স্বপ্নের ফেরিওয়ালা
ইন্টারভিউতে যেমন র্যাপিড ফায়ার পর্ব হয়, সে-রকম যদি কেউ জিজ্ঞেস করেন, ব্যাঙ্কক বলতেই প্রথম কী মনে পড়ে? আমি বলব নাসির ভাই। না, উনি আমার আত্মীয় বা বন্ধু কিছুই নন। তবু নাসির ভাইকে ছাড়া ব্যাঙ্কক ভাবা যায় না। এবার থেকে অবশ্য ভাবতে হবে, কারণ খবর পেয়েছি মাস দু’য়েক আগে, চুপচাপ মানুষটি চলে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সদা বিষণ্ণ ও উদ্বিগ্ন মনে হত নাসির ভাইকে। পরবর্তী কালে যখন ব্যাঙ্কক গেছি, খুশি হয়েছি দেখে, নাসির ভাইয়ের হোটেল বড় হয়েছে, পাশের বহুতলে চার চারটি সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন, ভাড়া দেন ট্যুরিস্টদের। আমরাও সপরিবারে থেকেছি সাজানো-গোছানো সেই ফ্ল্যাটে। তবু কখনও চওড়া হাসি দেখিনি মুখে, ওই যেটুকু না হাসলে নয় সৌজন্যের খাতিরে, ওইটুকুই।
মনে পড়ল, ব্যাঙ্ককে নাসির ভাইয়ের হোটেলে এক ভরা বাদলের রাত জেগে ওঁর জীবনের গল্প শোনা। আপাত সাধারণ, নিজেকে প্রায় মাটিতে মিশিয়ে রাখা একটি মানুষের গল্প যে এমন রোমহর্ষক হতে পারে, ভাবা যায় না! দু’হাজার সালের গোড়ার দিকে নাসির’স বুটিক হোটেল ছিল একদম সাদামাটা, নীচে রেস্তোরাঁ আর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে মেজেনাইন ফ্লোরে গোটা চারেক ছোট ঘর। তার একটাতে আমার বাস, বলা বাহুল্য, সস্তায় পুষ্টিকরের লোভে। সুকুমভিটের ব্যস্ত এলাকায় এরকম কমদামি হোটেলের সন্ধান ভাগ্যিস দিয়েছিলেন এক দাদা। উপরি পাওনা, দুরন্ত খাবার। যে-কারণে কাজে বা বেড়াতে ব্যাঙ্ককে গিয়ে আপামর বাঙালি পাঁচতারা ছেড়ে নাসির’স-এ টু মারে, তা হল অসাধারণ মেনু। তেল-কই থেকে চিংড়ির পোলাও, বোয়ালের ঝাল থেকে পান্তা ভাত, অর্ডার করলেই পাতে হাজির। আর বাংলাদেশী স্টাইলের ভুনা বা সালোন খেতে চাইলে তো এক্সট্রা খাতির। সেই প্রথম আমি বুটিক হোটেলের আসল মানে জানলাম। এতকাল দেখে এসেছি, বুটিক মানে ডিজাইনার, এক্সক্লুসিভ এবং দামি জামাকাপড়ের শো-রুম। কিন্তু হোটেলের বেলায় যে বুটিক মানে বাজেট, সেটা জানতাম না।
কলকাতার বাঙালির নামে আমেরিকায় রাস্তা? পড়ুন: ডেটলাইন পর্ব ৫১…
আদতে বাংলাদেশী, খুব কম বয়সে একদিন হঠাৎ করেই চলে এসেছিলেন থাইল্যান্ডে, বাঁকা পথে। কাজ খুঁজতে-খুঁজতে এক ভদ্রলোকের গাড়ি চালাতে শুরু করেন। তাঁর ছিল ব্যাঙ্ককে হোটেল আর অন্য অনেক ব্যাবসা। কয়েক বছর পর আচমকা মালিকের মৃত্যু হল। মহা বিপদে পড়লেন নাসির। এতদিন গা ঢাকা দিয়ে থাকতে অসুবিধা ছিল না, মাথার ওপর এক ধনী থাই মানুষের হাত ছিল। এবার কী হবে? হঠাৎ আলোর ঝলকানির মত তাঁর ছেলেরা জানাল, উনি হোটেলটি দিয়ে গেছেন নাসিরকে। খুশির খবর সন্দেহ নেই, কিন্তু নাসিরের না আছে থাই নাগরিকত্ব, এমনকী বাংলাদেশের পাসপোর্টে বৈধ ভিসার ছাপও নেই। এখন সম্পত্তি দখল নিতে গেলে বিপদ, সোজা জেলে। উপায় বাতলাল ওই ছেলেরাই। অথচ ওরা ইচ্ছে করলেই নাসিরকে ভাগিয়ে দিয়ে নিজেরা হোটেলটা নিয়ে নিতে পারত। কথায় বলে না, ভাগ্য যখন সহায় হয়, বন্ধ দরজাগুলো আস্তে-আস্তে খুলে যায়!
