জীবনের সেই অংশটা ছিল তুখোড় উত্তেজনার, প্রায় স্বাধীনতা সংগ্রামের মতো। বাড়িতে টিভি ছিল না। আর, মায়ের দৃঢ় ধারণা ছিল ষোলো বছর বয়সের আগে সিনেমা, বিশেষত ‘হিন্দি সিনেমা’ দেখলে, মহাপাতকী হওয়া অবধারিত। পরিচিত পরিধিতে পইপই বলে রাখা ছিল, কোনও টিভিওয়ালা বাড়িতে গিয়ে যেন সিনেমা গিলতে না বসি। অতএব, যা হওয়ার তা-ই হল। ইংরেজরা যেমন ভারতীয়দের ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি, তেমন আমাকেও কেউ পারল না। ক্লাস এইট-নাইনে উঠেই স্ক্যাপুলার জায়গায় গজাল দুটো ডানা। এবং, আড়ালে স্কুলব্যাগের ভেতর আশ্রয় পেল একটা চকলেট-রঙা টি-শার্ট। শঙ্করদার সেলুনে ঢুকত স্কুলের সাদা জামা-পরা এক ক্যাবলা কিশোর। আর, বেরিয়ে আসত চকলেট রঙের ডানাওয়ালা এক বেশরম বুভুক্ষু। তার চোখে-বুকে হাঁকপাঁক করছে এক সুবিশাল অন্ধকার গুহায় ছিটকে ছিটকে পড়া সোনালি-রুপোলি ফুলকির খিদে, যার নাম ‘সিনেমা’।
পকেটে টাকাপয়সা থাকত না। সুতরাং, কোনও বাছবিচারও থাকত না। বন্ধু বা বন্ধুনীদের কাছ থেকে দু’-তিন টাকা জোগাড় করতে পারলেই, ব্যস, সেদিনের মতো স্কুল কেটে হত্যে দিতাম তখনকার সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমাহলের সামনে। এমনকী, টাকা না পেলে, বহুবার বিনা-টিকিটেও ঢুকে পড়েছি হাফ-টাইমের সময়ে। কী উপায়ে সেসব করা যায়, সে-নিয়ে আজকাল কোর্স করালেও লাভ নেই। কারণ, সিঙ্গল স্ক্রিন ব্যাপারটাই এখন ডাইনোসর।
আরও পড়ুন: সবাই ভাবত বদমেজাজি, কিন্তু নানা ছিল সত্যিকারের ‘মেথড অ্যাক্টর’!
লিখছেন গৌতম ঘোষ…
বাছবিচারহীন খিদের সবথেকে উপকারী দিক হল, সব কিছুই অতি অমৃত মনে হয়। ফলে, যে-সিনেমাই পাচ্ছি, হাঁ করে দেখছি; কোনও-কোনওটা বার বার দেখছি। পর্দার সেইসব প্রেম, মারামারি, গান, হাসি, কান্না, মায় আবহসংগীত হয়ে উঠছে আমারই এক-একটা কোষ। জীববিদ্যার নিয়মে, পরবর্তী বছরগুলোতে সেসব কোষের অধিকাংশ মৃত; বা, খসে পড়েছে শরীর থেকে। আবার, কিছু-কিছু থেকে গিয়েছে অজর, অক্ষয়। যেমন, ‘ক্রান্তিবীর’ (১৯৯৪)।
নামটা আবিষ্কার করলাম পোস্টারে— নানা পাটেকার। সেই প্রথম দেখলাম, মেইনস্ট্রিম হিন্দি সিনেমায় এমন একজন হিরো, যাঁর গায়ের রং কালো; মাথায় খোঁচা-খোঁচা চুল; একগাল দাড়ি। বাজারের বলে দেওয়া ‘সুপুরুষতা’-র চামড়া চড়চড় করে ছিঁড়ে ফেলেছেন তিনি। অন্ধকার গুহায় বসে সেই প্রথম দেখলাম, নায়ক প্রতাপ নারায়ণ তিলকের চরিত্রে, সংলাপ উচ্চারণে, দৈহিক ভঙ্গিতে তাচ্ছিল্য, বিদ্রূপ আর তির্যকতার কী অবিরাম অগ্ন্যুৎপাত! এমনকী, বস্তির যে-নারীকে (‘কলমওয়ালি বাঈ’ মেঘা দীক্ষিত; অভিনয়ে, ডিম্পল কাপাডিয়া) সে আলতো পছন্দ করে, তাকেও ব্যঙ্গ করতে রেয়াত করে না।

