নির্দেশক নানা

Nana Patekar

আমি যখন নানা পাটেকরের সঙ্গে কাজ করেছি ‘প্রহার’-এ, তখন নানা পরিচিতই ছিল ওর খামখেয়ালের জন্য, ওর ‘আনপ্রেডিক্টেবলিটি’-র জন্য। ‘প্রহার’-এর চিত্রনাট্য ও নির্দেশনা ছিল নানা-র। নানা-র ওই মেজাজমর্জির সুনাম এতটাই বেশি ছিল যে, আমিও কিছুটা ভাবিতই ছিলাম তা নিয়ে। কিন্তু আমার চমকে দেওয়ার মতো উলটো অভিজ্ঞতা হয়েছিল। নানা আমার সঙ্গে এতটাই নরম ব্যবহার করেছিল নির্দেশক হিসেবে, যাতে মনে হয়েছিল, নানা-র হাতের তালুতে আমি একটা ফুলের পাপড়ির মতো রয়েছি।

শার্লি, অর্থাৎ মাধুরী দীক্ষিত অভিনীত চরিত্রটির ভাইয়ের চরিত্রে আমি অভিনয় করেছিলাম। বহু ক্ষেত্রেই আমরা, মানে আমি আর নানা আলোচনা করতাম পরস্পরের সঙ্গে চরিত্র নিয়ে। হয়তো আমি একটা দৃশ্যে আমার মতো করে অভিনয় করলাম, নানা বলত, ‘ভাল করেছ, কিন্তু এভাবেও করা যায়’, বলে হয়তো অন্যরকমটা ও করে দেখাল, তারপর বলল, ‘এভাবে করে দেখবে একবার?’ হয়তো বলল কখনও, ‘এইটা ওয়ান শট নিয়ে নিই, কী বলো?’ কখনও আবার মাধুরী হয়তো কোনও পরামর্শ দিল, ও বলত, ‘মাধুরী, বিচ পে মাত বোল, ছেলেটা ঘাবড়ে যাবে তো! তোমার ওপর রেগে গিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করলে কে সামলাবে?’ আশ্চর্য কথা, সবটাই কিন্তু আমাকে আরও স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতিতে রাখার জন্য।

আরও পড়ুন: বলিউডের প্রতি অভিমানী ছিলেন নানা পাটেকর! লিখছেন অর্জুন চক্রবর্তী…

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই ছবিতে আমার করার কথা ছিল কিন্তু কমান্ডোর চরিত্র, যে-চরিত্র করেছিল বিশ্বজিৎ প্রধান। কিন্তু শুটিং যখন শুরু হল, আমার হঠাৎ জন্ডিস হয়ে গেল! আমার তো ভীষণ মনখারাপ, ভাবলাম, ছবিটা বোধহয় আর করা হল না আমার। কিন্তু নানা এমনই জেদি পরিচালক, ও বলল, ‘শোনো ভাই, এই ছবি থেকে তোমার মুক্তি নেই। ছবিটা তুমি করছই!’ শেষমেশ তা-ই হল। এই চরিত্রটা আমার সেইভাবেই পাওয়া। আমার মনে আছে, নানা আমাকে এই কথাও বলেছিল, ‘তোমাকে কমান্ডোর চরিত্রটাই দিতাম। কিন্তু তোমার ভালর জন্যই দিলাম না। ওই চরিত্রটার জন্য যে-ট্রেনিং লাগবে, সেইটা করতে গেলে তুমি সিম্পলি মরে যাবে।’ তাই ওই নেশাড়ু চরিত্রটাই আমার জন্য বরাদ্দ হল তখন। দুটো মাত্র সিন, অথচ কী যত্ন নিয়ে আমাকে দিয়ে ও অভিনয় করিয়েছিল, ভাবলে আশ্চর্য লাগে এখন!

ওই নেশাড়ু চরিত্রটাই আমার জন্য বরাদ্দ হল তখন

নানা-র মতো নিবেদিতপ্রাণ অভিনেতা আমি দেখিনি। কিন্তু পরিচালক হিসেবে ওর একটা আচরণ আমাকে খুব অবাক করেছিল। আমি এই দুটো সিন পড়েই তো ফিদা হয়ে গিয়েছিলাম! ভেবেছিলাম, কী চমৎকার সিন! একটু প্রস্তুতি নেওয়া যাক। তো, আমি আমার মতো করে প্রস্তুতি নিয়েই চলেছি, নানা দেখছি আমার সঙ্গে রিহার্সালের ব্যাপারে গা-ই করছে না। এদিকে আমি জানি, নানা-ও আমার মতো থিয়েটারেরই লোক। কিন্তু আমাকে ও ছেড়ে রেখে দিয়েছিল। একদিন এমনও হয়েছে, নানা-র খোঁজে বেরিয়ে কোন একটা বাড়ির বাইরে দেখি ওর জিপটা দাঁড়িয়ে। আমি দ্বিরুক্তি না করে ঢুকে গিয়েছি সেই বাড়িতে। ঢুকে আবিষ্কার করেছি, ওটা দেবু দেওধর, মানে, ‘প্রহার’-এর চিত্রগ্রাহকের বাড়ি। আমি তো চরম অস্বস্তিতে! নানা কিন্তু নিরুত্তাপ, ও আমাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে ডেকে নিয়েছিল।

আমি একেবারে চরিত্রর মতো জামাকাপড় পরতে শুরু করে দিয়েছিলাম তখন। নানা-কে বললাম, আমি কিন্তু সবরকমের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি, কী কী করব সিনে, তা নিয়ে আমি একেবারে নিশ্চিত। নানা-র উত্তর ছিল, ‘আমিই এখনও পরিচালক তো? তোমার কথা শুনে তো তা বোঝা যাচ্ছে না!’

একটা কথা এখন মনে পড়লে একটু অদ্ভুতই লাগে। শুটিংয়ের পর নানা মধ্যাহ্নভোজের নেমন্তন্ন করেছিল আমাকে, আমার মনে আছে, সরাসরি বলে দিয়েছিলাম, ‘তুমি আমাকে সময় দাওনি, আমিও তোমাকে সময় দেব না!’ কিন্তু এখন বুঝি, নানা নির্দেশক হিসেবে ছিল অসম্ভব শান্ত। আমার বয়স তখন কম ছিল, তাই হয়তো বুঝিনি, কিন্তু মনে হয়, নানা বোধহয় বুঝেছিল যে, আমার সঙ্গে ওর রিহার্সাল না হলেও চলবে। হিন্দিতে একটা কথা আছে, যার মানে কতকটা এরকম যে, হাতি যখন চলে, হাতির হেঁটে আসা জায়গার শূন্যস্থানটাও তার পিছু-পিছু চলে। নানা পাটেকরকে নিয়ে আমার সেই কথাটাই বলতে ইচ্ছে করছে, এত অজস্র ছবিতে নানা-র স্বাক্ষর রয়ে গেল, কিন্তু একইসঙ্গে যেন, নানা আর নেই, এই শূন্যস্থানটাও রয়ে যাবে, একইভাবে।