পরিচিত এক থাই মুসলিম মহিলার সঙ্গে নাসিরের বিয়ে ঠিক করল তারা, যাতে সঙ্গে সঙ্গে থাই নাগরিকত্ব পাওয়া যায়। আটের দশকের সেই বিয়ে কিন্তু আমৃত্যু টিকে ছিল নাসির ভাইয়ের। আমিও দেখেছি ভাবীকে, হিজাব পরা গোঁড়া মুসলিম, মাদ্রাসা চালাতেন। সপ্তাহে একদিন হোটেলে আসতেন, সেদিন থরহরিকম্প থাকত নাসির ভাই-সহ সব কর্মীরা। মনে আছে, কাঁচুমাচু মুখে বোকা হাসি নিয়ে নাসির ভাই বলেছিলেন, ‘খুব কেয়ার করে বুঝলেন। আমি তো হোটেলেই থাকি। একদিন করে আসে আমার নোংরা জামাকাপড় নিয়ে যাওয়ার জন্য। কেচে, ইস্ত্রি করে দিয়ে যায়।’

সে-যাত্রা ব্যাঙ্কক গেছিলাম ট্রাভেল শোয়ের শ্যুটিংয়ে। রাতের ব্যাঙ্কক দেখাব না তা কী হয়! বেশির ভাগটা এডিট করে অবশ্যই। মাঝরাতে আমি আর ক্যামেরাম্যান বেরব শুনেই নাসির ভাইয়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ। অথচ কে না জানে ব্যাঙ্কক কখনও ঘুমোয় না! হোটেল থেকে হাঁটাপথে দুটো গলি পরেই প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদনের এলাকা। সেখানে আসলে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার মানে হয় না। নিশি নিলয়ের ভেতর ঢোকার প্রশ্নই ওঠে না। রাস্তায় একপাক হেঁটে যা দেখা যায়, তার ২০ শতাংশও দেখাতে পারব না বাংলা টিভি চ্যানেলে। নাসির ভাই কিছুতেই আমাদের ছাড়লেন না। যদি কিছু বিপদ হয়! অনেক বোঝালাম, কাজের খাতিরে আমাদের অনেক বিপজ্জনক জায়গায় যেতে হয়। ঠিক সামলে নেব। কিছুতেই শুনলেন না। কিন্তু পরে বুঝেছিলাম, নাসির ভাই সঙ্গে থাকায় কত সুবিধে হয়েছে। পথের ধারে মাসাজ পার্লারের মেয়েরা থেকে রেস্তরাঁর বাইরে পোল ড্যান্স করে লোক টানা ‘লেডি বয়’রা পর্যন্ত কী খাতির করে এঁকে। উনি সঙ্গে না থাকলে ক্যামেরা খোলাই মুশকিল হত। এখানে লেডি বয় ব্যাপারটা একটু বলে নিই কারণ এই শব্দটা আমি আর কোনও দেশে শুনিনি। তৃতীয় লিঙ্গ বা রূপান্তরকামীরা থাইল্যান্ডে বিনোদন দুনিয়ার কেন্দ্রবিন্দু বলা যায়। সৌন্দর্য আর গ্ল্যামারের চোখধাঁধানো মিশেল শুধু নয়, নাচে-গানে-অভিনয়ে এরা তুখোড়। নানা প্লাজা বা সয় কাউ বয়ের নামকরা বারগুলো বা ক্যাবারে শোতে হয়তো সবাই যান না, কিন্তু পরিবারের ছোট-বড়দের নিয়ে উপভোগ করার মতো শো অনেক হয় ব্যাঙ্ককে। সেই সব শোতে পারফর্ম করেন লেডি বয়রাই। শরীরকে দুমড়ে-মুচড়ে যে-কোনও অ্যাঙ্গেলে নিয়ে যাওয়ার যে নান্দনিক পারদর্শিতা তাঁরা দেখান, তা হার মানায় বিখ্যাত অপেরাকেও। সাজ, অভিব্যক্তি, সুর, ছন্দ সব মিলিয়ে মনে রাখার মত প্যাকেজ। আসলে থাই সমাজে এই যে রূপান্তরিত মানুষদের এত কদর, তার শিকড় হিন্দু শাস্ত্রের অনেক গভীরে। এশিয়ার বহু দেশেই, এমনকী ভারতেও অর্ধনারীশ্বরকে পুজো করার চল আছে। অর্ধেক শিব আর অর্ধেক পার্বতী। মহাবিশ্বের সৃষ্টিশক্তির অবিচ্ছেদ্য দুই রূপ। পুরুষ ও প্রকৃতি, একে অন্যকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি মন্দিরে অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি আছে। অথচ আমাদের দেশের সমাজে, এমনকী পরিবারেও রূপান্তরকামীরা উপহাস আর অত্যচারের শিকার। প্রাইড মার্চের উদ্যাপনে যা ঢাকা পড়ার নয়।
