আশৈশব শুনছি, গরমে মেজাজ তিরিক্ষি হয়ে থাকে। তবে কী জানি বাপু, ছেলেবেলায় ডেইলি ডোজ অব কানমলা, চড় আর চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকুনির চোটে তো আমার অন্তত মনে হত বড়দের মেজাজ সব মরশুমেই সমান তেতে আছে। ফলে, অঙ্কের স্যাডিস্টিক মাস্টারমশাইরা বেছে-বেছে কঠিন অঙ্কগুলো গ্রীষ্মের দ্বিপ্রাহরিক দিগ্বিজয়ের পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার জন্যই তুলে রাখতেন, মনে হয় না।
আমাদের গরম লাগত না। উত্তরবঙ্গে এখনও গরম পড়ে, তবে তার মেয়াদ মেরে কেটে দু’মাস। সে আবার ছুটির সময়, ফলে মনে এমন বসন্তের বাতাস বইত হামেহাল, যে বহির্জগতের প্রাকৃতিক অন্তরায়গুলিকে পাত্তাই দিতাম না। এখনও দেখি প্রখর তাপ অগ্রাহ্য করে ফুটপাথের শিশুরা পিচের রাস্তায় হুটোপাটি জুড়েছে। অবশ্য তারা গরিব। গত সত্তর বছরের খানিকটা বেশি সময়ে জেনেটিক মিউটেশনের ফলে মানুষ থেকে ‘অমানুষে’ পর্যবসিত করা গেছে— কিছুকাল কাটুক, স্টোন চিপস আর বালি খেয়ে বলবে, ‘মেরে পাস মাঁ হ্যায়।’
সে যাক, লাফালাফির প্রবণতাটি সব দেশে আপামর শৈশব, কৈশোরের ক্ষেত্রেই খাটে— তা দেখেছিলাম পুনের খাড়কিতে থাকাকালীন। মহারাষ্ট্রে গরমির তেজ কেমন, তা বৈশাখ-জষ্ঠি মাসে মাঠের পানে চাইলেই মালুম হয়। পাহাড়ের ঢাল ধুয়ে বহু শতাব্দী যাবৎ জমাট উপত্যকার ধূসর বাদামি মাটি পুড়ে কালো হয়ে যেত ফাল্গুনের শেষেই। সে মরশুমে ছেলেপিলেদের দেখেছি, ফাটিয়ে ক্রিকেট খেলছে, স্কুল-কলেজের মেয়েরা লক্ষ্মী পেট যাওয়ার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে আইসক্রিম হাতে এ-ওর গায়ে ঢলে হেসে কুটিপাটি হচ্ছে, গরিব বনজারাদের কচিকাঁচারা নদীতে ডিগবাজি মেরে ঝাঁপাঝাঁপি চানে মেতে আছে দিব্যি— কই, একমাথা রোদে, ভেজা গায়ে দাপিয়ে জ্বরের প্রকোপে কয়েক কোটি বেদের বাচ্চা ফৌত হয়েছে, এমনটা শুনিনি তো কদাপি! রোজই দেখতাম ভেলপুরি, সেদ্ধ চানা, পাউভাজির দোকানে থিকথিকে ভিড়। মধ্যবয়স্ক মহিলাদের অনেকে ছাতা মাথায় অনাবশ্যক দাঁত বের করে হেঁটে-চলে বেড়ালেও, বেশিরভাগই ওড়না টেনে লিস্টি হাতে এ-দোকান ও-দোকান ঝগড়া, আই মিন, কেবল বারগেইনিংএর মজা লোটার জন্যই ঘুরত— ‘সালোয়ার কামিজ কিনতে হবে, যাই চাড্ডি শিল-পাটার দরদাম সেরে আসি দোকানি বেটাচ্ছেলের সঙ্গে’ টাইপের অ্যাটিটিউড আর কী! তারই ফাঁকফোকর গলে নওজওয়ান থেকে বৃদ্ধ সবাই ‘অবলিভিয়াস টু’ তাপপ্রবাহ মাথা হেঁট করে ধান্দায় মগ্ন তো বটেই, খাটিয়ায় চিৎ কয়েকটা লাশকেও দেখেছি ঠাটাপড়া রোদেই দুলতে-দুলতে চলেছে শ্মশানের পথে—‘এখন থাক, রোদ পড়লে বেরুব’, ‘আমার আবার সানলাইটে এলাজ্জি’ ইত্যাদি আহ্লাদ-আবদারের জায়গাই নেই। একটা জাত এমনি-এমনি ইসে করে না!!
