বিভাবরী

গমরঙা ছোট্টখাট্টো ছিপছিপে মেয়েটির দেশের বাড়ি ছিল ফরিদপুর। কিন্তু ওপারের মাটিতে কখনও পা রাখেনি সে বা তার দাদা-দিদিরা। জন্ম থেকেই ত্রিপুরায়। আগরতলাতেই শেকড়। পাঁচ ভাই, তিন বোনের মধ্যে মেয়েটি সর্বকনিষ্ঠ। বড়দা ছিলেন স্বাধীনতা সেনানী। অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়ে চোদ্দ বছর কারাবাস করেছিলেন। আগরতলার বাড়িতে অবশ্য গানের চর্চা ছিল। মা রামপ্রসাদী আর শ্যামাসংগীত গাইতেন ঝরঝর করে সংসারের অজস্র কাজের ফাঁকে-ফাঁকে। নিজের হাতে শিব গড়ে পুজো করতেন গান গেয়ে। বাবা ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে খুবই একাত্ম ছিলেন। উপাসনায় নিয়মিত যেতেন, ব্রহ্মসংগীত ভালবাসতেন। মেয়ের মধ্যে গানের সম্ভাবনা লক্ষ করেছিলেন মা। সেই তিনের দশকে আগরতলার এক সাধারণ গৃহবধূ মনে-মনে স্থির করেছিলেন, মেয়েকে গানের তালিম দেবেন। সংসারের খরচ বাঁচিয়ে কিনে দিলেন ছোট্ট হারমনিয়াম। বাড়িতে মাস্টার রেখে শুরু হল তালিম। খেয়াল, ভজন, নজরুলের লঘু-ধ্রুপদী কাব্যগীতি। কিন্তু রবীন্দ্রসংগীতের নামটুকুও ছিল না কোথাও। কেউ-ই শেখাতেন না ও তল্লাটে। কোনও চলই নাকি ছিল না! ভাবতে অবাকই লাগে, যে ত্রিপুরার রাজা একদা ছিলেন বিশ্বকবির অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু, পৃষ্ঠপোষক, সেখানকার বালিকাটি রবীন্দ্রগান শিক্ষার সুযোগই পেল না শৈশবে!

কিন্তু তালিমের সুখ কপালে বেশিদিন সইল না। গানের মাস্টারমশাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তখন মা-বাবা খবর পেলেন আগরতলাতেই ফিরে এসে থিতু হয়েছেন ত্রিপুরা রাজপরিবারের বিশিষ্ট সংগীতসাধক কিশোরী দেববর্মণ, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্র। তাঁর কাছে ফের শিক্ষা শুরু হল উচ্চাঙ্গসংগীতের। ১৯৫৯ সাল। মেয়েটির বয়স তখন সদ্য পঁচিশ ছুঁয়েছে, আগরতলার পাট চুকিয়ে কলকাতা চলে এলেন গানের টানে। দাদার বাড়িতে থেকে গানই শিখবেন কেবল। গানই তার জীবন। কলকাতা আসতেই তুতো বোন খোঁজ দিলেন, ওরে! কাগজে বিজ্ঞাপন বেরিয়েছে জোড়াসাঁকোয় গানের কলেজ হচ্ছে রবীন্দ্রভারতী নামে! দাদা স্থির করলেন, যত দূরেই হোক না কেন, সেখানেই তরুণী বোনটিকে ভর্তি করবেন। রবীন্দ্রভারতীতে তখন উচ্চাঙ্গসংগীত শেখাচ্ছেন অমিয়রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়, তানসেন পান্ডে, চিত্ত রায়, পঞ্চানন ভট্টাচার্য! আর রবীন্দ্রসংগীতের ঘর আলো করে রয়েছেন মায়া সেন। ইন্টারভিউতে ডাক পড়ল। মায়া সেনের সামনে বসে পঁচিশের তরুণী। মায়াদেবী বললেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কোন গান গাইবে?’ তরুণী সলজ্জ ভঙ্গিতে জানালেন, তিনি একটিও রবীন্দ্রসংগীত জানেন না। এবার মায়াদেবীর চোখ কপালে! ‘সে কী! তাহলে তুমি এখানে কী করতে এসেছ?’ তরুণীর সলজ্জ জবাব, ‘শিখতে এসেছি দিদি। আমাদের আগরতলায় রবীন্দ্রসংগীত কেউ শেখান না। তাই এখানে এসেছি। তবে অন্য গান জানি আমি।’ মায়াদেবী তৎক্ষণাৎ আদেশ করলেন, ‘বেশ তাই গাও।’ সেই গান শুনেই অভিজ্ঞ অধ্যাপকের কান চিনে ফেললেন ভবিষ্যতের দিশারীকে। মায়া সেনের সুপারিশে রবীন্দ্রসংগীতে সুযোগ পেয়ে গেল মেয়েটি।

