দুই দেশের শহিদ

পৃথিবীব্যাপী মানবজাতির সুপ্রাচীন ইতিহাসে বিপ্লব তার সুন্দরতম হাতিয়ার এবং তা যদি হয় স্বাধীনতার লক্ষ্যে, তা হয়ে ওঠে অবিনশ্বর! তারপর বহু ক্রোশ পথ হেঁটেছে বাঙ্গা প্রদেশের এক সর্দারের স্বপ্নের মাতৃভূমি। তীব্র হয়েছে বৈষম্য, চওড়া হয়েছে বিভাজন। ধর্ম ও রাজনীতির সমান্তরাল অবস্থানও প্রকট। কৃষক-শ্রমিকের হাতে সমাজের স্টিয়ারিং যায়নি। সিংহাসন স্থির থেকে বদলে গেছে রাজমুকুট। কিন্তু প্রশ্ন থেকে গেছে সেই স্বপ্নের অপমৃত্যু নিয়ে। এমন এক উন্মাদ প্রেমিক যে, জেলবন্দি হয়েও চির স্বাধীন! দুই দেশের কাঁটাতারের ব্যবধান যে স্বাধীনতায় থাবা বসাতে অক্ষম। সীমান্ত পেরিয়ে দৃষ্টিগোচর হয় সেইসব রক্তবীজের দল।

২০১৩ সালে লাহোর হাইকোর্টের বরিষ্ঠ আইনজীবী আব্দুল রশিদ কুরেশি ও তাঁর পুত্র ইমতিয়াজ, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলাটি কোর্টে পুনরায় খোলার আবেদন করেন। এই মামলার ওপর ভিত্তি করেই প্রায় ৯৪ বছর আগে ফাঁসি হয়েছিল ভগৎ সিংহ, সুখদেব ও শিবরাম রাজগুরুর। আইনজীবী ইমতিয়াজ মনে করতেন, এই মামলায় সঠিক ন্যায়বিচার হয়নি। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলার তৎকালীন তিন বিচারকের ট্রাইবুনাল ৪৫০ জন সাক্ষীর বক্তব্য শোনেইনি। এমনকী, ফাঁসির আসামিরা আপিল করার সুযোগটুকু থেকেও বঞ্চিত হন। গোটা বিচার-প্রক্রিয়াটা এতটাই ত্রুটিপূর্ণ ছিল যে, প্রবীণ আইনজীবী এজি নুরানি এটিকে ‘বিচারবিভাগীয় হত্যা’-র তকমা দেন।

১৯৪৭ পরবর্তী সময়ে র‍্যাডক্লিফ সাহেবের দৌলতে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র ক্রমে দূরত্ব বাড়িয়েছে, ধর্ম যে ভাঙনে অনুঘটকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। তবু ভগৎ সিংকে কেন্দ্র করে দুই দেশই যেন আবেগপ্রবণ। উভয় রাষ্ট্র চায় তাকে নিজের সন্তান হিসাবে পরিচয় দিতে। ২০০৭ সালে ভগৎ সিংয়ের জন্মশতবার্ষিকীতে পাকিস্তানে ‘ইরতিকা’ নামক একটি উর্দু পত্রিকায় তাঁকে বীর শহিদ আখ্যা দেওয়া হয়। তাঁকে নিয়ে রচিত বেশ কিছু কবিতাও সেই পত্রিকাতে স্থান পেয়েছিল। খ্যাতনামা উর্দু লেখিকা, জাহেদা হিনা ভগৎ সিংকে ‘পাকিস্তানের পুত্র’ সম্বোধনে ভূষিত করেন। আদতে ভগৎ সিংয়ের জন্ম পাঞ্জাব প্রদেশের লয়ালপুর জেলায়, যা অধুনা পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে অবস্থিত। অন্যদিকে লাহোরে যে স্থানে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তাও আজকের পাকিস্তানে। প্রতি বছর ঘটা করে পড়শি দেশে তাঁর জন্মদিন পালিত হয়। ২০১২ সালে জনসাধারণের দীর্ঘ অনুরোধকে মান্যতা দিয়ে লাহোর পৌরসভার পক্ষ থেকে সাদমান চককে, ভগৎ সিং চক ঘোষণা করা হয়। শোনা যায়, পৌরসভার কাছে সুপারিশকারী এই বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ছিলেন প্ৰখ্যাত পাকিস্তানি কবি, ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কন্যা শিল্পী সালিমা হাসমি।

আরও পড়ুন: ভগৎ সিংকে পড়লে বোঝা যায় বিপ্লবীর অন্তরের কথা!
লিখছেন সায়ন্তন সেন…

কিন্তু সময়ের চোরাস্রোতে বয়ে এসেছে কট্টরপন্থার বিষ। ইসলামিক ধর্মীয় আগ্রাসন থেকে রক্ষা নেই ভগৎ সিং-অনুগামীদেরও। স্বাভাবিক! মাত্র ২৩ বছরে সহাস্যে ফাঁসির সাজা বরণকারী এক বিপ্লবী নিজেকে ‘নাস্তিক’ ঘোষণা করলে দু’দিকের রক্ষনশীল গোঁড়া সমাজের বিপদ আছে বইকি। তাই, মৃত্যুর এত বছর পরও পাকিস্তানে বিভিন্ন চরমপন্থী গোষ্ঠীর হুমকি ও আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয় তাঁর মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষদের। বহু ভগৎ সিং-সমর্থক লাহোর প্রশাসনের কাছে এখনও নিরাপত্তা প্রদানের বিফল আর্জি জানিয়ে চলেছে।

