‘Love is a cannibal, cutting out your eyes, surgical precision, an incision… /
If only the act were holy, to brave the bite and cling for life, they must call that matrimony.’
(Love is a Cannibal, Mel Rose)
মানুষের আকাঙ্ক্ষার রং কি রক্তবর্ণ? এক শরীরের অন্য শরীর পাওয়ার কামার্ত ইচ্ছের ঘ্রাণ কেমন? তা কি তীব্র কোনও আমিষগন্ধ? রক্তমাংসের মানবশরীরের প্রতি মানুষের লোলুপতার স্বাদ কেমন? সেই কোমল-কঠিন শরীরী সোয়াদের লোভ কি এতই জোরালো যে, সহজেই মানুষ অতিক্রম করে ফেলতে পারে ‘আমি’ এবং ‘অপর’-এর মধ্যবর্তী দূরত্ব? অন্য একটি শরীরকে অধিকার করার কামনা কি এতদূর তীব্র হয়ে উঠতে পারে, যেখানে মানুষ সেই দেহকে নিজের শরীরে মিশিয়ে নিতে, নিজের দেহের সঙ্গে সংযুক্ত করতে চায় বন্য আদিমতায়? যদি এমন করে ভেবে দেখা যায়, যে এই অদম্য আকাঙ্ক্ষার উৎপত্তি ঠিক কোথায়?
এই প্রসঙ্গে জ্যাক লাঁকার মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বের উল্লেখ আবশ্যিক। লাঁকার মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্ব অনুযায়ী আকাঙ্ক্ষা বা ‘ডিজায়ার (desire)’ উৎপন্ন হয় অভাব বা ‘ল্যাক (lack)’ থেকে। একজনের কাছে যা নেই, তা পাওয়ার জন্যই আকাঙ্ক্ষা জন্মায়। এবার এই পাওয়ার সীমা কোথায়? কতটা পাওয়া হলে, পাওয়া সম্পূর্ণ হয়েছে বলে মনে হয়। এখানেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মানবমস্তিষ্কের জটিল চিন্তাপ্রবাহ। মানুষের অনেক সময় পেয়েও পাওয়া শেষ হয় না। আরও পাওয়ার ঝোঁক চেপে বসে। সে নিজের শরীরের সীমা পার করে পেতে চায় অন্য শরীরকে। এই ইচ্ছে হল ইরোটিসিজম বা কামোত্তেজনার এক চরম পর্যায়। এখানে নিঃসন্দেহে উল্লেখ্য জর্জ বাতাইয়ের ‘এরোটিসিজম’ বইয়ের একটি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ উক্তি—
‘Eroticism is the approval of life up to the point of death.’
আরও পড়ুন: বিশ্বজুড়ে পিছিয়ে যাচ্ছে নারী অধিকারের লড়াই? লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…
অর্থাৎ, জর্জ বাতাইয়ের মতে কামতাড়না শুধুমাত্র যৌন ক্রিয়াকলাপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তা শরীরের সীমালঙ্ঘন করে পৌঁছে যেতে পারে এক অদ্ভুত হিংসাত্মক মনোজগতে, যেখানে শরীরের সীমারেখা মুছে দিতে, মানুষ একে-অপরের শরীর-ভক্ষণেও লিপ্ত হতে পারে। একেই বলা হয় ‘সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম’ বা ‘যৌন নরখাদকতা’। এই ভক্ষণক্রিয়ার মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত অন্য শরীর প্রবেশ করে নিজের শরীরে। সেই যৌনতার উৎস যদি হয় প্রেম, সেক্ষেত্রে মৃত্যুকে তখন অনাকাঙ্ক্ষিত মনে হয় না। এমনকী, যার শরীরকে ভক্ষণ করা হচ্ছে, সে নিজেও চাইছে এমন রতিসম্পৃক্ত একটি ধ্বংসকাণ্ড, এমনটাও হতে পারে। কখনও-কখনও ভালবাসা হয়ে উঠতে পারে এমনই ব্যাখ্যাহীন, চিন্তাভাবনার সাধারণ স্বাভাবিক কক্ষপথ থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া এক সর্বগ্রাসী জ্যোতিষ্কখণ্ড! সেই খণ্ড যে গ্রহের ওপরই আছড়ে পড়ুক, সেই গ্রহের ধ্বংস অনিবার্য। যদিও সেই ধ্বংস হয়ে যাওয়া, আনন্দের না হতাশার— তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে কামাবেগতাড়িত খাদক ও খাদ্যের কামনা ও প্রেমের আন্তঃরসায়নের ওপর।
মার্কিন গীতিকার ইথেল কেইন ঠিক সেই অনুভূতির কথাই প্রকাশ করেছেন তার গানের কথায়-কথায়—
‘Am I no more than a meal to you? / Take me then, piece by piece… / I am yours to chew, yours to swallow.’