সেই সময়ে অমিতাভ বচ্চন আর মিঠুন চক্রবর্তীর একচেটিয়া সম্মোহন ঢলে পড়েছে অস্তাচলে। হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে কাঁধে ধরে রেখেছেন সানি দেওল, জ্যাকি শ্রফ, সঞ্জয় দত্ত, আর অনিল কাপুর। সবেমাত্র পায়ের তলায় মাটি পেতে শুরু করেছেন আমির খান। সলমান খানের জমি তখনও নড়বড়ে। অজয় দেবগণ, অক্ষয় কুমার, আর শাহরুখ খানের ফুল ফুটতে তখনও দেরি আছে। এসবের মাঝে দুর্দম দাপটে ঢুকে পড়লেন নানা পাটেকার। একের পর এক সিনেমা হিট, সুপারহিট হতে থাকল শুধুমাত্র তাঁর ক্যারিশমায়।
উদাহরণ চাই? জুলিয়া রবার্টসের ‘স্লিপিং উইথ দ্য এনিমি’-র (১৯৯১) কাহিনি অবলম্বনে হিন্দিতে পর পর তৈরি হল তিন-তিনটে ফিল্ম! নায়িকার ভূমিকায় মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়ে ‘ইয়ারানা’ (১৯৯৫), জুহি চাওলাকে নিয়ে ‘দরার’ (১৯৯৬), আর মনীষা কৈরালাকে নিয়ে ‘অগ্নি সাক্ষী’ (১৯৯৬)। একই কাহিনির ভিত্তিতে বাংলায় দেবশ্রী রায়কে নিয়ে হল ‘ভয়’ (১৯৯৬); আর, ওড়িয়াতে অর্চিতা সাহুকে নিয়ে হল ‘মু সপনর সৌদাগর’ (২০০৮)।
‘ইয়ারানা’ আর ‘দরার’-এ নায়কের ভূমিকায় ছিলেন ঋষি কাপুর। দুটোতেই ছিল মন-দোলানো গান (‘মেরা পিয়া ঘর আয়া…’ কিংবা ‘দিওয়ানা দিওয়ানা…’)। তা সত্ত্বেও, দুটোরই ফ্লপ হওয়া আটকাতে পারল না কেউ। ওদিকে, ‘অগ্নি সাক্ষী’-তে পজেসিভ, অবসেসিভ বিশ্বনাথের চরিত্রে নানা-র হিমশীতল অভিনয় মনজয় করল সকলের। সেই বছরের যে-পাঁচটা হিন্দি সিনেমাকে ‘সুপারহিট’ তকমা দিল এক সর্বভারতীয় ইংরেজি পত্রিকা, সেগুলোর মধ্যে প্রথম নাম ছিল ‘অগ্নি সাক্ষী’-র। আর, শুধু তা-ই নয়। খল চরিত্রে কাজ করেও নানা-র নাম উঠে এল ‘টপ হিরো’-র তালিকায়; আমির খান, সলমান খান, গোবিন্দা-র পাশে। আরেকটা মজার কথা। সে-বছরের ‘ফ্লপ হিরো’-র তালিকায় প্রথম নাম ছিল শাহরুখ খানের! হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন (তথ্যসূত্র: ‘১৯৯৬: ব্লাড অ্যান্ড বোর’, ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’, ডিসেম্বর ২৭, ১৯৯৬)।

শাহরুখের প্রথম স্টারডমের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন নানা; ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’-এ (১৯৯২), এক পথচলতি দার্শনিকের চরিত্রে; যে অনর্গল ভাষণ দেয় দুনিয়াদারি নিয়ে। ওই সিনেমার আগে পর্যন্ত আউটডোর শুটিংয়ে কিং খানের নিরাপত্তার জন্য আলাদা কোনও ব্যবস্থা রাখতে হত না। সেই সময়ে হিমাচল প্রদেশে চলছিল ‘মায়া মেমসাব’-এর (১৯৯৩) শুটিং। প্রথমদিকে খোলামেলা রাস্তায় কাজ করলেন শাহরুখ, কোনও অসুবিধাই হল না। সমস্যা শুরু হল তখন, যখন সেই সপ্তাহেই রিলিজ হল ‘রাজু বন গয়া জেন্টলম্যান’। উসকোখুসকো চুলের নতুন নায়ককে দেখতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ভিড়। তড়িঘড়ি ইউনিট গুটিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হলেন পরিচালক কেতন মেহেতা। আউটডোরের বাকি দৃশ্য নেওয়া হয়েছিল স্টুডিয়োর ভেতরে, ফিল্মমেকিংয়ের পরিভাষায় যাকে বলে ‘চিটিং’। এই ঘটনা আমি শুনেছি ‘মায়া মেমসাব’-এর সিনেমাটোগ্রাফি টিমের সদস্য রাজেশ শাহের কাছে।
