বিস্তর বছর এই পৃথিবীতে বেঁচে, একজন সুন্দর অথবা একজন দুঃখী প্রাণপণে চাইছে ধুলো হয়ে যেতে। যে-মানুষেরা তাকে জড়িয়েছিল— ধুলো হয়েছে কবেই। ভাঙতে-ভাঙতে নিজের ছায়াটুকুও এখন মাটি। হয়তো কেউ এসে উড়িয়ে দেবে এক ফুঁ-এ।
নিজের আছে বলতে শুধু এই পার্থিব শরীরটা— অনেক সুতোর মাথায় কাটা-খাওয়া ময়ূরপঙ্খীর মতো, এত অনুদ্বিগ্ন যেন চাইছেই না অ্যান্টেনায় পেঁচিয়ে গিয়ে আর ক’টা দিন উড়তে। অথচ বিলেদা উড়তেই চেয়েছিল। আজীবন। ঘরের ফ্যাকাশে মতো দেওয়ালে ঝুলছিল মৃণাল সেনের ছবিসমেত একটা ভীষণ পুরনো ক্যালেন্ডার। এই লোকটা কে— ক্যালেন্ডারে মা কালীর ছবির ওপরে লোকটার ছবি কেন সেঁটে দিয়েছিল বাবা— বিলেদা জানে না। কখনও জানতেও চায়নি। ছবিটা ফেলেও দেয়নি। মাঝেমধ্যে সেই ক্যালেন্ডার থেকে আশ্চর্য একটা ছায়া এসে পড়ে ঘরের আয়নায়। আয়নার গায়ে লাগানো একটা চিরুনি। বিলেদার দু’কামরার ঘর— আলুথালু ছড়িয়ে থাকা তেলচিটে শাড়ি, ঢোলা পায়জামা, জ্যালজ্যালে ব্লাউজ আর ট্যাপ-খাওয়া আলমারি— মুহূর্তেই হয়ে যেত মাঘ মাসের ঘন নীল আকাশ। কাঁচা রোদের মাদুর-বিছোনো পথ ধরে, দাঁত মাজতে-মাজতে বিলেদা উঠে আসছে ছাদে। যতক্ষণ আলো, বিলেদা ততক্ষণ ছাদে। যেন শরীরের একটা অংশ, পেটকাটি ঘুড়ির সঙ্গে নিশ্চিন্তে উড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়। সন্ধে নামতে দেখলে, কী সোয়্যাগ নিয়ে, দু’হাতে লাটাই ধরে, নারকেল গাছ, সুপুরি গাছের হাতের তলা দিয়ে, ঘুড়িটা নামিয়ে আনত ছাদে। তারপর, চুলটা স্যাট করে উলতে নিত। ওই একটামাত্র সময়েই, বিলেদা যেন ঈশ্বরেরও ওপর দিয়ে যায়! জিজ্ঞেস করে বসে, ‘আয়! প্যাঁচ খেলবি?’ কিন্তু ঠিক দু’মিনিট। তারপরেই তুমুল লজ্জা পেয়ে ছাদ থেকে নেমে যেত। একা।
আসলে যে-সমস্ত ইচ্ছে-অভিলাষ-মেয়েমানুষ আমাদের অস্থির করে তোলে, উঁচুবাড়ির ছাদে লাট খায়, বিলেদা ঠিক তাদের তাদের ছোঁয়ার চেষ্টা করত, ভালবাসার চেষ্টা করত সামান্য ঘুড়ি দিয়ে।
এই সামান্য ঘুড়িই আজীবন তাড়া করছে বিলেদাকে। থিতু হতে দিচ্ছে না মোটে। না ভাল রেজাল্ট। না এমএলএ-র চেয়ার ধরে একটা চাকরি। অন্য যে-কোনও বেকারদের মতো, বিলেদাও তেমনই, বয়সটা একটু বেশি। বিয়াল্লিশ।
কীভাবে বিলেদার ঘুম ভাঙে— দুপুরের সেদ্ধভাতে নুন জোটে কি না— বিকেলে নদীর ধারে বসে থাকতে-থাকতে সেন্টু খায় কি না, সেইসমস্ত খুঁটিনাটি খবর রাখেনি কেউ। শুধু জানত, সে ঘুড়িখ্যাপা আর কত অনিশ্চিত। বেলা বাড়লে বিলেদা হয়ে ওঠে পাড়ার সেই সমস্ত দাদাদের মতো, যারা শুধুমাত্র ক্যারামই খেলতে পারে, আড়চোখে মেয়ে দেখে, আর ক্যাচাল বাঁধলেই হাজির হয়ে যায়— যেন পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন অঙ্কটাকেও তারা সমাধান করে দেবে বিড়ির ধোঁয়ায়।
‘ধুর শালা! তুই চুপ করবি?’