আরও পড়ুন: ইউরোপে কেন এত গরমের বাড়াবাড়ি?
লিখছেন অয়ন চক্রবর্তী…
তবে উত্তর ভারতের দুপুরে ঘর ছেড়ে পথের ধারে ছায়া খুঁজে বসতে দেখেছি মূলত গরিব মানুষকে। সর্বাঙ্গ ঢেকে অর্ধনিমীলিত চোখে পিটপিট করে আমাদের মতো নালায়েকদের পানে চেয়ে থাকত। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত পরিসরে এরা কখনওই প্রবেশ করেনি তা হয়তো নয়, তবে তা এতটাই কম সময়ের জন্য যে, পরে স্বাভাবিক পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধে হত না। গা ঢেকে বোসো, প্রচুর জল আর পয়সা থাকলে কাঁকড়ি-পেঁয়াজ-খরবুজ খাও, জোয়ারের রুটি অদৃষ্টে থাকলে তাই দিয়েই পেট ভরিয়ে রাখো— অর্থনৈতিক জাঁতাকলে ফেঁসে থাকা মানুষদের বাঁচার এই একমাত্র পথ। একবার পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে অটলবিহারীর সরকার ডিগবাজি খেয়েছিল মনে আছে? সেবার রাজস্থান থেকে গুজরাত, চক্কর মেরে সর্বত্র দেখেছি রাস্তার পাশে ‘রোটি ভাজি’-র দোকানে কাঁচা পেঁয়াজের বদলে চোয়াল শক্ত করে শুধু রুটি-লঙ্কার আচার দিয়ে ফিরিওয়ালা মশাইটি সক্কলের অভিশাপ মাথা পেতে নিচ্ছেন চুপচাপ। তারপর কী হইল জানে শ্যামলাল!
দুপুরের পর পশ্চিমের মরুভূমি থেকে ঝোড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলে দিল্লির নাভিশ্বাস ওঠা প্রথমবারের গর্মিতে মনে হয়েছিল, এবার শরীর শীতল হবে। ভুল ভেবেছিলাম। বাতাসের সঙ্গে উড়ে এল প্রচুর পরিমাণে বালি, সঙ্গে খুব ছোট হলেও আপাদমস্তক জিওলজিকাল সার্ভে আপিসের ছাপ মারা পাথরের টুকরো। জ্বরে পড়লাম পাতলা হাফ শার্ট পরে টুপি, নকাব ছাড়াই রোদে বেড়োনোর খেসারত দিয়ে।
বাংলাকে সে-অর্থে উত্তর ভারত বলার উপায় নেই। গাঙ্গেয় পূর্ব এবং পশ্চিমবঙ্গের অনেকখানি সে তাপপ্রবাহের নাগালের বাইরে পান্তা, হাতপাখা, আদা-জিরেবাটার ঝোল খেয়ে ডিগডিগে তনুটিকে আগলে রেখেছে। আরাবল্লির জঙ্গল উজাড় করে পাথরের খাদান তৈরির পর যে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা, তার ধাক্কা ‘ড্যাকোয়েট ইনফেস্টেড’ কান্ট্রির তাঁবুতে জন্মানো, তপ্ত বালিয়াড়িতে উট চড়ানো, পাগড়ি আঁটা ‘ড্যাকোয়েটস’-রা বাকায়দা সামলে নিলেও নিতে পারে, তবে ওদেশে বসত গেড়ে বাক্যের শেষে ‘হচ্ছে’ বলা দশটা-পাঁচটার বাবুরা হয় হিমশিম খেয়ে হিমালয়ে পালাবে, নয়তো ঝাড়েবংশে পটল তুলবে। এই যে প্রতি বছর মাসখানেকের তীব্র আম-কাঁঠাল-পাকা গরম, তার মধ্যেও বাঙালির মাথায় ক্রমাগত খেলা করে ‘‘আর তো মাত্র ক’দিন’’— তারপরই ৮ জুন, অর্থাৎ আষাঢ়স্য প্রথম দিবসেই তুমুল ‘আবার এসেছে আষাঢ়’, খিচুড়ি-মামলেট এবং ‘বস্তির ঘরে জল ঢুকলেই বাছাধনরা টের পাবে।’ এদিকে যে ‘জলের লেয়ার’ নেমেছে ঠান্ডা পানীয়র কোম্পানি এলাকায় কারখানা (পড়ুন নিরন্ন মানুষের সেবার্থে কর্মসংস্থান-কেন্দ্রিক পরিষেবা প্রদানের বহুজাতিক বিনিয়োগ সংস্থা) স্থাপনের ছ’মাসের মধ্যেই, সেদিকে কারও খেয়াল নেই। গরম পড়লে কে যে কাকে কীভাবে টাইট দেয়, আল্লা-ই জানে।