নয়ের দশকে কেমন ছিল নানা-র রাজপাট? আরেকটা উদাহরণ দিই। অমিতাভ বচ্চনের কেরিয়ারে, নিজের প্রযোজনা সংস্থায়, ‘কামব্যাক ফিল্ম’ হিসেবে গণ্য ‘মৃত্যুদাতা’-য় (১৯৯৭) জেলখানার ভেতরে একটা দৃশ্য আছে, যেটা কাহিনির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই দৃশ্যে অনেক কয়েদি একসঙ্গে বসে টিভিতে দেখছে ‘ক্রান্তিবীর’। কোন জায়গাটা চলছে সেই ফিল্মের? যেখানে চূড়ান্ত উন্মাদনায় প্রতাপ বস্তিবাসীদের বলছে, হিন্দুর রক্ত আর মুসলমানের রক্ত মিশিয়ে দিলে কীভাবে কেউ আলাদা করবে কোনটা কোন ধর্মের? স্রষ্টা যেখানে কোনও তফাত করেনি, সেখানে আমরা কোন হরিদাস তফাত করার?
নানা পাটেকারের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণই ছিল তাঁর সংলাপ উচ্চারণ। ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ, হাসি, কান্না— প্রকাশ করতে হোক যেমনই আবেগ, দর্শক একাত্ম হয়ে পড়ত তাঁর ব্যারিটোন কণ্ঠের সঙ্গে। আর, এহেন জনপ্রিয়তার ফর্মুলাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিলেন তিনি। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’ (১৯৯৬) দেখতে এসে একপ্রকার ঠকেই গেল এক শ্রেণির দর্শক। এ কী! তাদের প্রিয় অভিনেতার মুখে একটাও সংলাপ নেই! উদ্বিগ্ন, বিধ্বস্ত পিতা জোসেফ ব্রাগাঞ্জার চরিত্রটাই বোবা ও কালা! কিন্তু, নানা-র চোখ আর শরীরের কাব্যিক অভিনয় দেখে, আবারও প্রেমে পড়তে বাধ্য হল অডিয়েন্স। সংগীত অনুধাবনে অক্ষম জোসেফের সঙ্গে যেভাবে ক্রমশ দূরত্ব তৈরি হয় কন্যা অ্যানির (অভিনয়ে, মনীষা কৈরালা)— তা দেখে বুক মুচড়ে ওঠেনি, এমন পাষাণ হয়তো কমই আছে।

এই সূত্রে আরেকটা কথা মাথায় এল। কোন-কোন অভিনেত্রী কোন-কোন নায়কের সঙ্গে প্রেমিকা বা স্ত্রী-র ভূমিকায় কাজ করেছেন, আবার বয়স খানিক বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েছেন একই নায়কের মায়ের ভূমিকায় আসতে— তা নিয়ে মাঝে মাঝেই লম্বা-চওড়া বক্তব্য দেখি এদিক-ওদিক। কথাটা ভুল নয়। পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোতে বয়স্ক নায়ককে আমরা দিব্যি মেনে নিই; কিন্তু, চল্লিশ-পেরনো নায়িকাকে মেনে নিতে মুশকিল হয় আমাদের। এক অর্থে, এখানেও, নানা ছিলেন ব্যতিক্রম। কেরিয়ারের তুঙ্গে, একই অভিনেত্রী, মনীষা কৈরালার সঙ্গে তিনি পর পর কাজ করেছেন স্বামী (‘অগ্নি সাক্ষী’, ১৯৯৬), পিতা (‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’, ১৯৯৬) এবং এক আশ্চর্য প্রেমিকের (‘যুগপুরুষ’, ১৯৯৮) চরিত্রে।