‘এতদিন চুপ করে ছিলাম বলেই তো আমাকে এই দিন দেখতে হচ্ছে! বউটার হাতে দুটো পয়সা দিতে পারছি না, মাস শেষের আগে দেখবে আমিই টেঁসে গেছি কোনদিন, আর এরা বলছে আমি চোর!’
চার-পাঁচজনের একটা দল প্রায় চিৎকার করে ওঠে, ‘চোর বলব না? তো কি পোঙায় তুলে নাচব? রামু নিজের চোখে দেখেছে, কাল রাতে তুই আমাদের ভেড়ি থেকে মাছ চুরি করেছিস। এই রামু, কী দেখেছিস ঠিক করে বল তো!’
‘এক্কেরে ঠিক দেখলাম গো বিলেদা! মাঠের কোনায় হাগতে গেছি অন্ধকারে, যেন মনে হল আমাদের গজা! হাতে একটা খেপলা নিয়ে, সুড়সুড় করে ভেড়িতে নেমে যাচ্ছে। আমি তখনই সন্দেহ করেছিলাম। সবাইকে ডেকে এনে দেখি, মাছ হাওয়া!’
‘টোটাল দশ হাজার টাকার মাছ গায়েব হয়েছে কিন্তু বিলেদা!’
‘গজার একার বাড়িতেই বউ নেই। শালা আমরাও মুখে রক্ত তুলে খাটি। আমাদের ট্যাঁকেও পয়সা থাকে না। গামছা বেঁধে রাখতে হয়।’
‘তোদের কয়বার বলতে হয় রে, কাল রাতে বাড়ি ছিলাম না? বিশ্বাস না করিস তো টুম্পাকে ফোন লাগিয়ে দিচ্ছি!’
‘রাত্তিরে চুরি করে এখন সতী সাজতে এসছিস বাঞ্চোত?’
চার-পাঁচজনের দলটা, মেঘভাঙা বৃষ্টির মতো গজার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়। ধুয়েমুছে দিতে চায় ওকে। এতক্ষণ পরে একটা আড়মোড়া পেড়ে বিলেদা বলল, ‘আমি জানি গজা কেন চুরি করেছে!’
এই একটা আশ্চর্য কণ্ঠস্বর! যেটা কোনও মস্তানগোছের রোয়াব নয়, মালিকের ধমকও নয়, আবার ঈশ্বরের মতোও নয়। ওই কণ্ঠস্বরে, একটা ছাদের আশ্রয় ছিল। মাথা তুললেই মস্ত আকাশ। গজা ভীষণভাবে চাইলেও যেন মিথ্যে বলতে পারে না আর।
‘পুরো থম মেরে গেলি যে! সত্যিটা বলবি? না কি আমিই বলে দেব, কাল রাতে কোথায় ছিলিস?’
‘হ্যাঁ চুরি করেছি। বেশ করেছি। ভূপেনদা বলেছিল চুরি করলে টাকা দেবে, তাই করেছি।’
চার-পাঁচজনের দলটা একসঙ্গে বলল, ‘ভূপেনদা!’

