ব্যস্ত বম্বে শহর। একটি জ্বালাময়ী ভাষণ। দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া আগুন। বারুদের স্তুপে উষ্ণ চুম্বন একাকী দেশলাই কাঠির। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শত-সহস্র আঠারোর স্পর্ধা। রাস্তায় কালো মাথার ভিড়, অগুনতি নারীপুরুষ, শৃঙ্খল টুটছে, গিঁটগুলো আলগা হচ্ছে ক্রমে। কারারুদ্ধ হচ্ছেন একের পর এক প্রথম সারির নেতা। রাষ্ট্রীয় খাকি উর্দিধারীদের গ্রেফতার করতে কোনও বিশেষ অনুমতি অপ্রয়োজনীয়, ন্যূনতম সন্দেহটুকুই যথেষ্ট। অবরুদ্ধ করা হচ্ছে সাংবাদিকদের কলম। রাতের আঁধারেও চলছে সর্বাঙ্গীন নজরদারি। যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানো নিষিদ্ধ। খানিক ভ্রম লাগে! এই ভারত তো আমাদের অচেনা নয়, শুধু সময়টা অচেনা। এই ভারত প্রাচীন, সময়ের সরণি বেয়ে ফিরে এসেছে বারবার। কড়া নেড়েছে শাসকের দরজায়, অচলায়তনে। কখনও জরুরি অবস্থার ছায়ায়, কখনও বিরানব্বইয়ের প্রবল শীতে সভ্যতার ক্ষত হয়ে। সাঁজোয়া গাড়ি আর সাইরেন পেরিয়ে আবারও একদিন রোদ-ঝলমলে সকালের গল্প বলেছে।
যদিও এই গল্প স্বাধীনতা-পূর্ব ভারতের। তখনও অলিতেগলিতে পতপত করে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। সিংহত্রয়ী দখল করে আছে দিল্লির মসনদ। অবিভক্ত উপমহাদেশ জুড়ে বিশ্বযুদ্ধের ডঙ্কা। প্রাক-পুজো সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির বম্বে অধিবেশন। বাংলার নেতারাও হাজির। মহাত্মা গান্ধী দাবি জানালেন পূর্ণ স্বাধীনতার। বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয়দের সমর্থন যে পাচ্ছে না, তা কার্যত নিশ্চিত বুঝেছিল ব্রিটিশ ভাইসরয়। গোয়ালিয়া ট্যাংক ময়দানে গান্ধী ডাক দিলেন, ‘ভারত ছাড়ো!’ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে গণবিক্ষোভ শুরু হয়। অদ্ভুতভাবেই গান্ধীর ভাষণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রায় সমগ্র প্রথম সারির নেতৃত্বকে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা হয়। যে বন্দিদশা চলে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। ‘জেল ভরো’। সুভাষচন্দ্র বসু তৎকালীন সময় ব্যাখ্যা করেছিলেন, ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলনের মাধ্যমে আদতে স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হচ্ছে!’ দেশজুড়ে ১৭টি ইংরেজি এবং ৬৭টি আঞ্চলিক ভাষার সংবাদপত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা হল।
আরও পড়ুন: জেন জি ও গান্ধী!
লিখছেন সম্প্রীতি চক্রবর্তী…
স্ট্যানফোর্ড ক্রিপস ছিলেন ভারতের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে। তাঁর উদ্যোগেই তৈরি হচ্ছিল ক্রিপস মিশন। ক্রিপস মিশন ব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল আগুন। কিন্তু এই ভারত ছাড়ো আন্দোলন নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলির অবস্থান কী ছিল? অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ-এর পাশাপাশি এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল হিন্দু মহাসভা-ও। অন্যদিকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি তখন বৈশ্বিক প্রেক্ষিতে ফ্যাসিবিরোধী অবস্থানের নিরিখে বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির পক্ষে। অমলেন্দু সেনগুপ্ত তাঁর ‘উত্তাল চল্লিশ অসমাপ্ত বিপ্লব’ বইয়ে লিখেছিলেন, “আসলে ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে কেউই বিশ্বজনীন প্রেক্ষাপটে যুদ্ধের স্বরূপ বিশ্লেষণে রাজি নন। কি সুভাষ বসুর অনুগামীরা-কি দক্ষিণপন্থী গান্ধীভক্ত কংগ্রেসী বা জয়প্রকাশের কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট দল— এই যুদ্ধ সকলেরই চোখে এক সুবর্ণ সুযোগ। এই যুদ্ধে যে ইংরেজ হারছে— এ-বিষয়ে সবাই নিঃসংশয়। ইতিমধ্যে সিঙ্গাপুর-রেঙ্গুনের পতন ঘটেছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। অতএব শেষ আঘাত হানো।”
