মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ১০

ভালবাসার জানলা

আবার ভালবাসা চাইতে লজ্জা হয়!

একটা বয়সের পর মেয়েরা খুব সাবধানে প্রেমের কথা বলে। ‘ভালবাসা’ কথাটাও যেন একটু আস্তে বলতে হয়। যেন পাশের ঘরে কেউ শুনে ফেললে অস্বস্তি হবে। যেন ভালবাসা চাওয়াটা কোনও ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়, একটা বয়স পেরিয়ে যাওয়ার পর ঘোরতর অপরাধ। বিশেষ করে মেয়েদের। তিরিশে প্রেম চাইলে মিষ্টি। চল্লিশে চাইলে একটু মুশকিল। পঞ্চাশে চাইলে— ‘এই বয়সে আবার?’

এই ‘আবার’ শব্দটার মধ্যে কত অপমান লুকিয়ে থাকে, আমরা বুঝেও বুঝি । আবার কেন? মানুষ তো একবারই বাঁচে। প্রেমও কি একবারের বেশি চাইতে নেই? এটা কি হিন্দি সিনেমার বস্তাপচা ডায়লগ না কি? এটা তো আসলে ছালচামড়া ওঠা দগদগে একটা জীবন। আর একবার বাঁচা বলেই তো চেটেপুটে বেঁচে নেওয়া দরকার। এই জীবন-বাঁচার তরিকা এবং সংজ্ঞা সবার কাছে সমান নয়। তাই আমার মতো করে কেউ বাঁচছে না বলে বা সমাজের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মানছে বলে তার জীবনটা অন্যায় বলে দাগিয়ে দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে? আসলে অবচেতনের সুপ্ত বাসনা পুরণ হয় না বলেই হয়তো এই এ-ফোঁড়-ও ফোঁড় আঘাত, যে পাচ্ছে বা পেতে চাইছে— তাকে। ভালবাসার অন্যায় চাহিদা যে চাইবে, সে ছেলে হোক বা মেয়ে, তাকেই যা-তা বলা হবে, মেয়েদের অনেক বেশি আঘাত হানা হবে, হবেই। 

পড়ুন পর্ব ৯: মাঝবয়সে এসে মনে হয় ভাল থাকার কোনও সিলেবাস নেই! লিখছেন সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়…

হ্যাঁ, তর্ক করতে হলে অবশ্যই বলা যায়, আজকাল সিনেমা-সিরিজে অবশ্য মাঝবয়সের প্রেম নিয়ে অনেক গল্প হচ্ছে। নায়ক-নায়িকা বয়সে তরুণ নয়, তবু তারা আবার একে অপরের কাছে ফিরে আসছে। কখনও দু’জন বিধবা-বিপত্নীক মানুষের দেখা হচ্ছে, কখনও বিবাহবিচ্ছিন্ন দু’জন নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করছে। কখনও আবার ছেলেমেয়েরাই মায়ের জন্য সঙ্গী খুঁজে দিচ্ছে—বলছে, ‘মা, এবার তুমি নিজের মতো করে বাঁচো।’ আমরা সেই গল্প দেখে কাঁদি, ভালও লাগে। ভাবি, আহা, মানুষ তো যে কোনও বয়সে নতুন করে বাঁচতে পারে! কিন্তু সেসব হাতে গোনা। নিজের মাসি বা কাকিমা যদি এই রকম একটি ঘটনা ঘটায়, তখন দেখব, কার কত ধক মেনে নেওয়ার আর হাত ধরে তাকে নতুন জীবনে এগিয়ে দেওয়ার। 

