করতল স্পর্শে…
‘পরিবর্তন’ পত্রিকায় চম্বল নিয়ে আমার লেখাগুলি বেরোনোর মাস কয়েক পরের এক ঘটনা। সংবাদপত্রে ছোট্ট একটা খবর বের হয়— ব্যান্ডেলের কাছে চন্দ্রহাটি এলাকায়, একটি কারাখানা সংলগ্ন ঝোপঝাড়ের ভেতরে এক সাধুর ক্ষতবিক্ষত দেহ পাওয়া গেছে। ওই সাধু খুন হয়েছেন না কি, দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন— পুলিশ তদন্ত করছে। কুলকিনারা এখনও করতে পারেনি। এই ধরনের খবর দেখলেই, আমরা সে-খবরটির অন্তর্তদন্ত শুরু করে দিতাম। তারপর বিস্তারিতভাবে লিখতাম।
আমি ব্যান্ডেল হয়ে চন্দ্রহাটি চলে যাই। চন্দ্রহাটিতে একটি পুলিশ ফাঁড়ি ছিল। পুলিশের সঙ্গে কথা বলি। মগরা থানায় যাই। কারখানাটির শ্রমিকেরা মুখ খুলতে চাইছিলেন না। দু’চারদিন ঘোরাঘুরির পর অনেক জিজ্ঞাসাবাদে বুঝতে পারি শ্রমিকদের অনেকেই নতমস্তকে অনুশোচনারত। তাঁদের কিছু-কিছু কথায়, গোটা ঘটনাটি আমার চোখে ফুটে ওঠে। ওই সন্ন্যাসী মাসাধিককাল আগে চন্দ্রহাটিতে আসেন। গাছতলায় ছাউনি বেঁধে থাকছিলেন। শ্রমিক-বসতিতে রোগবালাই হলে, ওষুধবিষুধ দিতেন। শিশুদের সঙ্গে খেলতেন।
হঠাৎই একদিন একটি শিশু নিখোঁজ হতে, ছেলেধরার গুজব রটে। পরদিন আরেকটি শিশু উধাও। শ্রমিক বস্তির দলে-দলে পুরুষ নারী, ছেলেধরা সন্দেহে ওই সন্ন্যাসীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। সন্ন্যাসী নিহত হওয়ার দিন দুয়েক পর নিখোঁজ বালক দুটি একত্রে শ্রমিক মহল্লায় ফিরে আসে। শ্রমিক বসতিতে তখনই নেমে আসে, অনুশোচনার মেঘলা ছায়া।
আমার মরিচঝাঁপির প্রতিবেদন নিয়ে আলোচনা হয়েছিল রাইটার্সেও!
পড়ুন: সংবাদ মূলত কাব্য পর্ব ৩৬…
ইতিমধ্যে ঘটে যায় আরেকটি ঘটনা। চন্দ্রহাটির নিহত সন্ন্যাসী ছিলেন দশনামী সম্প্রদায়ের । প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দীক্ষা নিয়েছিলেন দশনামী সম্প্রদায়ের এক সাধুর কাছে। পশ্চিমবঙ্গে তখন জ্যোতি বসুর সরকার। এ-সবের ঘনঘটায় চন্দ্রহাটির সন্ন্যাসী হত্যার বিষয়টি, এ-রাজ্যে ধামাচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। সংবাদপত্রগুলিতে চন্দ্রহাটির সন্ন্যাসী হত্যার কোনও ফলোআপ বের হয়নি। আমার লেখাটি প্রেসে পাঠিয়ে তা ফেরৎ আনায়, আমি ক্ষুব্ধ হই। তখন আমার অল্প বয়স। গোলযোগ করি। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে— কোনও কাজ না দিয়ে, বসিয়ে রাখা হয় মাস কয়েক।
কী আর করি! একটি কালো ডায়েরিতে অফিসে এসেও আমি কবিতা লিখতে থাকি। কোনও কোনও দিন ৫/৬ টি কবিতাও লিখেছি। শ্রীরামপুর থেকে ট্রেনে হাওড়া আসতে-আসতে মাথায় কবিতার লাইন এসে যেত, হাওড়া থেকে ওয়েলিংটন বাসে আসতে-আসতে কবিতার লাইন এসে যেত… বাইরের জগৎ তখন বদলাতে শুরু করে দিয়েছিল, জনসমাজের লাল টুকটুকে স্বপ্নটি যেন মিলিয়ে যেতে শুরু করে দিয়েছিল; পরিস্থিতির কাছে মানুষ যেন ধীরে-ধীরে আত্মসমর্পণকে মেনে নিচ্ছিল— মনে হয়েছিল আমার।
কবিতা নিয়ে বিস্তর ভেবেছিলাম আমি। ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ বইটি লেখার পর থেকেই ভাবছিলাম (এখনও ভাবি), ওই বইটি পড়ে, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত আমাকে যে-চিঠিটি দিয়েছিলেন, সেটিও আমার ভেতর খুব কাজ করে। আমি ভাষাসংযমের কথা ভাবতে থাকি। বিষয় থেকে ছিটকে যাওয়ার কথা ভাবতে থাকি। ভাবি, কাহিনি থেকে, নাটকীয়তা থেকে যোজন-যোজন দূরে থাকবে কবিতা। যাই হোক! কালো ডায়েরির কবিতাগুলি থেকেই পরে বের হয় আমার ‘এভাবে কাঁদে না’ বইটি, আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ।