(Ode to Eaters, Ethel Cain)
অন্যদিকে সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজমের কিন্তু আরও ভিন্ন অর্থস্তর রয়েছে। ‘ক্যানিবালিজম’ অর্থ হল একটি শরীরকে ভোগ করা— ‘টু কনজিউম’। নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই ভোগ আক্ষরিক অর্থে ভক্ষণ না করেও তো করা যেতে পারে। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীদেহ তো প্রতিদিন হয়ে ওঠে ভোগ করার বস্তু। নারীকে মানুষ কম, পণ্য বেশি মনে হয়। পুরুষ তো বটেই, নারীও নারীকে দেখে, তার গায়ের রং, উচ্চতা, দেহের স্থূলতা, দাঁতের গঠন, স্তনের ওজন ইত্যাদির নিরিখে। যেন এই বিশ্বব্যাপী বাজারের দোকানে-দোকানে বিক্রি হচ্ছে নারীমাংস আর খরিদ্দার পরখ করে নিচ্ছে কোন নারীদেহ কত সুস্বাদু, অর্থাৎ কোন নারীকে ভোগ করলে কতখানি তৃপ্তি পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রেও কিন্তু নারী হয়ে উঠছে খাদ্য, চোখের খাদ্য, ইন্দ্রিয়ের খাদ্য লালসা-কামোদ্দীপনার খাদ্য। এও তো ক্যানিবালিজম! একজন নারীর দেহ যখন কোনও পুরুষ ভোগ করে, তখন সেই লালসার মধ্যে মিশে থাকে এক অনিবার্য অধিকারবোধ। সেখান থেকে জন্ম নেয় হিংস্রতা। নারীশরীরের ওপর নানাবিধ অত্যাচারের মূলে থাকে এই আগ্রাসন, অপরকে অধিকার করার সহিংস লালসা। ফলে বলা যেতে পারে, ধর্ষণও প্রকারান্তরে ক্যানিবালিজম। ১৯৬১ সালে প্রকাশিত জর্জ বাতাইয়ের ‘দ্য টিয়ার্স অফ এরোস’ বইতে আমরা খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা পাই—
‘Eroticism is, in the consciousness of man, that which puts his being in question.’
