সিনেমার চরিত্র

ইউরোপের বিখ্যাত সমস্ত শিল্পী, সে পিকাসো হোক বা ভ্যান গখ— তাঁদের নিয়ে কত-না সিনেমা হয়েছে! সেইসব দেখি, আর আমাদের মনে অনেক প্রশ্ন আসে, ভাল লাগে। যখন ইউরোপে যাই, সেই জায়গাগুলো খুঁজে বেড়াই— কোথায় তাঁরা কাজ করতেন, কোথায় থাকতেন ইত্যাদি। আমার মনে হয়, যোগেনদাও ওইরকমই একজন সিনেমার চরিত্র, সেইরকমই একজন বড় মাপের শিল্পী! আমি তো ওঁদের কাছ থেকে দেখিনি, দেখেছি যোগেন চৌধুরীকে।

লন্ডনের টেট মডার্নে ভূপেন খক্করের প্রদর্শনী। আমরা গেছি, যোগেনদাও আমন্ত্রিত অতিথি। দূর থেকে লক্ষ করেছিলাম, সেখানকার কিউরেটররা, বিদেশি ও ভারতীয় সংগ্রাহকরা, এবং সমস্ত ধরনের দর্শকরা— যোগেনদা প্রবেশ করামাত্রই সকলে যোগেনদার দিকে ঘুরে তাকাল। কেউ কথা বলছে, কেউ অটোগ্রাফ নিচ্ছে— এবং সেই মানুষটা হাসিমুখে সবার সঙ্গে ঘুরছেন। একজন বাঙালি হয়ে, একজন বাংলার শিল্পীর এই যে-ব্যাপ্তি চোখের সামনে দেখলাম— ভাবলে আজও সত্যিই গর্ব হয়!

আরও পড়ুন: শিল্পকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলান যোগেনদা!
লিখছেন অরুণিমা চৌধুরী…

বোস্টনের মিউজিয়াম অফ ফাইন আর্টস (এমএফএ)-এর বিশিষ্ট কিউরেটর লরা ওয়াইনস্টেইন এসেছিলেন কলকাতায়, উনবিংশ শতাব্দীর বাংলার প্রিন্ট নিয়ে একটা প্রদর্শনী করবেন বলে। দু’দিনের সফর। আমার বাড়িতে এবং অফিসে বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততার মধ্যে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কলকাতায় কী দেখার আছে তোমার?’ উনি বলেছিলেন পুরনো কলকাতার কয়েকটি জায়গার নাম আর সঙ্গে বলেছিলেন, ‘একবার যদি যোগেন চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে পারি!’ তার সাধ মিটিয়েছিলাম মেলার মাঠে। যোগেন চৌধুরী আর ওঁর আলোচনার সাক্ষী থাকার সুযোগ ঘটেছিল আমার।

যোগেনদার সঙ্গে যখনই কথা বলেছি, খেয়াল করেছি যে, সারাক্ষণ উনি খুব মজায় থাকতেন। মজা করে কথা বলতেন। কখনওই দুঃখ বা গ্লানির কোনও প্রকাশ ছিল না। উনি যা পেয়েছিলেন, সব কিছুতেই খুশি ছিলেন। যে-কোনও ঘটনাতেই খুঁজে পেতেন আনন্দের একটা দিক। খুঁজে বেড়াতেন যা-কিছু ভাল, সেই ভালটুকু। উৎসাহ দিতেন সবাইকে— সে প্রদর্শনীতেই হোক বা যে-কোনও কাজে।

লরা ওয়াইনস্টেইন ও যোগেন চৌধুরী
ছবি সৌজন্যে: লেখক

তাঁর প্রচুর পরিকল্পনা ছিল— শিক্ষা নিয়ে, শিল্প নিয়ে, মিউজিয়াম বানানো নিয়ে। সমস্ত বিষয়গুলোকে তিনি একা হাতে সামলাতেন। প্রতিদিনের দিনলিপির একটা নিজের ডিজাইন করা ডায়েরিও ছিল। ওইটুকু ছোট্ট একটা ডায়েরির মধ্যে কোনায়-কোনায় ছবির কথা লিখে রাখতেন। সেখানে ছবি এঁকে রাখতেন। বড় ছবিকে খাতায় ছোট স্কেচ করে রাখতেন, তারপরে সেখান থেকে বাছাই করে বড় ছবি হত। আবার সেই বড় ছবিগুলোকে খাতায় নোট করে রাখতেন, সেটারও একটা ছবি এঁকে। কোনওদিনও ফোটোগ্রাফির ব্যবহার করেননি। ওইভাবে কাজের দলিল করে রেখেছেন। তাঁর কাজ শুধুমাত্র ভারতে নয়, সারা পৃথিবীজুড়ে সংগৃহীত হয়েছে— জাপানে, আমেরিকাতে, ইউরোপে। আজও বিভিন্ন অকশনে যোগেনদার ছবির অনেক দাম ওঠে।

যোগেনদার একটা ছবি, খুব বেশি দামে বিক্রি হওয়ার পর ছবিটা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলেছিলেন, ওই ছবিটা ওঁর ছাত্রজীবনে বা কলেজজীবনের পরে, প্রথমদিকের প্রদর্শনীতে হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু উনি খুশি যে, এইভাবে মানুষ তাঁর ছবিকে সমাদর করেছেন। কারণ ওঁর মনে হয়েছিল, কীভাবে ছবির গতি এবং যাত্রাপথ সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে পালটায়, সেটা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এবং উপলব্ধি করেছিলেন বলেই, তাঁর ছবির মধ্যে একটা স্রোত সব সময়ে রয়েছে।