বিলেদা জিজ্ঞেস করল, ‘এই ভূপেনের হাত টপকেই ভেড়িটা কিনেছিলি না তোরা?’
‘ভূপেনদা পরশুর আগের দিন, রাত করে বাড়ি এল। বলল, একটা কাজ করে দিতে হবে। কাজটা ঠিকঠাক হলে নাকি অনেক টাকা দেবে। আর এমনিতেই পুজোর মাস, আমিও না করতে পারিনি।’
‘তাই বলে চুরি করবি তুই? আর সবাই মিলে, প্রতি সপ্তাহে কিছু কিছু পয়সা বাঁচিয়ে, ফ্যাক্টরিতে ওভারটাইম করে এই যে ভেড়িটা কিনেছিস, সেটা?’
ওরা দুনিয়ার মারপ্যাঁচ জানে না। ওরা এখনও বুলডোজার দেখেনি। ওরা বোঝে না, শৃঙ্খল ছাড়া ওদের হারানোর কিছু নেই। বিলেদাও বুঝত না। বাবা চিনিয়েছিল, ভূপেনের মতো কুত্তাগুলোই সব সময়ে চাইবে আমরা নিজেরা খেয়োখেয়ি করে মরে যাই। বাবার বলা কথাগুলো আওড়াতে-আওড়াতেই যেন বিলেদা বলে ওঠে, ‘এতে কার ফায়দা হবে জানিস? ওই ভূপেনের। ভেড়ির মালিকানা গেছে তো কী হয়েছে, গজার মতো মুখ্যুদের পয়সার লোভ দেখিয়ে মাছ নষ্ট করে দেবে আর নিজে দূরে দাঁড়িয়ে ঢ্যামনার মতো হাসবে—’
সেই ক্যালেন্ডার থেকে একটা ছায়া এসে মিশছিল বিলেদার ছায়ায়। গভীর হয়ে। এইভাবেই জীবনবোধ তৈরি হয়। কিন্তু এই জীবনবোধ আসলে কার? বিলেদার? না কি ওর বাবার? পাড়ার টপ ক্লাস বাতেলাবাজ হয়ে কেবল সেই জীবনবোধের বুকনি ঝাড়ে কি সে? প্রয়োগ করছে আদৌ?
সবাই বলে, বিলেদার বাবা নকশাল ছিল। জুটমিলের শ্রমিকদের নিয়ে একটা বড় মাপের আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, সেই সময়ে একদিন পুলিশ তুলে নেয়। আরও সবাই বলে, বিলেদার বাবা প্রিজনভ্যান থেকে পালিয়ে গেছিল কোনওভাবে। গুলিও চলেছিল নাকি কয়েক রাউন্ড। তারপর সাড়ে তিন বছর। বিলেদার বাবার কোনও খোঁজ মেলেনি। সবাই বলেছিল, মরে গেছে নির্ঘাত। একদিন রাতে মা বলল, ‘কোথায় ছিলে তুমি? ছেলেটাকে নিয়ে আমি যে একেবারে একা-একা?’ বিলেদার বাবা সেদিন জানলার বাইরে তাকিয়ে থেকেছিল শুধু। জানলা দিয়ে ঢুকছিল শরতের হাওয়া। আকাশে উড়ছিল একটা লাল রঙের ঘুড়ি আর ঘরের দেওয়ালে সেই ক্যালেন্ডার।
২
‘এইবার আমার মরামুখটা দেখলে শান্তি পাস বল?’