মানুষের অনিয়ন্ত্রিত কামপ্রবৃত্তির রহস্যময় আনাচকানাচ তার নিজের কাছেই অধরা। সেই রহস্যকে আবার অধরা মাধুরী হিসেবে ভুল করলে মুশকিল। কামতৃষ্ণা মেটাতে মানুষ কতখানি আগ্রাসী ও হিংস্রতার পথ বেছে নিতে পারে তা অনেক সময় সে নিজেই ঠাহর করতে পারে না। অন্য একটি শরীরকে সম্পূর্ণ অধিকার করার, সেই শরীরকে নিয়ে যা খুশি করবার মোহাচ্ছন্নতা কখনও-কখনও মানুষকে তার মনুষ্যত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই কারণেই আজ চারপাশে এত এত ধর্ষণ। সুতরাং, আমাদের চোখের সামনে এই ঘুরে ফিরে বেড়ানো মানুষেরা সকলেই— কেউ খাদ্য, কেউ খাদক।
মার্গারেট অ্যাটউডের উপন্যাস ‘দ্য এডিবল উওম্যান’ এই খাদ্য-খাদক সম্পর্ককে নতুন করে আতসকাচের তলায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এই গল্পের মূল চরিত্র মারিয়ান ম্যাকালপিন টরোন্টোতে বসবাসকারী একজন স্বাবলম্বী কর্মরত তরুণী। মারিয়ান পিটারের বাগদত্তা। দেখা যায়, বিয়ের দিন যত এগিয়ে আসতে থাকে মারিয়ান ততই হয়ে ওঠে খাদ্যবিমুখ। খাবারের প্রতি এক অদ্ভুত অনীহা এবং অস্বস্তি তাকে গ্রাস করে ফেলতে থাকে। খাবারের প্রতি এই বীতশ্রদ্ধ মনোভাব প্রাথমিকভাবে তার শারীরিক অসুস্থতা বলে মনে হলেও পরে বোঝা যায়, এর উৎস গভীরতর কোনও সমস্যা। অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন, আধুনিক জীবনযাপনে স্বচ্ছন্দ একজন তরুণী ক্রমে একথা উপলব্ধি করতে শুরু করে যে, তার স্বাধীন ব্যক্তিসত্তা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সে একটি মানুষ থেকে পরিণত হচ্ছে একটি বস্তুতে। যে বস্তুকে ভোগ করা যায়। ইচ্ছেমতো নিয়ন্ত্রণ করা যায়। মারিয়ানের মুখ থেকে আমরা শুনতে পাই—
‘I was beginning to understand that I was not a person but a thing.’

সমাজের চাপে এবং বহির্বিশ্ব দ্বারা নিজের জীবনকে প্রতি মুহূর্তে নিয়ন্ত্রিত হতে দেখার ফলে মারিয়ানের ক্রমশ মনে হতে থাকে তার পারিপার্শ্বিক জগৎ যেন তাকে খেয়ে ফেলছে। গিলে ফেলছে ধীরে-ধীরে।
পিটার, মারিয়ানের হবু স্বামী ক্রমে এই স্বাধীন নারীর জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। পিটার চায়, মারিয়ান তার পূর্বকল্পিত স্ত্রী-র ভূমিকা একেবারে নির্ভুলভাবে পালন করুক। অন্যদিকে মারিয়ান এই চাপিয়ে দেওয়া স্ত্রী-ভূমিকার কথা ভেবে এতদূর আতঙ্কিত যে, তার সমস্ত প্রতিরোধ ফুটে উঠেছে খাবারের প্রতি তীব্র অনীহার মাধ্যমে। এখানে মারিয়ান নিজেই খাদ্য, এবং পিতৃতান্ত্রিক সমাজ প্রতিনিয়ত তার স্বাধীন চিন্তাশক্তি এবং বেঁচে থাকার আনন্দকে ভক্ষণ করে চলেছে। একে কি তবে ‘সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম’ বলা চলে? নির্দ্বিধায়। পিতৃতন্ত্র একটি নারীর মনের শরীরকে ভক্ষণ করে চলেছে। মনেরও তো একটি শরীর থাকে। সকলের মনের অবয়ব ভিন্ন। সেই মন প্রতি মুহূর্তে ধর্ষিতা। তাই মারিয়ান নিজের মনের মানবসত্তা আর অনুভব করে না। সে বলে—
‘I was the thing that was being eaten.’
