জিরাফের ভাষা
বাজারের অসুবিধা ছিল বলে বাড়ির মধ্যে বা বাড়ির আশেপাশে যা আছে, তাই দিয়েই রান্নার জোগাড় হয়ে যেত অনেক সময়ে। যেমন বাড়িতে ছিল বেশ কিছু পেঁপে গাছ, কয়েকটা কলা গাছ। কলা গাছের কলার ছড়ার তলায় থাকে মোচা, মোচা কেটে নিলে গাছ আর বাঁচে না। কলা গাছের থোড় তখন খাদ্য হয়, কচু গাছ তো থাকতই, আর ছিল চালে ওঠা লাউ গাছ। কিংবা টিউবয়েলের ধারে এমনি-এমনি হওয়া থানকুনি পাতা। থানকুনি পাতা বেঁটে দিত দিদিমা। আরেকটা আশ্চর্য সুখাদ্য ছিল, গাঁদালি পাতা।
গাঁদালি বৃত্তান্ত বলার আগে, ওদের বাড়ির মলত্যাগের জায়গাটার কথা বলি। পায়খানা মানে একটা গর্ত। গর্তের এধার থেকে ওধার একটা গাছের ডাল আড়াআড়িভাবে রেখে দেওয়া। কয়েকটা খুঁটিও পোতা আছে চারিদিকে। বাসক পাতা এবং গাঁদালি লতা দিয়ে ঘেরা কয়েকটা বাবলা গাছ পেঁচিয়ে গাঁদালি লতা। ওই গাঁদালি লতার আড়ালে, খুঁটি ধরে গাছের মরা ডালে বসে এই মলত্যাগ কর্মটি সারতে হত। তলায় বহুজনের হাগা। কিছুটা শুকিয়ে কালচে তার ওপর পতিত হচ্ছে টাটকা হাগা। সেই হাগুর রূপ-গন্ধ সবই দেখা যায়।
এর আগে আমি খাটা পায়খানা দেখেছি। আমাদের বাগবাজারে সেনিটারি পায়খানা ছিল। কিন্তু বিরাটি-তে প্রথমে ছিল কুয়ো পায়খানা। একটা কুয়ো তৈরি করে তার উপরে প্যান সেট করে দেয়া হত। চাঁদপাড়ার দাদুদের হয়তো তখন এইটুকু সামর্থ্যও ছিল না।
মাটির হাঁড়িতে কিলবিল করা মাছ আর দিদিমার আনন্দ!
পড়ুন: উল্টো দূরবিন পর্ব ২৭…
ওই যে গাঁদালি লতার কথা বললাম, যা হাগার জায়গার মোহিনী আড়াল, সেই গাঁদালি পাতার পুরো নাম বানিয়েছিলাম, ‘গন্ধপাদালি’। কারণ হাতে রগড়ালে পাদের মতোই গন্ধ ছাড়ত। ওটা বাঁটলেও তাই। কিন্তু কী আশ্চর্য! বাঁটার পর যখন উনুনের কড়াইতে কালোজিরে-শুকনো লঙ্কা দিয়ে একটু নেড়ে দেওয়া হত, কোনও বাজে গন্ধ তো থাকতই না, বরং বেশ একটা স্বাদু ব্যাপার ঘটত। দিদিমা ওই বাঁটাটা দিয়ে কখনও বড়াও করত। ক্ষেতের চাল-ডাল এবং গাঁদালি পাতার বড়া দিয়ে দিব পেট ভরে ভাত উড়িয়ে দিতাম।
ছোটবেলায় আমরা পেস্ট এবং ব্রাশ ব্যবহার করিনি। বাঁ-হাতে নুন এবং এক ফোঁটা সর্ষের তেল দিয়ে দিত ঠাকুর্মা, ডান হাতের দাঁত মাজার আঙুল দিয়ে দাঁত মাজতাম। কখনও ছাই দিয়ে। বাবা মাজন কিনে আনতে লাগলেন। কাকামণি ইঞ্জিনিয়ার হয়ে চাকরি করার সময়ে প্রথম টুথপেস্ট আনলেন। কলগেট। আমরা আঙুল দিয়েই দাঁত মাজতাম।
চাঁদপাড়ায় দেখলাম, দাঁত মাজার বিভিন্ন উপায়। নিমের ডাল তো ছিলই, কিন্তু ওদের নিজেদের নিমগাছ তখনও ছোট। তাই নিম ডাল খুব বেশি নয়, খেজুর গাছের ডাল দিয়ে দাঁত মেজেছি। বাবলা গাছের ডাল দিয়েও। বড় হয়ে দেখলাম, ‘বাবুল টুথপেস্ট’। মানে বাবলার নির্যাস। ক্যারন গাছ নামে একটা গাছ ছিল, যা বেড়ার কাজে লাগত। ওই গাছের ডাল দিয়েও দাঁত মেজেছি। বকুল গাছের ডালেও।
