মানব চিড়িয়াখানা
এখন শুনলে আঁতকে উঠতে হয়, কিন্তু মাত্র সাত-আট দশক আগেও ইউরোপের ‘সভ্য’ দেশগুলোতে মানব-চিড়িয়াখানা বা ‘হিউম্যান-জু’ ছিল আকর্ষণীয় এক বিনোদনের জগৎ। ইউরোপীয় শারীরিক গঠনকে স্ট্যান্ডার্ড বা মানদণ্ড ধরে বিশ্বের অপেক্ষাকৃত পিছিয়ে থাকা দেশ, বিশেষ করে আফ্রিকার নানা দেশ থেকে স্থূলকায়, খর্বকায়, শীর্ণকায় কিংবা গঠনগত শারীরিক ভিন্নতার মানুষজনকে এইধরনের চিড়িখানায় ধরে আনা হত; রাখা হত পশুপাখির পাশাপাশি, কখনও বা একসঙ্গেও।
রবিবারের বিকেলগুলো হত জমজমাট। জার্মানির হ্যামবার্গ শহরের কার্ল হ্যানবেক স্থাপিত মানব-চিড়িয়াখানায় ফি-রোববার দশ হাজারেরও বেশি দর্শক সমাগম হত। তারজালির ভেতরে থাকা ‘পশুবৎ’, ‘অনগ্রসর’ মনুষ্যজগৎকে দেখে তারা যারপরনাই আহ্লাদিত হত এবং উৎকোচ হিসেবে তাদের দিকে কলাটা-মুলোটা ছুড়ে দিত। শিম্পাঞ্জী-হনুমান দেখলে এখনও বাচ্চারা যেমনটা করে আর কী!
এমনটাই চলছিল। কিন্তু মনুষ্যচিত্ত এমনই মেজাজি যে, একই বিনোদন তাকে দীর্ঘকাল আনন্দ দিতে পারে না। তাই দর্শকদের চিত্তাকর্ষণের লক্ষ্যে এবং মানব-চিড়িয়াখানাকে আরও নান্দনিক করে তুলতে এরপর এর সঙ্গে যুক্ত হল নানারকম ‘টাস্ক’ বা ‘পারফরমেন্স’। এই প্রসঙ্গে অটো বেঙ্গা বা সারা বার্টম্যান, ওরফে হটেনটট ভেনাসের কথা অনেকেই শুনে থাকবেন। বেঙ্গাকে রাখা হত ওরাংওটাঙের খাঁচায়— হনুমানের সঙ্গে তাঁর যে কী আশ্চর্য মিল, তা পারফর্ম করে দেখানোই ছিল বেঙ্গা-র টাস্ক। আর বার্টম্যানকে তোলা হত প্রদর্শনীতে, তাঁর টাস্ক ছিল আরও ভয়ংকর। তাঁকে মাদকাচ্ছন্ন করে, গলায় চেন পড়িয়ে ঘোরানো হত মঞ্চে। তাঁর নিরাবরণ শরীর, বিশেষ করে স্টিয়াটোপিজিয়া নামক অসুস্থতার কারণে তাঁর বিশেষভাবে উত্থিত উন্মুক্ত পশ্চাৎদেশ প্রদর্শন করে প্রকাশ্য মঞ্চে তার ওপর যে যৌন নিগ্রহ চলত, সে-ইতিহাস গোপন থাকাই ভাল!

আরও পড়ুন: লুকিয়ে দেখা, যৌনসুখ ও ক্যামেরা!