‘সকাল-সকাল শুরু করলে? ধ্যার! বললাম তো, ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের সঙ্গে কালই কথা হয়েছে।’
‘তোর বাবা মারা যাওয়ার পর, আজ বারো বছর ধরে রোজই কথা বলছিস। আর আমি? আজ মেজদির কাছে, কাল বড়দার কাছে হাত পাতছি বেহায়ার মতো। সেলাইমেশিনটাও দু’দিন হল খারাপ। তখন কতবার করে বলেছিলাম, বাবার চাকরিটা নিয়ে নে, নিয়ে নে—’
‘তোমার জ্বালায় বাড়িতে থাকাই দায় আমার!’
‘কে তোকে থাকতে বলেছে রে? আমি আজ চলে যাচ্ছি।’
মা কি বাবার মতোই হারিয়ে যেতে চায়? সাড়ে তিন বছর, না সমস্ত জীবনের মতো? অনেক সুতোর মাথায় কাটা-খাওয়া ময়ূরপঙ্খীর মতো বিলেদা ভেসে যাচ্ছে হাওয়ায়। এ-চরাচরে আর কোনও লাটাইয়ে যেন বেঁধে নেই বিলেদার জীবনসুতো। মা চলে যাচ্ছে?
চাইলেই বাবার চাকরিটা নেওয়া যেত। একবার ম্যানেজারবাবুর সামনে গিয়ে বলতে হত, ‘আপনি আমাদের মাইবাপ। চাকরিটা যদি করিয়ে দেন স্যার, তাহলে মায়ে-পোয়ে বেঁচে যাই।’
ম্যানেজারবাবু খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলত, ‘কেন করিয়ে দেব না? তুমি তো আমাদেরই লোক!’
এই কুৎসিত হাসির পেছনে যে না-কথাগুলো থাকত, ‘বিলাস সরকার! সন অফ বিভাস সরকার। তুমি আজ থেকে আমার বাঁধা!’

তখন থেকেই বিলেদা উড়তে চাইছিল। একেবারে ওড়ার মতো ওড়া। তেইশ বছর বয়স। বাবা চিনিয়েছিল, ওরাই পৃথিবীর আসল শত্রু। আমাদের ওরা ভরে দিতে চাইবে একটা অন্ধকুঠুরিতে। কিন্তু মনে রাখিস, আমাদের উড়তে হবে। দুয়ো দিয়ে পালাতে হবে। তারপরেও বাবা কেন শত্রুপক্ষের সামনে ধরা খেল? দ্বিতীয়বারের জন্য? হঠাৎ একটা চিৎকার ভেসে আসছে। মুখ তুলে চাইতেই, মোহিনী সান্যালের পানখেকো কুৎসিত মুখ, ফ্ল্যাশবালবের মতো একটা পর্দার ওপর পড়ল। মুখটা যত কাছে আসছে, এলোপাথাড়ি পানের পিক ফেলতে-ফেলতে, বিলেদার মনে হচ্ছে এক-একটা রক্তের দলা। মানুষের টাটকা রক্ত। মোহিনী সান্যাল কি মানুষ খায়? সে-ই চিৎকার করছে এখন।
‘কানার মতো ভ্যান চালাস নাকি? দেখতে পাস না?’
‘খড়ের গাদা বোঝাই ছিল তো, টাল সামলাতে পারিনি মোটে’, লোকটা প্রায় কেঁদে ফেলে।
‘চণ্ডী যতক্ষণ-না বাড়ি ফেরে, ওভাবেই পড়ে থাক। দেখছি আমরা তারপর!’
