তৃতীয় পর্ব: বিপ্লব এসে গেছে
মূল রচনা
বের্টোল্ট ব্রেখট
বঙ্গীকরণ
নীহার ভট্টাচার্য
পরিমার্জনা ও সম্পাদিত নাট্যরূপ
অনির্বাণ ভট্টাচার্য, প্রতীক দত্ত
পড়ুন আগের পর্ব


(দ্বিতীয় পর্বের পর)
[Projection 5 : Labour Collection]
শাকিল: (গান)
লড়াই করনেওয়ালে লড়াই করতে হে শান সে
বাঁচতে হে শান সে, মরতে হে শান সে… হ
হো লড়াইহে গরিবের ঘাম
হয়ে গেছে আজ বদনাম
ক্যাপিটাল যার কাছে লড়াই তো তার সাজে
নয়া যুগে নয়া সংগ্রাম
হো দুনিয়া জুড়ে তামঝাম
ঘেঁটে গেছে, কে ডান কে বাম
বিপ্লব নিলামে নামে কিংবা বেনামে
সেই পাবে যে দেবে দাম। পন্তু লাহাদের ছাতার তলায় এসো ভালবেসে
খুঁটে খাও শান সে, লুটে নাও শান সে…
over to Mr. Laha—
কোরাস: লুটে নাও, খুঁটে নাও, শান সে… (কাঁওতালি) এই এই মিঠুনদা… মিঠুনদা…
অর্পণ: ও মিঠুনদা…
মিঠুন: ওয়ে…
কোরাস: (কাঁওতালি) লুটে নাও, খুঁটে নাও
মতি: প্যাঁ প্যাঁপ্যাঁ প্যাঁপ্যাঁ প্যাঁপ্যাঁপ্যাঁ— (আইপিএল টিউন)
কোরাস: (কাঁওতালি)
পন্তু: আতাতাতাতাতা— (চিৎকার)
অরিন্দম: কী বলছে কিছুই বুঝতে পারছি না!
পন্তু: স্বচ্ছ ভারত— সবুজ সাথী… যাক গে, কমরেডস, লাইন।
উজান: আরে কনসা লাইন রে, কনসা লাইন?
অরিন্দম: জানি না। আমি ২৩টা লাইনে ঘুরে আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছি।
অর্ক: আরে ২৪টা বে, ২৪টা।
অর্পণ: ২৬ নম্বর লাইন বে ২৬ নম্বর…
প্রসেন: এএএএইইই ৩২ লাইনের পার্টি কে আছিস সামনে আয়।
রবীন: আমি তোর ৩২ পাটি ভেঙে দেব শালা—
কোরাস: (কাঁওতালি)
পন্তু: ওওওফফফ, কমরেডজ, বিপ্লবের লাইন।
উজান: আবে কনসা বিপ্লব বে, কনসা বিপ্লব?
অরিন্দম: আমি অনেকগুলো বিপ্লব করে আজ এখানে এসে পৌঁছেছি।
অর্ক: আরে ব্রিগেড স্টাইল বে, ব্রিগেড স্টাইল।
অর্পণ: ধর্মতলা বে, ধর্মতলা…
প্রসেন: এএএএইইই… তোরা এক কাজ কর, সব সোজা হয়ে আমার পিছনে লাইন দে।
রবীন: আরে সোজা হয়েই যদি দাঁড়াব, তোর পিছনে কেন দাঁড়াব রে? একেবারে না—
কোরাস: (কাঁওতালি)
পন্তু: দেখো দেখো, এদের অবস্থা দেখো… দেখো কী করছে দেখো— অনুকূল ঠাকুর দেখো।
কোরাস: (কাঁওতালি)
মতি: (অ্যাকাপেলা শুরু) বুম চাক আ ধুম/ বুম চাক…
পন্তু: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব …
মতি: ওরা কেউ কিছু করছে না, আমি আর করব না।
পন্তু: দুয়োটা কে দেবে?