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যেতে পারে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক হান কাং-এর ‘দ্য ভেজিটেরিয়ান’ উপন্যাসের কথা। এই গল্পেও আমরা মূল চরিত্র ইয়ং-হে-কে দেখি, সে হঠাৎ সমস্ত আমিষ খাবার প্রত্যাখ্যান করতে শুরু করে। পরিবারের তরফ থেকে তার এই সিদ্ধান্ত যে সহজে মেনে নেওয়া হয়নি, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এখানেও পাঠক স্পষ্ট বুঝতে পারেন, আমিষ খাবার বর্জন করা আসলে একটি প্রতীকি ক্রিয়া। এ যেন পিতৃতন্ত্রের অবিরাম ভক্ষণের বিরুদ্ধে এক স্পর্ধিত পদক্ষেপ। ধীরে-ধীরে ইয়ং-হে শুধু আমিষ খাবারই নয়, সমস্ত রকম খাদ্যদ্রব্যই বর্জন করে। সে মানসিকভাবে নিজেকে একটি প্রাণী থেকে উদ্ভিদে রূপান্তরিত হতে দেখে। এমন এক যাপনে সে স্বস্তি পায়, যার মধ্যে কোনও হিংসার স্পর্শ নেই। ক্যানিবালিজমের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে হিংস্রতা, সহিংস আগ্রাসন, অপরের শরীরকে অধিকার করার অদম্য লিপ্সা— তারই বিপ্রতীপে যেন এক শান্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে এই যুবতী।

প্রতীকী স্তরে সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজম বিষয়ে আরও জোরালো আলোকপাত করেছে অ্যাঞ্জেলা কার্টারের বেশ কিছু ছোট গল্প, যা প্রকাশিত হয় ‘দ্য ব্লাডি চেম্বার’ নামক একটি গল্প সংকলনে। এই সংকলনের কয়েকটি গল্প যেমন, ‘দ্য ব্লাডি চেম্বার’, ‘দ্য কোম্পানি অফ উলভস’, ‘দ্য টাইগার্স ব্রাইড’ জনপ্রিয় রূপকথার গল্পগুলিকে লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা প্রদর্শন, যৌন চাহিদা এবং শরীরের ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পুনর্নির্মাণ করেছে। ‘দ্য ব্লাডি চেম্বার’ গল্পটি প্রচলিত ব্লু-বার্ড রূপকথার এক অনবদ্য বিনির্মাণ। এই গল্পে প্রধান পুরুষ চরিত্র মার্কির যৌন আকাঙ্ক্ষা নেয় এক সাংঘাতিক ধ্বংসাত্মক রূপ। নারীদেহ তার কাছে দেখার এবং সম্ভোগের বস্তু। এই নারীদের ওপর অধিকার ফলোানোর জন্য মার্কি তাদের বিয়ে করে এবং নিজের অনিয়ন্ত্রিত যৌন ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে সে নারীশরীরকে যথেচ্ছভাবে ভোগ করে এবং অবশেষে সেই শরীর ধ্বংস করে দেয়। মার্কির বর্তমান স্ত্রী, বিশাল প্রাসাদের একটি নির্দিষ্ট ঘরে তার স্বামীর পূর্ববর্তী স্ত্রীদের মৃতদেহের সন্ধান পায়। এই মৃত তরুণীরা মার্কির যৌন ভক্ষণ এবং অকথ্য নির্যাতনের ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু কার্টার তার স্বভাবসিদ্ধ মুন্সিয়ানায় গল্পের একেবারে ক্লাইম্যাক্সে আস্তিন থেকে বের করেন তাঁর তুরুপের তাস। লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার এক আশ্চর্য হাতবদল পাঠক দেখতে পান। মার্কির সদ্যবিবাহিত স্ত্রী-র মা, অর্থাৎ একজন নারী, উদ্ধারকর্তা হয়ে দুষ্টের দমনের জন্য উপস্থিত হন এই গল্পে। একইভাবে ‘দ্য কোম্পানি অফ উলভস’ গল্পটি আসলে অত্যন্ত জনপ্রিয় রূপকথা ‘লিটল রেড রাইডিং হুড’-এর এক অতি-আধুনিক এবং সুচিন্তিত বিনির্মাণ। মূল গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্টার দেখান রেড রাইডিং হুড বনের পথে তার ঠাকুমার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে দেখা হয় এক সুদর্শন পুরুষের, যে প্রকৃতপক্ষে একজন ওয়ের-উল্ফ (নর-নেকড়ে)। এই সুদর্শন পুরুষকে কার্টার তাঁর গল্পে একজন কামতাড়িত শিকারি হিসেবে প্রতিপন্ন করেন। এই ওয়ের-উল্ফ একাকী অসহায় তরুণী রেড রাইডিং হুডকে প্রতারণা করে এবং তার শরীর ভোগ করতে চায়। পাঠকের মনে হয়, এই গল্পে কামলোলুপ ওয়ের-উল্ফ হল ভক্ষক এবং ওই তরুণী তার শিকার। এখানেই উল্টো চাল চালেন লেখক। দেখা যায়, তরুণী স্বেচ্ছায় নেকড়েদের জগতে প্রবেশ করছে। সে নিজের শরীরের ওপর অন্যের কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ মেনে না নিয়ে তার যৌন চাহিদার নিজস্ব ভাষা খুঁজে নেয়। সে নিজে থেকেই মিলিত হয় ওই ওয়ের-উল্ফের সঙ্গে। অস্বীকার করে পুরুষতন্ত্রের ক্ষমতা প্রদর্শন এবং তা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। কার্টারের সাবলীল কলম লেখে— ‘She knew she was nobody’s meat.’
এর ফলে খাদক এবং খাদ্যের মধ্যবর্তী সীমারেখা মুছে যায়। প্রশ্ন ওঠে, এই গল্পে তাহলে কে খাদক এবং কে খাদ্য? ‘দ্য টাইগার্স ব্রাইড’ গল্পটিতেও পাঠক ‘বিউটি’ এবং ‘বিস্ট’-এর ভূমিকা বদলে যেতে দেখেন। যে তরুণীকে তার পিতা সামান্য পণ্যের মতো ব্যাঘ্ররূপী ‘বিস্ট’-এর হাতে তুলে দেন, সেই তরুণী কিন্তু নিজেকে দুর্বল মনে করে ভোগের বস্তু হিসেবে বিস্টের হাতে ধরা দেয় না। সে স্বেচ্ছায় আপন করে নেয় বিস্টের পাশবিকতা এবং একইভাবে মুছে দেয় ভক্ষক এবং শিকারের মাঝখানের সীমারেখা।


সাদাত হাসান মান্টোর ছোটগল্প ‘ঠান্ডা গোস্ত’ এই যৌন নরখাদকতা-বিষয়ক আলোচনাকে একেবারে ভিন্ন এক দিশায় চালিত করতে পারে। এই গল্পে একজন মৃত নারীর দেহকে ‘গোস্ত’ বলা হয়েছে। গোস্ত, অর্থাৎ মাংস, যা মানুষের এক উপাদেয় খাদ্য। ভারতভাগের অস্থির সময়ে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কবলে পাঞ্জাব, সেই সময় ঈশ্বর সিং নামে এক ব্যক্তি এক নারীকে অপহরণ করে এবং পরে তার ওপর যৌন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়। কিন্তু ধর্ষণ করার পর ঈশ্বর সিং বুঝতে পারে যে, আগেই সেই নারীর মৃত্যু হয়েছে। সে আসলে একটি প্রাণহীন দেহকে ধর্ষণ করেছে। ওই নারীর ঠান্ডা নিথর দেহ পরিণত হয়েছে গোস্তে। এমনকী, মৃত্যুও ওই নারীকে কামলোলুপ ভক্ষক পুরুষের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। একে কি ক্যানিবালিজমের এক চরম মর্মান্তিক প্রকাশ বলব না? এইখানে এসে অত্যন্ত অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে জুলিয়া ক্রিস্তেভা প্রবর্তিত অ্যাবজেকশনের তত্ত্ব। ১৯৮০ সালে