চাঁদপাড়ার বাড়ির উঠোনের কোণায় একটা টিউবওয়েল ছিল, অদ্ভুত একটা গন্ধ ছিল সেই জলে, পাশেই পেয়ারা গাছ গাছে উঠতে শিখেছিলাম। পেয়ারা গাছেই আমার প্রথম গাছে চড়ার শিক্ষা। গাছে উঠে পেয়ারা ছিঁড়ে খাওয়ার কী অ্যাডভেঞ্চার মেশানো সুখ! দুটো কাঁঠাল গাছ ছিল, শিশু কাঁঠালকে ‘মুছা’ বলে শুছি। গাছে অনেক শিশু কাঁঠাল জন্ম নেয় গাছের কান্ড জুড়ে, অনেকগুলোই অকালে ঝরে যায়, এই ঝুরো কাঁঠালকলি বেঁটে দিদিমা একটা বড়া বানাত।

ওদের বাড়ির কাছাকাছি কোনও মুদি দোকানও ছিল না। ওই মাটির রাস্তা দিয়ে কিছুটা গিয়ে একটা কাঠ বাদাম গাছের ডান দিকে, একটা রাস্তা দিয়ে বাঁশ ঝোপ। ওখানে আলোছায়ার খেলা চলে, বাতাসে বাঁশ বনের ঝিরঝির শব্দ মেখে নিয়ে এক গেরস্থ বাড়ির বারান্দার কিছুটা ঘিরে একটা মুদি দোকান, ওখানে চাল-ডাল-নুন-গুড় পাওয়া যায়, আর এক পয়সায় একটা ঝুরি ভাজা একটা বড় বয়ামে ভরা থাকত। আমি আর শৈলা, দু’জনের হাতে দুটো প্যাঁচানো ঝুরি ভাজা। একটু-একটু করে ভেঙে খেতে-খেতে বাড়ি আসা, কখনও রাস্তার কুকুর পিছন-পিছন আসত, ওদের একটু ভেঙে দেওয়া।
ওদের বাড়ি থেকে মাঠ পেরুলে রেললাইন। রেললাইন পেরিয়ে শৈলাদের ইস্কুল। ডাকুরিয়া গ্রামটা লোকোমুখে ‘ঢাকুরিয়া’ হয়ে গেছে। স্কুলটার নাম ঢাকুরিয়া হাই স্কুল। ওদের মাঠে খেলা হত শীতকালে, ক্রিকেট বা ডাংগুলি। অন্য সময়ে ফুটবল। শৈলার বন্ধুরা ভাবত, আমি কলকাতার ছেলে। নিশ্চয়ই ভাল ক্রিকেট খেলতে পারি। কিন্তু ব্যাটসম্যান হিসেবে দু’ওভার টিকতে পারতাম না। পুরো কলকাতার প্রেস্টিজ পাংচার করে দিতাম।
আরো কত ছিন্ন ছবি মাঝে-মাঝেই মনে পড়ে, এখন এই বয়সে এসে স্মৃতিকথা লিখছি বলেই নয়, জীবনের বহুক্ষণে চাঁদপাড়া উঁকি দিয়েছে নানা ছবিতে। পানীয় পাত্রে স্ট্র দেওয়া হয়, স্ট্র মানে তো খড়। ধানগাছ যখন বড় হয়, হলুদ বরণ হয়নি তখনও, ধান গাছের ভিতরে একটা অর্ধ স্বচ্ছ দেহ থাকে। শৈলা সেটা বের করে দিত পাশের জমিটার ধান গাছ থেকে। একদম সত্যিকারে স্ট্র। ওই দিয়েই খেজুর রস খেয়েছি।
ওখানে আলোছায়ার খেলা চলে, বাতাসে বাঁশ বনের ঝিরঝির শব্দ মেখে নিয়ে এক গেরস্থ বাড়ির বারান্দার কিছুটা ঘিরে একটা মুদি দোকান, ওখানে চাল-ডাল-নুন-গুড় পাওয়া যায়, আর এক পয়সায় একটা ঝুরি ভাজা একটা বড় বয়ামে ভরা থাকত। আমি আর শৈলা, দু’জনের হাতে দুটো প্যাঁচানো ঝুরি ভাজা। একটু-একটু করে ভেঙে খেতে-খেতে বাড়ি আসা, কখনও রাস্তার কুকুর পিছন-পিছন আসত, ওদের একটু ভেঙে দেওয়া।
চাঁদপাড়ায় প্রথম দেখেছি বেজি। শন বনে ছুটন্ত খরগোশ, মৌচাক, কল্কে ফুলের বোঁটা চুষে এক বিন্দু মধু, চিতে বেড়ার লাল-লাল ফুল, সেই ফুলের উপরের অংশটা খুলে ফেললে লুকিয়ে থাকা এক বিন্দু মধু, বাবলা গাছের জিলিপি ফল…