অরিন্দম: আপনি আর একবার করুন…
কোরাস: মিলিয়ে দেব… মিলিয়ে দেব…
মতি: বুম চাক আ ধুম/ বুম চাক…
পন্তু: জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ…
কোরাস: (কেউ) জয় হিন্দ, (কেউ) বিপ্লব… (কাঁওতালি)
পন্তু : ওওওফফফ্, জয় হিন্দের সময় বিপ্লব না, বিপ্লবের সময় জয় হিন্দ না।
কোরাস: আর-একবার করুন—
পন্তু: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
পন্তু: জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ…
কোরাস: জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ…
পন্তু: এই বিপ্লব তোমার বাবারও নয়, কাকা-মেসো-জ্যাঠারও নয়।
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব …
পন্তু: নেপোয় শুধু মারছে দই, তোমরা শুধু চেবাও খই
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব …
পন্তু: নতুন দিনের নতুন গানে লাগিয়ে দে হইচই—
(সবাই হইচই করতে থাকে, মতি আইপিএল টিউন করে)
এই গানটি এই নাটকের প্রোমোশনের জন্য নির্মিত হয়েছিল
পন্তু: দেখো দেখো দেখো কী করছে দেখো— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেখো।
কোরাস: (কাঁওতালি)
পন্তু: কমরেডজ… বৈপ্লবিক হইচই…
কোরাস: এই চল চল ঠিক করে কর…
মতি: (গঙ্গাকে) তুমিও ধরো— ধুম চাক্ আ ধুম/বুম চাক্—
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
পন্তু: শোন রে, নেওটিয়া গোয়েনকা অম্বানীইইই—
মতি ও গঙ্গা: ট্যানাক ট্যানাক ট্যানাক…
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
পন্তু: যত ব্যবসা বোলচাল শয়তানিইইই—
মতি ও গঙ্গা: ট্যানাক ট্যানাক ট্যানাক
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব…
পন্তু: দাঁড়িয়ে আছে পন্তু লাহা
গরিবের চোখের মণিইইই—
মতি ও গঙ্গা: ট্যানাক ট্যানাক ট্যানাক
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব… বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
পন্তু: পকেট খালি করব শুধু গরিবেরই জন্য—
কোরাস: করবেন করবেন, মাইরি বলছেন? (২)
পন্তু: করব করব, মাইরি বলছি (২)
পকেট খালি করব শুধু গরিবেরই জন্য
অনেক মস্তি করে মালদারগুলো হবে হন্যে।
অত্যাচার—
কোরাস: চলবে না…
পন্তু: শোষণবাজি—
কোরাস: চলবে না…
পন্তু: নির্দয় হুমকি—
কোরাস: চলবে না (মতি ও গঙ্গা সুর করে)

পন্তু: আহ, বিপ্লব বিপ্লব চেঁচিয়ে তোমরা উপড়েছ বেশ কিছু বাল
বিপ্লব এবার আমার জিম্মায় দেখি কত ধানে কত চাল
(শ্রমিকেরা ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে)
পন্তু: চা… চা… চা… এই, আমার চা তেষ্টা পেয়েছে। আমার বাগানের চা নিয়ে আয় সরস্বতী—
গঙ্গা: ভারতী, চা নিয়ে আয়—
পন্তু: আর শোন, ওদের জন্য রান্না চাপা। সেই সকাল থেকে লড়াই শুরু হয়েছে…
অর্ক: ভোরবেলা কত্তা—
পন্তু: হ্যাঁ, সেই ভোরবেলা থেকে লড়াই শুরু হয়েছে। আমার কমরেডদের মুখগুলো একবার দেখ গঙ্গা— পেটে খিদে, চোখে আগুন! …বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
পন্তু: গুড, সরস্বতী— চার তলার ডরমেটরি ওদের জন্য খুলে দাও। ওরা আজ থেকে এখানেই থাকবে। চারতলা হবে আমাদের গেরিলা ছাউনি। দুয়োটা দিতে থাক… (শ্রমিকরা ‘বিপ্লব বিপ্লব’ চালাতে থাকে) ওখানে গড়ে তুলব গোপন অস্ত্রশালা। লিফলেট-টিফলেট সব ডাঁই করা থাকবে ওখানে। চুপ করে ঘাপটি মেরে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করব। অপেক্ষা করব সেই বৈপ্লবিক মাহেন্দ্রক্ষণের। তারপর আমার কাছে একটা টেলিফোন আসবে। শশশ— হ্যালো—
কোরাস: …বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
গঙ্গা: আপনি চান করবেন না?
