পাঁচের পাতা থেকে কাগজ পড়া শুরু হলে যেমন হয় আর কি! যোগেনদার সঙ্গে মুখোমুখি মোলাকাত, কলাভবনে স্নাতকোত্তর পড়তে যাওয়ার সময় থেকে। তার অনেক আগেই যদিও ওঁর সম্বন্ধে একটা ধারণা হয়েছিল, কিন্তু সেটা একটা সংগৃহীত ধারণা। একেবারে ফার্স্টহ্যান্ড যাকে বলে, তা ওই ১৯৯৭-’৯৮। ততদিনে তিনি বাঘকে চাঁদের স্বাদ পাইয়েছেন অগণিত রেখার আঁচড়ে; নীল কুর্তা পরা নেতা, ঢাউস কুমড়ো, প্রাগৈতিহাসিক ফুল আর নানাবিধ মুখাবয়ব কাগজে-ক্যানভাসে এঁকে ফেলেছেন। দেশ-বিদেশে নামডাক করে ফেলেছেন। উইভার্স সার্ভিসে কাপড়-কার্পেটের নকশা করেছেন, রাষ্ট্রপতি ভবনের ছবির ভাণ্ডার দেখভাল করেছেন। ফলে শিল্পজগতে তিনি লব্ধ প্রতিষ্ঠিত, যখন কলাভবনের অধ্যাপনায় যোগ দিচ্ছেন।
সেই সময়ে তাঁর মুখোমুখি হওয়া, সঙ্গলাভ, দু’বেলা একসঙ্গে কাটানো ছিল এক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর সঙ্গে দিনযাপন। তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠা বা পূর্বাশ্রমের সম্বন্ধে কোনও ধারণাই তৈরি হয়নি আমার। ওই পাঁচের পাতা থেকে কাগজ পড়ার মতো। ফলে আমার কাছে তাঁর পরিচিত এক সফল মানুষ হিসাবেই; কিন্তু সেই উচ্চাসনে আসীন এক ব্যক্তির মাটিতে হাঁটাচলা দেখে বোধ হত ইনি ব্যতিক্রমী। ক্রমে তাঁর ধারাবাহিক কাজের পরিচয় পেতে-পেতে এক অতি সাধারণ মানুষের খোঁজ পেয়ে গিয়েছিলাম। তাঁর ছবি আর তিনি নিজে, এই দুইয়ের মধ্যেই নিরাভরণ কিন্তু তীক্ষ্ণ, বিনয়ী কিন্তু বলশালী, কৌতুকী কিন্তু অকপট চরিত্রলক্ষণ পাই। আর যেটা পাই, তা হল সাংঘাতিক গোছানো এক চরিত্র। নিপুণ গৃহিণীপনায় মজানো কাজ৷ রোজনামচার খাতা থেকে ঠিকানা-লিখে-দেওয়া চিরকুট— সবেতেই লক্ষ্মীমন্ত।
কলাভবনে তিনি আমার সরাসরি মাশ্টারমশাই ছিলেন না, কিন্তু পথপ্রদর্শক ছিলেন। সাধারণ, অতি সাধারণ, নগণ্য, জঘন্য, নানান চরিত্রের সঙ্গে অকপট মেশা ছিল তাঁর। আর সেই সব চরিত্ররাই কখনও পরাবাস্তবতার নির্যাসে, কখনও-বা যাবতীয় মুখব্যাদান নিয়ে মুখোমুখি হত আমাদের। খিঁটখিঁটে, পিটপিটে, কুচুটে, ধড়িবাজ, ক্লিষ্ট, রুষ্ট, আহত, পীড়িত, ভোগী, কামুক, বিষণ্ণ এমন নানাবিধ চরিত্র। সমাজের আনাচ-কানাচের মানুষ তারা সব। নাকা চেকিং করার মতো খুঁজে এনে দিয়েছেন তাদের। কালিতে, কলমে, তুলিতে, প্যাস্টেলে। এবার দর্শক বুঝবে সেই চরিত্রদের নিয়ে কী করা যাবে। ভার তাদের ওপর।