মাসকয়েক আগে দেখি খবর হল, মহারাষ্ট্রের ঊষর পাহাড়ি পথে দূরপাল্লার বাস থামিয়ে যাত্রীদের বোতল থেকে বাঁদরে জলপান করেছে। তেষ্টায় ছাতি না ফাটলে কেউ মানুষকে বিশ্বাস করে না— অতএব বলা যেতেই পারে, প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সব জায়গাতেই শুকোচ্ছে।
যা-ই হোক। বাঙালির বিশ্বাস, এই তপ্ত তেলে ভাজা হওয়া থেকে একদিন ঝালে-ঝোলে, তালের বড়া, রথের মেলা, বাইশে শ্রাবণ থেকে মুক্তি মিলবেই। ফলে ফি-বছর ‘ছাইক্লোনের’ সংখ্যা বাড়ছে সেটি দিঘা-পুরি-মন্দারমনি যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল না হলে খেয়াল হয় না। আগে এক-দেড় যুগ পর-পর একটি প্লাবনের খবর মিলত, এখন প্রতিবছরই দু-তিনটে। সবসময়ই নিম্নচাপ, সবসময়ই ঘূর্ণাবর্ত— তবে ‘সবসময়ই’ বেবাক তাণ্ডব, ওলটপালট চুকলে রহিয়া-রহিয়া বিপুল মাঠের পরে, নব তৃণদলে ছেলেদের ফুটবল পায়ে ছোটাছুটি, ইতিউতি ছড়িয়ে থাকে কদম ফুল, আর পাড়ার তেলেভাজার দোকানের বাইরে কী প্রচণ্ড কলরব… সচেতন বাঙালি আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নিয়ে আলোচনা করে না তা নয়, তবে প্রাত্যহিকতায় ক্রমশ জুড়ে যেতে থাকা ছোটখাট অসুবিধেগুলোর সঙ্গে বড় আকারের পরিবর্তনকে মিলিয়ে দেখা এখনও তার এক্তিয়ারের বাইরেই রয়ে গেছে।
আটের দশকে টেলিভিশনে এক খাড়া-নাক বৃদ্ধ সাহেবকে দেখা যেত ডুবুরির পোশাক চাপিয়ে মাঝসমুদ্রে ডিগবাজি খেয়ে সিলমাছ থেকে তিমি, হাঙর, ডলফিন সবই দেখাচ্ছে কাছ থেকে। বখাটে ছোঁড়ারা ধৈর্য ধরে বসে থাকত যদি কখনও নিছক দৈবের বশে ‘ক্যামেরাম্যান’ বাড়ি ফেরার বেলায় ক্যামেরা অফ করতে ভুলে গিয়ে—অবিশ্বাসীরা ‘দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ’ বইটা পড়ে দেখুন— সমুদ্রসৈকতে সার-সার, মানে হাজার-হাজার বিকিনি-পরিহিতা স্বর্ণকেশীদের দেখিয়ে ফেলে। যা-ই হোক। অ্যাটেনবরো তখনও আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। বুড়োর নাম যদ্দুর মনে পড়ছে ক্যাপ্টেন কোস্টা। ওরই কোনও একটি পর্বে অ্যান্টার্কটিকার ক্রিল, তিমি মাছের প্রজনন প্রক্রিয়া, খাদ্যাভ্যাস, এবং পরিযানের সঙ্গে উষ্ণায়ন কেমন অঙ্গাঙ্গি যুক্ত, তা সাধারণ বাঙালি জানার সুযোগ পায়। এছাড়াও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পড়া কিছু সায়েব টাইপ বেঙ্গলি আছে, তা সেসব এলিমেন্টদের বাদ দিয়েই এই লেখা সারার চেষ্টা করব। সাধারণ বাঙালি ডিসকভারিতে সেসব মন দিয়ে দেখে না তা নয়, তবে সবটাই কেবল আশ্চর্য হওয়ার বিষয়, সবটাই ‘সিংহের ন্যাজটাও কেমন বাদ দেয়নি দেখেছো!’ বলে গদগদ হওয়াতেই শুরু এবং শেষ। ম্যাক্সিমাম কেউ ঠাকুরের অর্ডার দিতে গিয়ে পালবাবুদের ইনস্ট্রাকশন দিয়ে আসেন, অমনি সিংহ চাই এবার বাহনের ‘ভূমিকায়’। ব্যস, হয়ে গেল বাঙালির কর্তব্যপালন! কোভিডের কারণে লকডাউনের সময় গুরুত্বপূর্ণ খবর ছিল ভেনিসের খালে শুশুক ফিরেছে এবং রায়গঞ্জ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছে পরিষ্কার। গরম এবং নদী, সমুদ্র, আবহাওয়ার ধুলো-ময়লা-আবর্জনা কমার সঙ্গে দু’টি ঘটনার সরাসরি যোগ অনস্বীকার্য। পাড়ার ক্লাবে একজন জিজ্ঞেস কল্লে ‘তাহলে কি সানরাইজও…’— মানে কোনওভাবে যদি দার্জিলিং, নিদেন টাইগার হিল যাওয়ার গাড়ি ভাড়াটাও বাঁচানো যায় আর কী! এই উষ্ণায়নে এদের কিছু হবে না, স্রিফ নরকের আগুনে পোড়াতে হবে দু’পিঠ ঘুরিয়েফিরিয়ে!!
মাসকয়েক আগে দেখি খবর হল, মহারাষ্ট্রের ঊষর পাহাড়ি পথে দূরপাল্লার বাস থামিয়ে যাত্রীদের বোতল থেকে বাঁদরে জলপান করেছে। তেষ্টায় ছাতি না ফাটলে কেউ মানুষকে বিশ্বাস করে না— অতএব বলা যেতেই পারে, প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সব জায়গাতেই শুকোচ্ছে। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় গরমকালেও প্রচুর ঝরনা, এবং তাতে সারাবছর প্রচুর মাছ ধরার সুযোগ মেলে। সে মাছ পুনের আউন্ধ, খড়কি ইত্যাদি বাজারেও আসে। সেই জঙ্গলের ভেতর যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, রাজস্থান এবং গুজরাতের বিস্তীর্ণ ‘সুখা’ অঞ্চলের হালত কী দাঁড়িয়েছে, তা ভাবলেও হৃৎকম্প হয়। বরাবরই শুকনো অঞ্চলের পশুপাখিরা নিজেদের বাসস্থান এবং উড়ে বেড়ানোর এলাকায় আবহাওয়ার একটুআধটু খামখেয়ালিপনায় একরকম অভ্যস্ত, এবং তাদের শরীরের ধরনটি এর সঙ্গে বেশ মানিয়ে তৈরি হয়েছে কয়েক লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফলে। তবু, সবাই তো আর উট নয়। স্থানীয় ‘পরিযায়ী’ পাখিরা পরিচিত জলাধারের বদলে ফুটিফাটা মাটি আর ধুলো-ওড়া প্রান্তর দেখে আসা বন্ধ করেছে, ডিম এবং বাচ্চার সংখ্যা কমছে, বেশ কিছু বিলুপ্তপ্রায় পাখির মোট সংখ্যাও আশঙ্কাজনক। এরা সাইবেরিয়ার পাখি নয়, তবে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে খাদ্যান্বেষণে এবং ডিম পাড়ার উপযুক্ত, অর্থাৎ নিরাপদ জায়গা খুঁজে বেড়ায়। প্রাচীন ঝিল এবং হ্রদের পাড়ে কচুরিপানা ঠাসা নলখাগড়ার বনে বহু প্রজন্ম একটানা ডিম পাড়ার অভ্যস্ত ছন্দ ব্যাহত হলে সেটিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা একপ্রকার অসম্ভব। বনবিভাগের উদ্যোগে