বিতর্কিত একাদশ: পর্ব ৯

Representative Image

ট্র্যাজিক নায়ক

ইউরোপ ও আমেরিকাতে বর্ণবাদ প্লেগের মতো মহামারির আকার নিচ্ছে। এই বর্ণবৈষম্য, জাতি-বিদ্বেষ, ভূরাজনৈতিক চাপানউতোড়, পরিবেশদূষণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের সতর্কবাণীর আবহে, সংযুক্ত জার্মানির মিউনিখের অ্যালিয়েঞ্জ এরিনায়, অষ্টাদশ বিশ্বকাপ শুরু হল একটি বিশেষ থিম নিয়ে। ‘বর্ণবাদের অবসান হোক’— প্রতিটা ম্যাচ শুরুর আগে এই ব্যানার নিয়ে বার্তা দেওয়া হল ফুটবলারদের পক্ষ থেকে। বিশ্বকাপের বারোটি সুসজ্জিত স্টেডিয়ামেই দেখা গেল এই ব্যানার, যার এগারোটিই পশ্চিম জার্মানিতে, একটিমাত্র পূর্বে।

যদিও এই বিশ্বকাপের কিকঅফের আগে থেকেই বর্ণবৈষম্য নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবং অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের নিয়ে গঠিত বলে, ফরাসি দল ঘরে-বাইরে এই বর্ণবিদ্বেষের প্রথম নিশানা হয়ে যায়। অতি দক্ষিণপন্থী ফরাসি রাজনীতিবিদ জ্যঁ-মারি লা পেন, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই বলে দেন, এই ফ্রান্স টিমকে দেখে ফরাসি দেশকে চেনা যাবে না; কারণ অধিকাংশ ফুটবলাররাই কৃষ্ণাঙ্গ! বিতর্কে উস্কানি দিতে তিনি আরও যোগ করলেন যে, দলের ক্যাাপ্টেন জিনেদিন জিদান আলজেরীয় বংশোদ্ভূত হওয়াতে, তিনি নাকি ফ্রান্সের জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকার করেছেন! ইতালীয় সংসদের উচ্চকক্ষে উপরাষ্ট্রপতি রবার্তো ক্যালদেরলি বলেছিলেন, এই ফরাসি দল গঠিত হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ, ইসলামিক আর কমিউনিস্ট ফুটবলারদের সমাহারে। এই দলের সদস্যদরা ফরাসি জাতীয় সংগীত, ‘লা মার্সেইয়েস’-এর থেকে ‘লা ইন্তারন্যাাশনাল’ গাওয়াকে অগ্রাধিকার দেয়, বেথেলহেমের থেকে গুরুত্ব দেয় মক্কাকে!

আত্মঘাতী গোল হয়ে উঠল ফুটবলার খুনের কারণ? পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৮…

দ্বিতীয় রাউন্ড ম্যাচের আগে, প্রতিযোগিতার অন্যতম ফেভারিট, স্পেনের কোচ লুইস আরিগনেস, ফ্রান্স ও আর্সেনালের স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরিকে ‘ব্ল্যাক পিস অফ শিট’ (কালো বিষ্ঠার টুকরো) বলায় বিতর্ক চরমে ওঠে। ক্যারপ্টেন জিদান ও অঁরি ছাড়াও এই ফ্রান্স টিমে ছিলেন, মার্সেই দেসাই, লিলিয়ান থুঁর, প্যাট্রিক ভিয়েরা, ক্লদ ম্যাকলেলে, ডেভিড ত্রেজেগুয়েত, এরিক আবিদাল, সিলভিয়ান উইলটোর্ড-সহ বহু কৃষ্ণাঙ্গ মুখ, যাঁরা নিজের ক্লাব ও ফরাসি জাতীয় দলের স্টার ফুটবলার। জিনেদিন জিদানের নেতৃত্বে লে ব্লুজরা অবশ্য নক আউট পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচে, স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে এই বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্যের হিসেব সুদে-আসলে মিটিয়ে দিয়েছিলেন। সে-দিন হ্যানোভারের হেইনজ ভন এইডেন-এরিনায় দ্বিতীয়ার্ধে প্রবল আধিপত্য নিয়ে খেলতে দেখা গিয়েছিল, জিদান-ফ্রাঙ্ক রিবেরিদের।