পন্তু: হ্যাঁ, করব তো। ওরাও করবে।
গঙ্গা: এই যে, শোনো সবাই— গেটের বাঁ-দিক দিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে এগিয়ে যাও, পুকুর আচে।
পন্তু: পুকুর! গোড়াতেই শ্রেণিশত্রুর মতো কথা বললি রে যমুনা… ওরা আমার চাকর নয়, ওরা আমার কমরেডজ। সাম্য, সাম্য। আমি বাথরুমে চান করলে ওরাও করবে।
গঙ্গা: বাথরুমে অত জায়গা হবে না তো—
পন্তু: কে বলেছে হবে না? এই, শোন— আমি জল-শাওয়ারের তলায় দাঁড়াব, জল পড়লে তোদের দিকে এইভাবে ছিটিয়ে দেব, তোরা চান করে নিবি। পারবি না, কমরেডজ?
রবীন: খুব পারব কত্তা। ছিটিয়ে দেওয়া জিনিস গায়ে মাখার টেনিং সেই ছোটবেলা থেকেই।
পন্তু: গুড, সরস্বতী— চার তলার ডরমেটরি ওদের জন্য খুলে দাও। ওরা আজ থেকে এখানেই থাকবে। চারতলা হবে আমাদের গেরিলা ছাউনি। দুয়োটা দিতে থাক… (শ্রমিকরা ‘বিপ্লব বিপ্লব’ চালাতে থাকে) ওখানে গড়ে তুলব গোপন অস্ত্রশালা। লিফলেট-টিফলেট সব ডাঁই করা থাকবে ওখানে। চুপ করে ঘাপটি মেরে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করব। অপেক্ষা করব সেই বৈপ্লবিক মাহেন্দ্রক্ষণের। তারপর আমার কাছে একটা টেলিফোন আসবে। শশশ— হ্যালো—
নেপথ্য: কমরেড, ধনতন্ত্রের মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধুঁকছে। ইট’স দ্য টাইম।
পন্তু: ওকে। অ্যাটাআআআক— (শ্রমিকেরা লাফ দিয়ে উঠে গুলি চালাতে থাকে) সমস্ত বড়লোক, পুঁজিপতি, রক্তপিপাসু বড়লোকগুলোর ঘুম উড়িয়ে দেওয়া রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম শুরু হবে।
(অরিন্দম গুলি চালানোর শব্দ করতে থাকে)
পন্তু (অরিন্দমকে ধরে): কিন্তু রক্তক্ষয়ের জন্য কিছু রক্ত তো সঞ্চয়ও করতে হবে। তাই আজ থেকে তোরা চারতলার গেরিলা ছাউনিতে তরমুজ খাবি, আনারস খাবি, বেদানা খাবি, কুল খাবি। সরস্বতী, ব্যবস্থা কর।
গঙ্গা: করচি।
অরিন্দম: আবে এ তো দেখছি কপালের পেট খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ভ্যারভ্যার করে খুলেই যাচ্ছে।
প্রসেন: এই নতুন টাইপের বিপ্লবটা ভাই আমার হেব্বি পছন্দ হয়েছে। এটা সুরেনের বিপ্লবের থেকে অনেক ভাল।
অর্পণ: ভাল তো বটেই। সুরেনেরটায় মুড়ি, এটায় বেদনা বে বেদনা!
পন্তু: কে? কার নাম বললি? কী রে?