‘পরমা’ ছবির একটি দৃশ্য

আসলে, সিনেমার পর্দায় এই গল্প যতটা স্বাভাবিক, বাস্তব জীবনে ততটা নয়। বাস্তবে কোনও মাঝবয়সি মহিলা নতুন করে প্রেমে পড়লে, বা কোনও বিধবা আবার বিয়ে করলে, বা কোনও বিবাহবিচ্ছিন্ন মহিলা নতুন সঙ্গী বেছে নিলে— সেটা প্রায়ই খবর হয়ে যায়। কখনও সংবাদপত্রে, কখনও সোশ্যাল মিডিয়ায়, কখনও আত্মীয়দের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে। ‘পঞ্চাশ বছর বয়সে প্রেম খুঁজে পেলেন অমুক!’ ‘ছেলের বিয়ের পর মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে!’ ‘বিধবার নতুন জীবন!’ ‘মায়ের জন্য পাত্র খুঁজে দিল মেয়ে!’ খেয়াল করেছেন? খবরের শিরোনাম হওয়ার মধ্যেই একটা অস্বাভাবিকতার ঘোষণা লুকিয়ে থাকে। কোনও তেইশ বছরের মেয়ে প্রেমে পড়লে সেটা খবর নয়। ত্রিশ বছরের পুরুষ নতুন করে বিয়ে করলে খবর নয়। কিন্তু পঞ্চাশের একজন মহিলা কাউকে ভালবাসলেন— সেটা খবর। কারণ আমরা এখনও মনে-মনে বিশ্বাস করি, একটা বয়সের পর মহিলার জীবনে প্রেমের অধ্যায়টা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা।

তারপর তাঁর জীবনে থাকবে দায়িত্ব। সন্তান। সংসার। ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট। বাজারের লিস্ট। শাড়ির আলমারি। বিয়েবাড়ি। নাতি-নাতনির জন্মদিন। কিন্তু তাঁর নিজের হৃদয়ের জন্য? সেখানে যেন আর কোনও জায়গা বরাদ্দ নেই।

একজন মহিলা, যাঁর স্বামী মারা গিয়েছেন, তিনি কি সারাজীবন শুধু ‘বিধবা’ হয়ে থাকবেন? যাঁর বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে, তিনি কি আর কখনও প্রেমিকা হতে পারবেন না? যাঁর বিয়ে আছে, অথচ বহু বছর ধরে সেই বিয়ের ভেতরে কোনও সঙ্গ, স্পর্শ, কথা, আগ্রহ নেই— তিনি কি নিজের একাকিত্বের কথা বলবেন না? আর যে মহিলা কোনওদিনই ঠিক করে ভালবাসা পাননি? যিনি সংসার করেছেন, সন্তান মানুষ করেছেন, শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা করেছেন, স্বামীর পাশে থেকেছেন, বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিয়েছেন, অফিস করেছেন, অসুস্থ হলে নিজেই ওষুধ খেয়েছেন— কিন্তু কেউ কোনওদিন তাঁকে জিজ্ঞেস করেনি, ‘তোমার কী ভাল লাগে?’ তিনি যদি একদিন বলেন, ‘আমি একটু ভালবাসা চাই’— তাহলে এত অবাক হওয়ার কী আছে?

হয়তো তিনি ফুল চান না। হয়তো ডিনারও নয়। হয়তো শুধু এমন একজন মানুষ চান, যাকে রাত সাড়ে এগারোটায় ফোন করে বলতে পারেন, ‘আজ সারাদিন খুব খারাপ গেল।’ আর ওপাশ থেকে কেউ বলুক, ‘এসো, কথা বলি।’ ব্যস!

মাঝবয়সে প্রেমের চেহারাটা হয়তো এই রকমই হয়। এখানে সিনেমার মতো দৌড়ে এসে বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দরকার হয় হাঁটতে-হাঁটতে মাঝপথে থেমে বলা— ‘তুমি ক্লান্ত? বসবে একটু?’ দরকার হয় কেউ আপনার কথাটা মনে রাখুক। আপনি কোন গান পছন্দ করেন, চায়ে কতটা চিনি খান, কোন বিষয় নিয়ে কথা বললে আপনার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, কোন কথা শুনলে আপনি চুপ করে যান। এই বয়সে প্রেমের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা বোধহয়— কেউ আপনাকে লক্ষ করছে। কেউ দেখছে। শুধু আপনার চুলে কতটা পাক ধরেছে তা নয়। আপনার মুখের ক্লান্তিটাও।

কিন্তু এখানেই আসে লজ্জাটা। মহিলারা নিজেরাই লজ্জা পান। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভাবেন— এই বয়সে? ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেছে। বন্ধুরা কী বলবে? পরিবার কী ভাববে? লোকজন হাসবে না? আমি কি হাস্যকর দেখাব? আর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটা— আমার কি এখনও ভালবাসা পাওয়ার মতো বয়স আছে?

এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে নিষ্ঠুর। কারণ ভালবাসা পাওয়ার সঙ্গে বয়সের সম্পর্ক কোথায়? বয়সের সঙ্গে হয়তো শরীর বদলায়। পছন্দ বদলায়। জীবনের অগ্রাধিকার বদলায়। কিন্তু কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার ইচ্ছেটা তো বয়সের সঙ্গে মরে যায় না। বরং কখনও কখনও আরও তীব্র হয়।

কারণ পঞ্চাশে এসে মানুষ জানে, একাকিত্ব কাকে বলে। জানে, সারাদিন মানুষের মধ্যে থেকেও একা থাকা যায়। জানে, একই বিছানায় শুয়ে থেকেও দূরত্ব তৈরি হতে পারে। জানে, সংসার চলা আর সম্পর্ক বেঁচে থাকা এক জিনিস নয়। জানে, ‘সব ঠিক আছে’ কথাটার ভেতরে কতটা ফাঁকা জায়গা থাকতে পারে।

তাই হয়তো এই বয়সের প্রেম খুব আলাদা। এখানে কাউকে পেতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে না। বরং এতদিন নিজেকে হারিয়ে ফেলার পর, এমন কাউকে চাই, যার পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে আবার একটু ফিরে পাওয়া যায়।

কিন্তু সমাজ মহিলাদের সেই সুযোগটুকুও সহজে দেয় না। একজন পুরুষ ষাট বছর বয়সে নতুন করে প্রেম করলে আমরা বলি— ‘বাহ, মানুষটি এখনও প্রাণবন্ত!’ একজন মহিলা করলে— ‘এই বয়সে এসব?’ পুরুষের আকাঙ্ক্ষা বার্ধক্যেও প্রাণের লক্ষণ। মহিলার আকাঙ্ক্ষা বয়সের সঙ্গে বেমানান। কেন?

কারণ আমরা এখনও মহিলাদের শরীরকে তাঁদের নিজের বলে ভাবতে শিখিনি। তাঁদের ইচ্ছেকেও নয়। একজন মহিলা কত বছর বয়স পর্যন্ত সুন্দর, আকর্ষণীয়, কাম্য, প্রেমযোগ্য— তার একটা অদৃশ্য মেয়াদ আমরা ঠিক করে রেখেছি।

তারপর? তারপর তিনি মা। দিদা। কাকিমা। মাসি। অফিসের সিনিয়র। সংসারের মানুষ। সবকিছু হতে পারেন তিনি। শুধু একজন কামনা-বাসনাসম্পন্না নারী হয়ে থাকতে পারেন না। এটাই সবচেয়ে দুঃখের।

একজন মাঝবয়সি মহিলা যদি আবার প্রেমে পড়েন, তাঁর সবচেয়ে বড় ভয় হয়তো সমাজ নয়। নিজেই। তিনি ভয় পান নিজের ইচ্ছেকে। ভাবেন, ‘আমি কি বোকা হয়ে যাচ্ছি?’ ‘এই বয়সে প্রেম?’ ‘যদি ঠকে যাই?’ ‘যদি সন্তানরা কষ্ট পায়?’ ‘যদি লোকজন হাসে?’ ‘যদি মানুষটা আমাকে সত্যিই না চায়?’