আরও পড়ুন: দেবব্রত বিশ্বাসের অপ্রকাশিত চিঠি! সংকলনে অরিজিৎ মৈত্র…

রবীন্দ্রনাথের গান শিখতে পারবে জেনে পঁচিশ বছরের সদ্যফোটা যুবতীর শরীরে তখন শিহরণ! এ তো সেই রবীন্দ্রসংগীত, যা শুনতে ভালবাসতেন তার বাবা, কিন্তু গাইয়ে মেয়ে একটাও রবীন্দ্রসংগীত জানে না বলে মনে-মনে কষ্ট পেতেন। বলতে পারতেন না, কারণ বলে লাভ নেই। আগরতলায় রবীন্দ্রসংগীত শেখার ব্যবস্থা করা সেসময় অসম্ভবই ছিল। সেই রবীন্দ্রসংগীত শিখব? উত্তেজনায় নবাগতা ছাত্রীর রাতের ঘুম উড়ে গেল। কিন্তু ক্লাসে গিয়ে অচিরাৎ তার দিনের শান্তিও উড়ে যেতে বসল। যারা শিখতে এসেছে সকলেই রবীন্দ্রসংগীতে রীতিমতো পটু, তালিম নেওয়া ছাত্রছাত্রী! কেউ ‘দক্ষিণী’, কেউ ‘গীতবিতান’, কেউ ‘রবিতীর্থ’, কেউ ‘রবিরশ্মি’, কেউ ‘সুরঙ্গমা’… সকলেই রবীন্দ্রসংগীতে মোটের ওপর দক্ষ। আর তাদের মাঝে একফালি এই মেয়েটি, যে রবীন্দ্রসংগীতের র-টুকুও জানে না। মায়া সেনের প্রথম ক্লাস তরুণী ছাত্রীকে বুঝিয়ে দিল, রবীন্দ্রসংগীত এক অন্য ভূমি, অন্য চারণক্ষেত্র। সেখানে হাত-পা বাঁধা স্বরলিপির দাগে দাগে। একচুল এদিকওদিক হওয়ার জো নেই। স্বাধীনভাবে সুর খেলাবার অবকাশই নেই মোটে! রাগরূপ জেনে নিলেই যে বিস্তারে খেলিয়ে দেওয়া যাবে গলা, তার কোনও পথই নেই! লয়কারি-তানকারিতে বাজিমাত করে হাততালি কুড়োনোর রাস্তা এখানে বন্ধ। অথচ যাকে আপাতভাবে সহজে পেরিয়ে যাওয়া বদ্ধ পুকুর বলে মনে হচ্ছে, তার মধ্যেই অলক্ষে নিহিত অসীমের আহ্বান, অতলের রহস্য! সেই মাপা জলে পা ডুবিয়েই তৈরি করতে হবে গায়কী, প্রকাশ করতে হবে ভাব, অর্থ, আকুতি, বেদনা, আনন্দ, প্রেম, বিরহ। তালে বদ্ধ গানে ছোট্ট-ছোট্ট মীড়ের কাজ, গমক, স্পর্শস্বর, টপ্পার দানা, উচ্চারণ… এসবই হয়ে উঠবে হাতিয়ার! কিন্তু কীভাবে? অথৈ জলে পড়ল সে প্রথম দিনেই। মাথার ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায় সুর, গলায় বসানো তো দূর, ধরতেই পারছে না তাকে। হাত বাড়াচ্ছে, অথচ ছুঁতে পারছে না। যদিও বা কোনওমতে ধরে, স্বরলিপির শেকল কেটে বেরিয়ে যেতে চায় কারুকাজ, অমনি লালকার্ড দেখতে হয়। ক্লাস শেষে তরুণী ছাত্রী মায়া সেনকে বলল, ‘আমি পারব না দিদি। রবীন্দ্রসংগীত হবে না আমার দ্বারা।’ শিক্ষক দেখলেন ছাত্রীর চোখে জল। অভিভাবকপ্রতিম অধ্যাপক বুঝলেন তার কষ্ট। কিন্তু আর উপায়ই বা কী?

মায়া সেন

হঠাৎ ছাত্রীই শিক্ষককে বলে বসল, “মায়াদি, দু’দিন যদি আপনার কাছে একা বসে শিখি, শেখাবেন আমাকে? আসলে কিছুই তো জানি না এই গানের। আমাকে সাহায্য করবেন?” কিঞ্চিৎ কিন্তু কিন্তু করলেও রাজি হয়ে গেলেন মায়া সেন। আর সেই শুরু হল যাদবপুর থেকে চিৎপুর ছুটে-ছুটে গিয়ে মেয়ের রবিগান শেখার পালা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসের পর খালি পেটে বসে থাকত মেয়েটি খাতা হাতে। মায়া সেনের সব ক্লাস শেষ হলে, ছুটির পর তাঁর কাছে চলত বিশেষ তালিম রবীন্দ্রসংগীতে আনাড়ি ছাত্রীর। অসীম ধৈর্যে মায়াদেবী একটু একটু করে সাজিয়ে তুলতে লাগলেন ভবিষ্যতের রবিগানের ছোট্ট সাম্পানটিকে। তার গলায় জাগিয়ে তুলতে লাগলেন রাবীন্দ্রিক সুরের স্নিগ্ধতা, উচ্চারণের স্পষ্ট কোমলতা। ইতিমধ্যে মায়া সেন চিৎপুরের বাড়ি বদল করে চলে এসেছেন বালিগঞ্জ প্লেস। ছাত্রীর দাদাও বাসা করেছেন হিন্দুস্থান পার্কে। এবার পরিশ্রম একটু কমল। হিন্দুস্তান পার্ক থেকে পায়ে হেঁটে সে গান শিখতে যেতে লাগল মায়াদির বাড়িতে। তবে এবার আর একা নয়। অনেকের সঙ্গে বসে গান শেখা শুরু।