ক্রিস্তেভা তাঁর ‘পাওয়ারস অফ হরর: অ্যান এসে অন অ্যাবজেকশন’-এ ‘অ্যাবজেক্ট’ বস্তু সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়েছিলেন। ‘অ্যাবজেক্ট’ হল এমন কিছু, যার সঙ্গে মানুষ মানসিক দূরত্ব স্থাপন করতে চায়। তা নিজের শরীর, শরীরের অংশ বা নিজের শরীরসদৃশ কিছু হলেও মানুষ তাকে দূরে রাখতে চায়, কারণ সেগুলি মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে, সে এক মরণশীল, অস্থায়ী এবং আদিম সত্তা। তাই মানুষ নিজেরই শরীরসদৃশ অন্য একটি মৃত শরীরকে সহ্য করতে পারে না। মৃত শরীরকে সে নিজের সত্তার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়, ঠিক যেমন রক্ত, বমি, মল-মূত্র মানুষের শরীর থেকেই নির্গত হলেও, সে এইসবকে দূরে রাখতে চায় কারণ এগুলো মানুষের সভ্য, পরিচ্ছন্ন, অকলুষিত অস্তিত্বের সীমারেখাকে বিপন্ন করে তোলে।
তাই এই গল্পে ঈশ্বর সিং যখন বোঝে যে, সে এক মৃতাকে ধর্ষণ করেছে, তখন তার ভেতরে প্রাথমিকভাবে জন্ম নেয় নিজেকে ওই মৃতদেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করার তাগিদ অর্থাৎ অ্যাবজেকশন।

এতক্ষণ যে প্রতীকী যৌন নরখাদকতার পরিসরে এই আলোচনা ঘোরাফেরা করছিল, সেখান থেকে সরে এসে এবার আক্ষরিক অর্থে সেক্সুয়াল ক্যানিবালিজমের রহস্যময়ে অন্দরে খানিক প্রবেশ করা যাক। এই দিক থেকে দেখতে গেলে প্রথমেই যে উপন্যাসের কথা মনে পড়ে, তা হল ২০১৫ সালে প্রকাশিত কামিল ডি-অ্যাঞ্জেলিস লিখিত ‘বোনস অ্যান্ড অল’। এই উপন্যাসের মূল চরিত্র হল ম্যারেন ইয়ারলি নামের এক তরুণী, যাকে গল্পে সম্বোধন করা হয় ‘ইটার’ হিসেবে। ম্যারেন মানুষের মাংস খেতে পছন্দ করে এবং কিছুতেই নিজের এই ক্ষুধাপ্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নরমাংসের স্বাদাস্বাদনের এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা ম্যারেনকে চালনা করে। এই অনিয়ন্ত্রিত পাশবিক প্রবৃত্তির কারণে ম্যারেনের মা জেনেল তাকে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সে তার পিতার সন্ধানে আমেরিকার বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকে। এই সময় ম্যারেনের সঙ্গে দেখা হয় লি নামক এক যুবকের। দেখা যায়, লি-ও একজন ইটার। ম্যারেন এবং লি-এর মধ্যে ভালবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই উপন্যাসে যে ব্যাপারটি পাঠককে বিস্ময়াভিভূত করে, তা হল চরিত্রদের, অর্থাৎ যাদের ইটার হিসেবে গল্পে দেখানো হয়েছে— তাদের নিজেদের নরমাংস ভক্ষণের প্রবৃত্তিকে অত্যন্ত সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে এক মানবিক স্বভাব হিসেবে মেনে নেওয়া। এই প্রবৃত্তি ঠিক না বেঠিক, এই নিয়ে চরিত্রদের মাথাব্যথা নেই। নরমাংস তাদের কাছে মুখরোচক, এই অনুভূতিটিই শেষ কথা। তাই ম্যারেনের বয়ানে আমরা শুনতে পাই— ‘It doesn’t matter if I am right or wrong about that, it matters that I feel it.’
