মানুষ প্রাণী হিসেবে বড়ই বিচিত্র। যে-মানুষ মঙ্গলগ্রহে বসতি গড়ার পরিকল্পনা করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ লিখিয়ে নিতে চায়, সেই মানুষই আবার শ্রাবণের ভ্যাপসা দুপুরে ঘামে ভিজতে-ভিজতে কয়েক লক্ষ মানুষের সঙ্গে বিষহরির মেলায় গিয়ে দাঁড়ায়। যেখানে সাপ, ওঝা, মন্ত্র আর মানত মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় বিপুল সংখ্যক পাঁঠাবলির প্রথা। এমনই সব বিশ্বাস আমরা ইনচুড়ার ঝাঁপান মেলায় দেখতে পাই, যার সামনে আধুনিক বিজ্ঞান অসংখ্য প্রশ্ন তোলে। এ যেন কবির সেই সুর:
‘তুমি বলবে, এ যে তত্ত্বকথা,
এ কবির বাণী নয়।
আমি বলব, এ সত্য,
তাই এ কাব্য।’
যুক্তিবাদীরা এইসব মেলার মধ্যে কুসংস্কার দেখে পাশ কাটিয়ে যান। কিন্তু ইতিহাসবিদ বা নৃবিজ্ঞানীরা তা পারেন না। কারণ তাঁরা প্রশ্ন তোলেন— এই বিশ্বাস এত শতাব্দী ধরে কীভাবে টিকে থাকল? কোন সামাজিক প্রয়োজন তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— যে মানুষের নাম রাজদরবারের দলিলে নেই, জমিদারের বংশলতিকায় নেই, সরকারি ইতিহাসের পাতায় নেই, সেই প্রান্তিক মানুষের ভয়, অসুখ, মৃত্যু ও আনন্দের ইতিহাস আমরা কোথায় খুঁজব?
আরও পড়ুন: সুন্দরবনের মানুষদের কাছে বনবিবির উপাখ্যান নিছক গল্প নয়, একটা জীবনচর্যা!
লিখছেন অমিতাভ ঘোষ…
সেই উত্তর খুঁজতেই হুগলির বলাগড় ব্লকের ইনচুড়া গ্রামের বিষহরি ঝাঁপানকে নিছক ধর্মীয় মেলা না বলে, বাংলার লোকসমাজের এক জীবন্ত আর্কাইভ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। মেলার বর্তমান সাংগঠনিক রূপের ইতিহাস ১৯২৮ সাল পর্যন্ত অনুসরণ করা যায়; তবে স্থানীয় লোকস্মৃতি একে নিয়ে যায় আরও অনেক পেছনে। প্রবীণদের মতে, একসময়ে এ-অঞ্চলে সাপের উপদ্রব বাড়ায় চিকিৎসাহীন মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়ত। তখন এক তান্ত্রিকের বিষহরি মায়ের ঘট স্থাপনের লোকশ্রুতি থেকে শুরু করে মন্দির, মেলা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠে সমষ্টিগত স্মৃতি। এখানেই ‘ইতিহাস’ আর ‘লোকইতিহাস’-এর তফাত। ইতিহাস জানতে চায়— ঘটনাটি কবে ঘটেছিল? লোকইতিহাস একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে— মানুষ ঘটনাটিকে কীভাবে মনে রেখেছে?
শ্রাবণের নাগপঞ্চমী ঘনিয়ে এলে ইনচুড়া তার দৈনন্দিন ভূগোল ছেড়ে এক সাংস্কৃতিক ভূগোলে ঢুকে পড়ে। মেলা মানেই শুধু ধর্ম বা বাণিজ্য নয়; এর তলায় লুকিয়ে থাকে এক পুরোনো ভয়— বিষের ভয়। আর সেই ভয়ের বিপরীতে মানুষের তৈরি প্রতিরোধের নাম বিষহরি।
মনসা বৈদিক দেবসমাজের কেন্দ্রীয় দেবী নন। কিন্তু বাংলার লোকধর্ম কেবল উপর থেকে নীচে নামেনি, নীচ থেকেও বহু বিশ্বাস ক্রমাগত উপরে উঠে এসেছে। ব্রাহ্মণ্যধর্ম তাদের কখনও প্রতিরোধ করেছে, কখনও-বা বাধ্য হয়ে আত্মস্থ করেছে। মনসা রাজপ্রাসাদের দেবী নন; তাঁর জগৎ নদী, জলাভূমি, কৃষিজমি, রোগ আর দৈনন্দিন নিরাপত্তাহীনতার। যে-প্রকৃতির সঙ্গে লড়ে নিম্নবর্গের মানুষ বাঁচে, সেই প্রকৃতিই এখানে দেবীর শরীর।
মনসার প্রতিষ্ঠার কাহিনির মধ্যেই এই স্বীকৃতির লড়াই লুকিয়ে থাকে। তিনি চান প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ক্ষমতা তাঁকে দেবী বলে মেনে নিক। আর সেখানেই প্রবেশ করেন চাঁদ সওদাগর (মনসামঙ্গল কাব্যে যিনি চন্দ্রধর বণিক)।
চাঁদ শুধু একগুঁয়ে বণিক নন; তিনি সম্পদ, বাণিজ্য ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। কোন দেবতাকে পূজা করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর হাতে। বিপরীতে মনসা সেই কাঠামোর বাইরে দাঁড়ানো দেবী। এই সংঘাত তাই স্বীকৃত বনাম অস্বীকৃতের।
ইনচুড়ার ঝাঁপানে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত একটি ছড়া এই সংঘাতকে স্পষ্ট করে—
‘হাতে মোর হেতালকাঠি, শিবের আমি দাস,
কানাকানি মনসা তোরে কে করে বিশ্বাস?’
