সংবাদ মূলত কাব্য: পর্ব ৪২

কুরুক্ষেত্রের কাণ্ড

আমি ‘যুগান্তর’-এ যোগ দেওয়ার কিছু পর মিহিরদা, সাংবাদিক মিহির গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে সর্বভারতীয় একটি সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য করে নিয়েছিলেন। কোন্নগরে এখনও থাকেন মিহিরদা, ফেসবুকে সাংবাদিক-জীবন ও তৎকালের কত-না ঘটনাবলি নিয়ে বর্ষীয়ান মিহিরদা কী চমৎকার সব লেখা লিখে চলেছেন নিয়মিতভাবে। তা, মিহিরদা ‘যুগান্তর’-এর তরফে আমাকে আর বরেনদাকে পাঠিয়েছিলেন কুরুক্ষেত্রে। হ্যাঁ, মহাভারতের সেই যুদ্ধক্ষেত্র, কুরুক্ষেত্র। এই আধুনিক যুগে দিল্লির অদূরে হরিয়ানার এখনকার একটি ছিমছাম শহর কুরুক্ষেত্রে সেবার বসেছিল ভারতীয় ওই সর্বভারতীয় সাংবাদিক ইউনিয়নটির সম্মেলন। ‘যুগান্তর’-এর শ্যামলদা, সাব এডিটর শ্যামল দে কী কাজে যেন দিল্লি এসেছিলেন তখন, মিহিরদার মতো তিনিও এই ইউনিয়নের এক নেতা, তিনি যোগ দিয়েছিলেন আমাদের সঙ্গে। দিল্লি গিয়ে, সেখান থেকে স্থানীয় ট্রেনে আমরা গিয়েছিলাম কুরুক্ষেত্রে। কুরুক্ষেত্রে পৌঁছবার আগে দিল্লিতে সমবেত সাংবাদিকরা পোস্টারে-ফেস্টুনে বের করেছিলাম রাজধানীকে চমকে দেওয়া এক মিছিল। কেন সে-মিছিল, বলি তাহলে। সংবাদপত্রে সাংবাদিকরা যে-বেতন পেতেন, সেই বেতনবৃদ্ধি ও নতুন বেতনকাঠামো গড়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার কমিশন বসিয়েছিল। সেই ‘ওয়াংচু কমিশন’ সরকারকে রিপোর্ট দিচ্ছিল না। ঝুলিয়ে রেখেছিল। তাই দিল্লির রাস্তায় শীতের রোদে মিছিল থেকে স্লোগান উঠেছিল, ‘ওয়াংচু, ওয়াক থু।’

কুরুক্ষেত্রে পৌঁছে সন্ধের ভিতর একটি বড় খবর করে ফেলেছিলাম ছোট্ট শহরটিতে জড়ো হওয়া আমরা, সারা ভারতের সাংবাদিকরা। হয়েছিল কী, আমাদের দেশে তো চারজন শঙ্করাচার্য, তাঁদের একজন, কোনজন এখন আর মনে নেই, তিনি বেশ কিছুদিন নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন, তা নিয়ে খবর হয়েছিল, বলা হয়েছিল, সাধনার জন্য তিনি আত্মগোপন করেছেন। আমরা সাংবাদিক সম্মেলনের জন্য আগের বিকেলে পৌঁছে কুরুক্ষেত্র শহরটিতে সন্ধ্যায় ভীমতালের কাছে মন্দিরে (কোন মন্দির, তাও ভুলে গিয়েছি) দেখলাম ধূপ-ধুনোর ধোঁয়ার ভিতর শঙ্করাচার্য ধ্যানমগ্ন অবস্থায় বসে আছেন। ধ্যান ভাঙার পর আমরা সাংবাদিকরা ছেঁকে ধরলাম তাঁকে। ব্যস, পরদিন সারা ভারতের সংবাদপত্রগুলিতে খবর হয়ে গেল, শঙ্করাচার্যের সন্ধান মেলার। আকাশবাণী আগের রাতেই খবর দিয়েছিল।

ছড়া প্রতিযোগিতায় আমি বনাম অমিতাভ চৌধুরী! পড়ুন: ‘সংবাদ মূলত কাব্য’ পর্ব ৪১

ভীমতালের কথা উঠল যখন, একটা কথা একটু বলি। দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ হয়েছিল যে-মাঠটিতে, সেখানে একটু গদা ঠুকেছিলেন ভীম। ব্যস, সেখানে পুকুর, তালাও হয়ে গেল। সে-পুকুরে স্নানও করলেন জনা কয়েক সাংবাদিক।