কিন্তু ভারত ছাড়ো আন্দোলনের গুরুত্ব ছিল সেই সময়ে অপরিসীম। নেতাজির মহানিষ্ক্রমণ ও আজাদ হিন্দ ফৌজের হাত ধরে স্বাধীনতার স্বপ্নের জাল বোনা, এই ঘটনা ঘটছিল দেশের বাইরে। কিন্তু দেশে ব্রিটিশ শাসনের কফিনে শেষ পেরেক হিসেবে দেখা হচ্ছিল এই আন্দোলনকেই। ১৯৪২ সালের ৯ আগস্ট সমস্ত নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পরের বিস্ফোরণ ছিল অভাবনীয়। সুমিত সরকারের বিশ্লেষণে, “এতটা বোধহয় বড়লাট লিনলিথগো পর্যন্ত কল্পনা করতে পারেননি। এক অসম যুদ্ধের ময়দানে নামিয়ে কংগ্রেস নেতাদের আন্দোলনকে তিনি চূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের হিসেবে, কংগ্রেস বড় জোর ১৯৩২ সালের মতো দেশের এখানে ওখানে অসহযোগ আন্দোলনের ধাঁচে কিছু সরকার-বিরোধী জমায়েত হয়তো গড়ে তুলতে পারবে। সরকার বিব্রত হলেও, তার দ্বারা যুদ্ধপ্রচেষ্টা তেমন ব্যাহত হবে না। কিন্তু যা ঘটল তা অভাবনীয়। ১৯৪২ সালের ৩১শে আগস্ট বড়লাট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে এক গোপন তারবাতায় জানাচ্ছেন: ‘১৮৫৭ সালের পর এতবড় বিদ্রোহ ভারতের বুকে ঘটেনি। এর ব্যাপ্তি ও মারাত্মক চেহারার কথা আমরা সামরিক নিরাপত্তার খাতিরে কারও কাছে প্রকাশ করিনি।’”

কাট টু আজকের ভারত। বিগত কয়েক মাসের ব্যবধানে দুটো বৃহত্তর আন্দোলন দেখেছে দেশ। নিট কেলেঙ্কারিতে নাম জড়িয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। তারপর ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর সাম্প্রতিকতম প্রতিবেদন ও দেশব্যাপী গণবিস্ফোরণ। ক্যালেন্ডার বলছে সালটা ২০২৬ আর গুগল লোকেশন বলছে যন্তরমন্তরটা রাজধানী দিল্লিরই অংশ। কিন্তু তা মনে করিয়ে দিচ্ছে ঔপনিবেশিক ভারতের সেই পুরনো ছবিকে, কখনও বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে। প্রতিনিয়ত শাসক দলের রাজনৈতিক ভাষ্যে যে দুই দেশের নাম বারবার ঘৃণ্য উপমায় উচ্চারিত হয়, পুলিশি সক্রিয়তা খানিক তারই চিত্ররূপ এঁকে দিচ্ছে রাজধানীর বুকে। দিল্লি পুলিশের মধ্যে কোথাও কি ব্রিটিশ পুলিশের উত্তরাধিকার স্পষ্ট হচ্ছিল?
ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু মানুষকে তৎকালীন পুলিশ রীতিমতো গৃহবন্দি রাখার পরিকল্পনা করেছিল। স্বাধীন সংবাদমাধ্যম প্রহৃত হচ্ছে পুলিশের দ্বারা, এমন অভিযোগও উঠছে বারবার। মনে করে দেখলে, বিশাল সংখ্যক সংবাদমাধ্যমে নজরদারির পাশাপাশি ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় আতসকাচের নিচে এসেছিল গান্ধীর হরিজন পত্রিকা। নিষিদ্ধ হয় ন্যাশনাল হেরাল্ড, সৈনিক। ব্রিটিশ পুলিশ ‘বিপ্লব’ পত্রিকার প্রিন্টিং প্রেস সিজ্ করে। কংগ্রেস রেডিও ব্রডকাস্টার উষা মেহতা গ্রেফতার হন। ১৯৪২-এর অন্তিম লগ্নের পরিসংখ্যান খুললে দেখা যায়, প্রায় ৬০,০০০-এর কাছাকাছি স্বাধীন সাংবাদিক, লেখক ও প্রকাশক কারারুদ্ধ হয়েছিলেন ঔপনিবেশিক পুলিশের হাতে। তারপর স্বাধীনতার চাকা ঘুরল। কালচক্রে হাত রেখে অদৃষ্ট ইতিহাস লিখে চলেছে নিজের নিয়মে। মশালের হাতবদল হয়, কলমেরও। তবু সমাজ-দর্পণে শাসকের চেহারা একই থাকে।