বেশ কয়েক বছর পরের কথা। একদিন ক্লাসের পর মায়া সেন ছাত্রীকে বললেন, ‘একটু দাঁড়িয়ে যাও। কথা আছে।’ ছাত্রী স্থাণু। কী জানি কী ভুল হয়ে গেল আবার! কিন্তু হাসিমুখে মায়া সেন বললেন, ‘গাড়িতে ওঠো, আজ তোমাকে জর্জদার বাড়ি নিয়ে যাব।’ কে জর্জদা, জানেন না তরুণী। ভাল নামটা বললে অবশ্য চিনতে পারতেন, কারণ তিনি তখন জনপ্রিয়তা, খ্যাতি এবং বিতর্কের উত্তুঙ্গ শিখরে। কিন্তু ‘জর্জদা’ নামটা একেবারেই অপরিচিত। রাস্তায় যেতে-যেতে জানলেন জর্জদার পরিচয়। তরুণী প্রমাদ গুণলেন। অত বড় শিল্পীর না জানি কী বিশাল বাড়ি, বিশাল প্রতিপত্তি! আমাকে কেন সেখানে টেনে নিয়ে যাওয়া আবার! কিন্তু ট্রায়াঙ্গুলার পার্কের এক সরু অপরিসর আধো অন্ধকার গলিপথ বেয়ে জর্জদার আস্তানায় যেতে গিয়ে মোহভঙ্গ হল মেয়েটির! এ কেমন জায়গায় থাকেন রবীন্দ্রসংগীতের মুকুটহীন সম্রাট? তার ওপর ঢুকতেই হইহই করে ময়মনসিংগী বাঙালে জর্জদার সম্ভাষণ। ‘আরে মায়াদি করসেন কি… এই ভর সন্ধেবেলা কারে আবার লইয়া আইসেন? আউখাইন আউখাইন (আসুন আসুন)। ওই মোড়াটায় বউখাইন (বসুন)।’

এবার ছাত্রীর পরিচয়ের পালা। মায়া সেন বললেন, ‘জর্জদা, ও এবার রবীন্দ্রভারতী থেকে রবীন্দ্রসংগীতে এমএ পাশ করেছে। আমার ছাত্রী। খুব ভাল গায়।’ হইহই করে উঠলেন জর্জ বিশ্বাস, ‘করসেন কী মায়াদি? পণ্ডিত মাইয়ারে আমার কাসে নিয়া আইসেন?’ হো হো অট্টহাসি তারপরেই।

দেবব্রত বিশ্বাস

মায়াদির সঙ্গে কথা চালাচালি হতে হতেই তরুণীকে বললেন – ‘একখান গান করেন, শুনি।’ মেয়ের তখন শিরে সংক্রান্তি। একদিকে মায়া সেন, নোটেশনের একচুল এদিকওদিক হলেই চেপে ধরবেন। আর অন্যদিকে আবেগের রাজা জর্জ বিশ্বাস, যিনি নোটেশনকে তুচ্ছজ্ঞান করেন। সুর আসে তাঁর হৃদয় থেকে স্বতোৎসারিত হয়ে। এর মাঝখানে বসে তরুণীকে গাইতে হবে গান। এমন গান, যা শুনে মায়াদি সন্তুষ্ট হবেন, তাঁর শিক্ষণ সার্থক মনে করবেন, আবার জর্জদারও মনে হবে, মেয়েটির এক্সপ্রেশনে কোনও ফাঁক নেই, রসকষহীন ন্যাড়া গাছের মতো গান সে গায় না!

অতএব, মায়াদির দেখানো পথেই হাতে তালফাঁক দেখিয়ে যথাসম্ভব ভাব দিয়ে মেয়েটি গাইল, ‘তুমি যে আমারে চাও, আমি সে জানি’… হাতের তালু দিয়ে আলগা করে তালফাঁক দিচ্ছে সে হাঁটুর ওপর। শেষ হতেই জর্জদা বলে উঠলেন, ‘বেশ ভালোই গাইসেন। গাইসেন বেশ ভাল।’ বলেই মায়াদির দিকে ফিরে বলে উঠলেন, ‘কিন্তু মায়াদি একখান কথা… আপনেগো এই হাতপা দাপাদাপি কইরা গান গাওন, হেইডা আমার বালা লাগে না। হেইডা যে কী করেন আপনেরা… গান গাইব্যান অন্তরের অন্তঃস্থল থিক্যা আবেগ দিয়্যা… তা নয়, এইয়া আবার কী?’

ছাত্রী এদিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কিন্তু মায়া সেন দমার পাত্রী নন। বিনাযুদ্ধে সূচ্যগ্র স্বরলিপিও ছাড়তে নারাজ তিনি, ‘না না জর্জদা, তা বললে তো হবে না। আমি একজন প্রশিক্ষক। আমি তো ফাঁকি দিয়ে গান শেখাতে পারব না। আমার কাছে গান শিখে কেউ গাইতে বসবে, তবলিয়া বলবে দিদি কী তাল? সে বলতে পারবে না। দিদি সম কোথায়? ফাঁক কোথায়? কোন ছন্দে বাজাব? সে বলতে পারবে না! এরকম অসম্পূর্ণ শিক্ষা দেওয়া তো আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়! আমি গানের অর্ধেক জিনিস তাকে জানালামই না? এ কেমন শিক্ষা তবে দিলাম জর্জদা!’