প্রচুর পাখি কুরুক্ষেত্রে, ভোরবেলা দেখেছিলাম। সাদা-কালো মাছরাঙা, নানারকম কাঠঠোকরা, সংস্কৃত সাহিত্যের টিট্টিভ, দুধরাজ, আরও কত কী! তখন হরিয়ানার মুখ্যামন্ত্রী দেবীলাল না ভজনলাল, মনে নেই, দু’জনকেই দেখেছি। দু’জনেই দীর্ঘকায়। কী লম্বা! কী লম্বা! খুব আপ্যায়ন করেছিলেন। তারপর দেখলাম জাঠরা সবাই লম্বা, একেবারে নিখাদ আর্য। যেন মহাভারতের পৃষ্ঠাসকল থেকে আবির্ভূত হয়েছে। হিমাচলের মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর নামও মন থেকে উধাও হয়ে গেছে, আমাদের নৈশভোজে আপ্যায়িত করেছিলেন। দু’টি লাক্সারি বাসে সিমলা যেতে হয়েছিল চণ্ডীগড় হয়ে। চণ্ডীগড়ে বাসের বিরতি দিতে হয়েছিল ঘণ্টাখানেকেরও বেশি। কারণ হরিয়ানায় ছিল সুরা নিষিদ্ধ, কিন্তু পঞ্জাব-চণ্ডীগড়ে ছিল চালু। বরেনদা আমাকে ডাকলেন, ‘বাস থেকে নেমে আয়।’ চণ্ডীগড়ে হাইওয়ের এদিকে-সেদিকে ছিল লিকার শপ, পানশালা।

সিমলায় আমরা দু’রাত ছিলাম সরকারি অতিথিশালায়। মুখ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণে নৈশভোজে মাশরুমের কয়েকটি পদ ও স্যুপের স্বাদ মুখে লেগে আছে। আর আমি কিনা সেই মুখ্যমন্ত্রীর নাম ভুলে গিয়েছি! ফিরে আসি তবে ‘যুগান্তর’ অফিসে, বাগবাজারে। বাগবাজারে তখন ‘যুগান্তর’ অফিসের গলি দিয়ে বেরিয়েই উলটোদিকে থাকতেন রণজিৎ দাশ, কাছাকাছিই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি, প্রবুদ্ধ মিত্র থাকত বাগবাজার স্ট্রিটে বাটার আগে। ওদের সঙ্গে আড্ডা হত।

বাগবাজার স্ট্রিটে একটি অল্পবয়সি ছেলে মাঝে মাঝেই ‘যুগান্তর’ অফিসে আসত আমার আর সতীনাথদার কাছে, আমাদের দু’জনকে সে খুব পছন্দ করত। তার নাম বাপি। আমরাও তাকে খুব স্নেহ করতাম। ঘুরেফিরে চলে আসত বাপি। তখনই জানতাম যাত্রাসম্রাট স্বপনকুমার তার মামা। বাপি বলত, সে-ও অভিনয় করতে চায়, চায় অভিনেতা হতে। হয়েছেও। বাপির ভাল নাম সুরজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। নাটক, টিভি ধারাহিক ও চলচ্চিত্রের নামি অভিনেতা-নাট্যকার-পরিচালক সে।

‘যুগান্তর’-এ কয়েকদিন দেখলাম, বেজার মুখে এক সহকর্মী ঘোরাঘুরি করছেন। ‘যুগান্তর’-‘অমৃতবাজার’-এ সে-সময়ে কয়েকজন ছিলেন তুষারকান্তি ঘোষের পরিবারের আত্মীয়স্বজন। নানা বিভাগে ছড়িয়েছিলেন তাঁরা। ইনি তাঁদেরই একজন। কী হয়েছে, কী হয়েছে তাঁর? মুখ খোলানো গেল না। লোকমুখে, অর্থাৎ কয়েকজন সহকর্মীর মুখে জানা গেল, বারাসতে তুষারকান্তি ঘোষের বাসভবন শিশিরকুঞ্জের পাঁচিলের ভাঙা অংশগুলি মেরামতের কাজ হচ্ছিল। সে-পাঁচিল কি যে-সে পাঁচিল! তা হল প্রাচীর, যশোর রোডে সে-প্রাচীর পেরোতে বাসের দু-দু’টি স্টপ। তুষারবাবু খবর পেলেন, পাঁচিল মেরামতের দেখভালের দায়িত্ব যাকে দিয়েছেন, সে মাঝে মাঝে ডুব দিয়ে ওই ইট-বালি-সিমেন্ট কিছু-কিছু সরিয়ে বারাসতের অদূরে নিজের বাড়ি তৈরি করছে। শিশিরকুঞ্জে গিয়ে তুষারকান্তি দেখলেন, সত্যিই তাই, পাঁচিলের কাজ ঢিমেতালে হচ্ছে। তুষারকান্তি ঘোষের গাড়ি এবার ছুটল— কাছেই ওই আত্মীয়ের নির্মীয়মাণ বাড়ির দিকে। তুষারবাবু দেখলেন, সে-বাড়ি তৈরির কাজ প্রায় শেষ, খুটখাট খুচরো কাজ তদারকি করছে ওই আত্মীয়-যুবকটি। কাঁচুমাচু আত্মীয়টিকে হাতের লাঠিটি দিয়ে দু’ঘা কষিয়ে, গর্জন করলেন তুষারকান্তি, ‘হারামজাদা, আমার ইট-সিমেন্টে একতলা বাড়ি করলি, দোতলা করলি না! লোকে বলবে কী!’

