রটি তৈরি করলেন। সরকারি ‘চারুকলা পর্ষদ’-এর সভাপতি হিসেবেও তিনি সব ধরনের শিল্পী ও গ্রুপকে আমন্ত্রণ জানাতেন, কখনও সংকীর্ণতাকে প্রশ্রয় দিতেন না।
কলাভবনে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের জন্য তিনি অনেকটা সময় ব্যয় করতেন। এবং তাদের নতুন পথের দিশা দেখাতেন। যোগেনদার ছাত্রছাত্রীদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত এবং সেই প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে তাঁর স্মরণীয় অবদান আছে। এত ছাত্রবৎসল শিক্ষক ইদানীং কমে এসেছে।
যে-কোনও ধরনের ছবির প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসা ও গভীর শ্রদ্ধা ছিল। তিনি নিজে বিমূর্ত ছবি না আঁকলেও যাঁরা বিমূর্ত ছবি আঁকেন, যেমন অগ্রজ বিমূর্ত শিল্পী গণেশ হালুইয়ের প্রতি তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। কোনও শিল্পীকেই তিনি ছোট করতেন না, খুব জুনিয়র শিল্পীও ছবি দেখাতে নিয়ে এলে তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই ছবি দেখতেন ও মন্তব্য করতেন। ছবির কোনও মাধ্যম নিয়ে তাঁর কোনও ছুঁৎমার্গ ছিল না! আমার ডিজিটাল ছবি নিয়ে অনেক সিনিয়র শিল্পীর অনাগ্রহ থাকলেও যোগেনদার নির্দেশে ও অনুরোধে আমার পরবর্তী প্রদর্শনীগুলোতে ডিজিটাল কাজ দেখাই। তিনি এতে খুব আনন্দিত হন ও একটি কাজ ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহও করেন।
তাঁর জীবনের শেষ প্রকাশ্য অনুষ্ঠান তিনি করেছিলেন গত বছর আমাদের ‘সংলাপ অবিরত’ আয়োজিত ‘রবীন্দ্রনাথের গান ও ছবি’ নিয়ে একটি প্রোগ্রামে। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি সেদিন এসেছিলেন এবং আমাদের অনুষ্ঠান ও রবীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে অনেক কথা বলেছিলেন।
একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘ছবি আঁকার বাইরেও এত কাজের প্রেরণা কোথা থেকে পান?’ হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের থেকে।’
তাঁর মহৎ শিল্পসৃষ্টি নিয়ে অনেক আলোচনা, লেখা ইতিমধ্যে অনেক হয়েছে, আরও অনেক হবে। কিন্ত মানুষ যোগেন চৌধুরীর যাপিত জীবন ও মনন নিয়েও আলোকপাতের প্রয়োজন। আমরা যারা তাঁর ঘনিষ্ঠ হবার সুযোগ পেয়েছি, তাঁর ব্যক্তিত্বের আলোয় উদ্ভাসিত হতে পেরেছি— সেজন্য নিজেদের ধন্য মনে করি।
শেষ শ্রদ্ধা ও প্রণাম যোগেনদাকে!