বিশ্বাসমশাই চুপ। অনেকক্ষণ পর বললেন, ‘হ। ঠিকাসে। হেইডা আপনের বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে শিখাইব্যাননে।’

মায়া সেন তবু থামলেন না। বলে যেতে লাগলেন তালতত্ত্বের প্রয়োজনীয়তা, স্বরলিপির বাঁধুনি। একমত না হলেও চুপ করে শুনে চললেন বিশ্বাসমশাই। তারপর ছাত্রীর দিকে ফিরে বললেন, ‘হইসেনি অনেক। এবার আমি গাই, আপনে শোনেন।’ বলে শুরু করলেন সেই অননুকরণীয় জর্জীয় ভঙ্গিতে উদাত্ত কণ্ঠে ওই একই গান, ‘তুমি যে আমারে চাও…’

তরুণী বিভোর। বিহ্বল। এই প্রথম শুনলেন, দেখলেন, জানলেন… যে মাত্র কয়েকটি যতি, অবকাশ, মীড় আর সূক্ষ্ম প্রশ্বাসের হেরফের— এতেই গানকে এক উত্তুঙ্গ শিখরে টেনে নিয়ে গিয়ে শ্রোতাকে কীভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলা যায়! হাঁ হয়ে বসে থাকা বিমুগ্ধ ছাত্রীর সংবিৎ ফেরালেন মায়াদেবী স্বয়ং। তবে ‘জর্জদার কাছে শিখবে তুমি’ একথা একটিবারের জন্যও বললেন না। কেবল বলে দিলেন, ‘শোনো, তুমি ইচ্ছেমতো আসবে, জর্জদার বাড়িতে অবারিতদ্বার সকলের। তুমি এসে শুনবে ওঁর গায়কী। রোজ শুনবে। উনি পথ দেখাবেন। তুমি সেই পথ চিনে নেবে।’

জর্জদাও এক কথায় রাজি। ‘হ হ। যখন ইচ্ছা হইব, যখন মনে হইব, আয়্যা পড়ব্যান।’

বিভা সেনগুপ্ত (১৯৩২-২০২৬)

সেই শুরু তরুণীর জর্জদার কাছে যাওয়া। শুষে নেওয়া তাঁর গায়নভঙ্গি! ইতিমধ্যে রেডিওতে গান গাওয়ার দিন এগিয়ে আসছে। ছাত্রী ধরে পড়লেন, ‘আমাকে একটু গানটা দেখিয়ে দেবেন?’ জর্জদা এককথায় রাজি। ছাত্রী ধরলেন, ‘মোর হৃদয়ের গোপন বিজন ঘরে…’, জর্জদা দেখিয়ে দিচ্ছেন, তরুণী ধরে রাখছেন তাঁর প্রতিটি অক্ষর মস্তিষ্কের কোষে-কোষে।

হেনকালে মুচকি হেসে বিশ্বাসমশাই ছাত্রীকে বললেন, ‘আপনে বোধহয় জীবনে কখনও প্রেম করেন নাই! তাই ন্যা?’

এবার মেয়েটি লজ্জায় অধোবদন। কিন্তু জর্জদার ভ্রূক্ষেপ নেই। ‘বলি প্রেম করসেন কোনওদিন? তাইলে শোনেন, এইভাবে কথাগুলা কইতে হয়!’ সুদূর ত্রিপুরা থেকে আসা সেই স্বল্পপরিচিত তরুণী গায়িকাকে একটি একটি করে শব্দপ্রক্ষেপ দেখাতে লাগলেন জর্জ বিশ্বাস। কোথায় দম নিতে হবে, কোথায় পূর্ণযতি, কোথায় অর্ধযতি, কোথায় মীড়ের শুরু, কোথায় তার গন্তব্য, কতটুকু সুর ধরে রাখতে হবে, কতটুকু আলতো করে ভাসিয়ে দিতে হবে… সবটুকু একটু-একটু করে গলায় তুলিয়ে দিতে লাগলেন রবীন্দ্রগানের একচ্ছত্র রাজা।