চণ্ডীদা, এই তো গত পরশুই, বাড়ির সামনে চন্দ্রমল্লিকার কয়েকটা চারা বসিয়েছিল। বেড়া দিয়েছে বাঁশের। আজ সকালে, ওই সরু হাড়জিরজিরে রাস্তায়, খড়বোঝাই একটা ভ্যান, উলটোমুখে একটা টোটো ছিল, বাঁ-দিকে ড্রেন, সাইড দিতে গিয়ে লোকটা ফুলের বাগানে চিৎপাত। ভ্যানের গোটাটাই প্রায় ড্রেনে। বেড়াগুলো ভেঙেছে। দু’টুকরো।
ঘটনার সময়ে বারান্দায় বসে রেডিয়ো শুনছিল মোহিনী সান্যাল। চেঁচামেচি করে বিলেদার দলবলকে সেই ডেকে এনেছে। চণ্ডীদা বাড়িতে নেই। চণ্ডীদার স্ত্রী ভ্যানচালকের সামনে এক বালতি জল এনে দিয়েছে, বেজায় লজ্জিত, উদ্বিগ্ন একমাত্র মোহিনী সান্যাল। চণ্ডীদার প্রতিবেশী। সরকারি ব্যাঙ্কে চাকরি করেছে। ঢালাও পয়সা। তিনতলা বাড়ি। বাড়ির নীচে গ্যারেজ। গ্যারেজের ওপরে মাধবীলতা। মাধবীলতার মধু খেতে-খেতে ধান্দা করছে, কাউন্সিলারের সিটটা যদি বাগিয়ে ফেলা যায়!
‘একদম ছাড়বি না বিলে। লাইটপোস্টে বাঁধ ওকে।’
বিলেদার পায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটা, ‘খড়ের আঁটিগুলো সব ডেরেনে পড়ল। একটা টাকাও পাব না গো দাদা—’
একটু-একটু করে ভিড় বাড়ছে এবার। হাওয়া গরম হচ্ছে। হাতের কাজ ফেলে রেখেই, জানলায়-জানলায় লোক জমছে। বিলেদা বলল, ‘ধ্যার শালা! তোর টাকা কি আমার বাপ এনে দেবে?’
মোহিনী সান্যাল হঠাৎ বক্তৃতার ঢঙে বলে উঠল, ‘ভাইসকল! আমরা ওকে ছেড়ে দিতে পারি! কিন্তু একটা শর্তে। ক্ষতিপূরণ লাগবে। এক হাজার টাকা। কী বিলে, তাই তো?’
‘ঠিক বলেছ মোহিনীদা!’ কথাটা বলতে গিয়ে থমকে গেল বিলেদা। অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলল, ‘লজ্জা করে না? বিভাসের রক্ত বইছে তোর শরীরে? জানিস তোর বাবা জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পার্টির লাইন থেকে বিচ্যুত হয়নি?’ বিলেদা কেমন ভেবলে যায়। এতক্ষণ কে কথা বলছিল! আর কেউ শুনতে পায়নি তো? হন্যে হয়ে ভিড়ের মাঝে বিলেদা তাকে খুঁজে বেড়ায়। পায় না। আবার খোঁজে। আবারও পায় না। তারপর বলে, ‘থাক মোহিনীদা। ক্ষতিপূরণ নিয়ে লাভ নেই। আমরা ওকে এমনিই ছেড়ে দেব।’
‘ছেড়ে দিবি? ইয়ার্কি পেয়েছিস বিলে? এই তোরা পাড়ার ছেলে?’

‘সেগুলো আমরা দেখে নিচ্ছি মোহিনীদা!’
‘এরপর রাতবিরেতে পাড়ায় গুলি চলবে, আগুন লাগবে, আর তোরা ছেড়ে দিবি তো? উচ্ছন্নে যাচ্ছে পাড়াটা, উচ্ছন্নে যাচ্ছে—’
সেদিন রাতে দুটো ঘটনা ঘটল। সন্ধের পরে চণ্ডীদার বাড়িতে বিলেদা হাজির। চণ্ডীদার হাতে দুশো টাকা দিয়ে বলল, ‘এটা রেখে দাও চণ্ডীদা। ভ্যানওয়ালার ক্ষতিপূরণ! ফুলগাছগুলো আবার লাগিয়ো। আমরা দেখভাল করব সবাই।’
‘চুপচাপ বাড়ি যা। নিজের দিকে কবে তাকাবি তুই আর?’