কিছু জলাশয়ে জল ছাড়া হলেও, একটানা বৃষ্টি না হলে গোটা বাস্তুতন্ত্রের ধাঁচা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া সময়ের অপেক্ষামাত্র। পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে নানা ধরনের পোকামাকড়ের সংখ্যা আশ্চর্যরকম বৃদ্ধি পেয়েছে গত কয়েক বছরে। বেড়েছে বিষধর সাপও, যা আগে সারস গোছের লম্বা ঠ্যাংওলা পাখিরা স্বাভাবিক লাঞ্চ এবং ডিনারে ধরে খেত। বনবিভাগের লোকরা খানা ডোবায় পাইপ লাগিয়ে জল ভরলেও, সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সাপ ধরে খাবে, তা নিশ্চয়ই এক্সপেক্টেড নয়। উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ গলে যাওয়া বা মরু বরফের পরিমাণ কমার আঁচ আমরা এখনও সেভাবে পাই না, তবে চারপাশের জীবজগতের ছোটখাট গোলমালগুলো ক্রমশই বড্ড বেশি প্রকট হয়ে উঠছে।
ইউরোপ, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চল পুড়তে শুরু করেছে সেই মে মাস থেকে একটানা। প্রতি বছরই পোড়ে, তবে এবার টনক নড়েছে। আলাস্কা, কানাডার পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ বনভূমি এবং ছোট-বড় জনপদ পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলের অ্যায়লানে পেট চেপে ধরে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে এমনি নয়— নিজের দেশ সামলাতে পারে না, তার আবার…! উষ্ণায়ন ঠেকানোর দায় আদতে পশ্চিমি ইউরোপ-আমেরিকার, না কি চিনের, সে বিষয়ে বাদানুবাদের বয়স আরও খানিকটা বেশি— প্রায় আড়াই দশক। এতকাল আফ্রিকা জুড়ে একের পর এক খরা এবং অনাবৃষ্টির ধাক্কা বেচারা ‘কালা আদমিরা’ সামলেছে যৎসামান্য গুঁড়ো দুধ, পার্থেনিয়াম মেশানো গম এবং গোপনে চোখ-ফুসফুস-কিডনি-লিভার-রক্তকণিকার রোগের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মেশানো ওষুধের বিনিময়ে। বোমা-বন্দুককেও ঈশ্বরের আসনে বসাতে শিখেছে দুধের শিশুরা দু’বেলা মাইলোর জাউ আর নানা কিসিমের ড্রাগের নেশায় বুঁদ হয়ে খরাপ্রবণ এলাকা ছেড়ে একটানা গৃহযুদ্ধের উর্বর জমিতে গজিয়ে ওঠা বিবদমান শিবিরগুলিতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার আশ্রয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর বিনিময়ে। গোলমাল ঠেকানো যেত। ইউরোপে উদ্বাস্তুদের প্রবেশ আটকাতে ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালির মতো উন্নততর ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র একজোট হতে পারে, আর আফ্রিকায় আগ্নেয়াস্ত্র পাঠানো বন্ধ করতে পারবে না, হয়? স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা আবর্জনাহীন জলে সামন মাছের চাষ থেকে সমুদ্রে মেশিন ফিট