লিখছেন বিজলীরাজ পাত্র…
এখন শুনতে অবাক লাগলেও, সত্যি এটাই যে, বিনোদনের এই অত্যাশ্চর্য জগৎ কিন্তু্ মানব সভ্যতার ইতিহাসে চারশো বছরেরও বেশি সময়— ষোড়শ থেকে বিশ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল। তারপর নাকি মানুষ ক্রমে সভ্য হল, সকল মানুষের সমান অধিকার ও দাবিদাওয়ার বিষয়টি জোরালো হল। প্রান্তিক এবং পশ্চাৎপদ মানুষের নিরাপত্তা তথা তাদের উন্নয়নকার্যে একাধিক বৈশ্বিক সংস্থা ও সংগঠন নির্মিত হল। এবং এর অত্যাবশ্যক কর্মসূচি হিসেবে মানব-চিড়িয়াখানা নামক অভিশাপের হাত থেকে মানবজাতির মুক্তি ঘটল।
কিন্তু কথায় বলে, ইতিহাস ফিরে-ফিরে আসে। আর আমার মনে হয়, মানবসভ্যতার নিয়তিই এই, যে সে অবিরাম একই অক্ষের চারপাশে ঘুরপাক খেতে থাকে। চরকিবাজির চারপাশের ঘূর্ণায়মান আলোকবৃত্ত যেমন, কখনও ভরকেন্দ্রের খুব কাছাকাছি, কখনও খানিক দূরে; তবু প্রতিবার নিঃশেষিত হওয়ার আগে অবধি একই অক্ষে প্রদক্ষিত, ঠিক তেমনই মনুষ্যসভ্যতাও কখনও ধ্বংসের খুব কাছাকাছি, কখনও খানিক দূরে, তবু অবক্ষয়ের কক্ষপথেই তার সকল আসা-যাওয়া। যদিও চরকির আগুনে ফুলকির মতোই সভ্যতার ইতিহাসেও দু-এক ছটাক বিপ্লব আর প্রতিরোধের ঝড় মাঝেমধ্যে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু তাতে অন্য যাত্রাপথের সন্ধান মেলে না। আর সেই জন্যই সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে সেই একই ভুল, একই অন্যায়, একই অত্যাচার আর একই নৃশংসতার দলিল নিত্যনতুন ফর্মে ফিরে ফিরে যায়, ঘুরে ঘুরে আসে।
হয়তো একজীবনে এই আসা-যাওয়ার সবটুকু আমরা দেখতে পাব না। সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রাপথে ব্যক্তিজীবন বড়ই ক্ষীণজীবী। তাই আমরা কেউ হয়তো সিস্টেমের যাওয়াটা দেখতে পাব, কেউ আসাটা। তবে একটু ব্যতিক্রমী মন হলেই চরকিবাজির ফুলকির মতোই বাইরে ছিটকে পড়ে, একটিবার গোটা ব্যাপারটাকে নিস্পৃহ চোখ দিয়ে দেখার এবং বোঝার সুযোগ হবে।

তবে কিনা, সে বড় সহজ কাজ নয়। হলে, যে মানবসভ্যতা প্রায় চারশো বছর ধরে মানব-চিড়িয়াখানা নামক এক ন্যাক্কারজনক আইডিয়াকে বাস্তবায়িত করে, লালিত করে, মজা লুটে, শেষমেশ আপন বোধোদয় ঘটিয়ে সেই অন্যায়-অপমান, অত্যাচার আর অবিচার নিঃশেষিত করতে তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অবলুপ্ত করল, তারাই আবার ‘বিগ বস’-এর মতো আরেক অত্যাশ্চর্য মানব-চিড়িয়াখানার জন্ম দেয়?
চিড়িয়াখানাই তো! হয়তো তারজালির নয়, কিন্তু কংক্রিটের— বিষয়টা তো একই। এখানেও একদল মানুষকে একটা জায়গায় আটকে রেখে, একগুচ্ছ সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের ওপর অবিরাম নজরদারি চালানো হচ্ছে। এখানেও আর-এক দল মানুষ টিভির পর্দার এপার থেকে দর্শকাসনে বসে অবিরাম তা দেখছে। উত্তেজিত হচ্ছে, মজা পাচ্ছে, হাততালি দিচ্ছে, অপছন্দের পারফর্মারকে গালিগালাজ করছে, পছন্দের পারফর্মারের জন্য উৎকোচে কলা-মুলোর বদলে সোশ্যাল মিডিয়ায় লম্বা চওড়া পোস্ট লিখছে।
এমনকী, টাস্ক বা পারফরমেন্সের ব্যাপারটাও ফর্ম বদলে প্রায় একই রকম। বেঙ্গা-বার্টম্যানরা যেমন পূর্বনির্দেশিত ‘টাস্ক’ পারফর্ম করতেন, আজকের দিনের বিগ বস-এর প্রতিযোগীরাও বিগ বসের আদেশানুসারে টাস্ক পারফর্ম করে। তারা সাপ সাজে, ব্যাঙ সাজে, মাগুর মাছ থেকে মুটে-মজুর, রাজরানি থেকে জেলের আসামি; চোর থেকে চেরি মাথায় কেক, পপ সিঙ্গার থেকে পপকর্নের বাটি— সব সাজে দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য। তারা সারারাত টাট্টু ঘোড়ার কান ধরে বসে থাকে, সারাদিন অপরের রেশন চুরি করে, আর তারপর রাতদিন এক করে একে অপরকে খিস্তি করে, মান-অভিমান করে, প্রেমের অভিনয় করে, এমনকী, যৌনতারও!

