
উল্টো দূরবিন: পর্ব ১৪
‘যে-অঙ্কগুলি আমি পারি না, ভাল ছেলেদের কাছে সে-সব জলভাত। জ্যামিতির যে-এক্সট্রা গুলো স্যর করাচ্ছেন, সে-সব আমার আয়ত্তের বাইরে। আমি লজ্জা পেতে লাগলাম। আমি ব্যাকবেঞ্চার হতে-হতে, লাস্টবেঞ্চার হয়ে গেলাম।’

‘যে-অঙ্কগুলি আমি পারি না, ভাল ছেলেদের কাছে সে-সব জলভাত। জ্যামিতির যে-এক্সট্রা গুলো স্যর করাচ্ছেন, সে-সব আমার আয়ত্তের বাইরে। আমি লজ্জা পেতে লাগলাম। আমি ব্যাকবেঞ্চার হতে-হতে, লাস্টবেঞ্চার হয়ে গেলাম।’

আমাদের বাংলা নতুন বছরের নড়াচড়া শুনি আগে থেকেই, যখন দেখি মোটা শিব, পটকা শিব, ভোটকা শিব, খেঁচা শিবরা সেজেগুজে বেরিয়ে পড়েছে। সবাই যাবে নকুলেশ্বর তলায়। বাবার কাছে গাজন হবে। কালীঘাটে সারা বছর কালীর চেলাদের বড় বাড়ন্ত। এই ক’টাদিন গেঁজুড়ে নন্দী-ভৃঙ্গিরা দখল করে।

‘মাল্টিপ্লেক্স এল, সিঙ্গেল থিয়েটার আস্তে-আস্তে কমতে আরম্ভ করল। মাল্টিপ্লেক্স-সংস্কৃতি আমেরিকা-তেই প্রথম শুরু হয়েছিল, কারণ ওরা দেখল লোকজন সিনেমাহল-বিমুখ হয়ে পড়ছে ক্রমাগত। রেস্টুরেন্ট-জামাকাপড়— এসবের মধ্যে সিনেমাহল নিয়ে এলে নাকি, লোকের দেখার সম্ভবনা বেড়ে যায়।’

‘বড়পিসেমশাই ঘরের ছাগলদের নিয়ে যেতেন হিসি করাতে। বাচ্চাদের হিসি করানোর সময়ে মায়েরা যেমন জিভে শিস্ধ্বনির মতো এক ধরনের আওয়াজ করে, যে-আওয়াজটা অক্ষর সাজিয়ে বলা যাবে না, তেমন আওয়াজই করতেন এবং আশ্চর্য— ছাগলেরা হিসিও করত।’

“কালীঘাট বাজারের সামনের রাস্তার ওপর হত গড়মিল সংঘের পুজো। আমাদের নিজেদের মধ্যে তেমন গড়মিল ছিল না। সংঘের নাম হয়েছিল ‘গড়মিল’ সিনেমা থেকে। পরে সেই পুজো ফরওয়ার্ড ক্লাবের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন সেখানে ছিল কালীঘাট ফাঁড়ি। এখন সেটাই থানা। বেশ বড় কালীপুজো।”

ঝলমলে শহরে, কোনও এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। দেখা হয়ে যায় তারুণ্যের সঙ্গে। সেই দেখাটুকু যে কোনওদিন চিরতরে অতীত হয়ে যাবে, সে-কথা স্বপ্নেও কল্পনা করা যায় না। দূরপাল্লা নামটুকুতে দূরের হাতছানি থাকলেও, কিছু বন্ধু-আবেশে তা বড় কাছের ভ্রমণ হয়ে থাকে। রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের সেই বন্ধু…

আমার এক বন্ধুর বাড়ি ছিল গঙ্গার ঘাট-লাগোয়া পাড়ায়। একতলা বাড়ি। ওদের চৌকির পায়া ছিল লম্বা লম্বা। বছরে বেশ কয়েকবার ভরা কোটালের জলের থেকে বাঁচতে ওদের ঘরসংসার উঠত চৌকির ওপর।

‘ওঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে, আমি খুব তোতলাতাম। হ্যাঁ, বলা হয়নি, আমি খুব ছোটবেলায় তোতলা ছিলাম। এতে আমার একটা সুবিধা ছিল, স্কুলে স্যারেরা পড়া ধরতেন না। কলেজে ঢুকে একটু এসএফআই করতাম, বক্তৃতাও দিতাম, তখনই তোতলামিটা চলে যায়।’

‘বয়স যত বেড়েছে, উত্তর ভারতের দিল্লি, পঞ্জাব কিংবা চণ্ডীগড়ের ছোট গলি পুরনো বাড়ির দালান, ভিড় বাস কিংবা গুরদোয়ারার ভিড়কে কেন্দ্রে রেখে মিলিয়ে নিতে চেয়েছি তিন বোনের তিনটি উচ্চতার তিনরকম গড়নের মিলে যাওয়া কোনও অস্তিত্ব।’

‘একবার রেঙ্গুন থেকে দু’জন এল, ওদের কলকাতা দেখাতে নিয়ে যাওয়া হবে। কেন কে জানে, আমাকেও নিয়ে গেলেন। তখনও পিসেমশাইয়ের গাড়ি ছিল না। কোনওভাবে একটা গাড়ি জোগাড় করেছিলেন, কিম্বা ভাড়া নিয়েছিলেন।’

বিকেলের দিকে কালীঘাট রোডের ওপর বরফের গাড়ি ঘুরত। সেখানে বরফ থাকত লাল শালুতে মোড়া। সামনে কাঠ ঘষার রেঁদা। সেখানে বরফ ঘষলে ঝুরো ঝুরো হত, সেগুলো ছোট একটা গ্লাসের ভেতর ঢুকিয়ে লাল-সবুজ মিষ্টি সিরাপ দিয়ে একটা কাঠি গুঁজে দিত। খেতাম মাঝেসাঝে। কালীঘাট রোডের ওপর রকমারি খাবার জিনিস ঘুরত, যেমন সব তীর্থক্ষেত্রে ঘোরে।

‘কালীঘাটে অনেক কালী! কালীময়! কালীচরণ পাণ্ডার কথা তো আগেই বলেছি। কালীদির চোলাইয়ের ঠেকও খুব বিখ্যাত। দিবারাত্রি খোলা। ব্লাডারে করে চোলাই আসত। দিন-রাত লোক বসে। সারা কালীঘাটের তাবৎ মাতাল কালীদির খদ্দের। দিবারাত্রি খোলা? শ্মশানযাত্রীরা খুঁজে খুঁজে ঠিক এখানে আসবে। তখন বিলাতি নয়, দেশিই চলত।’
This Website comprises copyrighted materials. You may not copy, distribute, reuse, publish or use the content, images, audio and video or any part of them in any way whatsoever.
©2026 Copyright: Vision3 Global Pvt. Ltd.