ভাঙার সাহস

সালটা বোধহয় ১৯৭৯। তখন আমার বয়স একুশ বছর। সেই সময়ে যোগেনদার সঙ্গে আমার‍ প্রথম আলাপ।

তার আগে থেকেই যোগেনদার ছবি দেখেছি, বিড়লা একাডেমি-সহ অন্য আরও নানা জায়গায়। যোগেনদা, মকবুল ফিদা হুসেন, বিকাশদা (ভট্টাচার্য), শ্যামল দত্তরায়, গণেশ পাইনদের ছবি দেখার জন্য সেসময় আমরা উৎসুক থাকতাম। ভাবতাম, কখন আমাদের ওঁদের ছবি দেখার সুযোগ আসবে! ১৭-১৮ বছর বয়স থেকেই ওঁদের ছবি দেখছি। স্কুলজীবন থেকেই ওঁদের নাম জানি, কিন্তু চাক্ষুষ দেখার সুযোগ খুব কমই পেতাম। তাই যখন ছবি আঁকতে শুরু করেছি, তখন থেকে সুযোগ পেলেই এঁদের ছবি দেখতে ছুটতাম। সেই সময় থেকেই আমি যোগেনদার ভক্ত। ওঁর লাইনস, ওঁর রেখাগুলো আমাকে খুবই ‌স্পর্শ করত। আজও, যখন ছবি আঁকতে-আঁকতে সংশয়ী হই, ঠিক পথে এগচ্ছি কি না ভাবি, তখন যোগেনদা আমাকে ভরসা দেন। কীভাবে? যেখানে বসে আমি ছবি আঁকি, তার ঠিক পিছনে যোগেনদার আঁকা একটি ছবি আছে। সেই ছবিটার দিকে পিছন ফিরে তাকাই, ভাবি, ভাঙাতে কোনও দোষ নেই।

যেভাবে হাত-পা, আকার-আকৃতিকে ভেঙেচুরে একটি স্পর্শকাতরতা তৈরি করতেন, যেভাবে আঁকার মধ্য দিয়ে আমাদের রক্তের শিরা-উপশিরায় যে অনুভব যোগেনদা পৌঁছে দেন, তা শেখার বা বোঝার জন্য অনেকটা সময় লাগে, কিন্তু যাত্রাটা অপূর্ব। সেই যাত্রাটা কিন্তু সহজ নয়। তাই এখনও ছবি আঁকতে-আঁকতে কোথাও বাধা পেলে, কোথাও দ্বিধা হলে, যোগেনদার আঁকা ছবিটার দিকে তাকালেই প্রাণিত হই।

আলোকচিত্র সৌজন্য: নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

আরও পড়ুন: যোগেনদার হাতের ছোঁয়ায় সহজ রেখা হয়ে উঠত অনন্য! লিখছেন পরেশ মাইতি…

এই হচ্ছে আমাদের যোগেনদা!

পরবর্তীতে, ধীরে-ধীরে, ওঁর সঙ্গে গভীর এবং সুন্দর একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। আমি ও আমার স্বামী, দু’জনের সঙ্গেই যোগেনদার অসম্ভব ঘনিষ্ঠতা ছিল। কত প্রশ্ন, কত নালিশ, কত কথাবার্তায় সমৃদ্ধ হয়েছে সেই সম্পর্ক বারবার! আমার নিজের ছবির জন্য নিজের প্রশ্ন রেখেছি, ওঁর মতামত জানতে চেয়েছি— যোগেনদাও টানা উৎসাহ দিয়ে গেছেন। ফোনে কখনও-কখনও এক ঘণ্টার বেশি কথোপকথন চলেছে। যোগেনদা ছিলেন আশ্চর্য মনোযোগী শ্রোতা। এমন লোক তো হারিয়েই যাচ্ছেন। গণেশকাকু (গণেশ হালুই), রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় রয়েছেন এখনও‌। এঁরা কেবলই শিল্পী নন, এঁরা জীবনযাপন করেছেন ঋষির মতো, মহৎ সেই জীবনযাপন। শিল্পীর কদর করতে জানতেন যোগেনদা, জীবনের শেষাবধি। নিজে কত বড় শিল্পী হয়েও, ছাত্রছাত্রীদের বা তরুণ শিল্পীদের কথা শুনতে চাওয়া, সেই কথার পরিসর তৈরি করার ক্ষেত্রে জুড়ি ছিল না যোগেনদার। এইদিক থেকে একেবারে অন্যরকমের মানুষ ছিলেন যোগেনদা। 

আলোকচিত্র সৌজন্য: নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রথম সেই ১৯৭৯ সালে, দিল্লিতে প্রথম যোগেনদাকে দেখি। সাদা ধবধবে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা যোগেনদা, কাঁধে একটি ঝোলা। তখন যোগেনদা ছিলেন রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর‌। তখন যোগেনদার বাঘের ছবি, মানে টাইগার সিরিজের ছবি বিখ্যাত। সেই যোগেনদাকে সামনে থেকে দেখে বিস্মিত হয়ে গেলাম! কী অমায়িক হাসি, কী সহজ-সরল মেলামেশা! সে অবিস্মরণীয় অনুভূতি! সেই আলাপ, সেই থেকে এই এতগুলো বছরের যোগাযোগের শুরু। যোগেনদা আমার ছবিও কিনেছেন, চিত্রকূট আর্ট গ্যালারি-সহ নানা জায়গা থেকে। যোগেনদা আমার ছবি কিনছেন, এইটার চেয়ে বড় পুরস্কার আর হয় না।যোগেনদা দয়া দেখিয়ে ছবি কিনতেন না, ছবি পছন্দ হলে তবেই কিনতেন। আমাকে সেটা অদ্ভুত একটা আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল‌। 

রবীন্দ্রসংগীত ভালবাসতেন অসম্ভব। রাজস্থান, লন্ডন, জার্মানি— যেখানেই ওঁর সঙ্গে ট্রিপে গেছি, সেখানেই যোগেনদা রবীন্দ্রনাথের গান গাইতেন। অবাঙালি শিল্পীরা, যাঁরা রবীন্দ্রসংগীত জানতেন না, তাঁরাও বিমোহিত হয়ে শুনতেন। আমি আর যোগেনদা উদাত্ত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছি কতবার, আজও মনে পড়ে।

সেই কারণেই যোগেনদার আঁকা ছবিটাকে বিগ্রহের মতো আমার ছবি আঁকার জায়গার পিছনে রেখে দিয়েছি। ওই ছবিটাই আমাকে ছবি আঁকায় ভাঙচুরের সাহস দেয়। আমি ওই ছবিটা দেখে বুঝি, চেনাজানা শরীরের কাঠামোকে ভাঙার স্বাধীনতা আমার আছে, আমার এক্সপ্রেশন, আমার অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য চেনা এক ভেঙে আমি বেরতেই পারি। হাত বা পা আরেকটু লম্বা হতেই পারে! এই সাহসটা বারবার যোগেনদাই আমাকে দেন। 

শেষ সময়টায় ওঁকে সেভাবে পাইনি আমরা। আর এমনই দুর্ভাগ্য, আমি কলকাতা থেকে ফ্লাইটে উঠে অন্য শহরে যাওয়ার সময় খবর পেলাম, যোগেনদা আর নেই! আমার স্বামী সৌভাগ্যবশত ছিলেন যোগেনদার শেষ কাজে। 

এক বিরাট হীরকখণ্ড আমরা হারালাম। উনি শুধু নিজের জন্য বাঁচেননি, সবার মধ্যে ছড়িয়ে থেকে বেঁচেছেন। কত বড় শূন্যতা যে তৈরি হল!