বিশ্বের আকাশে তখন অশান্তির মেঘ। আজকের আমেরিকা-ইজরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের সূত্রপাত সেই সময়ে। ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরি করছে আর নিজের অপরিশোধিত তেল-ভাণ্ডার সংরক্ষণ করছে, এই অভিযোগ তুলে ইরান আক্রমণ করার হুমকি দিতে শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইজরায়েল, গাজায় হানাদরি চালাচ্ছে তাদের এক ‘যুদ্ধবন্দিকে’ মুক্ত করার কারণ দেখিয়ে। ইরাকে তখনও গণহত্যা চালাচ্ছে মার্কিন সেনা, ইরাকিরা নিজের দেশের তেল-ভাণ্ডার ‘লুকিয়ে’ রেখেছে, এই ‘অপরাধের’ বিচার হিসেবে। বলিভিয়ার প্রথম আদিবাসী রাষ্ট্রপতি ইভো মোরালেস আমেরিকা ও ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমে ‘দোষী’ সাব্যস্ত হয়েছেন, তৈল ও গ্যাস সম্পদের জাতীয়করণ করে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার জন্য! ইতালিতে বন্দি অবস্থায় প্রতিপালিত, দু’বছর বয়সি ব্রুনো নামক এক খয়েরি ভাল্লুককে জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়ার পর, সে জার্মানিতে পাড়ি দেয় ও তার বিরুদ্ধে খরগোশ, ভেড়া, মৌচাক ইত্যালদিকে গৃহপালিত প্রাণীসম্পদকে আক্রমণ করার অভিযোগ ওঠে। যদিও ফুটবলে সে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি, তবুও বিশ্বকাপ সংগঠকরা ব্যাভেরিয়ার জঙ্গলে তাকে গুলি করে হত্যা করল, কোনও ঝুঁকি না নিতে চাওয়ার অজুহাতে। যা নিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ কর্মীরা ছিলেন রীতিমতো সরব। এই ভূরাজনৈতিক আগ্রাসন, হিংসা ও হুমকির বিষাক্ত প্রভাব পড়ছে ফুটবলেও।

এই পরিস্থিতিতে, জার্মানিতে বিশ্বকাপে অভিষেক হল আন্তর্জাতিক ফুটবলের দুই তরুণ প্রতিভার— লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর। যদিও রক্ষণাত্মক কৌশল ও শক্তিনির্ভর ফুটবলের দিকে ঝুঁকে থাকায়, দু’জনের কোচই দুই প্রতিভার প্রতি সুবিচার করলেন না। আর পেশাদারি ফুটবল জীবনের অন্তিম প্রতিযোগিতা হিসেবে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপকে বেছে নিয়েছিলেন ফরাসি ফুটবলের রূপকথার নায়ক, জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান। আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে যাঁর ডাকনাম ছিল, জিজু।

স্পেনকে হারিয়ে রেমন্ড দমেনেকের প্রশিক্ষণাধীন দল, কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হল ব্রাজিলের, যে-দলে কাফু, রোনাল্ডো, রোনাল্ডিনহো, রবার্তো কার্লোস, কাকাদের মতো তারাদের সমাহার। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের দখলে তখন বিশ্বকাপের অধিকাংশ রেকর্ড। সর্বোচ্চ টানা এগারোটি ম্যাচ জিতেছিলেন কাফুরা, যা আজও বিশ্বকাপের রেকর্ড। প্রতিযোগিতার ইতিহাসে তখনও পর্যন্ত ২০১টি গোল করেছিল ব্রাজিল, যার ধারে কাছে ছিল না কোনও দল। বিশ্বকাপে ব্যপক্তিগত খেলোয়াড় হিসেবে সবথেকে বেশি ম্যাচ জেতার রেকর্ড ছিল ব্রাজিল-অধিনায়ক কাফুর দখলে। পরে এই রেকর্ড প্রথমে ভাঙলেন, জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজা; বর্তমানে এই রেকর্ড আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসির দখলে। গার্ড মুলারকে টপকে, ১৬টি গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা তখন ব্রাজিলের সুপারস্টার স্ট্রাইকার রোনাল্ডো। পরে এই রেকর্ডও প্রথমে ক্লোজা, ও পরে লিও মেসি ভেঙে দেন। ক্লোজার গোলসংখ্যা ১৯। ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইজিপ্ট ম্যাচ পর্যন্ত মেসি করেছেন, রেকর্ড ২১টি গোল।

এই পরিস্থিতিতে ফ্র্যাঙ্কফুটের কমার্জব্যাঙ্ক এরিনায়, ছ’বারের লক্ষ্যে ছুটতে থাকা ব্রাজিল দলের মুখোমুখি হলেন থিয়েরি অঁরি-মার্সেই দেসাইরা। কিন্তু প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর, দ্বিতীয়ার্ধে প্রাধান্য বিস্তার করল লে ব্লুজ। একক দক্ষতায় মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, নিজের জাত চেনালেন জিজু। জিদানের মাপা, ভাসিয়ে দেওয়া ফ্রি-কিকে ভলি করে ব্রাজিলের জাল কাঁপালেন অঁরি। এই বিশ্বকাপে সোনার বলের অন্যতম দাবিদার ভাবা হচ্ছিল, রোনালডিনহোকে। মাস দেড়েক আগে ফ্রাঙ্ক রাইকার্ডের প্রশিক্ষণাধীন বার্সিলোনাকে, ‘উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ’ শিরোপা জিতিয়ে আসা রোনালডিনহো, জার্মানি বিশ্বকাপে আঁচড়ই কাটতে পারলেন না। জিদানদের বিরুদ্ধে তাঁর ম্যাজিক দেখার আশায় ছিল গোটা ব্রাজিল, কিন্তু পোর্তো আলেগ্রের সোনার ছেলে নিষ্প্রভই রয়ে গেলেন। মসৃণ গতিতে সেমিফাইনালে চলে গেল ফ্রান্স। হারের জ্বালায় ব্রাজিল সমর্থকরা রোনালডিনহোর একটি কুড়ি ফুট স্ট্যাচু ভেঙে গুঁড়িয়ে দিলেন!