ওয়েলিংটনে হিন্দ সিনেমা হলের পিছন দিকে ছিল, ওদিককার চাকুরিজীবীদের টিফিন খাওয়ার মস্ত একটি দোকান। তখন কাছেই কাজ করতেন কবি অরুণ বসু, লেখক সুব্রত সেনগুপ্ত। দুপুরে ওঁদের সঙ্গে দেখা হত। নবদ্বীপ থেকে অরুণ বসু বের করতেন ‘অজ্ঞাতবাস’ পত্রিকাটি। কালো ডায়েরি থেকে একগুচ্ছ কবিতা অজ্ঞাতবাসে বের করে ছিলেন অরুণদা। ‘তোমাকে বনের মধ্যে ছুটে যাওয়া পথ মনে হয়।’ কালীদা, কালীকৃষ্ণ গুহ তখন মৃণাল দত্তের সঙ্গে যৌথভাবে ‘শতভিষা’ পত্রিকাটি প্রকাশ করছেন, কালো ডায়েরির ৬টি কবিতা বের হল শতভিষায়। ‘একাকিনী নও বলে মনে হল, পিছনে আলোর মূর্তি কালো হয়ে আসে চিরকাল।’ কালীদা তখন ছিলেন দমকলের অধিকর্তা, এস এন ব্যানার্জি রোডে, কলকাতা পুরসভার কাছেই দমকলের সদর দপ্তর। বিলেত থেকে এসে তখন উৎপলদা, উৎপলকুমার বসু চিত্রবাণীতে কর্মরত। ওয়েলিংটনের কাছেই চিত্রবাণীর অফিস। জ্যোতির্ময় দত্ত, তাঁর ‘কলকাতা’ পত্রিকাটির কবিতা দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন উৎপলদাকে। চিঠি দিয়ে আমার কাছে কবিতা চাইলেন উৎপলদা। যখন ছাপা হল, দেখা গেল একটি শব্দ পরিবর্তন করেছেন ( বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকা সম্পাদনার কথা তাঁর মনে পড়েছিল হয়তো)। উৎপলদার এই সম্পাদনায় খুব রাগ হল আমার। কটূবাক্য লিখে একটা পোস্টকার্ড ক্ষেপণাস্ত্রের মত ছুঁড়েছিলাম, মনে পড়ল।
পরিবর্তনে আমার ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে— এমন খবর কী করে যেন, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কানে গিয়েছিল। এক দুপুরে টলিমলি পায়ে শক্তিদা আমাদের অফিসে দুদ্দাড়ভাবে ঢুকে হই-হই বাঁধিয়ে দিলেন। সম্পাদক অশোক চৌধুরী, সংযুক্ত সম্পাদক ধীরেন দেবনাথকে তুইতোকারি করে হুঙ্কার দিলেন তিনি। তারপর কয়েকটি কাপ ডিশ ভেঙে ওই রকমই দুদ্দাড় গতিতে শক্তিদা সেন্ট্রাল এভিনিউয়ে চলে গেলেন। শক্তিদার এই ক্ষুব্ধ আগমন ও আমাদের অফিস পরিক্রমায় আমার অস্বস্তি জাগলেও আমার কোনও ক্ষতি হয়নি। তবে দমবন্ধ লাগছিল আমার। কালো ডায়েরিতে কবিতা লেখার প্রচেষ্টা সশে।সে-সময়ে শ্বাস নেওয়ার মত-মনে হয়েছিল।
কবিতা নিয়ে বিস্তর ভেবেছিলাম আমি। ‘জলপাই কাঠের এসরাজ’ বইটি লেখার পর থেকেই ভাবছিলাম (এখনও ভাবি), ওই বইটি পড়ে, প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত আমাকে যে-চিঠিটি দিয়েছিলেন, সেটিও আমার ভেতর খুব কাজ করে। আমি ভাষাসংযমের কথা ভাবতে থাকি। বিষয় থেকে ছিটকে যাওয়ার কথা ভাবতে থাকি। ভাবি, কাহিনি থেকে, নাটকীয়তা থেকে যোজন-যোজন দূরে থাকবে কবিতা।
ওই সময় সম্পাদক অশোক চৌধুরীর সঙ্গে কী এক মতভেদে সংযুক্ত সম্পাদক ধীরেন দেবনাথ পরিবর্তন ছেড়ে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’য় চলে গেলেন; আনন্দবাজার থেকেই ধীরেনদা পরিবর্তনে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ‘আনন্দবাজার’-এ গেল অজয় বিশ্বাস। পরিবর্তনে সংযুক্ত সম্পাদক হয়ে এলেন আনন্দবাজার পত্রিকার সাংবাদিক, পার্থ চট্টোপাধ্যায়। পরিবর্তনে রিপোর্টার ছিল পিনাকী মজুমদার। পুলিশের খবর করত, আমার খুব বন্ধু, সেও সে-সময়ে পরিবর্তন ছেড়ে চলে যায়। ডামাডোলের মতো পরিস্থিততে, ওই সময়ে আমিও পরিবর্তন ছেড়ে দিই। কালো ডায়েরির লেখাও শেষ হয়ে গিয়েছিল।হয়ে পড়লাম কাঠ বেকার। এদিক-সেদিক টুকটাক ফ্রিল্যান্স করতাম। আর ঘুরতাম, এ-জেলা সে-জেলা।