থাইল্যান্ডের অনেক জায়গাতেই অর্ধনারীশ্বরের মন্দির আছে। সুকুমভিটের রাজপথেই দেখেছি কাচে ঘেরা অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি। পায়ের কাছে ফুল, ফল-ফান্টার বোতল রেখে গেছে মানুষ। এরকম উপচার অবশ্য থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও দেখেছি। পুজোর ডালাতে ফুল, ফল ঠিক আছে, কিন্তু কোল্ডড্রিঙ্কস কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে এক পুরোহিত জানিয়েছিলেন, লাল বা কমলা রং উষ্ণতার প্রতীক, তাই ভক্তেরা ভালবেসে ভগবানকে উজ্জ্বল রঙের পানীয় দিয়ে আপ্যায়ন করেন। বজ্রযান বৌদ্ধধর্মে অবশ্য তান্ত্রিক মতে পুজো হয় বলে গাঁজা, সিগারেট, মদ থাকে অর্ঘ্যে। কাম্বোডিয়া আর থাইল্যান্ডে এরকম মন্দিরও দেখেছি। তবে বৌদ্ধরা যে মঠে, মন্দিরে, এমনকী রাজপ্রাসাদেও পোশাকের ব্যাপারে ভীষণ কড়া, সেটা না জানলে বিপদে পড়বেন থাইল্যান্ডে। পা ঢাকা পোশাক তো পরতেই হবে, ছেঁড়াফাটা জিনস নৈব-নৈব চ, উর্ধাঙ্গে হাতকাটা কিছু চলবে না। নিয়ম না মানলে হয় ফিরে যেতে হবে, নয়তো সামনের দোকান থেকে পাজামা কিনে পরতে হবে। যাঁরা নেটে থাইল্যান্ডের সৈকতে খোলামেলা ছবি দেখে মুগ্ধ, ট্রাভেল ব্রোশিওরে উত্তেজক সব খেলাগুলোর খবরে রোমাঞ্চিত, ব্যাঙ্ককের রাস্তায় স্বল্পবসনা সুন্দরীদের চটুল হাসিতে মুদ্ধ, তাঁরা হকচকিয়ে যাবেন এমন রক্ষণশীলতায়। তাই বলি, সাধু, সাবধান।

কিছু বিদেশে সাবধান হওয়া সত্যিই জরুরি। এ-বিষয়ে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় সব বিশ্ব সমান। আমরা যাব ছাও ফ্রায়া নদী পেরিয়ে ওয়াট অরুণ মন্দির দেখতে। কথাটা আসলে ‘বিছানায় শয্যাশায়ী’র মতো ভুল হল কারণ থাই ভাষায় ওয়াট মানে মন্দির টেম্পল অফ ডন। সূর্যের রথের সারথি অরুণ, আবার প্রথম সূর্যের আলোও অরুণ। ফেরিঘাটে পৌঁছে ফাঁকা টিকিট কাউন্টারে গিয়ে শুনলাম, আজ ফেরি বন্ধ। ওপারে যেতে গেলে বিপুল টাকা দিয়ে ফেরি রিজার্ভ করতে হবে। এখানে বলে রাখি, থাইল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে ট্যুরিস্ট-পসন্দ দেশগুলোর একটা হলেও ইংরেজি এরা তেমন শেখেনি। ফলে সাধারণ হোটেলে-রেজরায়-দোকানে বোঝানো খুব মুশকিল। সেভেন ইলেভেন ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের তাকে বিস্কিট না খুঁজে পেয়ে, সেলসগার্লকে কোনওমতেই বোঝাতে পারিনি কী চাই। আর একজায়গায় শুধু থাই ভাষায় লেখা থাকায় বুঝিনি যে পেট শপ, ডগ বিস্কিট দিয়েছিল আমার হাতে। পাটায়ার পাঁচতারা হোটেলে পর্যন্ত রিসেপশনের মেয়েটি অনেক অঙ্গভঙ্গি করেও বোঝাতে পারল না যে ঘরের চাবি ওরা জমা রাখে ডেস্কের ভেতর দিকের একটা বক্সে। সেখান থেকে চাবি সংগ্রহ করতে লেগেছিল পাক্কা কুড়ি মিনিট।