৪০ বছর পর, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে প্রত্যাবর্তন ঘটল পর্তুগালের। ১৯৬৬-র ইউসেবিও যুগের পর আবার শেষ চারে পৌঁছল তাঁরা।

লুই ফিগোর পর্তুগাল সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল নকআউট পর্বে নেদারল্যান্ড ও ইংল্যান্ডকে হারিয়ে। ২০০২-এ ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাপম্পিয়ন করেছিলেন যে লুই ফেলিপে স্কোলারি, ২০০৬-এ তিনিই ছিলেন পর্তুগালের কোচ। কিন্তু ২০০০-এর ‘ইউরো কাপ’ সেমিফাইনালের মতোই ফিগোদের হার মানতে হল জিদানদের কাছে। মিউনিখের অ্যালিয়েঞ্জ এরিনায় প্রথমার্ধে থিয়েরি অঁরিকে বক্সের মধ্যো ফাউল করলেন রিকার্ডো কার্ভালহো। পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোলটি করলেন জিদানই। ‘কৃষ্ণাঙ্গ’ ফুটবলারদের কাঁধে ভর দিয়ে আট বছর পর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছে গেল ফ্রান্স।

লুই ফেলিপে স্কোলারি

রক্ষণাত্মক ফুটবলের দাপট

দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই মাঠে ফুল ফোটাচ্ছিলেন জিদান। রক্ষণনির্ভর, মধ্যমানের ফুটবল ও ফুটবলারদের প্রাধান্যের মধ্যে ‘আলজেরীয় বংশোদ্ভূত’ জিদান ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম। যিনি ‘স্ককীয় স্টাইল’-এ সবুজ ক্যানভাসে মহাকাব্য রচনা করে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন, ফুটবলের শৈল্পিক ঘরানাকে। সেই বিশ্বকাপ দেখতে আসা এক বিদেশি দর্শক কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘এই টুর্নামেন্টে ফুটবলাররা খুবই সংযত আচরণ করেছে; তারা ধূমপান করেনি, মদ্যপান করেনি, আবার খেলেওনি!’ দেশের জার্সি গায়ে ক্লাব ফুটবলের নক্ষত্রদের ব্যর্থতা যখন প্রকট হচ্ছিল, একে-একে বিদায় নিচ্ছে স্পেন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা; বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল যখন ‘ইউরো কাপ’-এ পর্যবসিত হয়েছে! তখন একমাত্র জিজুর কল্পনাশক্তিই রক্ষা করেছিল ফুটবলের আকর্ষণ।

উলটোদিক থেকে কাতেনাচিও সিস্টেমে রক্ষণকে আরও জোরালো করে ফাইনালে উঠে এল ইতালি। ইতালির কোচ মার্সেলো লিপ্পি ফাবিও ক্যানাভারো, মার্কো ম্যাতারাজ্জি, জিয়ানলুকা জামব্রোতাদের দিয়ে চিনের প্রাচীরের মতো এক রক্ষণের ছক সাজিয়েছিলেন। কোয়ার্টার ফাইনালে ইউক্রেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে, সেমিফাইনালে আয়োজক জার্মানির মুখোমুখি হল আজ্জুরিরা।

জার্মানরা অবশ্য শেষ চারে এসেছিল, বার্লিনে প্রতিযোগিতার ফেভারিট আর্জেন্টিনাকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর টাইব্রেকারে হারিয়ে। স্কিলের নিরিখে অনেক শক্তিশালী দল হাতে থাকা সত্ত্বেও, আর্জেন্টিনার কোচ হোসে পেকেরম্যারন ম্যাচটা হেরেছিলেন, নিজের ভুল স্ট্র্যাটেজির মাশুল গুনে। রবার্তো আয়ালার গোলে যখন আর্জেন্টিনা এগিয়ে, মাঠে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য বিস্তার করেছে আকাশি নীল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি, তখন পেকেরম্যাান, টিমের মূল স্কিমার— জুয়ান রোমান রিকেলমে ও মূল স্ট্রাইকার হার্নান ক্রেসপোকে তুলে নিয়ে অহেতুক রক্ষণাত্মক কৌশল নিতে গেলেন, ও জার্মানদের ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দিলেন। আর্জেন্টিনাকে হঠাৎ রক্ষণের গুহায় ঢুকে যেতে দেখে, গোল শোধের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়লেন মাইকেল বালাকরা। ও রক্ষণের মুহূর্তের ভুলে ফ্লাইং হেডে গোল করে দিলেন ক্লোজা। ম্যাচ গড়াল অতিরিক্ত সময়ে। পেকেরম্যানকে তৃতীয় পরিবর্তনটি করতে হয়েছিল, আহত গোলরক্ষককে বদলানোর জন্যই। অর্থাৎ, ১২০ মিনিট বেঞ্চে বসে রইলেন দুই প্রতিভাবান— লিও মেসি ও জেভিয়ার স্যানভিওলার মতো অ্যাটাকার। টাইব্রেকারে শেষ দুটো শট জার্মান গোলকিপার জেনস লেহম্যােনের হাতে মেরে, বিদায় নিলেন আয়ালারা। ঘরের মাঠে কোনওক্রমে সেমিফাইনালে উঠে মুখরক্ষা করল জার্মান দল।