এই রোজকারের দৃশ্যচিত্রণে জটিলতা নেই বেশি, কিন্তু শিল্প-উপাদান প্রচুর। এটা বুঝেছিলাম যে, সামান্য অনুষঙ্গে এহেন কাজ করতে গেলে মাটিতে পথ হাঁটতে হয় প্রতিনিয়ত, অকপট হতে হয় এবং হতে হয় সুগৃহিণী। আলুথালু রেখাগুলো শাখানদীর মতো। কখনও জলসিক্ত, কখনও রুক্ষ। বলিরেখার মতো। সময়প্রবাহের চিহ্ন। ওঁকে নকল করেই রোজনামচার খাতায় আঁক কাটি প্রতিদিন। টুকরোটাকরা কথা লিখে রেখে লুকিয়ে রাখার মতো। একদিন ওই কথারা শিরোনাম হয়ে যায় প্রদর্শনীর। ‘Bhupen never love woman’, ২০১৩ সালে আঁকা এক ছবির শিরোনাম৷ ‘Monument to the dead’, ২০০৬-এ আঁকা আরেকটা কাজের শিরোনাম। এবারে প্রশ্ন হল, এ-সমস্ত নিছকই কি কোনও শিরোনাম? মনে হয় না। এগুলো আসলে সবই কথোপকথন, এক-একটা সময়ের সঙ্গে।

যোগেনদা এভাবেই আমাদের ধরাছোঁয়ার মধ্যে চলে এলেন। প্রতিষ্ঠা ওঁর জন্য কোনও ‘এলিভেটেড লাইফ’ তৈরি করতে পারেনি। এর আরেকটা কারণ ছিল উদ্যম। সংগঠিত থাকা, সংঘ তৈরি করার চেষ্টা করা নিরন্তর। ‘স্বাদ’ থেকে ‘চারুবাসনা’, ‘কবিতা সংগ্রহ’ থেকে ‘আর্টইস্ট’ পত্রিকা প্রকাশ তার প্রমাণ। দীর্ঘদিন ধরে শিল্প-পত্রিকা প্রকাশের ইচ্ছা, আলোচনা চলতেই থাকত বাইপাস কানেক্টরের ওপর নান্দীমুখের বাড়িতে। হঠাৎই একদিন ঝাড়াখাড়া দিয়ে উঠে পত্রিকা নিয়ে লাফিয়ে পড়লাম সবাই— আমি, তাপসদা, মধুচ্ছন্দা, রুচিরা, সৌমিক। যোগেনদার দাদা ঝন্টুদা, মানে মণীন্দ্র চৌধুরী ক্যাশিয়ার আর শিল্প-ইতিহাস নিয়ে সদ্য-পাশ-দেওয়া সোমা ভৌমিক সম্পাদক। সবার ওপরে যোগেনদা। প্রথম সংখ্যার অর্থ যোগালেন তিনি। ঘটা করে উদ্বোধন, ভবিষ্যৎকথা সবই হল। তারপর দ্বিতীয় সংখ্যা। সেবারও তিনি জোগালেন অর্থ। তারপর তার উদ্যোগে অর্থ জোগালেন প্রশান্ত তুলসিয়ান, সত্যম রায়চৌধুরী। যোগেনদা দেশ-বিদেশে যান আর সেখানকার শিল্পের প্রকাশনা নিয়ে আসেন। আমরা নিঃশঙ্ক চিত্তে চা-সিঙারা সহযোগে পত্রিকার ভূতভবিষ্যৎ চিন্তা করে যাই। ক্রমে বাসাবদল। নান্দীমুখ থেকে চারুবাসনা-য়।