দর্শককে বশীভূত করতে পারতেন তিনি, তাঁর কাজের প্রেমে পড়তে। যেমন, ‘থোড়াসা রুমানি হো যায়েঁ’-তে (১৯৯০) গ্রামে বৃষ্টি আনতে এসে, নায়িকা বিন্নিকে (অভিনয়ে, অনিতা কাঁওয়ার) আত্মবিশ্বাস জোগায় তাঁর জাদুকরের চরিত্র। বা, ‘ওয়জুদ’-এ (১৯৯৮) তাঁর নাট্য-নির্দেশকের চরিত্র নায়িকা অপূর্বাকে (অভিনয়ে, মাধুরী দীক্ষিত) শেখায় কীভাবে আঁখি-উপকূল কয়েক মুহূর্তে হয়ে উঠবে অশ্রু-টলমল। এই ফিল্মেই, জাভেদ আখতারের লেখায়, তাঁর আবৃত্তি করা ‘ক্যায়সে বাতাউঁ ম্যাঁয় তুমহে মেরে লিয়ে তুম কউন হো…’ পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছে প্রণয়গাথার এক অবিস্মরণীয় প্রদীপ। আবার, সেই নানা-ই যখন ‘তৃষাগ্নি’-তে (১৯৮৮) এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, যে ভেতরে-ভেতরে দগ্ধ হয়ে চলেছে শরীরী তাড়নায়, তখন তাঁর নিশ্চল দৃষ্টি আমাদের ভাবায় প্রেম, কাম, মানবজীবন, আর মানুষের জন্য মানুষের তৈরি করা হাজারও রীতিনীতির দ্বিধা।

নানা পাটেকারের অভিনয়ে বেশ কিছু চরিত্র থাপ্পড় মেরেছে আমাদের প্রথাগত উঁচু-নীচুর নিগড়ে। যেমন, তথাকথিত ‘ছোটলোক’ কোগা-র কাছে তুচ্ছ হয়ে যায় স্বর্গে গিয়ে মোক্ষলাভের মোহ (‘দীক্ষা’, ১৯৯১)। বম্বের মতো হইহই বৈভবের শহরে পরিযায়ী শ্রমিকের দুর্দশা দেখায় বসন্ত মান্ড্রে (‘দিশা’, ১৯৯০)। আবার, ‘হু তু তু’-তে (১৯৯৯) বিদ্রোহী কবি ভাউ হয়ে তিনি দেখিয়েছেন এ-দেশের চির-অস্থির রাজনীতি।
‘অঙ্কুশ’ (১৯৮৬), ‘পরিন্দা’ (১৯৯০), ‘প্রহার: দ্য ফাইনাল অ্যাটাক’-এর (১৯৯১) মতো গুরুগম্ভীর সিনেমায় তিনি বহুচর্চিত। কিন্তু, ছোটদের জন্য তৈরি করা ফিল্ম— যা ভারতে মোটামুটি দুর্লভ— সেখানেও সমান সাম্রাজ্য ছিল তাঁর। ইয়াব্বড় পাকানো গোঁফ, গায়ে ঝলমলে জোব্বা, আর কপালে টকটকে লাল তিলক আঁকা একটা ভয়ংকর ভূত, রাণা দিগ্বিজয় সিং ক্রমশ নত হতে থাকে শিশুদের কাছে (‘অভয়’, ১৯৯৪)। বিস্তীর্ণ অরণ্যের মাঝে সখারাম ওরফে গণপতরাওয়ের প্রেতাত্মা হয়ে ওঠে বালক চিকলু-র (অভিনয়ে, সক্ষম কুলকার্নি) বন্ধু (‘পক পক পকাক’, ২০০৫)।
অনুরাগ কাশ্যপের পরিচালনায় প্রথম সিনেমা, ‘পাঁচ’ (২০০৩), যা এখনও পর্যন্ত আইনিভাবে রিলিজ হয়নি। বেআইনি পথে যারা দেখেছে, তারা জানে কাহিনিটা নেওয়া হয়েছিল পুনের জোশি-অভয়ংকর খুনের ঘটনা থেকে। সেই একই ঘটনার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল ‘মাফিচা সাক্ষীদার’ (১৯৮৬)। অভিনয়ের আঙিনায় কী অসম্ভব সাংঘাতিক হয়ে উঠতে পারতেন নানা পাটেকার, তাঁর চরিত্র-চিত্রণে অপরাধবোধ কীভাবে পেত বিষাদের ছায়া— প্রত্যক্ষ করার জন্য, হে পাঠক, এই সিনেমাটা দেখুন।