সেমিফাইনালে দুই দলের রক্ষণাত্মক কৌশলের জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গোল হল না। অতিরিক্ত সময়ে ডিফেন্ডার ফাবিও গ্রসো প্রথম গোল করলেন, এরপর পরিবর্ত আলেজান্দ্রো দেল পিয়েরো একটি দুরন্ত গোল করে জার্মানদের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিলেন।

শিল্পী জিদানদের জন্য ইতালির ফাঁদ

হট ফেভারিট হিসেবে ফাইনাল খেলতে বার্লিন পৌঁছল ফ্রান্স। আর্ট কলেজের অধ্যাপকের মতো চেহারার ফরাসি কোচ রেমন্ড দমেনেকের হাতে রয়েছে, অঁরি-রিবেরি-ভিয়েরা-থুঁরদের মতো এমন সব তাস, যাদের নিয়ে আক্রমণ ও রক্ষণে দুরন্ত ভারসাম্য রচনা করা যায়।

বার্লিনে ফাইনাল খেলতে আসা দুটো দল মিলিয়ে আটজন জুভেন্তাসের প্লেয়ার ছিলেন। পাঁচজন ইতালির, তিনজন ফ্রান্সের। এই বিশ্বকাপের আগেই ইতালির ঘরোয়া ফুটবলের যে-কেলেঙ্কারির পর্দা ফাঁস হয়, সেই দুর্নীতিচক্রে প্রধান অভিযুক্ত ছিল তুরিনের এই ক্লাব। আর সিলভিও বার্লুসকোনির এসি মিলান। এই মাফিয়া-রাজনীতিবিদ তথা ফুটবলকর্তা নানা দুর্নীতির অভিযোগ গায়ে নিয়েও, আইনি বিচার প্রক্রিয়াকে এড়িয়ে চলার ক্ষমতা রাখতেন। এদের বিরুদ্ধে রেফারিকে ঘুষ দেওয়া, সাংবাদিকদের মোটা টাকায় কেনা, চুক্তিপত্রে জালিয়াতি করা, ক্লাবের হিসেবের খাতায় ব্যাপক গরমিল করা, ক্লাবের পদে নিয়োগ নিয়ে স্বজনপোষণ করা, টেলিভিশন সম্প্রচারকে কৌশলে প্রভাবিত করা— ইত্যাটদি নানা অভিযোগ ওঠে।

ইতালির দুর্ভেদ্য রক্ষণ ছিল, কিন্তু আক্রমণে সে-রকম ঝাঁঝ ছিল না। রবার্তো বাজ্জিওর যুগ তখন অতীত, অভিজ্ঞ দেল পিয়েরোকে কোচ লিপ্পি ব্যবহার করছিলেন পরিবর্ত হিসেবে, আর দলের মূল স্কিমার আন্দ্রেয়া পির্লোকে খেলাচ্ছিলেন ‘ডিপ’ থেকে, মূলত রক্ষণাত্মক ভূমিকায়। ফরোয়ার্ড ফ্রানসিস্কো তোত্তিকেও কোচ অপারেট করাচ্ছিলেন একটু পেছন থেকে। স্টপারে শুরুতে ক্যানাভারোর জুটি ছিলেন আলেজান্দ্রো নেস্তা। গ্রুপ লিগের ম্যাচে তিনি চোট পেয়ে বসে যাওয়ায়, রিজার্ভ বেঞ্চ হাঁতড়ে ম্যাতারাজ্জিকে ক্যানাভারোর সঙ্গে জুড়ে দিয়ছিলেন লিপ্পি।

৯ জুলাই, বার্লিনের ওলিম্পিয়া-স্টেডিয়ামে ফাইনালে নামার আগে দু’কোচই দল সাজালেন সামনে একজন মাত্র স্ট্রাইকারকে রেখে। সাদা জার্সি পরিহিত লে ব্লুজদের আপফ্রন্টে থিয়েরি অঁরি, আজ্জুরিদের লুকা তোনি। তবে দমেনেক শুরু থেকেই অনেক বেশি আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছিলেন। প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেরই বক্সের বাইরে ভিয়েরাকে ফাউল করে, হলুদ কার্ড দেখলেন ইতালির রাইট ব্যািক জামব্রোতা। ম্যা চের ছ’মিনিটে মাথায় ইতালি বক্সের মধ্যেদ ফ্লোরেন্ত মালুদাকে ফাউল করলেন ম্যা তারাজ্জি। পেনাল্টির বাঁশি বাজালেন রেফারি হোরেশিও এলিজোন্দো। পেনাল্টি থেকে অনবদ্যত চিপ করে ইতালির গোলকিপার জিয়ানলুগি বুফঁকে বোকা বানালেন জিদান। বল ক্রসবারের নীচের অংশে লেগে, গোলের মধ্যেন ড্রপ করে বুঁফর হাতে গেল।