এরপর আর কখনও কোনও গান নিয়ে প্রশ্ন করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি তরুণী। নির্ভয়ে চলে গিয়েছেন তাঁর কাছে। বলে দিন জর্জদা, এ গান কেমন করে গাইব? পরম স্নেহে জর্জ গেয়ে শুনিয়েছেন সেই গান, আয়ত্ত করেছে তরুণী। এমন করেই আমৃত্যু, প্রায় এগারোটা বছর, জর্জদার শয্যাপার্শ্বে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষার্থী হিসেবে, অনুজা হিসেবে, ভক্ত হিসেবে। তাঁর খোলা গলার সেই আশ্চর্য ব্যারিটোনে মুগ্ধ হতে হতেই তাঁর আবেগ এবং অননুকরণীয় গায়নভঙ্গিকে একাগ্রভাবে আত্মস্থ করেছেন, মায়া সেনের কড়া স্বরলিপিবদ্ধ তালছন্দের শাসন মাথায় নিয়েই। তাই সেই তরুণীর গায়কী পরবর্তীকালের এক অনন্য ঐতিহ্যের স্মারক, যা তাঁর সমসাময়িক বা অনুজপ্রতিম কেউ-ই হয়তো রপ্ত করতে পারেননি। দুই বিপরীত ঘরানার এই সেতুবন্ধ তার সমসাময়িক একজন শিল্পীও করা তো দূরস্থান, ভাবতেই পারেননি। ফলে এভাবেই সেই তরুণী, ততদিনে অবশ্য পূর্ণা নারী… একটু একটু করে হয়ে উঠেছেন রবীন্দ্রসংগীতের একাকী পথের পথিক, আত্মমগ্ন, অন্তঃপুরচারিণী একান্ত রবীন্দ্র-উপাসক। সুরসাধক।

রবীন্দ্রসংগীতের এই প্রবীণতম শিল্পী, বিভা সেনগুপ্ত অতি সম্প্রতি চলে গেলেন। আজ এই লেখায় স্বীকার করতে লজ্জা লাগলেও এ-কথা সত্যি যে এই প্রবাদপ্রতিম শিল্পীর নাম আমি জেনেছিলাম মাত্র ২০২৪ সালে, তাও ঘটনাচক্রে, আমার শাশুড়িমায়ের কাছ থেকে। শাশুড়ি মা নিজেও রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পী, গান এখনও নিয়মিত শেখেন, চর্চা করেন, তাঁর সব আনন্দের-দুঃখের অভিমানের সঙ্গী রবীন্দ্রসংগীত। গীতবিতান তাঁর প্রিয়তম আশ্রয়। তাই আমি মাঝে-মাঝে আমার গোপন সংগীতসুধা-আকাঙ্ক্ষা মেটাতে মায়ের কাছে ঝাঁপি খুলে বসি। সেই মা, ২০২৪ সালে হঠাৎই একদিন একটা ইউটিউব লিংক পাঠালেন। এক অশীতিপর বৃদ্ধা (তখনও নাম, ধাম, বয়স কিচ্ছু জানতুম না) ‘কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি’ গাইছেন। খোলা মঞ্চে একটিমাত্র মাইক আর একটিমাত্র হারমোনিয়ম সঙ্গী। গান শুনে চোখ ট্যারা হয়ে গেল! এ কী রে বাবা! ওই ঝুলে পড়া চামড়া আর ফোকলা দাঁতের মধ্য দিয়ে এই গান বেরচ্ছে? এ কি সত্যি? এআই নয়তো? আশ্চর্য হয়ে মাকে বললাম, ‘আরিব্বাস, এঁকে কোথায় পেলে মা? কী রেঞ্জ এখনও গলার! আর কী অসামান্য এক্সপ্রেশন, এই বয়সেও মীড়ের ওপর কী নিয়ন্ত্রণ! সাংঘাতিক!’ মা আমার চেয়েও বেশি আশ্চর্য হয়ে বললেন, ‘এ কী রে, উনি তো বিভা সেনগুপ্ত! এই বাংলায় রবীন্দ্রসংগীতের প্রবীণতম শিল্পী। তুই আগে ওঁর গান শুনিসনি? নামও শুনিসনি? সে কী!’

অজ্ঞতা ধপাস করে প্রকাশ পেয়ে গেল। কিন্তু প্রবল লজ্জার চেয়েও প্রবল বিস্ময় এবার আমাকে চেপে ধরল। কে ইনি? কেন আমি কোনওদিন ওঁর গান শুনিনি কোত্থাও? ওঁর একটাও রেকর্ড, ক্যাসেট কেন ছিল না আমাদের বাড়িতে? আমি চার বছর বয়স থেকে রবীন্দ্রসংগীতের ছাত্রী। তবু আমার কোনও গুরুর মুখে আমি কেন শুনিনি ওঁর নাম? আমার অবচেতনে প্রায় জন্মের পর থেকেই গানের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। মা আর বাবা দু’জনেই গাইতেন। যদিও কেউ কখনও প্রথাগতভাবে শেখেননি, তবু রবীন্দ্রসংগীত ছিল ওঁদের রক্তে-মজ্জায়, নিঃশ্বাসে-প্রঃশ্বাসে। বাবার যৌবনকালে হেন কোনও রবীন্দ্রসংগীত-শিল্পী নেই, যাঁর গান মঞ্চে বা রেকর্ডে বা রেডিওতে বাবা শোনেননি, বা পরবর্তীতে আমাকে শোনাননি! তাহলে ইনি কেন বাদ পড়লেন? কেন বিভা সেনগুপ্ত নামটা আমার অপরিচিত থেকে গেল? কেন গোটা আশি-নব্বই দশকে টেলিভিশনের পর্দায় ওঁকে সেভাবে দেখলাম না? কেন ইউটিউব জমানায় ওঁর গান শুনতে পেলাম না এতদিন? কেন কোনওবার রবীন্দ্রসদনে রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানে ওঁর উপস্থিতি দেখিনি? বুঝতেই পারছিলাম না। এ কেমন রহস্য!