করে বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে আর একের পর এক গজিয়ে ওঠা, মুনাফার অঙ্কে আমেরিকাকে টেক্কা দেওয়া মারণাস্ত্র তৈরির কারখানা বন্ধ করতে পারে না বললেই বিশ্বাস করতে হবে? আফ্রিকা জুড়ে গৃহযুদ্ধের ফলে পতিত জমি বাড়ছে— যাদের চাষ-আবাদ করার কথা, তারা কামান-বন্দুক না ধরলে দু’বেলা দু-মুঠো জাউ জুটবে না এবং পরবর্তী প্রজন্মের লোকেদের বীজের নমুনা, বর্ষার মেঘ, পেকে ওঠা ফসল চেনানোর, বা ঊষর ভূখণ্ডে পাথর বেছে, মাটি কুপিয়ে, গোবর ছড়িয়ে, বয়ে চলা নদী থেকে নালা কেটে চাষজমি তৈরির তরিকা শেখানোর কেউ নেই। নালাগুলির দু’পাশে গাছ গজায়, সেগুলিকে লালন করা হয় কারণ তার ছায়ায় চাষিরা ক্লান্তি দূর করতে যেমন দু-দণ্ড জিরোয়, তেমনি বহুমূল্য জল সরাসরি রোদের তাপে বাষ্প হয়ে উবে যায় না দ্রুত। সেরকম গাছের ছায়ায় বসার কেউ না থাকায় গান বাঁধার অবসরগুলোও তো তৈরি হচ্ছে না আর। ওয়াদ হামিদের দৌম গাছগুলো না থাকলে চারপাশের প্রবহমান জীবনের আখ্যান-ইতিহাস, কাজিয়া-মহব্বত, ইশারা-ইঙ্গিতের টুকরো ছবিগুলো ধরে রাখার মানুষদেরও নিরাপদ শহরের বহুতলের ছায়ায় সস্তা মালের বাজারের খোঁজে উঠে চলে যেতে হবে বরাবরের মতো। ফলে জমির তাপ বাড়ছে— বেড়েই চলেছে।
ভূমধ্যসাগরের ঠিক ওপারে ফার কোট, মিঙ্ক কলার, কিড গ্লাভ্স-শোভিত ইউরোপও সে তাপপ্রবাহের ধাক্কায় বেসামাল। যদ্দুর মনে পড়ছে, জুন মাসেই খুব সম্ভবত বিবিসি খবর করল, ফ্রান্সে গরমের চোটে খানা ডোবায় দুমদাম অবগাহন করতে নেমে পড়ায় এক হপ্তায় ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাঁতার জানা বা না-জানার বিষয়টি মশাইদের মাথায় খেলেইনি মোটে। স্পেন এবং ফ্রান্সের পার্বত্য অঞ্চলে হাইকিং করতে গিয়ে খাণ্ডবদহনে হালকা রোস্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে জনাসতেরো ইংরেজ পর্যটক। গরমি কমানো থেকে কোকেন উৎপাদনের দায় অবধি সবটাই ‘অসভ্য’ এশিয়ান, আফ্রিকান, আর লাতিন আমেরিকানদের ঘাড়ে চাপিয়ে ভেবেছিল প্রিস্টিন ইউরোপে কেবল ড্যাফোডিল ফুটবে আর নাইটিঙ্গেল গাইবে। উঁহুঁ বাপু, অত গুড় আধসের লয়কো! পশ্চিম থর থেকে উড়ে আসা ধুলোয় যেমন নাজেহাল দিল্লি-নিবাসী মিত্রোঁদের দস্তরখান ‘কিরকিরা’, হারমাট্টানের ধুলো এবং কাঁকর দিব্যি পৌঁছয় নিউ ইয়র্কে। এই খবরগুলো বাকায়দা রাখা প্রয়োজন। প্রকৃতি কার ভাগে কী সরিয়ে রাখবে, সে-সিদ্ধান্ত সামিট বৈঠকে স্থির হয় না— পারি-র বৈঠকে যে অন্তত হয়নি, সেটুকু বলাই যায়।