৯ জুলাই, বার্লিনের ওলিম্পিয়া-স্টেডিয়াম

এই ম্যাতারাজ্জির ওপরই দেওয়া হয়েছিল ফাইনালে জিদানকে মার্ক করার দায়িত্ব। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ থেকেই ‘ট্যাকেল ফ্রম বিহাইন্ড’ নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ‘ফিফা’। অর্থাৎ পেছন থেকে ট্যাকেল করলেই ফাউল দিতে পারেন রেফারি। তবে এ-জন্য একটি ক্যান্সার ঢুকেছিল বিশ্ব ফুটবলে। আক্রমণরত ফুটবলার বেরিয়ে গেলে, পেছন থেকে তার জার্সি টেনে ধরে আটকানোর চেষ্টা করতেন ডিফেন্ডাররা। এই ফর্মুলার প্রয়োগ যথারীতি বার্লিনের ফাইনালেও দেখা গেল, ও তা হয়ে উঠল এক বিশ্ব বিতর্কের উৎস।

জিজু ফুটবল খেলতেন মস্তিষ্ক দিয়ে,পরিস্থিতি অনুযায়ী জায়গা পরিবর্তন করে, তাকে মার্ক করা বরাবরই কঠিন ছিল। তার ওপর এই আসরে তিনি ছিলেন ফর্মের চূড়ায়। তাই সারা ম্যাচে, ম্যাতারাজ্জির ম্যান মার্কিং এড়িয়ে, বারবার ছিটকে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন জিদান। তাঁকে আটকাতে প্রায়ই তাঁর জার্সি টেনে ধরতে দেখা যাচ্ছিল ম্যাতারাজ্জিকে।

তবে ফ্রান্স বেশিক্ষণ লিড ধরে রাখতে পারল না! ছ’মিনিটের করা ভুলের প্রায়শ্চিত্ত ১৯ মিনিটে করলেন ইতালীয় স্টপার। পির্লোর কর্নারে নিখুঁত হেডে, ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে এনেছিলেন ম্যাতারাজ্জি। এরপর জিদান-অঁরি-মালুদাদের বহু প্রয়াস কাতেনাচিও রক্ষণের জাঁতকলে আটকে গেল। ম্যাচ গড়ালো অতিরিক্ত সময়ে।

জিদানের মতো বলপ্লেয়াররা মূলত ফ্রি খেলতে ভালবাসেন। ঘাড়ের কাছে একজন মার্কার সবসময়ে লেগে থাকলে, তাঁরা হন বেজায় বিরক্ত। তাই ম্যা্তারাজ্জির মার্কিং এড়াতে বারবার মাঝমাঠে নেমে আসছিলেন জিজু। ম্যাচ এক্সট্রা টাইমে যাওয়ায়, গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন জিজু। বক্সের মধ্যেে ঢুকে তার একটি পুশ অল্পের জন্য দ্বিতীয় পোস্টের বাইরে যায়। তাঁর একটি হেড অনবদ্যে দক্ষতায় শরীর ছুঁড়ে সেভ করেন বুঁফ।

ম্যাচ তখন অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়অর্ধে, জিদান বারবার বক্সে হানা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাকি আর মাত্র দশ মিনিট। একটা মুভ ব্যর্থ হওয়ার পর, জিদান ইতালি-বক্স থেকে সেন্টার সার্কেলের দিকে ফিরছেন। যথারীতি পেছন-পেছন আসতে দেখা গেল ম্যা্তারাজ্জিকে। দু’জনের মধ্যেে চলছিল বাক্যবিনিময়, যা হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠল!
‘তুমি শার্ট চাও তো প্লিজ একটু অপেক্ষা কর। ম্যাচের পর দিয়ে দেব। এখন ওটা ছাড়। তোমার সঙ্গেই বদলাবো ম্যাচের পর।’
‘জার্সি নয়, তোমার বোনকে চাই! ও তো যৌনকর্মী, তাই না…?’
পরে বিভিন্ন সক্ষাৎকারে জিদান ও ম্যাতারাজ্জি, দুজনের বক্তব্য থেকে উপরের এই কথোপকথনটা উদ্ধার করা যায়।