কোভিড এল। আমি কলকাতার দুর্গাপুজোর মাঠে কাজ করি নিয়মিত। কোভিডের জন্য পুজোর কাজ ম্রিয়মাণ। সরকারি ফরমান পালন করতে-করতে দিশাহারা আমরা সবাই। ২০২১ সালে আরও টালমাটাল অবস্থা। সেবার আমি ঠাকুরপুকুর স্টেট ব্যাঙ্ক পার্ক পুজোকমিটির কাছে দায়বদ্ধ। তাদের অনুরোধ করে সুরুল গ্রাম থেকে কমল মালাকার নামে এক শোলাশিল্পীকে দিয়ে সাজ বানাই। আর যোগেনদাকে অনুরোধ করি একটা চালচিত্র এঁকে দিতে। প্রস্তাব শুনেই উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। আমি ওঁকে বলেছিলাম যে, মাউন্ট করা একটা কাগজ, চালির মাপে কেটে ওঁর সাউথ সিটির বাড়ির স্টুডিয়োতে রেখে আসব। যদি মনে হয় দুটো-একটা দাগ দেওয়ার, যেন দেন। ইচ্ছা না হলেও অসুবিধা নেই, কেননা এটা নিজেদের কাজ। মনে আছে, চতুর্থীর দিন সকালে যোগেনদার ফোন, ‘একটা চেষ্টা করলাম৷ এসে দেখো তো কাজের হল কি না!’ দৌড়ে গিয়ে দেখি এক আজব দৃশ্য। ভেবেছিলাম বুঝি দশ মহাবিদ্যা বা দশাবতার আঁকবেন উনি। দেখি এঁকেছেন ফোলিয়েজ। ফুল-লতাপাতার এক জড়ানো লাউমাচা। ধর্মচক্র মুদ্রার বুদ্ধের মাথার চারপাশে যেমন লতাগুল্মের বলয় থাকে, তেমন দৃশ্য। আপ্লুত আমি। সোজা নিয়ে ঠাকুরের চালচিত্রে সেঁটে দিলাম। দেবীপক্ষের অঞ্জলি। আধুনিক মননের সাক্ষাৎচিহ্ন।

তারপর এক সেরামিক্স ওয়ার্কশপে থাকার জন্য আব্দার করেছিলাম। ভাস্কর শিল্পীবন্ধু সুরজিৎ বণিকের ডেরায় ‘নির্মাণ’ শিরোনামে এক রাকু সেরামিক্সেরর ওয়ার্কশপ। যোগেনদা প্রায় রোজ আসতেন। মাটিতে কাজ করতেন। কিম্ভুত-অদ্ভুত কিছু পোর্ট্রেট বানাতেন আর মন দিয়ে আমাদের কথা শুনতেন। পুড়িয়ে নেওয়ার পরে দেখি সেগুলো অজস্র বলিরেখাতে সজ্জিত। ছবির মতো মূর্তি।
এভাবেই কাটাকুটিদের উত্তরণ হয়। কাগজ থেকে মাটিতে, মাটি থেকে পোড়া মাটিতে, ঠিকানা-লেখা চিরকুট থেকে প্রতিমার চালচিত্রে— সর্বত্র বিরাজমান তিনি। তাঁর অগুনতি খাতা দেখেছি আমি। কলকাতার দেবভাষা শিল্পসংস্থা থেকে ওঁর খাতার ফ্যক্সিমিলি প্রকাশিত হয়। ৫২ নম্বর খাতায় এক জায়গায় চোখ আটকে গিয়েছিল কলকাতা বিয়েনালে-র সাংগঠনিক নকশায়। ইচ্ছা ছিল ওঁর সেরামিক্সের একটা বিভাগ রাখার। আর সেখানে অনেকের সঙ্গে আমার নামটাও লিখে রাখা আছে দেখলাম। অভাবনীয়। আমি কীই-বা গুরুতর কাজ করতে পেরেছি সেরামিক্সের যে উনি মনে রেখেছেন! কিন্তু এই শনাক্তকরণটাই কাজ। পেট-পিঠের ক্ষতরূপ মূর্ত করা আর আনাচ-কানাচ থেকে শিল্পচর্চাকার খুঁজে আনা— যোগেনদা দুটোই পারতেন। তাই ভারতশিল্পের চালচিত্রে আলপনার মতো অনায়াস চলনে অক্ষয় থাকবে তাঁর নাম।
ছবি সৌজন্যে: লেখক