কিন্তু করার কিছু নেই। জীবন তো আধখানা কেটে গেছে ওঁর নাম না-জেনে, গান না-শুনে। এবার ভরসা ইউটিউব আর গুগল। শুরু করলাম খোঁজাখুঁজি। আর বুঝলাম, বিস্ময় আমার সবে শুরু। কী অসামান্য গায়কী, কী সাংঘাতিক গলার রেঞ্জ, কী অসংকোচ, উন্মুক্ত উচ্চারণ, কী অব্যর্থ Pause দু’টি শব্দের মাঝখানে! আর এই সবই আমি দেখছি অটুট, ওঁর ৯২ বছর বয়সে! খুঁজে-খুঁজে ওঁর কম বয়সের কিছু গান বের করলাম। শুনলাম। তবু যেন হাত চলে যায় বৃদ্ধবয়সের গানের ভিডিওর দিকেই। এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা, শতবর্ষের দশক বেয়ে এগোচ্ছেন, লোলচর্ম, পলিতকেশ, দন্তহীন… হয়তো খানিক অসুস্থও (জানি না সেটা নিশ্চিতভাবে)… এরকম মাইকের সামনে একা বসে আছেন দাপটের সঙ্গে, আত্মপ্রত্যয় যেন জড়ানো সারা শরীরে। গানের খাতাটাতা কিচ্ছু নেই সামনে, একফালি কাগজও নয়। চোখগুলি বয়সের ভারে কিছুটা ছোট আর ঘোলাটে। তবু চশমার ফাঁক দিয়ে সেই চোখ থেকেই যেন ফুটে বেরচ্ছে এক অদ্ভুত নির্লিপ্তি, অকৃত্রিম আত্মনিবেদন। বিরলদন্ত মুখ দিয়ে শ স ষ ত থ ট খানিকটা ফশ ফশ করে বেরিয়ে পড়তে চাইছে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু কণ্ঠের এক আশ্চর্য নিয়ন্ত্রণ আর ভাবপ্রকাশের সংযম যেন সেই উচ্চারণকে লাগাম দিয়ে বাঁধছে। কী সহজ, অনায়াস ভঙ্গিমায় গেয়ে যাচ্ছেন একের পর এক দুরূহ গান। স্বরবিচ্যুতি নেই কোথাও। সুরতাললয় একেবারে হাতের তালুতে মাপা। অথচ প্রতিটি শব্দের অর্থ যেন আলাদা করে এগিয়ে এসে বলছে ‘আমাকে দেখুন!’ এমনটি তো আগে কখনও শুনিনি! কেন শুনিনি? এ প্রশ্ন কুরে-কুরে খায়!

প্রসঙ্গত বলি, আমার সংগীতগুরুরা ভাগ্যক্রমে সকলেই ছিলেন গোঁড়া রবীন্দ্রপন্থী। ভাবপ্রকাশের নামে নোটেশন নিয়ে এদিক ওদিক কেরামতি, তালবদ্ধ গানে তাল ছেড়ে দিয়ে ঢেলে ঢেলে অজস্র মীড় দিয়ে গায়ন, এক্সপ্রেশনের দোহাই পেড়ে টপ্পাঙ্গের গানে দানার পর দানা মিহিদানা দিয়ে দিয়ে দিয়ে দিয়ে অনর্থক শব্দের লেজে আগুন দিয়ে টেনে লম্বা করে ফেলা, আচমকা অন্তরা থেকে গান ধরে ফেলা— এসবই চিরকাল জেনেছি অত্যন্ত নিন্দনীয়, পরিহার্য বলে। গুরুদের কাছে আজীবন শিখে এসেছি রবীন্দ্রসংগীত গাওয়ার প্রধান শিক্ষা: পরিমিতিবোধ। কিন্তু আসল শিক্ষা হল, সেই পরিমিতির লক্ষ্মণরেখার মধ্যে দাঁড়িয়েও সুরকে কথাকে ভাবকে জ্যামিতির মতো নানা দিকে নিয়ে যাওয়া… কখনও আঘাত, কখনও আদর, কখনও নিবেদন, কখনও নিষ্কৃতি— অনায়াসে এইসব ঘাটে-ঘাটে গানকে নিয়ে যাওয়া আলতোভাবে। কখনও থামবে, কখনও বা থামার ভাব হবে কিন্তু থামবে না, তালের গতির ফাঁকে-ফাঁকে ভাবের গতি পুরে দিয়ে এগোবে গান। সেই তো প্রকৃত রবীন্দ্রসংগীত-শিক্ষা!