মুহূর্তের মধ্যের ম্যাতারাজ্জিকে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে দেখা গেল। ছুটে এলেন ইতালি ও ফ্রান্সের কয়েকজন প্লেয়ার। ছুটে এলেন রেফারিও। কিন্তু ঘটনাটা সম্পূর্ণ রেফারির চোখের আড়ালে ঘটেছিল। মাঠের মধ্যের একমাত্র প্রত্যিক্ষদর্শী গোলকিপার বুঁফ এসে তাকে কিছু বললেন। তাই রেফারি এলিজোন্দো চতুর্থ রেফারি স্পেনের লুইস মেদিনা কান্তালেজোর স্মরণাপন্ন হলেন। কান্তালেজোর পরামর্শ নিয়ে এসে জিজুকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে দিলেন এলিজোন্দো, ইতালির স্টপারের পাঁজরে মাথা দিয়ে আঘাত করার জন্য।

লাল কার্ড দেখার পর মাঠ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন জিদান

ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা জিদানের জন্য প্ররোচনার ফাঁদ পেতেছিল ইতালি। মুহূর্তের ভুলে সেই ফাঁদে মাথা দিয়ে ফেললেন বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার। যিনি কটূক্তি করেছিলেন বা অপমানকারী, তাঁকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা গেল, আর যিনি অপমানিত হলেন, তাঁকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হল! যে-দর্শকরা জিদানকে উঠে দাঁড়িয়ে সম্ভাষণ জানানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তাঁরাই মাঠ ছাড়ার সময়ে তাঁকে কটাক্ষ করলেন! লে ব্লুজরা সেরা প্লেয়ারকে হারিয়ে দশজন হয়ে যাওয়ায়, ইতালির পক্ষে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া সহজ হয়ে গেল! এবং টাইব্রেকার পর্যন্ত ম্যাচের বাকি সময়টা তাঁকে কাটাতে হল ড্রেসিংরুমে। একাকী, নিঃসঙ্গ অবস্থায়। ডেভিড ত্রেজেগুয়ে সেই টাইব্রেকারের একমাত্র ব্যতিক্রমী শুটার, যিনি মিস করলেন। বল বারে লেগে উড়ে গেল। ফাবিও গ্রসো পঞ্চম শটে বল জালে জড়িয়ে দিতেই উৎসব! আজ্জুরিদের জার্সিতে চতুর্থ তারাটি বসে গেল। ইতালি চারবার বিশ্বকাপ জেতায়, ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার সমবিন্দুতে চলে এল। দুটো মহাদেশেই সোনার পরী পেয়েছে ন’বার করে।

এই ত্রেজেগুয়ের গোল্ডেন গোলেই ২০০০ সালের ইউরো ফাইনালে ইতালির মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছিলেন জিদানরা। ম্যাচে ইতালি দীর্ঘক্ষণ এক গোলে এগিয়ে থাকার পর, ইঞ্জুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে সমতা ফিরিয়েছিলেন পরিবর্ত ফরোয়ার্ড উইলটোর্ড। ইতালীয়রা মনে করত, ওই ট্রফি তাদের প্রাপ্য ছিল, যা ফ্রান্স ছিনিয়ে নেয়। বার্লিনের ফাইনালে সেই হারের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ছিলেন ক্যানাভারোরা।

পিউমার কাছে হারল আ্যাডিডাস, স্পন্সরদের খেলায়। পর্তুগালকে হারিয়ে তৃতীয় হল জার্মানি, যাদের স্পন্সর নাইকি। ফুটবল-বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ তখন অনেকাংশেই এই কয়েকটা বহুজাতিক ক্রীড়া-পোশাক ও সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক সংস্থার হাতে। এই বিশ্বকাপের খেলা দেখে বারবার মনে হয়েছিল, আট-ন’জন ডিফেন্ডারের চক্রব্যুবহে হারিয়ে, হন্যে হয়ে গোলের পথ খুঁজছেন একজন মাত্র স্ট্রাইকার! আর্জেন্টিনার কার্টুনিস্ট রবার্তো ফোন্তানারোসা এই স্ট্র‍্যাটেজি নির্ভর খেলা দেখে কটাক্ষ করে লিখেছিলেন, আধুনিক ফুটবলে স্ট্রাইকাররা পান্ডাদের মতোই বিপন্ন এক প্রজাতি।

আর্জেন্টিনার হোরেশিও এলজোন্দোই একমাত্র রেফারি, যাঁকে কোনও বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ ও ফাইনাল— দুটোতেই বাঁশিওয়ালার ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ফাইনালের বিতর্ক মাঠেই শেষ হল না। বার্লিনে মাঠে নামার আগেই, অষ্টাদশ বিশ্বকাপের সেরা ফুটবলার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে সোনার বল জেতা হয়ে গিয়েছিল জিদানের। সাংবাদিকদের ভোটে সবার আগে ছিলেন জিজু (২০১২ পয়েন্ট), ইতালির ক্যাপ্টেন ফাবিও ক্যাজনাভারোকে পেছনে ফেলে (১৯৭৭), তৃতীয় স্থানে ছিলেন ইতালির আন্দ্রেয়া পির্লো। ফাইনালের পর ‘ফিফা’ সভাপতি শেপ ব্লাটার বললেন, মাঠের ঘটনার মূল্যায়ন করে শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি যদি সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে পুরস্কার কেড়ে নেওয়া হতে পারে জিদানের! নিজের সতেরো বছরের ফুটবল জীবনে, ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মোট দশবার লালকার্ড দেখেছিলেন ফরাসি সুপারস্টার।