আরও আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ম্যারেন এবং লি, দু’জনেই নরমাংসভোজী, কিন্তু একে-অপরের সঙ্গে তারা প্রেমের সম্পর্কে আবদ্ধ। যৌনতার নিরিখে যেমন তারা একে-অপরের শরীরকে ভক্ষণ করে, যা আক্ষরিক অর্থে ভক্ষণ নয়, তেমনই আক্ষরিক অর্থে যে খাদ্য তারা গ্রহণ করে, তা উভয়েরই পছন্দের। খাবার যেহেতু জীবনধারণের একটি মূল রসদ, তাই একত্রে ভাল থাকার ক্ষেত্রে তাদের পারস্পরিক ইচ্ছের প্রকাশ কিছুটা এরকম— I love you, I want us both to eat well.
যৌন নরখাদকতার একেবারে প্রকৃষ্ট নিদর্শন তুলে ধরেছে চেলসি জি. সামার্স রচিত উপন্যাস ‘আ সার্টেন হাঙ্গার’। এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে একজন সফল লেখিকা এবং ফুড ক্রিটিক ডরোথি ড্যানিয়েল। গল্পের পায়ে-পায়ে হাঁটলে পাঠক জানতে পারবেন, ডরোথি একজন অতি দক্ষ এবং সুচতুর সিরিয়াল কিলারও বটে। কিন্তু এই নারী যে-কোনও মানুষকে হত্যা করে না। সে পুরুষদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে এবং শুধুমাত্র পুরুষদেরই হত্যা করে। সামার্স এই উপন্যাসে গতানুগতিক লিঙ্গভূমিকাকে একেবারে উলটে দিয়েছেন। এখানে পুরুষরা, সমাজে স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতার রাশ যাদের কুক্ষিগত, তারাই এক মহিলা ভক্ষকের খাদ্য। ডরোথির শিকার সেইসব পুরুষ, যারা তাকে শারীরিকভাবে আকর্ষণ করে। ডরোথি এই পুরুষদের শুধুমাত্র হত্যাই করে না, বরং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে, সেই নরমাংসকে রান্নার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে। এই প্রসঙ্গে ভীষণভাবে উল্লেখ্য, ১৯৬৬ সালে মেরি ডগলাস প্রবর্তিত ‘পিওরিটি অ্যান্ড ডেঞ্জার’ তত্ত্বের ‘matter out of place’-এর ধারণা। ডরোথির হত্যা করা পুরুষদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র হল আধুনিক জনসমাজ। কিন্তু এই নারী তার পছন্দের পুরুষদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে পরিণত করছেন মৃতদেহে এবং আরও একধাপ এগিয়ে নিজের খাদ্যে। নিঃসন্দেহে ‘ম্যাটার আউট অফ প্লেস’।
ঘুরেফিরে আমরা চলে আসি বৃত্তের সেই একই বিন্দুতে, যেখান থেকে এই আলোচনা শুরু হয়েছিল। যৌন নরখাদকতার নানা অলিগলি ঘুরে এসে একথা মনে হবেই যে, ভালবাসা বা তীব্র প্রেম থেকে যখন নরমাংস ভক্ষণের (তা আক্ষরিক অর্থে হোক বা প্রতিকী অর্থে) তীব্র আকাঙ্ক্ষা জন্মাতে পারে, সেখানে যৌন অধিকার প্রতিষ্ঠা, ক্ষমতা প্রদর্শন, অপরকে নিজের মধ্যে আত্তীকরণের ইচ্ছে এই সমস্ত কারণে নরখাদকতার প্রবৃত্তি জাগ্রত হওয়া একেবারেই অসম্ভব নয়। তাই এই ক্যানিবালিজমের মতো হিংস্র, ধ্বংসাত্মক বিষয় নিয়ে এই দীর্ঘ আলোচনা শেষ করা যাক প্রেমের কথা বলেই। শেষটুকু মিলিয়ে দেওয়া যাক শুরুর সেই কবিতার পঙক্তি দিয়েই, যেখানে কবি মেল রোজ বলছেন—
‘Love Is A cannibal/ starving for your heart,/ carving through the carcass/ it has slowly torn apart.’



