ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে, ১৯৪৮ সালে, দিল্লিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের নেতৃত্বে দেশের প্রথম মিউজিক কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তাতে গায়ক-বাদক মিলিয়ে অন্তত ৪৫ জন হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী অংশগ্রহণ করেছিলেন। রাজেন্দ্র প্রসাদকে কেন্দ্রে রেখে সমস্ত শিল্পীদের নিয়ে একটি ছবি তোলা হয়েছিল, যা সংগীতের ইতিহাসবিদদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে রয়ে গেছে আজও। সেই ছবিটি দেখলে একটি বিশেষ জিনিস উপলব্ধ হয় যে, সেই ৪৫ জন শিল্পীদের মাঝে রাজেন্দ্র প্রসাদের ঠিক পাশে একজনমাত্র মহিলা শিল্পী উপস্থিত। তিনি আর কেউ নন, প্রখ্যাত খেয়াল শিল্পী, বিদূষী কেশরবাঈ কেরকর।
পুরুষ শিল্পীদের তুলনায় শাস্ত্রীয় সংগীতের আঙিনায় নারীদের উপস্থিতি যে শতাংশের বিচারে একেবারেই নগণ্য ছিল তৎকালীন ভারতে, এই ছবি তার প্রমাণ।
একটা প্রশ্ন থেকে যায় যে, কেবল কেশরবাঈ কেরকর কেন? সে-যুগে মহিলা শিল্পীর সংখ্যা যথেষ্ট কম হলেও, একেবারে ছিল না, তা তো নয়। ঠিক এই প্রশ্ন থেকে উৎসারিত হয় কেশরবাঈ কেরকরের বিশিষ্টতা শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে ঠিক কোন জায়গায়। ১৮৯২ সালের ১৩ জুলাই, উত্তর গোয়ার কেরি নামক এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন কেশরবাঈ কেরকর। তাঁর পরিবার ছিল সংগীতকারদের পরিবার। সংগীতের মাধ্যমে তাঁরা গ্রাসাচ্ছাদন করতেন।

আরও পড়ুন: গীতা দত্তর সুর, গীতা দত্তর জীবন!
লিখছেন বৃন্দা দাশগুপ্ত…
স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ভারতে যে-সমস্ত নারী শিল্পীরা ছিলেন, তাঁদের একযোগে তওয়াইফ গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করা হত। মন্দিরের দেবদাসীরাও ছিলেন এই শ্রেণির মানুষ। কেশরবাঈ-এর সংগীত-সাধনা শুরু হয়েছিল মাত্র আট বছর বয়সে কোলাপুরে। প্রথমে আব্দুল করিম খাঁ সাহেব, তারপর রামকৃষ্ণ বুয়া ওয়াজের কাছে তিনি সংগীতশিক্ষা করেন। সেসময় বম্বে শহর (আজকের মুম্বই) ধীরে-ধীরে ভারতে বাণিজ্যিক রাজধানী হয়ে উঠছে। স্বাভাবিকভাবে ধনী মানুষদের একটি এলিট সম্প্রদায় গড়ে উঠতে থাকে। এই এলিট সম্প্রদায় সে-যুগে শাস্ত্রীয় সংগীতে পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। ঠিক যেমন বাংলার জমিদাররা একসময় শাস্ত্রীয় সংগীতের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। আর এই পৃষ্ঠপোষকতা ধনী পরিবারদের মধ্যে একটা যেন প্রতিযোগিতার ধারা বইয়ে দিয়েছিল। সত্যজিৎ রায়-এর ‘জলসাঘর’ ছবিতে আমরা দেখি, বিশ্বম্ভর রায় (ছবি বিশ্বাস) চরিত্রটি তাঁর পড়তি জমিদারির একদম শেষ টাকাটুকু দিয়েও বাঈজি বায়না করতে চান! কারণ, সেসময় তা ছিল ধনী পরিবারের এক বিরাট চিহ্ন। সাহিত্য-সিনেমা থেকে তখনকার বাস্তব জীবন আলাদা ছিল, তা নয়।