কোচ দমেনেকের সঙ্গে জিজু

‘আমাকে শাস্তি পেতে হয়েছিল, কিন্তু যে-প্ররোচনাকারী, তাঁর কিছুই হয়নি! এটা ঠিক নয়। ঘটনার জন্য আমার কোনও অনুশোচনা নেই, কারণ আমি যদি অনুতপ্ত হই, তাহলে ও যা বলেছিল, তা মান্যতা পেয়ে যাবে।’ বার্লিনের ঘটনা সম্পর্কে পরে অকপট জিজু। কিন্তু ওই ফাইনালের পর অঁরি-আবিদালরাে ড্রেসিংরুমে ফেরার পরে সতীর্থদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন জিদান। যা দেখে ফ্রান্সের বহু তারকাই অবাক হয়েছিলেন। বার্থে-ত্রেজেগুয়েদের মতে জিদান ক্ষমা চাওয়ার মতো কোনও আচরণ করেননি। বিশ্বকাপে এটি তাঁর দ্বিতীয় লালকার্ড, প্রথমটি ১৯৯৮ বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বের সৌদি আরব ম্যাচে। যদিও ঘরের মাঠে সে-বার শেষপর্যন্ত ফ্রান্সকে বিশ্বচ্যাপম্পিয়ন করেছিলেন জিজু, ফাইনালে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করে। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, নিশ্চিত বিশ্বকাপ হারানোর দুঃখের মধ্যে শেষ হল, ৩৪ বছর বয়সি এক কিংবদন্তি ফুটবলারের কেরিয়ার।

বিতর্ক আরও দানা বাঁধল, ম্যাতারাজ্জি ঠিক কী বলে জিদানকে উস্কেছিলেন, তা নিয়ে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’, ‘দ্য ডেইলি মিরর’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কয়েকটি রিপোর্ট প্রকাশ করায়। এক ফরেন্সিক লিপ রিডারকে দিয়ে ঘটনার সময়ে ম্যাতারাজ্জির ঠোঁটের নড়াচড়া বিশ্লেষণ করিয়ে সেই রিপোর্ট দাবি করল, ‘তোমার সন্ত্রাসী মা’ শব্দবন্ধটি জিদানের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিলেন ইতালীয় ডিফেন্ডার। ম্যাতারাজ্জিও ছাড়বার পাত্র নন, লন্ডন উচ্চ আদালতে ট্যাবলয়েডগুলোর বিরুদ্ধে ঠুকে দিলেন মোটা টাকার মানহানির মামলা। এবং ‘ডেইলি মিরর’ ও ‘ডেইলি স্টার’-এর বিরুদ্ধে মামলা জিতলেন। এরপর, ‘দ্য সান পত্রিকার’ মালিক রুপার্ট মাডরক তাঁর সঙ্গে মোটা টাকার বিনিময়ে আদালতের বাইরে মিটমাট করে নেন। তাঁর আইনজীবী স্টিভ হেফার সূত্রে জানা যায়, এই টাকার অঙ্ক ছিল এক লক্ষ পঁচিশ হাজার পাউন্ড! এর থেকে এই উপসংহার টানা যায় যে, ম্যাতারাজ্জি এই বর্ণবৈষম্যমূলক মন্তব্য করেননি। অবশ্য স্বয়ং জিদানও এই বিশেষ শব্দবন্ধ ব্যবহারের অভিযোগ কখনও করেননি ইতালীয় ডিফেন্ডারের বিরুদ্ধে। তবে তাঁকে উত্তেজিত করতে, তাঁর বোন লিলাকে টেনে যে কটূক্তি করেছিলেন ম্যাতারাজ্জি, এই কথা ফরাসি পত্রিকা লেকিপকে দেওয়া একটা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন জিজু। অন্যত্র তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, সেদিন মাঠে তাঁর মাকে নিয়েও কটূক্তি করা হয়েছিল।

বিতর্ক আরও দানা বাঁধল, ম্যাতারাজ্জি ঠিক কী বলে জিদানকে উস্কেছিলেন, তা নিয়ে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ‘দ্য সান’, ‘দ্য ডেইলি মিরর’, ‘দ্য ডেইলি স্টার’ কয়েকটি রিপোর্ট প্রকাশ করায়। এক ফরেন্সিক লিপ রিডারকে দিয়ে ঘটনার সময়ে ম্যাতারাজ্জির ঠোঁটের নড়াচড়া বিশ্লেষণ করিয়ে সেই রিপোর্ট দাবি করল, ‘তোমার সন্ত্রাসী মা’ শব্দবন্ধটি জিদানের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছিলেন ইতালীয় ডিফেন্ডার। ম্যাতারাজ্জিও ছাড়বার পাত্র নন, লন্ডন উচ্চ আদালতে ট্যাবলয়েডগুলোর বিরুদ্ধে ঠুকে দিলেন মোটা টাকার মানহানির মামলা