নবতিপর বিভা সেনগুপ্তর গানে সেই প্রতিটি তত্ত্ব যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়ে উঠতে দেখলাম আমি। ওই ৯২ বছর বয়সেও দেখলাম এতটুকু কক্ষচ্যুত হয়নি তাঁর সাধনা। আরও খুঁজতে খুঁজতে পেলাম এক অমূল্যরতন। প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের পারফরমিং আর্টসের অধ্যাপক শ্রীমতী মুখোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে তৈরি বিভা সেনগুপ্তকে নিয়ে তথ্যচিত্র। দেখতে শুরু করে হঠাৎ বুঝতে পারলাম, কেন তিনি অসামান্যা হয়েও মূলস্রোতে চিরকাল ব্রাত্য, অপাঙক্তেয়। কারণ রবীন্দ্রসংগীতের সেই একমেবাদ্বিতীয়ম ব্রাত্যজনকেই যে গুরু বলে মেনেছিলেন বিভা! তাঁর রুদ্ধসংগীত অনিরুদ্ধ হয়েছিল ছাত্রী বিভার গলায়, কিন্তু সামনের সারিতে আসেনি সেভাবে। আসেনি? না কি আসতে দেওয়াই হয়নি? না কি কোনও দুর্ল্যঙ্ঘ অভিমান চেপে গুরুর মতোই অসামান্য প্রতিভা নিয়ে চিরটাকাল উপেক্ষিতা রয়ে গেলেন বিভা? কেন? শুধু গুরুপরিচয়ের বদান্যতা?

অথচ নিজেকে ‘দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্রী’ বলে কখনও পরিচয় দিতেন না বিভা। অন্য কেউ বললে সংশোধন করে দিতেন। বলতেন, ‘আমি মায়া সেনের ছাত্রী। তাঁর কাছেই আমার হাতেখড়ি, আমার শিক্ষা। আর তাঁর হাত ধরেই জর্জদাকে পাওয়া। জর্জদাকে অনুকরণ করবার যোগ্যতা আমার নেই। আমি শুধু তাঁকে শুনেছি। তাঁর গায়কীর মূলে পৌঁছতে চেষ্টা করেছি। কেন তাঁর গান এমনভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষকে পাগল করে? কী আছে তাঁর ভাবের ঘরে? আমি জানতে চেয়েছি তাকে।’ তাই মায়া সেনের এই একনিষ্ঠ শিষ্যা বারংবার খুঁড়ে দেখতে চাইতেন গানের প্রতিটি শব্দের প্রক্ষেপণ কেমন করে করছেন জর্জদা। তাঁর কাছে বিভা শিখেছিলেন কীভাবে একই পঙক্তির কয়েকটি শব্দকে নানাভাবে গেয়ে গেয়ে দেখতে হয়, কোন ধরনটিতে গানের সবটুকু অর্থ শ্রোতাকে নাড়া দিয়ে যাবে! একই পঙক্তির নানা স্থানে যতি এনে-এনে পরীক্ষা করতে হয়, কোনখানে দম ছাড়লে দোলা লাগছে মনে! অথচ জর্জদার তত্ত্বাবধানে এই নিরন্তর পরীক্ষানিরীক্ষা সত্ত্বেও স্বরলিপি থেকে এতটুকু বিচ্যুত হননি কখনও! মায়া সেনের শিক্ষাকে এমনই অন্তস্থ করেছিলেন, যে, তাকে এড়িয়ে স্বরলিপিচ্যুত হয়ে কোনও পরীক্ষা করার কথা ভাবতেই পারতেন না। তাহলে কোন রহস্যে তিনি আড়ালে রয়ে গেলেন আজীবন? সুচিত্রা, কণিকা, সুবিনয়, অশোকতরু-র সেই তারকাখচিত সভার একটি কোণেও কেন তাঁকে দেখতে পেলাম না আমরা? কেন তাঁকে রেকর্ড করা হল না সেভাবে? আমার জানা নেই। কারণ এসবই আমার জন্মের বহু আগের কথা।

জন্মের পরের চল্লিশটি বছরে যাঁর নাম জানতে পারিনি, গান শুনতে পাইনি, তাঁর ব্যাপারে জন্মের আগের খবর আমার কাছে থাকার কথা নয়। থাকতও না, যদি না হঠাৎ করে হাতে এসে পড়ত ওই তথ্যচিত্র এবং বিভা সেনগুপ্তর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার। জানতে পারতাম না জর্জ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর আশ্চর্য রসায়ন তথা গুরু-শিষ্য সম্পর্কের কথা। প্রায় প্রতিদিন সন্ধেবেলা ছ’টা থেকে রাত আটটা, সাড়ে আটটা পর্যন্ত বিভা থাকতেন ও-বাড়িতে। গান নিয়ে কথা, গান শেখানো, গান শোনানো, নানা সংশোধন, নতুন গানের কথা, পুরনো গানের স্মৃতি রোমন্থন চলতেই থাকত। আটটার ঘণ্টা বাজলে জর্জদা তাঁর অতিবিশ্বস্ত এক অনুচরকে বলতেন ‘যা দিদিকে একটু পৌঁছে দিয়ে আয়।’ অথচ তাঁদের নিয়ে কখনও কোনও কুৎসা করতে পারেনি কেউ, একটিও কুবাক্য লেখা সম্ভব হয়নি তাঁদের রসায়ন নিয়ে। আমৃত্যু বিভা ‘জর্জদা আপনি’ সম্বোধন করেছেন বিশ্বাসমশাইকে, আর তিনি এই অনুজপ্রতিম কন্যাকে ডেকেছেন ‘বিভাদি আপনে’ বলে! সম্পর্ক পারিবারিক রূপ নিয়েছিল ক্রমে-ক্রমে। বিনা পারিশ্রমিকে জর্জ বিভার জন্মভূমি আগরতলায় গিয়েছেন একাধিকবার, মায়া সেনের সঙ্গে। বলেছেন ‘আমারে পয়সা দেওন লাগব না। থাকতে খাইতে দিলেই হইব। বললে দুইটা গানও গায়্যা দিমু।’ গেয়েছেনও। বিভার দাদা যখন বদলি হলেন এলাহাবাদে, তখনও বারবার ফিরে-ফিরে গিয়েছেন সেখানে, নতুন-নতুন গান নিয়ে। বিভার বউদি রাশিয়ান ভাষা জানেন শুনে ‘তোমার হল শুরু’ গানের কথা লিখে দিয়েছিলেন শুদ্ধ রাশিয়ানে! সে-কাগজ বিভার কাছে রাখা ছিল সযত্নে।