পিনাকী এক ব্যবসায়ীকে ধরে, ‘আজকের ব্যতিকর্মী’ নামে ‘পরিবর্তন’-এর ধাঁচে একটা মাসিক নিউজ ম্যাগাজিন বের করেছিল। দুটি সংখ্যায় প্রচ্ছদ কাহিনি লিখেছিলাম। একটি আজিজুল হক-নিশীথ ভট্টাচার্যদের দ্বিতীয় কেন্দ্রীয় কমিটি সম্পর্কে, সবে ওঁরা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছেন যখন। আরেকটি কী নিয়ে, মনে নেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘দেশ’ পত্রিকায় বুক রিভিউয়ের কাজ করিয়েছিলেন। এভাবেই টুকটাক উপার্জন করছিলাম আমি; আর ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম কৃষ্ণনগর, রানাঘাট, মেদিনীপুর, ক্যানিং, সোনারপুর, বহরমপুর-দহরমপুর…

অমিতকুমার ঘোষ, আমাদের শ্রীরামপুরের ঘোষ স্টুডিওর ছেলে, খুব ভাল ছবি তোলে। ছয়ের দশকের মাঝামাঝি, ওদের ওই ঘোষপরিরারটি তখনকার বার্মা (মায়ানমার) থেকে শ্রীরামপুরে আসে। অমিত শ্রীরামপুর কলেজ দেখতে ইউরোপ থেকে আসা সাহেব মেমদের ছবি তুলত। ওইরকম একটি সাহেবদের দল অমিতকে রোমে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে দু’বছর ফটোগ্রাফির পাঠ নিয়ে, অমিত তুখোর আলোকচিত্রী হয়ে শ্রীরামপুরে ফিরেছিল। পরিবর্তনের কাজকর্মে আমি মাঝেমধ্যেই অমিতকে সঙ্গে নিয়েছি। সেই অমিত একদিন সাত সকালে বাড়িতে হাজির, ‘মৃদুলদা, ১২টার সময় ইন্দিরা গান্ধী ডানকুনিতে আসছেন। কোল কমপ্লেক্স উদ্বোধন করবেন। আমার ইন্দিরা গান্ধীর ছবি চাই। চলো প্লিজ চলো।’ অমিত সাইকেলে এসেছিল। আড্ডা দিতে আসা শ্যামলেন্দুর সাইকেলটি নিয়ে আমি অমিত দু’টি সাইকেলে সাঁই-সাঁই ডানকুনি রওনা হলাম। তখন সকাল ১০টা, ১৯৮১ সালের শীতকাল। ১৯৮০ সালের লোকসভা নির্বাচনে জিতে ইন্দিরা গান্ধী আবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। পঞ্জাবে তখনও খালিস্তানি উপদ্রব শুরু হয়নি বলে নিরাপত্তার এত আঁটোসাঁটো ব্যাপার ছিল না।
তবু আটকে দিলেন এক পুলিশ অফিসার। গাড়ি রাখার জায়গায় সাইকেল দু’টি রেখে, মঞ্চের সামনে এগিয়ে, প্রেস লেখা চেয়ারগুলির দিকে যাচ্ছি, ওই পুলিশ অফিসার সবিস্ময়ে শুধোলেন, সাইকেলে প্রেস! গোটা-গোটা লাল হরফে প্রেস লেখা পরিবর্তনের পরিচিতিপত্রটি পকেটে ছিল। সেটি দেখিয়ে বললাম, লোকাল। ‘আনন্দবাজার’-র নিশীথদা(দে), ‘যুগান্তর’-র মিহিরদা(গঙ্গোপাধ্যায়) প্রেস-এর ঘেরা এলাকায় বসে, যথাক্রমে রিষড়া ও কোন্নগরে থাকতেন। চিনতাম। দু’জনেই ডাকলেন, আরে এসো, এসো। স্যরি বলে সরে গেলেন পুলিশ অফিসারটি। আমি আর অমিত প্রেসের ঘেরায় ঢুকে পড়ে মিহিরদা, নিশীথদার পাশে বসলাম।
কপ্টার থেকে নেমে, গটগটিয়ে মঞ্চের দিকে যাওয়ার সময়ে, প্রেস লেখা অঞ্চলটিতে চকিতে ধীরগতিতে হেঁটে হাত নাড়লেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তারপরেই আমার দিকে করমর্দনের হাত বাড়িয়ে বললেন, হ্যাল্লো, ইয়ং রিপোর্টার। প্রিয়দর্শিনীর করতল স্পর্শ করে মৃদু কাঁপন-সহ বললাম, ওয়েলকাম, পিএম ম্যাম।