‘আমি টিনএজে নিজের মাকে হারাই। তাই কারুর মাকে নিয়ে বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তখনও আমি এটা জানতামই না যে, ওর বোন আছে; এটা ঠিক যে আমি ওর জামা ধরে টানছিলাম, যা নিয়ে ও আমাকে প্রথমে কড়া কথা শোনায়’, এরপর ম্যাাতারাজ্জির স্বীকারোক্তি, ‘কিন্তু বোধবুদ্ধি হারিয়ে আমি ওঁর বোনকে নিয়ে মন্তব্য করে ফেলি। বলেছিলাম, ‘জামা নয়, তোমার যৌন কর্মী বোনকে নেব!’ মিলান, রোম, তুরিন, নেপলসের মাঠের বাইরে এর থেকে অনেক বেশি অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ হয়। তাই আমি এটা আশা করিনি যে, ও এভাবে রিঅ্যাক্ট করবে। তা যদি করতাম, তাহলে আমিও প্রস্তুত থাকতাম প্রতিরোধের জন্য। ভাগ্যিস ছিলাম না, নাহলে ওর সঙ্গে আমাকেও লাল কার্ড দেখতে হত!’ ম্যাতারাজ্জির এই স্বীকারোক্তি জিদানের যুক্তিকেই আরও জোরালো করে। তবে আন্তর্জাতিক বা ক্লাব ফুটবলে এরকম কটূক্তি করে প্ররোচিত করার কৌশল নতুন কিছু নয়, অভিজ্ঞ পেশাদার জিদানের তা না জানারও কথা নয়। তাই বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো ম্যাচে, তার থেকে আরও বেশি সতর্কতা আশা করতেই পারতেন ফুটবলপ্রেমীরা। তাই হয়তো ফ্রান্স হারার পর সতীর্থ, সমর্থক ও দর্শকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন জিজু। জিদান-ম্যাতারাজ্জি, আর্জেন্টিনার রেফারি ও স্পেনের চতুর্থ রেফারিকে ‘ফিফা’র শৃঙ্খলারক্ষা কমিটির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। চারজনের বক্তব্য শোনার পর ‘ফিফা’ জিদানকে তিন ম্যাচের জন্য ও ম্যাতারাজ্জিকে দু’ম্যাচের জন্যে নিলম্বিত করে। এ-ছাড়া দু’জনকে জরিমানাও করা হয়। জিজু যেহেতু আগেই অবসর ঘোষণা করে ফেলেছিলেন, তাই তাকে ‘ফিফা’য় তিনটি কর্ম দিবসে যোগ দিতে হয়েছিল। সোনার বল কেড়ে নেওয়াও সম্ভব হয়নি যোগ্যতম প্রাপকের হাত থেকে।

‘আমি নিজের সন্তানদের, অন্যকে শ্রদ্ধা দেখিয়ে শ্রদ্ধা আদায় করার শিক্ষা দিই। এমন কিছু আমাকে বলা হয়েছিল, যা শোনার থেকে মুখে একটা ঘুঁষি খাওয়াও সম্মানের। আমার মা তখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভরতি ছিলেন। একজন মানুষ হিসেবে আমি রিঅ্যাক্ট করে ফেলি। আমার টিমমেট, সমর্থক ও ফাইনালের দু’বিলিয়ন দর্শকের কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করি এই আচরণের জন্যে, কিন্তু মরে গেলেও ম্যাতারাজ্জির কাছে দুঃখপ্রকাশ করতে পারব না।’ পরে ঘটনা সম্পর্কে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন জিদান। এই ঘটনার কুড়ি বছর পর তার পুত্র লুকা জিদানকে ২৬ বিশ্বকাপে দেখা গেল আলজিরিয়ার প্রথম গোলরক্ষকের ভূমিকায়।

এত বিতর্কের পর, ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে গ্রুপের গণ্ডি পেরতে ব্যর্থ হল ইতালি ও ফ্রান্স। কিলিয়ান এমবাপেদের মতো নতুন প্রজন্মের ফুটবলারদের নিয়ে ফ্রান্স ২০১৮-তে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেও, বার্লিনের ওই ফাইনাল জয়ের পর বিশ্বকাপের মানচিত্র থেকে প্রায় হারিয়ে গেল ইতালি। পরপর দু’বার তারা গ্রুপের গণ্ডি টপকাতে ব্যর্থ হল, তারপরের তিনটে বিশ্বকাপের মূল পর্বে দেখাই গেল না আজ্জুরিদের। একমাত্র সাফল্য, ২০২১-এ লন্ডনের ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ইউরো কাপ জয়।

বার্লিনের ফাইনালে তাঁর ঢুসো মারা ঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে আজও বিতর্ক শেষ হয় নি। ২০০৬-এর বিশ্বকাপে যে-অবিসংবাদিত নায়কের আসন অপেক্ষা করেছিল তার জন্যও, মুহূর্তের অসংযমী প্রতিক্রিয়ায় তা হারিয়ে ট্র্যাজিক নায়কে রূপান্তরিত হয়েছিলেন জিজু।