কেবলই কি ভয়, ভালবাসা, হিংসা, রাজনীতি ছিল তাঁর অভিনয়ের পরিসরে? উঁহু, হাস্যরস বিতরণেও তিনি ছিলেন রাজা। ‘কোহরাম’-এর (১৯৯৯) মতো সিরিয়াস সিনেমায়, ইনস্পেক্টর কিরণ পাটকারের (অভিনয়ে, তাবু) স্নানদৃশ্য— যা প্রায় সাড়ে পাঁচ মিনিট ধরে চলে— সেখানে হঠাৎ পৌঁছে যাওয়া বসু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (বিবিসি) ওরফে মেজর অজিত আর্যের আচরণ আর সংলাপ বলার ধরন দেখলে হাসি উথলে উঠবে না, এমন গোমড়াথেরিয়াম নিশ্চয়ই দুর্লভ! আবার, ‘ওয়েলকাম’-এর (২০০৭) ডন উদয় শেট্টি, যার একান্ত স্বপ্ন জীবনে সে একটিবার সিনেমায় অভিনয় করবে— আর, তাই তাকে বোকা বানিয়ে রাস্তায় রোদ্দুরে ঘোরানো হয় আলু-পেঁয়াজের ঠেলাগাড়ি নিয়ে, অথচ পরনে তখন তার ধোপদুরস্ত স্যুট!
‘পরিন্দা’-র অন্যতম লেখক ছিলেন শিবকুমার সুব্রমনিয়ম। মুখ্য চরিত্রে শিবকুমারকে নিয়ে শ্রীরাম রাঘবন বানিয়েছিলেন তাঁর এফটিটিআইয়ের স্টুডেন্ট ফিল্ম, ‘দ্য এইট কলাম অ্যাফেয়ার’ (১৯৮৭)। সেই সিনেমায় মাত্র পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের জন্য পর্দায় এসেছিলেন নানা পাটেকার। কী প্রয়োজন ছিল তাঁর, এক অখ্যাত ছাত্রের শর্ট ফিল্মে কাজ করার? হিন্দি আর মারাঠি মিলিয়ে ততদিনে তিনি অভিনয় করেছেন দশটিরও বেশি সিনেমায়! নাটকের দুনিয়ায় ‘স্টার’ তো বটেই, সিনেমার জগতেও মোটামুটি পরিচিত মুখ তখন তিনি! এখন বুঝতে পারি, আসলে কাজের প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর; আগ্রহ ছিল যে-কোনও সুযোগে নিজের শিল্পকে পালিশ করে চলার। ‘পরিন্দা’-তেই অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন সঞ্জয় লীলা ভনসালি; যাঁর নিজের পরিচালিত প্রথম ফিল্মে আমরা নানা-কে পেয়েছিলাম বোবা-কালা রূপে।
খুব কম অভিনেতাই পারেন তাঁর শিল্পের এত কাছাকাছি যেতে, যাঁকে পর্দায় দেখে মনে হয় এ তো আমার মতোই রক্তমাংসের মানুষ! আমার কাছে নানা পাটেকার তেমন একজন। অভিনয়-শিল্প সম্বন্ধে কাটা-ছেঁড়া করার যোগ্যতা আমার নেই। তবে, দর্শক হিসেবে এটুকু ধরতে পারি, থিয়েট্রিক্যাল আর সিনেমাটিক— দুই ধরনের অভিনয়-ধারাকেই আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন তিনি। পর্দায় কথা বলত তাঁর সম্পূর্ণ শরীর। আর, শরীর যখন স্থির, যখন সেভাবে কোনও ‘অ্যাকশন’ নেই দেহের— তখন ভাবপ্রকাশে সঙ্গত দিত তাঁর বাঙ্ময় দুটি চোখ। একই সিকোয়েন্সে দাঁড়িয়ে কীভাবে অনবরত বদলে যেতে পারে দৃষ্টির ভাষা, সে-নিয়ে ভবিষ্যতের কাছে উদাহরণ হয়ে থাকবে ‘শক্তি: দ্য পাওয়ার’-এর (২০০২) ক্লাইম্যাক্স।