বহুকাল আগে কলকাতায় কোনও এক এক শীতের রাতে গেরস্তবাড়ির টিনের চালে বরফ জমেছিল। পাতলা আস্তরণ— স্কিইং বা স্নো ম্যান তৈরির আহ্লাদে মেতে ওঠার উপযুক্ত নয়— তবে এই যে প্রতিবারই মাঘ মাসে নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিই যে, এবার একটু ‘আর্লি সামার’, সে অবস্থা ছিল না কয়েক দশক আগেও। সোয়েটার না চাপিয়ে দুর্গাপুজোয় বেড়োনো ছিলো অকল্পনীয়, কালীপুজোয় ব্যানার্জিজেঠু এয়ারফোর্সের মোটা রেগুলেশন ওভারকোট, বালাক্লাভা, জুরাপ ইত্যাদির আস্তরণ সরিয়ে কাঁপতে-কাঁপতে বেরতেন— মন্ত্রশক্তির ওপর অহৈতুকি বিশ্বাস না থাকলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে কেবল উপবিতের ভরসায় মাতৃশক্তির আরাধনা সম্ভব নয়, তা ঘোর অবিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও বুঝেছিলাম। এখন বছরের ওই সময়ে এয়ার কন্ডিশনারের বিক্রি কেমন তা উৎসাহী পাঠকরা চাইলে খোঁজ নিতে পারেন— মনে হয় না ‘পিক’ সিজ়নের চাইতে কিছুমাত্র কম হবে। আমরা কচিকাঁচার দল পেট ঠেসে খিচুড়ি-লাবড়া সাঁটিয়ে অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় মা-কাকিমাদের চাদরের তলায় গুটিসুটি মেরে থাকতেম। সমাগত রক্তচক্ষু ভক্তকুল— অর্থাৎ কিনা জনাকতক ব্যাকওয়ার্ড গোছের কাকিমাকে বাদ দিলে মূলত কাকা, জ্যাঠারা— সিএসডি ক্যান্টিন থেকে ‘চাকর-বাকরদের’ বগাবত-প্রবণতা ডাইলিউট করার উদ্দেশ্যে জলের দরে ‘বিলোনো’ রাম নামক পানীয়টির টাইম টেস্টেড ইন্টার্নাল কম্বাশ্চনের ভরসায় দরাজ গলায় আড্ডা চালাতেন। কোনার কাকুর মতো দরিয়া দিল নবাবজাদারা নিজেদের সাপ্লাই লাইনটিকে ঠিক তো রাখতেনই, উৎসুক রামসেবকদের জন্যও যে বোতলখানেকের ব্যবস্থা থাকত, তার খবর আমরা রাখতাম। সামাজিক উৎসব থেকে বাদ কেউই পড়ত না, স্বেচ্ছায় বনবাসে না গেলে— আর আমাদের দেশের বনাঞ্চল শীতের রাতেও বরই মনোরম। সে গল্প পরে হবে’খন। ফলে মদ্যপান আরডুয়াস টাস্কে পরিণত হয়নি তখনও, ঘামতে-ঘামতে ‘ফায়েড্রাইস সিলিসিকনেস’ সহযোগে গলাদ্ধকরণের গর্ভযন্ত্রণাও নয়। আবহাওয়া, যাকে বলে দ্রুত-বিলম্বিত, ঠেকা জুগিয়েছে বরাবর।
গত কয়েক বছরে পরিবেশটা আগাপাশতলা বিষিয়ে যাওয়ার পিছনে এই হতবাক লোকগুলোর পূর্ণ সহযোগিতা ছিল। সবাই চেয়েছে বড়লোক হতে, পরিবারে একটার বদলে দুটো গাড়ি থাকা এবং গণপরিবহণ বর্জনই সাফল্যের সূচক মনে করেছে, নির্বিচারে গাছ কাটার সঙ্গে আগামী শীতে নতুন ‘পিকনিক স্পট’ খোঁজার দিকদারি ছাড়া অন্য কোনওকিছুকে জীবনে স্থান দেয়নি, এবং সোলার প্যানেল যে আসলে চায়ের জল গরম করার জন্যই বসানো হয়, সে-বিষয়ে সকলেই নিশ্চিত। এই যে একটানা লোকে বলে চলেছে ‘তোর চৈতন্য হোক’, ‘আমার চেতনা চৈতন্য করে দে মা’ বা ‘আমারই চেতনার রঙে’ ইত্যদি, বাঙালি তবু কিছু শেখে না কেন? সম্পূর্ণ ল্যাজেগোবরে ক্যালাস একটি জাতি কোথায় শিক্ষিত হয়ে উঠবে ক্রমশ তা নয়, শহরের রাতগুলোকে টুনিলাইটের ঝিকিমিকি করে দিল ঝুলন সাজানোর মতো।