পিকনিক হয়েছিল একবার। বোধ করি, ওই সাংবাদিক ইউনিয়নটির আয়োজনে। জলযানে, কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত যাওয়ার ওই স্টিমারে কলকাতার সব ক’টি সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা যোগ দিয়েছিলেন। আমরা, ‘যুগান্তর’ অফিসের অদূরে বাগবাজার ঘাট থেকে উঠেছিলাম। আমি, সতীনাথদা, গৌরাঙ্গদা, ‘অমৃতবাজার’-এর মঞ্জুল গুপ্ত, দিলীপ মৌলিক, অন্যান্য ঘাট থেকে আনন্দবাজারের অরুণ বাগচী, শংকরলাল ভট্টাচার্য ও আরও কয়েকজন। সে-সময়ের নতুন কাগজ ‘আজকাল’ থেকে সুমন চট্টোপাধ্যায়, সূর্য ঘোষ, এছাড়া ‘বসুমতী’-‘সত্যযুগ’-‘স্টেটসম্যান’-‘টেলিগ্রাফ’ থেকে অনেকে।

তুষারকান্তি ঘোষের গাড়ি এবার ছুটল— কাছেই ওই আত্মীয়ের নির্মীয়মাণ বাড়ির দিকে। তুষারবাবু দেখলেন, সে-বাড়ি তৈরির কাজ প্রায় শেষ, খুটখাট খুচরো কাজ তদারকি করছে ওই আত্মীয়-যুবকটি। কাঁচুমাচু আত্মীয়টিকে হাতের লাঠিটি দিয়ে দু’ঘা কষিয়ে, গর্জন করলেন তুষারকান্তি, ‘হারামজাদা, আমার ইট-সিমেন্টে একতলা বাড়ি করলি, দোতলা করলি না! লোকে বলবে কী!’

এলাহি পানভোজনের আয়োজন ছিল ওই অলৌকিক জলযানটিতে। কলকাতা ছাড়তেই আমরা কয়েকজন— আমি, সূর্য, সুমন, সতীনাথদা তর্ক জুড়ে দিলাম শংকরলালদার সঙ্গে; সাহিত্যর সে-তর্ক গড়াল বিকেল পর্যন্ত। অনেকের নামেই নিন্দামন্দ হল। সাহিত্য বাজারের বিষয় নয়, একযোগে আমরা তির ছুড়লাম শংকরলালের দিকে। এমনকী খাওয়ার সময়েও। ডায়মন্ড হারবার পৌঁছনোর আগেই ‘আমার খুব কাজ আছে’ বলে বাটানগরে শংকরদা নেমে গেলেন। সন্ধ্যায় ফেরার পর আমাকে সামলে একটা ট্যাক্সিতে সতীনাথদা তার বাড়িতে নিয়ে গেল। এরপর অনেক রাতে আলোকচিত্রী প্রদীপ দাস শিয়ালদায় তার মেসে নিয়ে গেল। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে ঘুম ভাঙতে চায়ের কাপের সঙ্গে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’টি বাড়িয়ে দিল প্রদীপ। বলল, ‘দেখো তো শংকরলালকে, কত ভাল, ঠিক বাটানগরে নেমে সোজা বইমেলায়, সমাপ্তিদিবসের রিপোর্ট লিখেছে।’ আমি দেখলাম, প্রথম পাতায়, নীচে শংকরলালদার অ্যাংকার নিউজ। তখন বইমেলার সমাপ্তির দিনটিতে লেখক-পাঠক মুখোমুখি প্রশ্নোত্তর হত। শংকরলালদার ওই খবরে দেখলাম, স্টিমারে দল বেঁধে শংকরলালদার কাছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে যা-যা সমালোচনা করেছিলাম, শংকরলালদা তা বইমেলার পাঠকদের মুখে-মুখে বসিয়ে দিয়েছেন। আনন্দবাজার পড়ে যে-কেউ ভাববে, বইমেলায় সুনীলকে পাঠকদের এ কী আক্রমণ! বিকেলে কফি হাউসে সূর্যের (হায় অকালপ্রয়াত সে) দেখা হল, হো হো হাসলাম আমরা।

দিন দুয়েক পর। ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটা লেখা বের হল। সুনীল সে-লেখায় জানালেন, বইমেলায় কোনও পাঠকই তাঁর গল্প-উপন্যাসকে অগভীর বলেননি। কেউ বলেননি, তাঁর গদ্য জলের মতো!