কেশরবাঈ কেরকর ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। এবং ধীরে তিনি বম্বে শহরে বিঠঠল শেঠের পৃষ্ঠপোষকতা পান এবং পরবর্তীকালে শেঠের শিবাজি পার্কের ফ্ল্যাটে থিতু হন। বিঠঠল শেঠ কেবলমাত্র কেশরবাঈকে ভালবেসেছিলেন তা নয়; তিনি কেশরবাঈ-এর সংগীত-জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার নিয়ামক আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের কাছে খেয়াল শিক্ষার জন্য তিনি ব্যবস্থা করেন। আল্লাদিয়া খাঁ ছিলেন তখনকার দিনে সবথেকে বেশি জনপ্রিয় সংগীতকার এবং গুরু। তাঁর নির্মিত জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানা খেয়ালের ইতিহাসে একটি বিশিষ্টতা অর্জন করেছিল। কিন্তু তাঁকে ধরা ছিল একপ্রকার অসম্ভব। বিঠঠল শেঠ অসুস্থতার অভিনয় করে আল্লাদিয়া খাঁ-কে বম্বে নিয়ে আসেন এবং কেশরবাঈকে তাঁর সামনে হাজির করেন। আল্লাদিয়া খাঁ প্রথমে একেবারেই কেশরবাঈ কেরকরকে গান শেখাতে রাজি হননি। অনেক পীড়াপিড়ির পর তিনি দু’টি শর্তে কেশরবাঈকে ‘গাণ্ডা-বন্ধন’ শিষ্যা করেছিলেন। এক, তাঁকে পাঁচশো টাকা (সেই কালে) নজরানা দিতে হবে। আর দুই, তিনি যা বলবেন, যেমন বলবেন, ঠিক সেইরকমভাবে কেশরবাঈকে শিখতে হবে। তখনকার দিনে পাঁচশো টাকার ব্যবস্থা বিঠঠল শেঠ করেছিলেন, বলাই বাহুল্য, তিনি ছিলেন রীতিমতো ধনী। আর কেশরবাঈ-এর রাজি না হয়ে উপায় ছিল না, কারণ উস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ-এর কাছে তিনি শিখতে পারবেন সরাসরি।

অতএব, শিক্ষা শুরু হল। আজ সংগীতশিক্ষা, রেওয়াজ ইত্যাদি শব্দগুলো যেভাবে ঘুরে বেড়ায় এবং এই শিক্ষার গাম্ভীর্য, গুরুগৃহে বাস, গুরুসমীপতে শিক্ষা করার যে আদর্শ আমরা দেখি, তার একটা চরম, পূর্ণ ছবি আমরা আল্লাদিয়া খাঁ-এর শিক্ষা আর শিক্ষার্থী কেশরবাঈ-এর মধ্যে ফুটে উঠতে দেখি। ভোর চারটে থেকে সকাল আটটা অবধি উস্তাদ আল্লাদিয়া খাঁ-এর কাছে শেখা। তারপর সকালের নাস্তা। আবার ন’টা থেকে বারোটা অবধি রেওয়াজ। এরপর দুপুরে বিশ্রাম এবং বিকেল থেকে পুনরায় রেওয়াজ শুরু। সন্ধ্যা আটটায় গিয়ে শেষ। শেষে আল্লাদিয়া খাঁ-কে নৈশাহার করিয়ে রাত দশটায় শেঠের গাড়িতে করে কেশরবাঈ-এর নিজের ফ্ল্যাটে ফেরা। দশ মাসের এই ক্রমাগত রেওয়াজে মাত্র দু’টি রাগ কেশরবাঈ শিক্ষা করেছিলেন— মুলতানি এবং তোড়ি।
