উল্টো দূরবিন: পর্ব ৩৬

‘তালি-বান’ দাদু

দাদুর চোখের ছানি অপারেশন করা হয়নি। ছানিটা শুরু হয়েছিল ৭০ বছরের পর থেকে। ৮০-তেও মোটামুটি ভালই দেখতে পেতেন। দাদু ৮৯ বছর বয়সে প্রয়াত হন। আমি দাদুর কিছুই পাইনি। আমার প্রথম চোখের ছানি অপারেশন করা হয় ৫৫ বছর বয়সে, দ্বিতীয় চোখ ৫৯ বছর বয়সে। আর ৭২ বছর বয়স থেকে এআরএমডি (Age related macular degenaration) রোগে ভুগছি। বাঁ-চোখটা আক্রান্ত হয়। ক্রমশ দৃষ্টিশক্তি কমে যাচ্ছে। কিছুদিন পর পর চোখে ইঞ্জেকশন নিতে হয়, যা খুবই ব্যয়সাপেক্ষ। অন্য চোখটাও সম্প্রতি আক্রান্ত হয়েছে। এর নাকি কোনও চিকিৎসা নেই। ইঞ্জেকশন দেওয়া হয় অন্ধত্বকে বন্ধ করতে নয়, ডিজেনারেশনকে বা ধ্বংসগতিকে কিছুটা ধীর করার জন্য মাত্র।

আমার বাবার চোখও বেশ ভাল ছিল। বাবার ছানিও অপারেশন করতে হয়নি। শেষ বয়সেও চোখে ভাল দেখতেন, কানে ভাল শুনতেন। দাদু যতদিন পেরেছেন, বই পড়েছেন, নানা ধরনের বই। বইপত্র বাড়িতে বেশি ছিল না। পিসেমশাই পত্রপত্রিকা কিনতেন, ‘দেশ’ কিনতেন প্রতি সপ্তাহে। ‘বসুধারা’ নামে একটি পত্রিকার কথাও মনে পড়ে। ব্যবসায়ী মানুষ, অথচ এইসব পড়তেন। আমরা আর পিসেমশাইরা যখন এক বাড়িতেই ছিলাম, ওদের ঘর থেকে নিয়ে দাদু বই-পত্রিকা পড়তেন।

আরও পড়ুন: এক-একটা ক্যামেরার ফ্ল্যাশে জ্বলে উঠত এক জীবন! ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৩৬…

আমার বাবার পড়াশোনার অভ্যেস বেশি ছিল না। সময়ও ছিল না। তুমুল জীবনসংগ্রাম করতে হয়েছে। দাদু তো ৬০ বছর বয়সেই পার্টিশনের টালমাটালের মধ্যে পড়েছেন, আর বাবা তো প্রায় প্রথম যৌবনেই। এদিকে চলে আসা, চাকরি, টিউশনি, বিশাল সংসার সামলানো। যখন একটু অবস্থা ফিরেছে, নিজেদের একটা বাড়ি হয়েছে, আমি চাকরি পেয়েছি, বাবার তখন আর খুব একটা পড়াশোনার আগ্রহও জন্মায়নি। বাবা অবশ্য খবরের কাগজটা পড়তেন ভাল করে। গল্প করতে খুব ভালবাসতেন। আত্মীয়স্বজন আসত, নইলে বাবাই চলে যেতেন। কত গল্প— পাড়াপড়শির সঙ্গে, দুধওয়ালার সঙ্গে, সবজিবিক্রেতার সঙ্গে।

দাদুকে চুপচাপ শুয়ে থাকতে দেখতাম না। কিছু-না-কিছু করতেন সব সময়ে। মশারির সেলাই খুলে গেলে সূচ-সুতো দিয়ে সেলাই করতেন, নাহলে তালপাতার পাখাটার চারদিকে শাড়ির পাড়ের বর্ডার সেলাই করতেন। এতে পাখাটার সৌন্দর্য বাড়ে, কিন্তু তখন সুন্দর-টুন্দর নগণ্য ব্যাপার। শুধুই টেকসই করা হচ্ছে পাখাটাকে। চলবে অনেকদিন। যদিও তখন একটা তালপাতার পাখার দাম দু-আনা বা তিন আনা। ওটাও যেন অন্তত চার-পাঁচ বছর টিকে যায়, সেই ভেবেই পাড় লাগানো। দাদুকে শতরঞ্চিতেও তালি লাগাতে দেখেছি। শতরঞ্চি ফুটো হয়ে গেলে টুকরো কাপড়ের তালি লাগাতেন নিজেই। এতটাই ‘তালি-বান’ ছিলেন আমার দাদু। শুধু দাদু নয়, গোটা পরিবারেরই এই অভ্যেস ছিল। কোনও জিনিসকে বহুদিন এবং বহু ভাবে ব্যবহার করার নানাবিধ ফন্দিফিকির উদ্ভাবন করা হত। তরি-তরকারির খোসা বা চোকলা ফেলে দেওয়া হত না। যতটা সম্ভব অন্যভাবে ব্যবহার করা হত। লাউ-চালকুমড়োর চোকলা আগে ভাপিয়ে নিয়ে সামান্য তেলে কালোজিরে-শুকনো লঙ্কা দিয়ে ভেজে নেওয়া, পটলের খোসা বাটা, কুমড়োর দানাগুলো শুকিয়ে ভেতরের শাঁস বার করে নিতে বাটা— তার যে কী অপূর্ব স্বাদ! মাছের তেল, কাঁটা, মুড়ো কিছুই ফেলা যেত না। নেহাত আঁশটা খাওয়া যেত না।

উনুনের আঁচ নিভন্ত হলে সেই উত্তাপটুকুও ব্যবহার্য ছিল। সেই আঁচে রাঙা আলু বা পেঁয়াজ ফেলে দিলে ওটা নরম হয়ে থাকত। এমনকী, ছাইটুকুও ফেলা যেত না। সেই ছাই দিয়ে বাসন মাজা হত। বিরাটির বাড়িতে ওই ছাই মানকচু গাছের গোড়ায় ফেলে দেওয়া হত। ওই ছাইয়ে প্রচুর পুরুষ্ট হয়। ক্যালেন্ডারের পাতার পুরনো মাস ছিঁড়ে গেলে উল্টোদিকে হিসেব লেখা হত, ক্যালেন্ডার দিয়ে বানানো হত বইয়ের মলাট। শাড়ি ছিঁড়ে গেলে তার পাড় রেখে দেওয়া হত। শাড়ি, ধুতি জড়ো করে একটার ওপর আরেকটা রেখে পাড়-ছেঁড়া সুতো দিয়ে কাঁথা সেলাই হত। সেলাইতে নকশা থাকত। ফুল, প্রজাপতি, মাছ, কলকা এরকম। তবে ফুল-ফুল খেলার সময়ে ততটা ছিল না, যতটা প্রয়োজন। কাঁথাই হত বেশি, কাঁথা সেলাই একজনে ভাল হয় না। মা-ঠাকুমা মিলেই এই সেলাই করত, তবে ঠাকুমার ‘ভইনডি’-রা এলে কাঁথা নিয়ে বেশ একটা উৎসব ভাব চলে আসত। তিন-চারজন মিলে। মানুষের মনে একটা শিল্পীমন থাকে, গোপনে, আনন্দে সেটা প্রকট হয়। সেই আনন্দ লুকিয়ে থাকে হরমোনের খেলায়। মনে পুলক জাগে, চোখে ঘনায় ঘোর। কাঁথার ওপর ফুটে ওঠে নানারকমের ফুল।