যাই হোক, ফেরি ভাড়ার অঙ্ক শুনে চমকে উঠলেও আমরা ভাবলাম, টুকটুক (বড়সড় অটো) করে এসে পড়েছি যখন এতদূর, কী আর করা! টাকা দিতে যাচ্ছি, হঠাৎ কাউন্টারের পিছনের জানালা দিয়ে দেখলাম, নদীর বুকে যাত্রী বোঝাই ফেরি। সন্দেহ হল। বাইরে বেরিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখানে আর কোনও কাউন্টার আছে?’ সে বলল, ‘ঐ তো একটু এগোলেই আরও দুটো আছে।’ গিয়ে দেখি, দিব্যি ফেরি চলছে এবং ভাড়া সামান্য। ওখানকার লোকরাই বলল, ট্যুরিস্ট বুঝে মিথ্যে বলেছে।
থাইল্যান্ডের অনেক জায়গাতেই অর্ধনারীশ্বরের মন্দির আছে। সুকুমভিটের রাজপথেই দেখেছি কাচে ঘেরা অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি। পায়ের কাছে ফুল, ফল-ফান্টার বোতল রেখে গেছে মানুষ। এরকম উপচার অবশ্য থাইল্যান্ডের বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতেও দেখেছি। পুজোর ডালাতে ফুল, ফল ঠিক আছে, কিন্তু কোল্ডড্রিঙ্কস কেন?
ওয়াট অরুণের অসাধারণ স্থাপত্য, রাজপ্রাসাদের মহিমা, ফ্লোটিং মার্কেটের মজা, সাফারিতে ডোপড রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মাথা কোলে নিয়ে ছবি তোলার আদিখ্যেতা, ফ্লেমিংগোদের ফ্যাশন শো, ডলফিনের সার্কাস, পথের ধারে রেস্তরায় সাজানো রাক্ষুসে সাইজের অক্টোপাস, শপিংয়ের স্বর্গ এক-একটা মল— ব্যাঙ্কক আসার হাজার একটা কারণ আছে। আর রসিকজনের জন্য আছে বিশেষ আকর্ষণ, বুঝহ যে জন জানহ সন্ধান!

আমি শেষ করব আবার সেই নাসির ভাইয়ের কথা দিয়ে। সন্ধেবেলা দাঁড়িয়ে আছি হোটেলের বাইরে। দেখবেন, আলো মরে গিয়ে সাঁঝ নামার মুহূর্তে হঠাৎ কেমন চুপচাপ হয়ে যায় চারপাশ। সেই আধো অন্ধকার নীরব পথের মাঝখান দিয়ে টুংটুং করে ঘণ্টা বাজিয়ে এগিয়ে আসছে এক ফেরিওয়ালা। তার ঠেলাগাড়ির কাচের বাক্সে আলো জ্বলছে। কেমন যেন মনে হল, ছোটবেলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। কাছে আসতে দেখি, গুবরে পোকা, আরশোলা আর অনেকরকম ছোট-ছোট পোকা ভাজা বিক্রি করছে চানাচুরের মতো ওজন করে। নাসির ভাই মজা করে বললেন, ‘খাবেন নাকি?’ আমার বিকৃত মুখভঙ্গি দেখে হেসে উঠলেন আর আমি চমকে উঠলাম। নাসির ভাই এমন দরাজ হাসতে জানেন? স্লেটরঙা আকাশের দিকে চেয়ে বললেন, ‘জানেন, আমাদের ছেলেবেলায় ঢাকার গলিতে এরকম ঘণ্টা বাজিয়ে আসত কাচের বাক্সে মিঠাই ফেরি করতে। আমরা ছুটে যেতাম, ঘিরে ধরতাম। কেনা হত না সবসময়ে, পয়সা কই? তাও কী আনন্দ!’ এবার বুঝলাম, শিকড়ছেঁড়া মানুষের মুখ কেন অমন বিষণ্ণ হয়।