রবীন: আজ্ঞে কত্তা, সুরেন। আপনার চার নম্বর চা বাগিচার মজুর?
পন্তু: ওহ, কমরেড সুরেন… তাই ভাবি। জঙ্গল আছে, বাঘ নেই কেন? জল আছে, কুমির নেই কেন? বিপ্লব আছে, সুরেন নেই কেন! সুরেন, সুরেন দাস— আমার বেস্ট কমরেড। যমুনা— এদিকে শোন। যতীনবাবু আমাকে বললেন, সুরেনকে নাকি সাসপেন্ড করা হয়েছে! কে করেছে, কে? ডেকে নিয়ে আয় তাকে।
গঙ্গা: ডেকে আনার কী আছে, দাঁড়িয়েই তো আছে।
পন্তু: একবার বল কে—
গঙ্গা: আপনিই, আবার কে!
পন্তু: ওফ, পাপ বেড়ে যাচ্ছে। আমার পাপ বেড়ে যাচ্ছে। ধুয়ে ফেলব। বিপ্লবের স্নিগ্ধ লালচে জলে সব পাপ ধুয়ে ফেলব। জোড়হস্তে নতজানু হয়ে আমি তার কাছে ক্ষমা চাইব। ডেকে আন সুরেনকে, যা।
গঙ্গা: যাহ বাবা, গত সপ্তাহে আপনিই তো বললেন সুরেনটা ঝান্ডাবাজ, লাহাপুরে সুরেনের উপস্থিতি মঙ্গলজনক নয়, ওর বিপ্লবের ঠেলায় আপনার চা বাগানের কাজ লাটে উঠেছে!
পন্তু: তুই তোর মুখ না সামলালে আমি আমার হাতকে আর সামলাতে পারব না, গঙ্গা। বিপ্লবের ঠেলা আবার কী? বল বিপ্লবের মেলা। বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব… (শ্রমিকরাও সঙ্গে বলতে থাকে) সেই মেলায় সবাইকে শামিল করে নেব। লুকিয়ে, পালিয়ে-হেদিয়ে, মুখ বেঁকিয়ে, চোখ উল্টিয়ে, গলিতে, ঝুপড়িতে, হাগাঘরে, চৌদিকচত্বরে যে-যে আছে, সবাই শামিল হবে এই মেলায়। সাম্য রে, সাম্য। সবার গন্তব্য এক। সবার ছন্দ, সবার গন্ধ, সবার মুখ, সবার বুক, সবার স্বপ্ন এক। বল— এক।
শ্রমিকরা: এক…
পন্তু: এক্ষুনি ডেকে পাঠা সুরেনকে, এক্ষুনি।
গঙ্গা: বলছি, এক্ষুনি মানে আপনার চান করবার আগে না আপনার চান করবার পরে?
পন্তু: আআআহ, বাজে কথা বন্ধ কর। এক্ষুনি মানে এক্ষুনি।
গঙ্গা: ভারতী— মানসকে বল বাবু সুরেনকে ডাকছেন। …ডেকেছি।
পন্তু: আমি চান করব, আমি চান করব…
(পন্তু ও যমুনা স্নান করতে যায়)
অর্পণ: এই, দেখলি? বাবু মাগী নিয়ে চান করতে গেল।
প্রসেন: আরে বললাম না, এই বিপ্লবটাই সেরা বিপ্লব। পচুর সুবিধা।
মতি: সুবিধের চপ পেট ভরে খেয়ে হেগে ছড়াতে যদি না চাও, মানে-মানে কেটে পড়ো এখান থেকে।
অর্ক: এই, এটা কে রে?
উজান: মতি। কত্তার ড্রাইভার, সুরেনের বন্ধু।
রবীন: অঅঅ… তাই ভাবি ওর ছাঁটে আগুন লেগেছে কেন।
মতি: ধনা, আমার ছাঁটে না। আগুন লাগবে তোদের ছাঁটে। তোরা এই বাড়িতে প্রথম। আমি প্রতিদিন থাকি। ভাল কথা বলছি, বাঁচতে চাস তো পালা—
কোরাস: এএএ—
মতি: বাড়িস না বাড়।
পন্তু: জলটা ছাড়? আআআহ! এ কী গঙ্গা, আমি যে তোকে বললাম আমি আমার কমরেডজদের সাথে চান করব?