ভগৎ সিংহের মৃত্যুর পরেও পাকিস্তানজুড়ে বহু মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। লাহোরের বহুল প্রচলিত দৈনিক ‘দ্য ট্রিবিউন’-এ ২৬ মার্চ প্রকাশিত প্রথম পাতার প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাহোর-সংলগ্ন মিন্টো পার্ক অঞ্চল সেদিন বিক্ষোভ সমাবেশে ফেটে পড়েছিল। ১৯৬৫ সালে যুদ্ধের পূর্ববর্তী সময় অবধি ভারতীয় পর্যটকরা পাকিস্তানের পাঞ্জাবে ভগৎ সিংহের জন্মস্থান ১০৫ নং চক ভ্রমণে যেতেন। শহীদ-ই-আজমকে নিয়ে রচিত বিখ্যাত সিন্ধি কবি শেখ আয়াজের বইটি এখনও একটি শ্রেষ্ঠতম কাজ হিসেবে পাকিস্তান জুড়ে প্রশংসিত হয়। এছাড়াও পাঞ্জাবি কবি আহমেদ সেলিমের বিখ্যাত কবিতা সংকলন ‘কেহদি মান নে ভগৎ সিং জামিয়া’ বা ‘কোন মা ভগৎ সিংকে জন্ম দিয়েছেন’— একটি অভূতপূর্ব কালজয়ী আখ্যান। বহু জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিত্ব নিমজ্জিত থেকেছেন ‘ভগৎ’ নামক এই ধারণাটির অতল সন্ধানে। সাংবাদিক আম্মারা আহমেদ দীর্ঘদিন লাহোরে গবেষণারত ছিলেন ভূমিপুত্রকে নিয়ে। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ওয়াকার পিরোজ উর্দু ভাষায় জীবনী সম্পূর্ণ করেছেন ভগৎ সিংয়ের। ব্রিটিশ ভারতীয় পণ্ডিত ও আইনজীবী সৎবিন্দর জাস নিজ দায়িত্বে পাকিস্তানের পাঞ্জাবে গিয়ে ঘেঁটে দেখেছেন আর্কাইভ— ১৩৪টির বেশি ফাইল অধ্যয়ন করে রচনা করেছেন দু’টি তথ্যসমৃদ্ধ বই।

পাকিস্তানে ভগৎ সিংয়ের বাড়ি

মৃত্যুর পর ভগৎ সিং-সহ তিন স্বাধীনতা সংগ্রামীর মৃতদেহ বিকৃত করেছিল ব্রিটিশ সরকার। পরিবারের হাতে না দিয়ে প্রথমে পোড়ানোর চেষ্টা হয় ও পরবর্তীতে পাটের বস্তায় ভরে গান্ডা সিং ওয়ালা গ্রামের কাছে শতদ্রু নদীতে নিক্ষেপ করা হয়। স্থানীয় কিছু মানুষের সহায়তায় ভগৎ সিংহের সহোদরা, বিবি অমর কৌর এবং লালা লাজপত রাইয়ের কন্যা পার্বতী বাই, অগোচরে ব্রিটিশ জেলের কর্তাদের অনুসরণ করেছিলেন। তাঁরাই উদ্ধার করেন তিন বিপ্লবীর আধপোড়া দেহাংশ। দাহ অনুষ্ঠানের জন্য লাহোরে ফিরিয়েও আনা হয়। অবিভক্ত পাঞ্জাবের ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষ শেষকৃত্যে অংশ নেয়। শোনা যায়, শেষ যাত্রায় যাওয়ার সময় মুখের কালো মুখবন্ধ পরতে অস্বীকার করেছিলেন ভগৎ সিং। নিজের মাতৃভূমিকে অন্তিম দর্শনের আকুল আকাঙ্ক্ষা আর অলিগলি ছাপানো ইনকিলাবি গর্জনের মাধুর্য। ঘৃণার পৃথিবীতে দেশমাতৃকাপ্রেম জুড়ে দেয় দুই দেশ!

বর্তমান ভারতে ‘পাকিস্তানি’ শব্দবন্ধটি গালাগালির সমার্থক। রাষ্ট্রীয় গুন্ডারা ক্ষুব্ধ হলে যখন তখন বিরোধী কণ্ঠস্বরকে বিনা ভিসায় পড়শি দেশে পাঠাতে দ্বিধাবোধ করেন না। বিগত এক দশক জুড়ে এমনটাই স্বাভাবিক, হয়ে গেছে! কালকূটের অনল একলহমায় সবটুকুকে গ্রাস করেছে। ক্রিকেট মাঠে বন্দুক চালানো উদযাপন হোক কি ফাইটার জেট ধ্বংসের দাবী, সৌহার্দ্যের ঠাঁই এখন গরলগিলনে। এই দেশই কি চেয়েছিলেন ভগৎ সিং? বধির দেশে অবিরত ঘৃণার বিস্ফোরণ। যেখানে আগামী ভালবাসার কথা শুনতে নারাজ। এখানে ঘৃণাই সর্বশক্তিমান। কাঁটাতারের আগল টপকে যেখানে কোনও নিষ্পাপ একরত্তির বলার সাহস নেই— I deny the very existence of that Almighty Supreme Being!