এই শেষ প্রশ্নটার উত্তরই সবচেয়ে কঠিন। কারণ এত বছর সংসার, দায়িত্ব, সম্পর্কের মধ্যে থাকার পরও অনেক মহিলা ভেতরে-ভেতরে বিশ্বাস করতে শেখেন যে তাঁদের চাওয়া হয়তো আর কারও কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের জন্য দরজা বন্ধ করে দেন।

তারপর একদিন হঠাৎ কেউ দরজায় কড়া নাড়ে। একটা ফোন আসে। একটা মেসেজ। একজন মানুষ বলে, ‘তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভাল লাগে।’ আর ভেতরের বহুদিনের ঘুমন্ত মেয়েটা একটু নড়ে বসে। সে ভয় পায়। আবার ভালও লাগে।

তারপর সে ফোনটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে থাকে। উত্তর দেবে কি দেবে না। দেবে। না, দেবে না। আচ্ছা, এত রাতে উত্তর দিলে কি খুব আগ্রহী মনে হবে? কাল সকালে দেওয়া ভাল। তারপর সকালে উঠে দেখে— সে নিজেই হাসছে।

এই হাসিটুকুর জন্য কি সত্যিই ক্ষমা চাইতে হবে?

আমি জানি না।

মেয়েরা একটা বয়সের পর আর প্রেম চায় না— এই কথাটা মিথ্যে। তারা শুধু প্রেম চাওয়ার কথাটা বলা বন্ধ করে দেয়। লজ্জায়। ভয়ে। সমাজের চোখে। সন্তানের কথা ভেবে। নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।

হয়তো এই বয়সে প্রেম করা উচিত কি না— এই প্রশ্নটার কোনও উত্তরই নেই। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর থাকা উচিত। এই বয়সে একজন মহিলার ভালবাসা চাইতে লজ্জা পাওয়া উচিত কি না?

না। একেবারেই না।

কারণ ভালবাসা নির্দিষ্ট কোনও বয়সসীমার সম্পত্তি নয়। কেউ যদি পঞ্চাশে এসে প্রেম চান, তাঁকে পঞ্চাশের মতোই প্রেম করতে দিন। একটু সাবধানে, একটু ভয় নিয়ে, আগের ভুলগুলো মনে রেখে, নিজের স্বাধীনতাকে আঁকড়ে ধরে। কেউ যদি ষাটে এসে কারও হাত ধরতে চান, তাঁকে ধরতে দিন। কেউ যদি সত্তরেও কারও জন্য অপেক্ষা করেন, তাঁকে অপেক্ষা করতে দিন। আর কেউ যদি সারাজীবন একা থাকতেই চান, সেটাও তাঁর অধিকার।

শুধু একটা জিনিস যেন আমরা না করি— একজন মহিলাকে তাঁর বয়স দিয়ে তাঁর হৃদয়ের দরজা বন্ধ করে দিতে বলি না।

কারণ মেয়েরা একটা বয়সের পর আর প্রেম চায় না— এই কথাটা মিথ্যে। তারা শুধু প্রেম চাওয়ার কথাটা বলা বন্ধ করে দেয়। লজ্জায়। ভয়ে। সমাজের চোখে। সন্তানের কথা ভেবে। নিজের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে।

আর কখনও কখনও, গভীর রাতে, ঘুম না এলে, নিঃশব্দে তারা ভাবেন— ‘আচ্ছা, আমার জীবনটা যদি আর একটু অন্যরকম হত?’

এই ‘অন্যরকম’-এর মধ্যে হয়তো কোনও পুরুষ নেই। হয়তো শুধু একজন মানুষ আছে। যে পাশে বসবে। কথা বলবে। হাতটা ধরবে। আর বলবে— ‘তোমার এতদিন খুব কষ্ট হয়েছে, তাই না?’

কখনও-কখনও, মাঝবয়সে এসে, প্রেমের চেয়ে বেশি দরকার হয় এই একটি বাক্য।

কেউ যেন অন্তত বুঝতে চায়— আমি শুধু এতদিন সবার জন্য ছিলাম না। আমিও কারও জন্য থাকতে চেয়েছিলাম। আমারও তো কাউকে ভালবাসতে ইচ্ছে করে। আমাকেও কেউ ভালবাসুক— এই ইচ্ছেটা এখনও মরে যায়নি।

এতে লজ্জার কী আছে?