আল্লাদিয়া খাঁ-এর জয়পুর-আত্রৌলি ঘরানার খেয়ালে যে বিশিষ্টতা, তা যেন কেশরবাঈ কেরকরের সংগীতে খুব সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। এই ঘরানার খেয়াল নিয়ে নানা মত। কেউ বলে এতে কল্পনার জায়গা কম। কেউ বলে রাগ বিস্তার অন্যান্য ঘরানার তুলনায় তেমন নেই বললেই চলে। কিন্তু এই ঘরানার যে মুড, তা এতই অ্যাকাডেমিক, এই গানে সৃষ্ট মুহূর্তরা এতই সুদৃঢ়ভাবে দর্শকের মনে গিয়ে বেঁধে যে, এই ঘরানার গান একবার শুনলে তা ভুলতে পারা বেশ কঠিন। কেশরবাঈ কেরকর জি-শার্প স্কেলে গাইতেন। তৎকালীন সমাজে নারীর যে তথাকথিত কণ্ঠস্বর, তার খুব কাছাকাছি কেশরবাঈ-এর কণ্ঠ ছিল না। বরং, তিনি এতটাই খাদে এবং তৎসঙ্গে এতটাই ওপরে গাইতে পারতেন যে, সেই প্রকরণ পুরুষ শিল্পীদেরও ঈর্ষার কারণ হত। তাঁর সংগীতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় ছিল তানের বিস্তার। কেশরবাঈ কেরকরের তান অতুলনীয়, খেয়াল সংগীতের ইতিহাসে তা বড়ে গুলাম আলি খাঁ সাহেবের পাশে তাঁর নাম বসতে পারে ওই তানের জন্যই। তিনি তানের স্বর্গ গড়ে যেভাবে সমে এসে ফিরতেন, মনে হতো সুর এবং তাল যেন তাঁর জন্মগত অধিকার। নোটেশনের প্রতি এত মনোযোগ, সুর লাগানো এত নির্দিষ্ট এবং সুরেলা আবহ তৈরি করার প্রতি এত প্রয়াস কেশরবাঈ কেরকরের গানে ছিল, মনে হত, তাঁর সেই সুরের যথার্থতা একমাত্র ইউরোপীয় শিল্পীদের সঙ্গে তুলনীয়। সেই সব মণিমুক্তোসম প্রমাণ তাঁর ছোট-ছোট দ্রুত খেয়ালের যে রেকর্ড ইউটিউব বা অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে এখনও মেলে তাতেই পাওয়া যায়। অথচ কেশরবাঈ কেরকর একেবারে গান রেকর্ড করতে চাইতেন না। তিনি রেডিওতে গাওয়ার জন্য ভীষণভাবে প্রথমদিকে অরাজি ছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যেভাবে দিনের পর দিন অতি পরিশ্রম করে তিনি গান শিখেছেন, সেই গান উত্তর প্রজন্মের জন্য রেকর্ড আকারে তিনি দিয়ে যেতে রাজি নন। তাঁর মতে সেই গান কেবলমাত্র রসবোধসম্পন্ন, শাস্ত্রীয় সংগীতের বুঝদার শ্রোতার সামনে মিউজিক কনফারেন্সে সরাসরি শোনানোর জন্য।

নারী-পুরুষ নির্বিশেষে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ভারতে যে ক’জন প্রথম সারির সবথেকে কাঙ্ক্ষিত সংগীতশিল্পী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম কেশরবাঈ কেরকর। ১৯৩৮ সনে কলকাতার জোড়াসাঁকোতে রবীন্দ্রনাথের সামনে তিনি সংগীত পরিবেশন করলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সেই সুরের জালে নিমগ্ন হয়ে এত খুশি হয়েছিলেন যে, তিনি তাঁকে ‘সুরশ্রী’ পদবিতে ভূষিত করেছিলেন। তখনকার দিনে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে কোনও আখ্যা পাওয়া ছিল দেশে-বিদেশে সমস্ত পুরস্কারের থেকে বড় পাওনা।
ব্যক্তি কেশরবাঈ কেরকর ছিলেন রঙিন একজন মানুষ। তাঁর জীবনী ফিরে পড়লে কিংবা তাঁকে নিয়ে যে-সমস্ত বই বেরিয়েছে, সেসব দেখলে মনে হয় তাঁর মধ্যে একজন অবুঝ শিশু সারা জীবন বাস করেছে। তিনি ছিলেন ব্যবহারে ভীষণরকম দাম্ভিক, এবং তাঁর চারপাশের শিল্পীদের কটুকথা শোনানোতে একদম পিছপা হতেন না। সাদা সিল্কের শাড়ি, হিরে-জহরতে মোড়া সাজ ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের অন্যতম পরিচয়। বয়সকালে মাথার টাকে তিনি কাজল লাগাতেন। কেশরবাঈ বোধহয় একমাত্র শিল্পী ছিলেন তৎকালীন সময়ে যাঁর বহু ছবি উঠেছিল। বহু দেশীয় এবং ইংরেজি পত্রপত্রিকায় তাঁর সাক্ষাৎকার ছাপা হত। তিনি ছিলেন খেয়াল সংগীতের মহারানি। মেজাজও ছিল তেমনই। নিজের সংগীতশিক্ষা সম্বন্ধে তিনি কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘আমার চেহারা তো দেখতেই পাচ্ছেন। যৌবনকালে কত চটক ছিল বুঝতে পারছেন? যে-কোনও গুরু আমার রূপ দেখেই আমাকে প্রায় বিনা পয়সায় শেখাতে রাজি হয়ে যেতেন!’ রাগরাগিনীর তর্ক উঠলে তিনি নাকি বিনা দ্বিধায় বলে দিতেন, ‘ছাড়ুন, আপনাদের এসব রাগের বিচার। আমরা যাঁদের কাছে শিখেছি এবং যেভাবে শিখেছি, রাগ আমাদের কাছে দাস হয়ে থাকে। কীভাবে খেলাব তা আমরা খুব ভাল জানি!’
একবার রসুলন বাঈ-এর সঙ্গে তাঁর কোনও এক সম্মেলনে দেখা হয়েছিল। তিনি প্রথমেই মুখ কুঁচকে বলেছিলেন যে, রসুলান বাঈ সেখানে কী করছে? অর্থাৎ, খেয়ালের মতো বিরাট ও ব্যপ্ত চর্চায় রসুলন বাঈ-এর মতো হালকা গান গাওয়া শিল্পীর অংশগ্রহণ কীভাবে হয়? রসুলন বাঈ-এর অভ্যাস ছিল, বাঁ-হাতের কড়ে আঙুলটা কানে প্রবেশ করিয়ে কখনও-কখনও রাগ ধরতেন। রসুলন বাঈ যখন তাঁকে বলেন যে, তিনি কেশরবাঈ-এর কাছে কিছু না, তখন তিনি নাকি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘কুছ নেহি তো তেরি চুঙ্গলি (কড়ে আঙুল) কিস কাম কি? থক গয়ি?’ অল ইন্ডিয়া রেডিওতে গান গাইতে না চাইলেও শাস্ত্রীয় সংগীত-বিভাগে দ্বিতীয় যে-শিল্পী নির্বাচিত হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন কেশরবাঈ কেরকর। কিন্তু তাঁর পরে গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলের গান বাজানো হলে, তিনি আকাশবাণীকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন যে, তাঁর গান যেন কোনওদিন আর কখনও বাজানো না হয়। কারণ, তিনি যে শ্রেণির শিল্পী, তাঁর পরে যদি ‘ছোটখাটো’ যে-কোনও শিল্পীকে সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে তা তাঁর সংগীতের অপমান। আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের মগুবাই কুর্দিকরকে শেখানো তিনি কোনওদিন মেনে নিতে পারেননি। গুরুর সঙ্গে বহুবার ঝগড়া করেছেন। আবার মল্লিকার্জুন মনসুর সম্বন্ধে তিনি আল্লাদিয়াকে বলেছিলেন, আপনি এবং আপনার ছেলে মিলে একটা দানো ছেড়েছেন বাজারে। এ আমাদের সব্বাইকে একদিন খেয়ে নেবে।’
খেয়াল সংগীতে কেশরবাঈ কেরকরের বিশিষ্টতা আজও অনন্য। কিন্তু সেই ঘরানার আর কেউই তাঁর ধারে কাছে ছিল না, কিংবা তাঁদের উপস্থিতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়া— এ যেন এক অবুঝ শিশুর মতো নিজের পিতৃসম গুরুকে আঁকড়ে থাকার প্রয়াস।
