ছোট বাচ্চাদের ট্রেনিংয়ের মাঠে আচমকাই ঢুকে পড়েছিল সে। কেউ মারাদোনার ‘১০’ নম্বর। কেউ বেকহ্যামের ‘৭’ নম্বর জার্সি পরেছে। সেই সঙ্গে আবার অনেকগুলো হরেক সাইজের কুচোকাচা মেসি। কেউ সাদা, কেউ কালো, কেউ দোঁ-আঁশলা— স্প্যানিশ-পর্তুগিজ দুটো ভাষাতেই নোংরা জাতিবিদ্বেষী কুকথায় যাদের বলা হয় ‘মুলাটো’— আর রাজনৈতিকভাবে সঠিক, শালীন ভাষায় বলতে গেলে ‘মাল্টি-রেসিয়াল’। এদের বেশিরভাগেরই গায়ে নিজের সাইজের চেয়ে বড় ঢোল্লা নীল-সাদা আর্জেন্টাইন ‘নাম্বার টেন’। আর সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে খাটো বাচ্চাটা চাপিয়েছে ‘মেসি’ লেখা বার্সার একটা বেঢপ জার্সি। ছেলেগুলো নিজেদের মতোই ফুটবল নিয়ে কাড়াকাড়ি খেলছিল। আর তাদের খেলার মাঠে অনাহূত ঢুকে পড়া ভিনি নিজের মনেই সেই খেলার কমেন্ট্রি করছিল।
এই অবধি কোনও সমস্যাই ছিল না। কিন্তু বাচ্চাদের বলটা একবার ছিটকে চলে এল ভিনির কাছে। সে একটা শট মেরে দিব্যি বলটা ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারত ওদের কাছে। কিন্তু ভিনির পা-দুটো হঠাৎই কেমন যেন নিশপিশ করে উঠল। বলে ছোটখাটো স্ট্রোক দিতে-দিতে আর হালকা ড্রিবল করতে-করতেই সে মাঠের একেবারে ভেতরটায় ঢুকে আসে। কয়েকটা বাচ্চা বল নিতে এগিয়ে এলেও ভিনি ড্রিবল করতেই থাকে। একজন, দু’জন, তিনজনকে কাটিয়ে, এগিয়ে আসা খোকা গোলিটাকেও ‘নাটমেগ’ করে— মানে পায়ের তলা দিয়ে বল গলিয়ে দেয়। বাচ্চাগুলোর চোখে মুগ্ধতা। এমনকী, একটু আগেই ভিনির বল-স্কিলে শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে যে-ছেলেটা মাটিতে হুমড়ি খেয়েছিল, সে-ও অবাক চোখে প্যান্টের ধুলোটুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: বিশ্বকাপের আলো, অভিবাসীদের অন্ধকার!
লিখছেন রোদ্দুর মিত্র…
কিন্তু তেড়ে এসেছে তার বাবা। ‘কে মশাই আপনি? শিং ভেঙে বাছুরের দলে গুঁতোগুঁতি করতে ঢুকেছেন? আপনার জন্য আমার ছোট্ট ছেলেটা ভয়ে কেমন সিঁটিয়ে গেছে দেখেছেন?’ লোকটার মেজাজ আরল গলা দুটোই ক্রমশ চড়ছিল। ভিনিও যেন একটু ঘাবড়ে, গুটিয়ে যাচ্ছিল। একটু অপ্রতিভ, বোকা-বোকা হাসি আর মিইয়ে যাওয়া গলায়, আমতা-আমতা করে নিজের সাফাই দিচ্ছিল। আর কিছুক্ষণ অমনি চললে, লোকটা হয়তো দলবল জুটিয়ে ভিনির ওপর চড়াও হয়েই বসত। কিন্তু তখনই কোত্থেকে এক হোঁতকা ফুটবল আর একগাদা লোকজন নিয়ে দু’জনের মাঝে ঢুকে পড়ল ম্যাল। ম্যাল, মানে ম্যাল ব্র্যাডলি, লন্ডনের শহরতলি এলাকায় যুব ফুটবল কোচিংয়ের জীবন্ত কিংবদন্তি— একধারে সে যেন স্যর অ্যালেক্স ফার্গুসন, আর্সন ওয়েঙ্গার, পেপে গুয়ার্দিওলা আর একদা জ্যাংড়াবাসী আমাদের বৃদ্ধ অমল দত্তর কম্বো অফার। গলি-মহল্লার মাঠে ঘুরে-ঘুরে তিনি কিশোর প্রতিভা খুঁজে বেড়ায়। চোখের সামনে ম্যালকে দেখে রগচটা বাবাটাও মুহূর্তে গলে জল। গদগদ গলায় হাত কচলাতে-কচলাতে বলে, ‘আমার ছেলেটার খেলা যদি একটু দেখতেন!’ কিন্তু ম্যালের চোখ, মন তখন ভিনিকেই দেখছে। তার ওই উদাসীন, অন্যমনস্ক, কিছুতেই কিছু এসে যায় না ভঙ্গিটাকে দেখছে। আর ওই মুহূর্ত থেকেই ম্যাল আর ভিনির জীবন, ফুটবল নামের একটা আশ্চর্য খেলার অদৃশ্য সুতোয় জড়িয়ে যায়। আর এভাবেই থিয়া শারকের ছবি ‘দ্য বিউটিফুল গেম’-এর প্রস্তাবনা পর্বটা সারা হয়ে যায়।
আসলে ম্যাল একটা ফুটবল দল তৈরির জন্য দিন-রাত এক করে ফেলেছে। রাতের ঘুমেও ঢুকে পড়ছে সেই দল গড়ার চিন্তা। এই দল রোমে যাবে ‘হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপ’ বা গৃহহীন মানুষদের বার্ষিক বিশ্বকাপ ফুটবলে ইংল্যান্ডের হয়ে অংশ নিতে। সেদিক থেকে দেখলে ম্যাল সত্যিই এই মুহূর্তে একটি জাতীয় দলের কোচ, আর সেই দলের স্ট্রাইকারের জায়গাটা জোরদার করতেই সে তাঁর স্কোয়াডে ভিনিকে চাইছে। ভিনির বল-টাচ, বডি-সোয়ার্ভ বা তাদের ওই ঘরছাড়া ব্রিগেডের তথাকথিত ‘দুর্ভেদ্য’ গোলরক্ষককে চ্যালেঞ্জ করে বলে-বলে গোল দেওয়া আর পুরো ব্যাপারটাতেই এ-আর-এমন-কী গোছের একটা ক্যাজুয়াল ভঙ্গি— সবটা মিলিয়ে ম্যালের মনে হয়েছিল, এই লোকটা যে-কোনও সময় ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে। তাই ভিনি এই সাড়ে বত্রিশ ভাজা-মার্কা টিমের চক্কর থেকে কেটে পড়তে চাইলেও, ম্যাল তাকে ছাড়ার পাত্র নয়।


এই প্রসঙ্গে একটা কথা জানিয়ে রাখা দরকার। এই যে দুনিয়ার গৃহহীন মানুষদের ফুটবল বিশ্বকাপ, এটা কিন্তু ‘দ্য বিউটিফুল গেম’-এর পরিচালক থিয়া বা তাঁর চিত্রনাট্যকার ফ্র্যাঙ্ক কট্রেল বয়েসের কোনও ইউরোপীয় ভাবনা নয়। সত্যিই ‘হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপ ফাউন্ডেশন’ নামে একটা এনজিও-র উদ্যোগে সেই ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর এমন একটা বিশ্বকাপের আয়োজন হয়ে আসছে। ২০১০ থেকে মেয়েদেরও একটা আলাদা বিভাগ চালু হয়েছে। এই মুহূর্তে ছেলেদের চ্যাম্পিয়ন মিশর আর মেয়েদের উগান্ডা। আর দুটো বিভাগেই এখনও অবধি সবচেয়ে বেশিবার কাপ জেতার রেকর্ড মেক্সিকোর— সদ্য-সদ্যই যারা ইংল্যান্ডের কাছে হেরে আমাদের চেনা, তথাকথিত আসল বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল (রাউন্ড অফ ১৬) থেকে ছিটকে গেল।
আসলে এসব তথ্য-পরিসংখ্যান কিছুই না। গৃহহীন বিশ্বকাপের আসল জোরের জায়গা এই ভাবনাই, আর সেই ভাবনাটাকে রূপ দেওয়ার সময়টা। একুশ শতকের এই পুরোটা সময় জুড়ে দুনিয়াভর নয়া-ঔপনিবেশিক হানাদারি, দখলদারি, জাতিদাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক হানাহানি, গৃহযুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী যখন কোটি-কোটি মানুষের ঘর-বসত-আশ্রয়, ঠিকানা-পরিচয়, পরিবার-দেশ সব কেড়ে নিচ্ছে— তখন এই আজব বিশ্বকাপ নানা দেশের এই বেঘর, বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকে শুধু ফুটবল দিয়ে জুড়তে চেয়েছে। কারণ, এই মাটির পৃথিবীতে, ফুটবল একমাত্র সেই সর্বজনীন সাংস্কৃতিক সত্তা, যার জাত, ধর্ম, দেশ, কাল, ভাষা কিচ্ছু হয় না। সাড়ে চারশো গ্রাম ওজনের ওই হাওয়াভরা গোল চামড়ার বলটাই হয়ে উঠতে পারে একটা সমান্তরাল পৃথিবী।