বাবলা গাছের বীজ পেকে গেলে লাল হয়ে গুটিয়ে যায়। সামান্য মিষ্টি লাগে খেতে। কালবৈশাখীর সময়ে আকাশ ভরা কালো মেঘ, কী গম্ভীর। বড় আকাশ অবশ্য বাগবাজারের গঙ্গার ধারেও দেখেছি। কালবৈশাখীর মেঘ এবং তোলপাড় হাওয়া। চাঁদপাড়ার কালবৈশাখী আবার একটু অন্যরকম। মাঠ দাপিয়ে আসা হওয়া অন্য গন্ধ বয়ে আনতো। গরম কালে পাটি বিছিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে থেকেছি অনেক রাত অব্দি, আকাশে কত তারা, তারাগুলো কী উজ্জ্বল! কলকাতার আকাশে এত তারা নেই, আর ওগুলো এত উজ্জ্বল নয়।
শেয়াল ডেকেছে বারবার। প্রথমে একটা দুটো শেয়াল চিৎকার শুরু করলে, কয়েক মুহূর্ত পর থেকেই কোরাসে শুরু হয়। আর কত জোনাকি! ঝাঁকে-ঝাঁকে জোনাকি। শৈলার কাছে শুনেছি, এখন জোনাকি প্রায় দেখাই যায় না, শেয়ালের ডাকও শোনা যায় না। স্টেশন পেরুলে সেই সেগুন গাছের সারিও নাকি নেই। চুরি, গাছ চুরি। ক্ষমতাবানেরা বেচে দিয়েছে। বহুদিনের প্রাচীন গাছ, প্রতিটি গাছের দাম কয়েক লক্ষ টাকা। মোলায়েম জোছনা রাতের কথাও মনে পড়ে।

একটু পরে ওদের আরো একটা ঘর হয়েছিল পিছনের দিকে জমিতে। গাঁদালি গাছে ঘেরা হাগুখানা পেরিয়ে পাটকাঠির বেড়া, শনের ছাউনি। একটা ছোট জানলা, সেটার বাঁশের চটায় বাঁধানো কপাটও বাঁশের কঞ্চির। ওখানে থাকতাম আমি আর শৈলা। সামনের জমিতে জোছনা পড়ত, কখনও কুয়াশা জড়ানো। জোছনা ডাকত আয়-আয়, বেরিয়ে পড়তে চাইতাম। শৈলা যেতে চাইত না। কখনও ভূতগ্রস্তের মতো ঘুরেছি একা, ভয়-ভয় করত। কী একটা পাখি ডাকত, রাতে নিস্তব্ধতার মধ্যে একটা জিরাফের ভাষা লুকিয়ে থাকে। তখন ‘জিরাফের ভাষা’ শব্দটা মনে আসা অসম্ভব, আর সেই অনুভূতিও অক্ষরে অনুবাদ হয় না।
একটা সবুজ রঙের ট্রেন যেত দিনে একবার। আরেকবার ফিরত, যখন বনগাঁর দিকে যেত। তখন দিদিমা বলত, বারোটা বাজে। ওটা ছিল পাকিস্তান মেল। দুপুরে খুলনা অব্দি যেত। ১৯৬৮ সাল নাগাদ ওই ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। তখন তো আমার ১৭-১৮ বছর বয়স, আমি এ-সব তার আগেকার কথা বলছি।
আমার সাত-আট বছর বয়স থেকে ১৪ ১৫ বছর বয়স অব্দি খুব বেশি করে চাঁদপাড়া যেতাম। লেখাপড়ার চাপ বেড়ে যাওয়ার পর কমে যায়। তাছাড়া শৈলার দাদা সুখময়কাকু উড়িষ্যার চাকরি ছেড়ে কলকাতায় একটা কাজ পায় এবং এরপর নিজেই ব্যবসা শুরু করে। বিয়ে হয়, ওদের ঘরদোর পাল্টাতে শুরু করে। চাঁদপাড়ায় তখন আগেকার মোহ ছিল না, যা বলছিলাম আরকি। ওদের বাড়িতে একটাও ঘড়ি ছিল না, যখন বনগাঁ থেকে ট্রেন ছেড়ে চাঁদপাড়া হয়ে কু-ঝিকঝিক করতে-করতে যেত, দিদিমারা জানত, সাড়ে চারটে বাজে। সেকেন্ড ট্রেন মানে ছ’টা। ট্রেনের হিসেব ঠিক না করতে পারলে, লাগোয়া পাশের বাড়ির শীতলের মাকে জিজ্ঞাসা করত, দশটার ট্রেন গেছে কি না। চাঁদপাড়ায় কয়লার ট্রেন দেখেছি, তার বিশাল ইঞ্জিন, সেই দুরন্ত পিস্টনে চাকা ঘোরাচ্ছে। এরপর ডিজেল, তারপর ইলেকট্রিক। গুগল থেকে এইমাত্র জানলাম, ইলেকট্রিক ট্রেন চালু হয়েছে ১৯৭২ সাল থেকে।