কিন্তু এতসব তথ্যের আবডাল গলে কোথায় যেন বিভার এই নিভৃতি, এই জনবিস্মৃতির আড়াল, এই অন্ধকারের অন্তরধন হয়ে থাকার একটা প্রচ্ছন্ন ব্যাখ্যা মনে-মনে উঁকি দিচ্ছিল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই যেন বুঝতে পারছিলাম, স্বরলিপির পরিমিতি আর ভাবের জ্যামিতির এই সাংঘাতিক মাদারি কা খেল কীভাবে অনায়াসে গলায় ফোটাতেন এই মানুষটি। যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছিলাম, মায়া সেন এবং জর্জ বিশ্বাস বিভা-র দুইদিকে দাঁড়িয়ে। একজন সুতো ছাড়ছেন, একজন টানছেন। বিভা হাঁটছেন সেই সুতোর ওপর দিয়ে। একাকী। গানের মন্দিরাখানি দুই হাতে ধরে ভারসাম্য রেখে এগচ্ছেন দৃঢ় নিশ্চিত পদক্ষেপে। তিনি জানেন কোন মুহূর্তে কোনদিকে ঝুঁকে আবার সোজা হতে হবে। পদস্খলন হওয়া চলবে না একচুল। তাঁর মায়াদি যেন অদৃশ্য শাসনে খুলে ধরছেন স্বরবিতানের পাতা, আর তাঁর জর্জদা বাদল দিনের পাগলা হাওয়ার মতো উড়িয়ে দিতে চাইছেন তাকে। বিভা দেখছেন সব, অথচ দেখছেন না। সামনে নিবদ্ধ স্থির দৃষ্টিতে বিভা কেবল দেখছেন পাখির চোখটুকু। স্বরলিপির কিনার বেয়ে অবলীলায় খোলা চুল আর নীলাম্বরী আঁচল ওড়াচ্ছেন আবেগের বর্ষাবাতাসে! এমন যুগলবন্দি কেউ কখনও শুনেছে? রবিশংকর আর মেনুয়িনকে বলে বলে টক্কর দেয় ৯২ বছরের সেই একক দ্বৈতসত্তা! অথচ তাঁর আশপাশে কোনও জনবাহুল্য নেই, এনকোর-এনকোর নেই, করতালির পায়রা ওড়ানো নেই, আসুন দিদি বসুন দিদি নেই, বড়-বড় গাড়ি-বাড়ির বৈভব নেই, একশোখানা বুম আর লাইট, সাউন্ড, অ্যাকশনের উচ্চকিত আস্ফালন নেই, কিচ্ছু নেই। আছে শুধু একটি হারমনিয়াম আর একজোড়া ক্ষীণকায় হাত।

আঙুলের শিরা বেরিয়ে এসেছে উঁচু-উঁচু হয়ে, মণিবন্ধে ঢলঢল করছে একখানি চুড়ি, ব্লাউজের হাতা ঢিলে হয়ে গিয়েছে। সাদা শাড়ি আলুথালু জমে আছে এক কাঁধে। তবু সেই হাত দু’টি থামছে না। একজন বেলো টানছে আর একজন ঘুরছে সাদাকালো রিডের ওপর। নির্দন্ত মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছে আর বেরিয়ে আসছে বাঁশির মতো এক একবগ্গা সুর। ‘কালো তারে বলে গাঁয়ের লো-ও-ও-ও-ও-ক!’ টপ্পার দানাগুলো যেন কয়েকটা মুক্তোদানার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে হারমনিয়ামের কাঠের ওপর। টুকটুক শব্দ পাচ্ছি যেন! পরক্ষণেই সেই সবটুকু হাতের মুঠোয় ভরে নিয়ে মোহনবাঁশি লুকিয়ে পড়ছে অশথগাছের আড়ালে। একটুকু মুখ বের করে আলতো করে লাগাচ্ছে কোমল নিষাদ, এক দোলনে পৌঁছে যাচ্ছে কোমল ধৈবতে… তাতেই যেন ঘন নীল মেঘ পুঞ্জ-পুঞ্জ হয়ে নেমে আসছে বনপুকুরিয়ার মাঠের ওপর, কোপাইয়ের জলে সেই জলভরা মেঘের কালো ছায়া যেন নিবিড় হয়ে ডুব দিচ্ছে।

ঠিক তখনই বাঁশি হঠাৎ থেমে গিয়ে… সুরে ঝিমঝিম কবিতার মতো অকুণ্ঠ উচ্চারণে শুধোচ্ছে… ‘কালো?’

কী দৃপ্ত সেই উচ্চারণ!