তারপর কথা নেই, বার্তা নেই সব রাস্তায় বড়-বড় হ্যালোজেন। কেন রে বাপু, বাঘ বেরয় তোদের মহল্লায়, না কি রঘু ডাকাতের এলাকা? এই যে এত বিদেশে যাস, দেখিস না আলোর পরিকল্পনা শিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারদের হাতে ছাড়লে কেমন হয়? কেউ বলে দেয়নি শহরের গাছে নানা ধরনের পোকামাকড়, পশুপাখিদের বাস? কেউ বলেনি রাতগুলোকে দিন বানিয়ে ফেললে তাদের কতখানি অসুবিধা হয়? কেউ শেখায়নি রাতের, অন্ধকারের, আলোআঁধারির মাধুর্যও উপভোগের বিষয়, যে আঁধার আলোর অধিক, তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়নি কেউ? সব অন্ধকার গলি থেকে ধর্ষকরা বেরিয়ে আসার আশঙ্কাই যদি আলোকোজ্জ্বল শহরের বাস্তব পরিস্থিতি, তাহলে আলো লাগিয়েও কোনও লাভ আখেরে হয় কি? দেশের আশি শতাংশ গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছয়নি— তাদের বঞ্চিত করেই আমাদের মতো বিশ্বের সমস্ত উন্নয়নশীল দেশে শহরগুলোকে সাজানো হয়। কয়লা পুড়িয়েই সে বিদ্যুৎ তৈরি হয়, এবং হবেও, যদ্দিন সামান্য মজুরির কৃতদাস প্রথার সুবিধে কাজে লাগিয়ে মুনাফাখোরি চালানো যাবে সরকারি পরিকাঠামোর ঠেকনায়। উষ্ণায়নের প্রসঙ্গ থেকে এই বিষয়গুলোকে ছাঁটা হয় স্বাভাবিক রাজনৈতিক কারণে। আর আমরা আধুনিক হওয়ার চক্করে, ভিডিও গেমের চৌখুপিতে আটকে পড়ে, একাধিক সুসজ্জিত ফ্ল্যাটের স্কোয়ারফুট মাপার চক্করে খবরই রাখি না দিল্লির ঘুড়ির বাজার নষ্ট হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে। নিজেদের ছাদ নেই, অপরের মাঠগুলো তপ্ত তাওয়ায় রূপান্তরিত হল কেন, তার খোঁজ রাখার দায় ঝেড়েছি কীসের ব্যস্ততায়, কে জানে। কেবল এক বৃদ্ধ ঘুড়ির ব্যবসায়ী তার ছোট্ট, ঘুপচি দোকানে বসে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে বলে চলে, কীভাবে বাচ্চারা এই গরমে খোলা মাঠ বা শানবাঁধানো মেঝেয় দৌড়ে ঘুড়ি ওড়ানো ছেড়েছে বাধ্য হয়ে। এত গরমে খোলা মাঠ থেকে পাততাড়ি গুটিয়েছে সবাই। ক্রিকেট খেলা হচ্ছে রাতে, ছাদওলা অ্যাকাডেমিতে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ঘামে ভেজা শরীরে ছুটে-ছুটে বল কুড়িয়ে দেওয়া ক্রীতদাসদের পরবর্তী প্রজন্ম।
বড় বদলগুলো একদিন সবাইকে ডুবিয়ে মারবে। এদেশের বিস্তীর্ণ উপকূলবর্তী এলাকায় নোনা জল ঢুকছে, মিঠে জলের বহু হ্রদের জীববৈচিত্র আপাদমস্তক পালটেছে গত কয়েক বছরে। সে খবর রাখেন গরিব মানুষরা। আমাদের সঙ্গে তাঁদের দেখা হয় না, অতএব আমরা ছোটখাট বদলগুলো দেখতে পাই না। তবে জানলা দিয়ে পাশের বাড়ির ছেলেটাকে আর ঘুড়ি ওড়াতে দেখা যায় না কেন, সে প্রশ্ন মাঝেমধ্যে করলে হয়। কী বলেন?