লেখকের বাড়িতে
ছবি সৌজন্যে: লেখক

এর আগে যোগেনদার প্রদর্শনী নিয়ে লিখতে গিয়ে এক জায়গায় লিখেছিলাম, ‘যোগেন চৌধুরী কি ছবি আঁকতেন, না কি ছবি বুনতেন?’ কারণ তাঁর যে-লাইন, সে-লাইনগুলো যেন বোনার মতো— শেষ আর হয় না। বার বার তিনি বুনে গেছেন একটার পর একট ছবি।  মাটিতে বসে কাজ করতে ভালবাসতেন। শান্তিনিকেতনের এই অভ্যাস কিন্তু তার ছবি আঁকার শুরুর দিন থেকেই ছিল। খুব কম জায়গাতেও উনি স্টুডিয়ো বানিয়ে নিতে পারতেন। তুলি ধরা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে, উত্তর-পূর্ব এশিয়ার জলরঙে ছবি আঁকার পদ্ধতির এক সরলীকৃত ‘যো’-পদ্ধতি তিনি রপ্ত করেছিলেন। তুলির ডগায চাপ দিয়ে সাবলীলভাবে তৈরি করতেন লাইন। এইভাবে ছবি আঁকার ভিডিয়ো দেখেছি যামিনী রায়ের। লাইন ড্রয়িং-এর মাস্টার যামিনী রায়ের উত্তরসূরী যে যোগেন চৌধুরী, তা বললে অত্যুক্তি হবে না। যোগেনদার প্রতিটা ছবির মধ্যেই শিরোনাম থাকত; কোনও ছবিই নামহীন ছিল না। নামহীন না থাকার মানেই হচ্ছে, তিনি নির্দিষ্ট কোনও-না-কোনও ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। তিনি খালি ক্যানভাসে যখন ছবি এঁকেছেন, মানুষের সম্পর্কের কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষকে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ছবির মূল বিষয় হিসেবে। শুধু তাই নয়, একাধারে ছবিকে যেমন ভেঙেছেন, তেমনি ছবিকে করে তুলেছেন বাস্তবানুসারী।

স্টুডিয়ো
ছবি সৌজন্যে: লেখক

ওঁর ছবির ভাবনা নিয়ে হেমেন মজুমদারের একটা কথা মনে পড়ছে। তিনি এক জায়গায় লিখেছিলেন, ‘চিত্রকর ও চিত্রশিল্পীতে একটা পার্থক্য আছে। মানুষকে শুধু মানুষ যে আঁকে তাকে বলে ‘চিত্রকর’; এটা বাইরের মানুষ আঁকা হল। আর যে মানুষটাকে ভেতরের জিনিস, অর্থাৎ মন ও গুণ দিয়ে তৈরি করে তাকে বলে ‘চিত্রশিল্পী’। যেমন, ‘বিদ্যাসাগর’ আঁকতে গিয়ে যদি পরিষ্কার মেদিনীপুরী হাট দিয়ে একটি মানুষ দাঁড় করান যায় এবং তা দেখে পাড়ার লোকেরা বললে, ‘হাঁ ইনি আমাদের ঈশ্বর শর্মাই বটে’ তা হল চিত্রকরের পট। আর যদি তাঁকে দেখে মনে হয়— আহা! কি সুন্দর— যেমন রূপ তেমনি পাণ্ডিত্য! আবার তেমনি দয়া— যেন দেবতা বসে আছেন, তবে তাকে বলব শিল্পীই এঁকেছে। কথাটা বুঝতে প্রথমে একটু শক্ত হবে। তারপর চিত্রকর— দ্রষ্টা আর শিল্পী— স্রষ্টা।’ যোগেন চৌধুরী যখনই প্রতিকৃতি এঁকেছেন, সেগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে। কারণ প্রতিটি প্রতিকৃতিতেই ভাবের প্রকাশ ছিল অসম্ভব গভীর। তিনি অন্যভাবে মানুষকে দেখতেন, তাঁদের মনের গভীরে পৌঁছাতে পারতেন।

সমস্ত মানুষকে উৎসাহ দিয়ে একটা বড় পৃথিবীর সম্ভাবনা দেখতেন যোগেনদা। নিরন্তর যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন, প্রতিবাদ করেছেন অশিক্ষার বিরুদ্ধেও। সেই প্রতিবাদী যোগেনের ক্যানভাসেও ফুটে উঠেছে বহু ছবি। পাশাপাশি তিনিই আবার ফুল-পাতা এঁকেছেন। যতই কালো রঙের ফুল হোক, কালো রং দিয়ে আঁকা হোক— সেই ফুলগুলো দেখে কিন্তু রঙিনই মনে হয়। আর এই রঙিন ফুলগুলো কালোতে ফুটিয়ে তোলার জন্য যে-বিশেষ চোখ ছিল তাঁর, যে-বিশেষ তুলির টান উনি পেয়েছিলেন— সেসবই তাঁকে এই সময়কালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ একজন শিল্পী গড়ে তুলেছে।