চণ্ডীদার বাড়ির গলি থেকে বেরোতেই, একটা চাঁদ উঠল। বিলেদা দেখল, মোহিনী সান্যালের বাড়ির ওপর দিয়ে একটা দশতে ঘুড়ি কেটে আসছে। বিরাট সাইজ। রাত দশটার অন্ধকারেও, বিগত কুড়ি বছরের অভিজ্ঞতায় বিলেদা স্পষ্ট বুঝতে পারছে, এক লাটাই সুতো ঝুলছে ঘুড়িটার পেছনে। হাতের কাছেই ছিল, দুটো-তিনটে ভারী পাথর। এক ঝলক দেখলে মনে হবে, শালগ্রাম শিলা! বিলেদার মনে হল, ঢিলপ্যাঁচ করে ঘুড়িটাকে নামাতেই হবে। এত বড় ঘুড়ি! পর পর দুটো ঢিল। পর পর দুটো ভারী পাথর। দশতে ঘুড়িটা নামছে। বিলেদা সুতোর নাগাল পেয়ে গেছে আর মোহিনী সান্যালের বেলজিয়ান কাচের জানলা— মিহি-মিহি ধুলো… দশতে ঘুড়িটা দিয়ে টেনে প্যাঁচ খেলতে খেলতে, তুড়ি মেরে মেরে, পুরো আকাশ সাফ করে দিচ্ছে বিলেদা, এই টান টান টান টান, ভোওওওওকাট্টা!
অনেক রাতে বাড়ি ফিরে দেখল, মা সত্যিই চলে গেছে। এই প্রথম বিলেদাকে যেন স্পর্শ করল ছাদহীনতার কষ্ট। মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেলে নিজেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অংশীদার মনে হলেও, ভাটা পড়ে ঘুড়ি ওড়ানোয়। এখন আর দুপুরে একমুঠ খেয়েই ছাদে ওঠা যাবে না। ওই ক্যালেন্ডার থেকে নেমে এসে এক ছায়া, এক শক্তি, এক চরিত্র তাকে আটকে দেয়, আটকে দেয়, মোক্ষম খিল এঁটে দেয় ছাদের দরজায়, ক্রমাগত ঠেলতে শুরু করে মুদির দোকানের দিকে— ওদের দোকানে লোক নেবে। হিসেবের খাতা লেখার কাজ জানলে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
বিলেদা তাই হিসেবরক্ষক— পাড়ার সবচেয়ে বড় মুদির দোকানের। সকালবেলায় সে পাড়ার দাদা। বেলা বাড়লে মুদির দোকানের হেল্পার। দুপুরে ঘুড়িখ্যাপা। আবার বিকেল থেকে রাত অবধি হেল্পার। হিসেবের খাতা। হেল্পার। ঘুড়িখ্যাপা। হিসেবের খাতা।
অবশেষে ঠেলে গড়িয়ে চলতে শুরু করেছিল বিলেদা। ঘুড়িও ওড়াচ্ছিল ইচ্ছে হলে। ভারি আশা করে বসেছিল, মা ফিরে আসবে এইবার। সেলাইমেশিনটা সারিয়ে এনেছে। কিন্তু ভোররাতে খবর এল, মায়ের হার্ট অ্যাটাক। মামাবাড়িতেই। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ফুরসত দেয়নি। মায়ের মৃতদেহের পাশে বসে, ওই দূরে, ভিড়ের অঞ্চল পেরিয়ে, মানুষপোড়া ধোঁয়া যেখানে মিশে যাচ্ছে, আকাশের গভীর থেকে ঝরছে অসংখ্য ছিটকাপড়ের টুকরো, সুতোয় জট পাকিয়ে যাচ্ছে কখনও, তারই মধ্যে, বিলেদার ছলছলে দুটো চোখ যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে সেই ক্যালেন্ডা থেকে নেমে আসা ছায়াটাকে— হতে পারে সেই আশ্চর্য ছায়া, যে শেষবারের মতো পৃথিবীতে নেমে এসে বিলেদাকে বানিয়ে দিত একটা ময়ূরপঙ্খী ঘুড়ি: যা দূর হ! তুই মুক্ত… ফুঁঃ…