গঙ্গা: সে নয় কাল করবেন। আজ একা-একাই করে নিন। আর আমি তো আচি।
পন্তু: টুমরো টুমরো অ্যান্ড টুমরো! সংগ্রামের খাতায় কোনও কাল হয় না যমুনা— ডু ইট নাও। ডেকে আন ওদেরকে।
গঙ্গা: এই যে, সবাই এসো, বাবু ডাকচে।
উজান: এ কী রে, বাথরুমে কেন ডাকছে? সত্যিই সবাই মিলে চান করব নাকি!
অর্পণ: এই, বাবু হোমোপসেচুয়াল নয় তো?
অরিন্দম: আমি আবার আজকেই ভেতরে জাঙিয়াটা পরে আসিনি!
প্রসেন: চিন্তা করিস না, বললাম না, এই বিপ্লবটাই সেরা বিপ্লব?
পন্তু: গঙ্গা—
গঙ্গা: আরে কী হলটা কী! আসবে তো?
অর্পণ: তুমিও যাবে নাকি ভেতরে?
গঙ্গা: তাতে তোমার কী?
উজান: বলছি, ভেতরে কী হবে গো?
গঙ্গা: যাও না, গেলেই বুঝবে।
রবীন: এএ মতি সরকার—
মতি: যাও, যাও, ভেতরে যাও— (গঙ্গাকে) আটকাতে পারলে না?
গঙ্গা: আটকানো যায়? জানোই তো!
পন্তু: গঙ্গা—
(বাথরুমের ভেতর শ্রমিকরা ‘বিপ্লব বিপ্লব, জয় হিন্দ জয় হিন্দ’ স্লোগান দেয়। পন্তু কমোডের উপর উঠে বাদলকে লাথি কষায়।)
গঙ্গা: এই যে, চান হয়েছে? ওকে তোলো, বেরোও। অনেক হয়েছে, যাও, বেরোও।
উজান: বাদল আয়…
পন্তু: মতিকে ডেকে আন গঙ্গা—
গঙ্গা: বাবু তোমায় ডাকচেন।
মতি: কত্তা, আসলে ওরা—
(সুরেন ঢোকে)
সুরেন: তোরা? তোরা এখানে কী করছিস? বাদল, তোর গায়ে রক্ত কেন?
অরিন্দম: ইয়ে, মানে, পেয়ারা পাড়তে গিয়ে গাছ থেকে পড়ে দাঁত ভেঙেছে।
সুরেন: পেয়ারা? কার গাছের পেয়ারা? ধনা, এদিকে তাকা— তোর সাথে আমার কাল রাতেই কথা হল না? তোর তো আজ গোপীপুরে দু’নং চা বাগিচায় লিফলেট দিতে যাবার কথা। তুই এখানে কী করছিস?