অন্য পক্ষ জবাব দেয়—
‘পদ্মা বলে শোনরে চণ্ড, অহংকার তোর ছাড়ো,
লোহার বাসর ভেদ করিয়া লখিন্দরে মারো।’
এখানে ‘হেতালকাঠি’ প্রতিষ্ঠিত শক্তির দম্ভ আর কর্তৃত্বের প্রতীক। আর ‘চ্যাংমুড়ি’? ক্ষমতা যে নাম কাউকে ছোট করার জন্য দেয়, লোকসমাজ কখনও-কখনও সেই অপমানকেই কুড়িয়ে নিয়ে নিজের স্মৃতির অস্ত্র বানিয়ে ফেলে।
রবীন্দ্রনাথের ভাষায় যারা— ‘ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির / মূক সবে— ম্লানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর / বেদনার করুণ কাহিনী…’ — বলাগড়ের সামাজিক ইতিহাসেও সেই ভূমিহীন কৃষক, ক্ষেতমজুর, মাঝি-মাল্লা, কারিগর ও আদিবাসী মানুষের অভাব ছিল না। জমিদারবাড়ির আখ্যানে এঁরা প্রান্তবর্তী বা অনুল্লিখিত চরিত্র। বাবু-সংস্কৃতির ইতিহাসে এঁরা নীরব দর্শক বা শ্রমিক মাত্র।

অথচ লোকমেলার মাঠে এসে এই হিসেব বদলে যায়। এখানে ঢোকার জন্য কোনও আমন্ত্রণপত্র, পদবি, সংস্কৃত মন্ত্রের শুদ্ধতা কিংবা কৌলীন্যের শংসাপত্র লাগে না। মূলধারার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের পাশাপাশি এটি নিম্নবর্গের মানুষের তৈরি নিজস্ব বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিসর।
বিপ্রদাস পিপলাইয়ের ‘মনসামঙ্গল’-এ সপ্তগ্রাম-ত্রিবেণীসহ নদীনির্ভর বাংলার যে-ভূগোলের সন্ধান মেলে, বলাগড় ও তার পাশ দিয়ে বয়ে চলা বেহুলা নদী সেই স্মৃতিরই অংশ। চিকিৎসাবিজ্ঞানহীন সমাজে ঝাঁপানের ওঝারা ছিলেন একাধারে লোকচিকিৎসক, গায়েন ও অভিনেতা। প্রবীণদের স্মৃতিতে ঝাঁপানের রাত ভরিয়ে রাখত জাঁতগান ও বেহুলার করুণ আখ্যান—
‘কাঁদিসনে বেহুলা, জ্যান্ত হবে তোর পতি,
বিষহরি মার চরণে করগো মিনতি।’
এখানে বেহুলা শুধু পৌরাণিক চরিত্র নন, তিনি বিপর্যয়ের কাছে হার-না-মানা লোকসমাজের প্রতীক।
আজ সময় বদলেছে। ভারতের Wildlife (Protection) Act, 1972-এর ফলে জীবন্ত সাপ ধরা ও প্রদর্শন আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। ওঝাদের সেই প্রতিযোগিতার জায়গায় এসেছে প্রতীকী সাপ, শোভাযাত্রা ও লোকগান। কিন্তু উৎসব থামেনি। কারণ ঝাঁপানের প্রাণ শুধু সাপে ছিল না— ছিল মানুষের সমষ্টিগত স্মৃতিতে।
অথচ লোকমেলার মাঠে এসে এই হিসেব বদলে যায়। এখানে ঢোকার জন্য কোনও আমন্ত্রণপত্র, পদবি, সংস্কৃত মন্ত্রের শুদ্ধতা কিংবা কৌলীন্যের শংসাপত্র লাগে না। মূলধারার সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের পাশাপাশি এটি নিম্নবর্গের মানুষের তৈরি নিজস্ব বিকল্প সাংস্কৃতিক পরিসর।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিহাস এখানেই। চাঁদ সওদাগর যে-দেবীকে ‘চ্যাংমুড়ি কানি’ বলে তাচ্ছিল্য করেছিলেন, সেই দেবীই পরে বাংলার অন্যতম প্রধান লোকদেবী হয়ে উঠলেন। ইনচুড়ায় আজও তাঁর নামে শ্রাবণে মানুষের ঢল নামে। প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার অস্বীকৃতিকে ছাপিয়ে লোকসমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের সাংস্কৃতিক বৈধতা নিজেই ছিনিয়ে নিয়েছে।
জমিদারি প্রথা আজ বিলুপ্ত, বাবু সংস্কৃতির জৌলুস অতীত, নদীবাণিজ্যের পুরোনো পৃথিবী মৃত, এমনকী ওঝার ঝাঁপিতে সাপ বন্দি রাখার অধিকারও আজ আইন কেড়ে নিয়েছে। কিন্তু অপমানের তিলক ভেঙে বেরিয়ে আসা ‘চ্যাংমুড়ি’ হেরে যায়নি। শ্রাবণ এলে আজও মেলা বসে, হাজার-হাজার মানুষ আসে।
ইতিহাস কেবল ক্ষমতাবানের লেখা দলিল নয়; যাদের দলিল লেখার সুযোগ ছিল না, তারাও গান, ছড়া আর মেলার মধ্য দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব খোদাই করে রাখে। হাজার বছরের রাজদণ্ড আর হেতালকাঠির বিপরীতে দাঁড়িয়ে, ইনচুড়ার এই নিঃশব্দ লোকসমাজ আজও যেন এক অবাধ্য জেদে চিৎকার করে বলে— ‘নো পাসারান’!