৩
একটা বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ। এক আকাশ অতৃপ্তির মেঘ। অথবা কোনও বিষাদগ্রস্ত সেলাইমেশিন— বিলেদাকে হাঁ-মুখ করে গিলে খেতে আসছিল। মুদির দোকানের কাজটাও ছেড়ে দিল। এখন ঘুড়ি ওড়াতে উঠে প্রায়শই লাটাই থেকে সমস্ত সুতো বের করে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করে। শরীরের একটা অংশ তো উড়ছেই, বাকিটা নিশ্চয়ই টেনে নেবে। মায়ের মুখঝামটা শোনার জন্যে জানলার ধারে বসে থাকে। চুপ করে। এত ঘুড়ি, এত রং, এত নকশা, এত-এত ভোকাট্টাকে টপকে, বিলেদা এখন চাইছে স্রেফ ধুলো হয়ে যেতে। পাড়ার ছোট-ছোট বাচ্চাদের ডেকে বলছে, ‘যদি আমি ধুলো হয়ে যাই, তাহলে আমাকে উড়িয়ে দিবি এক ফুঁ-এ?’
ভয় পেয়ে সবাই পালায়। সচরাচর কাছে ঘেঁষতে চায় না আর। রামু বলে, ‘আমাদের সাথে ভেড়িতে কাজ করবে বিলেদা? টাকাপয়সা কিচ্ছু দিতে হবে না। মাক্কালি!’
গজা বলে, ‘আমার ছেলেটাকে ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়ে দেবে?’
গজা-রামু, ওরা সবাই বলে, ‘তোমার বাবা নকশাল ছিল বিলেদা? সেদিন মোহিনী সান্যালের বাড়িতে তুমিই পাথর ছুড়েছিলে, না? বেশ করেছিলে!’
‘শোন গজা! শালা আমি যদি আজ রাতে ধুলো হয়ে যাই, কাল সকালে আমায় উড়িয়ে দিবি তোরা?’
নেশাজড়ানো গলায় গজা উত্তর দিল, ‘তোমার জন্যে জান হাজির!’
তড়াক করে লাফ দিয়ে উঠে বিলেদা দৌড়য় বাড়ির দিকে। গায়ের ময়লা জামা রামুর গায়ে জড়িয়ে দেয়। একটা দুর্দান্ত চাঁদের রাতে, যৌনগন্ধে আকুল একটা মেনিবিড়াল আঁচড় কাটছে নিজেরই ছায়ায়, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের প্রচারে বেরিয়েছে মোহিনী সান্যাল, ঢোল বাজছে আর লোক নাছছে প্রচণ্ড; পাঁচিল বেয়ে, বাড়ির একদম ওপরের ন্যাড়া ছাদে উঠে পড়ে বিলেদা। মাথার ভেতর জট পাকিয়ে যায়— জটের ভেতর জঞ্জাল— জঞ্জালে আস্তাকুঁড়ের শব্দ— আমার ছেলেটাকে ঘুড়ি ওড়ানো শিখিয়ে দেবে বিলেদা— বেশ করেছিলে পাথর মেরেছিলে— টাকাপয়সা লাগবে না— মাক্কালি— তোমার বাবা নকশাল ছিল— ভেড়িতে কাজ করবে— মাক্কালি— কিচ্ছু লাগবে না— মাক্কালি…
হঠাৎ বিলেদার চোখ যায় আকাশে। একটা ঘুড়ি কেটে আসছে। ঢিলপ্যাঁচ করে না এখনই যদি নামানো যায়, তাহলে প্রেস্টিজের দফারফা…