অর্পণ: ধনাকে এরম করিস না সুরেন, ওর পেটে আলসার। ডাক্তার দেখাতে পারছে না।
সুরেন: সে তো আমারও পেটে আলসার। জামা যদি ভেজাবই, রক্তবমি করে ভেজাব। লাথি খেয়ে নয়। লাহাপুরে তোরা নতুন। তোদের পইপই করে বারণ করেছিলাম, শুনলি না আমার কথা। খিদে পেলে আর সুরেনকে মনে থাকে না, তাই তো? তখন ভুলে যাও যে সুরেনেরও পেটে খিদে।
প্রসেন: সুরেন, ভাই, রাতের বেলা মাচায় কথা হবে। এখানে এসব কথা বলা ঠিক দেখায় না।
সুরেন: রাতের বেলা আবার কী? যা হবে, এক্ষুনি হবে। এক্ষুনি বাদলের চিকিৎসার খরচ দিতে হবে বাবুকে।
উজান: ওসব ঝামেলা করতে হবে না, সুরেন— ছাড় না।
সুরেন: তুই বুঝতে পারছিস না—
পন্তু: তুই শুনতে পাচ্ছিস না? খুঁজে বের কর কোথায় আছে। (মতিকে) ওই পচা মাংসের কঙ্কালগুলোকে আমার পিছনে তুমিই ভিড়িয়েছ। আমার ধারণা রাস্তায় ওদের কিছু খাইয়েওছ। ধারণা নয়, বিশ্বাস। আমি গন্ধ শুঁকে খচ্চর চিনতে পারি। এই ব্যাগ থেকে যত টাকা গেছে, সেটা মাইনে থেকে কাটা যাবে। মাইনেটাই আদৌ যদি পেতে চাও, বিকেলের মধ্যে খরচের হিসেব দিয়ে যাবে। চোখের সামনে থেকে সরে যাও। আর শোনো, ওই গুয়ের ডেলাগুলোকে আমার দালান থেকে সরাও।
(মতি বেরিয়েই সুরেনকে দেখতে পায়)
মতি: পাইন মেরেছে! সুরেন?
সুরেন: তোর বাবুর চান হয়েছে?
মতি: হাঁ হয়েছে। এখুনি বেরবে। তার আগে তুই এখান থেকে বেরো।
সুরেন: কেন বেরব? বাদলের নাক ফেটে রক্ত পড়ছে। এখুনি ওর চিকিৎসার খরচ দিতে হবে। তার আগে কেউ বেরবে না। কী কমরেডস?
কোরাস: বিপ্লব বিপ্লব বিপ্লব…
সুরেন: কী?
কোরাস: জয় হিন্দ জয় হিন্দ জয় হিন্দ…
সুরেন: তোর বাবু কী করেছে এদের সাথে?
মতি: সুরেন, ভাই, মাথা গরম করিস না। বাবুর নেশা কেটে গেছে। বেরিয়ে এসে তোকে দেখতে পেলে কী হবে, তুই ভালই জানিস। শুধু তো লাথি মেরেছে, এরপর জানে মেরে দেবে। তুই যা, ওদেরও যেতে বল। তাড়াতাড়ি গিয়ে পৌঁছতে পারলে ওরা আজকের মজুরিটা পেয়ে যাবে।
পন্তু: মতি—
মতি: হাতজোড় করছি ভাই, তুই যা। ওরাও তো সকাল থেকে না খেয়ে আছে, সেটা আমি ম্যানেজ করছি। তুই থাকলে আর কিছুই করা যাবে না। তুই যা—
(সুরেন চলে যেতে গিয়ে দাঁড়ায়। মতি সুরেনের হাতে হ্যারিকেন তুলে দেয়। সুরেন রুমাল বার করে। মতি সেই রুমাল বাদলকে দেয়। সুরেন চলে যায়।)
মতি: শোন, তোদের ভালর জন্যই বলছি… বাবুর এখানে থাকার আশা ছাড়, যে যার নিজের কাজে ফিরে যা। বাবু এখুনি বেরবে না। আর বেরিয়ে যদি—
বাদল: বাবু—
মতি: আরে কী হল কী? বাবু সেই কখন বললেন তোদের এখান থেকে চলে যেতে? এখনও এখানে বসে আছিস? বেরো সব… বেরচ্ছে না।
পন্তু: গঙ্গা…
(পন্তুর বন্দুক থেকে গুলি চলে। পন্তুর বন্দুকের দিকে তাকিয়ে শ্রমিকরা পাছায় হাত দিয়ে বেরিয়ে যায়। আয়ান ও রাধা নাচতে-নাচতে ঢোকে। মিঠুন ঢোকে। নাচতে থাকে। বাদলের মরদেহ নিয়ে শ্রমিকেরা চলে যায়। সুরেন দাঁড়িয়ে থাকে।)
বিরতি / INTERVAL
(চলবে)