এখন কথা হল যে, অন্য মানুষের জীবনের ওপরে অ-প্রয়োজনে হোক বা প্রয়োজনে, খেলার ছলে হোক বা বিনোদনের খাতিরে, শুভাকাঙ্ক্ষায় হোক বা অনুসন্ধিৎসায়— কোনও অবস্থাতেই যে নজরদারি করা চলে না, এটা যে অন্যায় এবং অনৈতিক, সে-কথা আমাদের বোঝাবে কে! এই প্রসঙ্গে মাত্র কয়েক বছর আগে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি জনপ্রিয় বাংলা চলচ্চিত্রের কথা বলতেই হয়। ছবিতে প্রৌঢ় বাবা-মা-এর দাম্পত্যকলহের কারণ বুঝতে অজ্ঞাতসারে তাঁদের শোওয়ার ঘরে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছে ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, জামাই…। তারপর সেই ক্যামেরার সঙ্গে সংযোজিত স্ক্রিনে তাঁদের আবেগঘন মুহূর্ত একযোগে দেখছে তারা। এই নজরদারি যে নজর রাখা নয়, এবং শুভাকাঙ্ক্ষী হয়েও এটি কারও সঙ্গে করা চলে না; বাবা–মায়ের সঙ্গে না, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের সঙ্গে না, বন্ধুর সঙ্গে না, এমনকী, প্রেমিক বা জীবনসঙ্গীর সঙ্গেও না, সে-পাঠ আমাদের শেখাবে কে?
যদিও পাঠের কথা বলতে গেলে আরেক গণ্ডগোল। কারণ অন্যের যাপনকে আড়াল থেকে নজরদারির মাধ্যমে বিনোদন প্রাপ্তির এই আশ্চর্য জগতের হদিশ কিন্তু আমাদের দিয়েছে ইউরোপ-আমেরিকাই। সেই আমেরিকা, যারা নাকি নাগরিকদের ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ব্যক্তিগত নিভৃতির গুরুত্বের পাঠ শেখায় ছোট বয়স থেকে! পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় ‘বিগ ব্রাদার’ নামক রিয়েলিটি শো থেকেই এদেশে ‘বিগ বস’-এর আগমন। জর্জ অরওয়েল তাঁর ডিস্টোপিয়ান উপন্যাসে যে বিগ ব্রাদারের সর্বাত্মক নজরদারির দু:স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তাকেই যে বিনোদনের উপজীব্য করা যায়, তা আগে কে জানত! নেদারল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানি, স্পেন, ব্রাজিল, ইতালি, ফ্রান্স পর্তুগাল, গ্রিস, পোল্যান্ড, মেক্সিকো, চিল্ আর্জেন্টিনা হয়ে থাইল্যান্ড, তুর্কি, ইজরায়েল, পাকিস্তান, আরব আমিরশাহীর দেশগুলিতেও আজ এই নজরদারির খেলার রমরমা। আর এদেশেও এই খেলার জনপ্রিয়তা এমনই যে, ২০০৬ সালে প্রথমে হিন্দিতে সম্প্রচারিত হওয়ার পর, একের পর এক রাজ্য তাদের নিজেদের ভাষায়— কন্নড়, বাংলা, তামিল, তেলেগু, মারাঠি, মালায়ালাম ভাষাতেও এই খেলার রাজ্যভিত্তিক আয়োজন করে চলেছে।
তাই আজকের দিনে এই নজরদারির খেলার যে রমরমা, যে জনপ্রিয়তা, দর্শক সংখ্যা, টিআরপি, অর্থ এবং বিনিয়োগের সমীকরণ, তাকে অতিক্রম করে এই খেলার সঙ্গে জুড়ে থাকা অমানবিকতা আর অনৈতিকতার পাঠ খুঁজে দেখা বড় সহজ কাজ নয়। বিশেষ করে যখন সেই স্কুলজীবন থেকেই অঙ্ক-ইংরেজির চাপে আমাদের মরাল সায়েন্সের ক্লাস চাপা পড়ে গেছে। বরং আমি জানি যে, আজকের দিনের এই জনপ্রিয় ‘বিগ বস’ শো-কে সেকালের মানব চিড়িয়াখানার সঙ্গে তুলনা করায় চিত্ত উন্মোচনের বদলে রাগ হবে বহু মানুষের। তাতে অবশ্য আশাহত হওয়ার কারণ দেখি না। ষোড়শ, সপ্তদশ কিংবা অষ্টাদশ শতকের সাধারণ মানুষও নিজেদের সময়ে দাঁড়িয়ে মানব চিড়িয়াখানার মধ্যেকার অন্যায়, অবিচার আর অনৈতিকতা দেখতে পাননি; দেখতে পেয়েছি আমরা, পরবর্তী প্রজন্মরা। তেমনই আজকের ‘বিগ বস’ খেলার মধ্যেও যে নজরদারির অত্যাচার, আমরা তা দেখতে না-পেলেও দেখবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
আর এটাই আসল কথা। আর এখানেই আমরা আতসবাজির ফুলকির মতোই বাকি সভ্যতার থেকে আলাদা।