অনেক সময় সাক্ষাৎকারে তিনি বেশ কিছু বেঠিক তথ্য দিতেন। যেমন, তিনি বহুবার বলেছেন যে, তিনি আল্লাদিয়া খাঁ-এর মৃত্যু অবধি তাঁর কাছে শিখেছেন। তাঁর ঘরানা-সহকর্মীরা পরে জানিয়েছেন যে, এ-তথ্য সত্যি নয়। বিঠঠল শেঠের মৃত্যুর পরে তিনি আর আল্লাদিয়া খাঁ সাহেবের কাছে শেখেননি। অবশ্য ততদিনে তাঁর খেয়াল সংগীতের শিক্ষা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, তিনি নাকি বলতেন যে আল্লাদিয়া খাঁ-এর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি জনসমক্ষে গান গাইতেন না; গুরুর পিছনে বসে তানপুরা ধরতেন। এই তথ্যও সঠিক নয়। কারণ, বহু তৎকালীন শ্রোতা-দর্শকরা তাঁর গান আল্লাদিয়া খাঁ-এর মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই শুনতেন। নিজের শিক্ষাপ্রণালীর প্রতি তাঁর এতটাই ভাল লাগা ছিল যে, তিনি মনে করতেন আল্লাদিয়া খাঁ-এর একমাত্র শিষ্য এবং সেই ঘরানার একমাত্র সংগীতশিল্পী তিনিই। অর্থাৎ আল্লাদিয়া খাঁ-এর পুত্ররা কিংবা তাঁর অন্যান্য শিষ্য-শিষ্যাদের উপস্থিতি তিনি কখনও মানেননি।
খেয়াল সংগীতে কেশরবাঈ কেরকরের বিশিষ্টতা আজও অনন্য। কিন্তু সেই ঘরানার আর কেউই তাঁর ধারে কাছে ছিল না, কিংবা তাঁদের উপস্থিতিকে একেবারে নস্যাৎ করে দেওয়া— এ যেন এক অবুঝ শিশুর মতো নিজের পিতৃসম গুরুকে আঁকড়ে থাকার প্রয়াস। তিনি নিজে ভীষণ পরিশ্রম করে দিনের পর দিন গুরুর সমীপে পড়ে থেকে গান শিখলেও, সারা জীবনে একটি মাত্র ছাত্রী তাঁর হয়েছিল— দন্দুতাই কুলকার্নি। এছাড়া, তিনি কাউকে কোনওদিন আর গান শেখাননি। গান শোনানোর প্রতি ছিল এই শিল্পীর সকল মনোযোগ। সংগীত নাটক আকাদেমি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন তিনি, যাঁকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল (১৯৫৩)। তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছিলেন (১৯৬৯)। সবচেয়ে বড় কথা, ১৯৭৭ সালে যখন মহাকাশে সারা পৃথিবী থেকে বেছে গোল্ডেন ডিস্কে বিভিন্ন গান পাঠানো হয়েছিল, তখন একমাত্র ভারত থেকে তাঁর গান ‘জাত কাহা হো’ প্রেরিত হয়েছিল। সংগীত-ইতিহাসবিদ রবার্ট ই. ব্রাউন তাঁর এই গান মনোনীত করে বলেছিলেন যে, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ কেশরবাই কেরকরের গানে লুকিয়ে আছে।
তবে কেশরবাঈ কেরকর যদি না থাকতেন, তাঁর সমসাময়িক এবং পরের প্রজন্মের নারীরা হয়তো শাস্ত্রীয় সংগীতে এগিয়ে আসতে পারতেন না। তওয়াইফ থেকে পেশাদার সংগীতশিল্পীতে পরিণত হওয়ার প্রতিটি নারীর যে যাত্রা, তা অনেক সহজ হয়ে গেছিল কেশরবাঈ কেরকরের সাফল্যের কারণে। তাঁর কাছে প্রত্যেক শিল্পীর, বিশেষত নারী-শিল্পীদের, এইখানে এক বিরাট কৃতজ্ঞতা। প্রথম মিউজিক কনফারেন্সের সেই ছবি আজ তোলা হলে হয়তো নারী-পুরুষ প্রায় সমান-সমান ভাগে বিভক্ত হতেন। কিন্তু কেশরবাঈ কেরকর সেদিন একা বসেছিলেন বলেই আজকে নারীরা সমান জায়গা পেয়েছেন।