এই প্রতিযোগিতায় একবার খেলে এসেই এইসব ঘর হারানো, রাস্তায় হকারি করে পেট চালানো বা নেশামুক্তি কেন্দ্রে বারবার ঢোকা-বেরনো মানুষগুলোর জীবন একদম রাতারাতি বদলে গেছে, যাচ্ছে বা যাবে এমনটা নয়। সাত-সাত চোদ্দো মিনিটের কয়েকটা ‘ফোর-এ-সাইট’ ম্যাচে তাদের খেলা দেখে এইসব চালচুলোহীন লোকজনকে বায়ার্ন মিউনিখ, বার্সেলোনা, এ সি মিলান বা লিভারপুল, নিদেনপক্ষে বোকা জুনিয়র্স, সাও পাওলো বা স্যান্টোসও ‘এসো আমার ঘরে এসো’ বলে খাতিরযত্ন করে সই করাবে, এমনটাও নয়। কিন্তু এই ফুটবল উৎসবটা কোথাও, এই গৃহহীন মানুষদের তাদের মতোই আরও কিছু মানুষের সঙ্গে, চারপাশের সমাজের সঙ্গে, নিজের বা ভাসতে-ভাসতে চলে আসা নতুন দেশের মাটির সঙ্গে— একটা শিকড়ের যোগ তৈরি করতে শেখায়। চিরকালের উপেক্ষা, অবহেলা, তাচ্ছিল্য পেয়ে আসা, বেঁচে থাকার প্রতি মুহূর্তে আরেকটু বেশি করে প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানুষগুলো নিজের অস্তিত্বকে আরেকটু গুরুত্ব দিক, নিজের জন্য গর্বিত হোক, নিজেকে ও নিজের মতোই পৃথিবীর আরও অনেক মানুষকে সম্মান করুক— ‘হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপ’-এর লক্ষ্য শুধু এটুকুই, ব্যাস!
তবু চোদ্দো মিনিটের এই খেলা এইসব মানুষ বা ওই বিশ্বকাপের প্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবলারদের কাছে কিন্তু ‘আসল’ বিশ্বকাপই! তার চেয়েও বড় কথা, ২০০৩-এ এই খেলার আসর শুরু হওয়ার পাঁচ বছর আগেই, ১৯৯৮-এ বিশ্বকাপ জয়ী নীল জার্সির ফরাসি ফুটবলদলকে ‘লো ব্লুজ’-এর পাশাপাশি কোথাও ঠাট্টা, কোথাও গর্ব মিশিয়ে ‘ব্ল্যাক ব্লঁ বেউর’ বলে ডাকা শুরু হয়ে যায়। মানে সাদা, কালো আর আরবদের নিয়ে তৈরি ফুটবল-বিগ্রেড। উপনিবেশের স্মৃতি, ইতিহাস আর অভিবাসনের বাস্তব, বর্তমান মিলিয়েই নতুন শতাব্দীর ইউরোপের বহুত্ববাদী, অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়া সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার প্রতিফলন শুধু ফ্রান্স নয়— ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, বেলজিয়ামের জাতীয় ফুটবলদলেও দেখা গেল। এমনকী, আর্য-রক্তের শুদ্ধতা ও জাতীয় গরিমার নাম করে আস্ত একটা বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়া জার্মানিও অভিবাসী ফুটবলারদের জন্য জাতীয় দলের দরজা বন্ধ করতে পারল না।
অবশ্য ইউরোপীয় ফুটবলে এই ‘অভিবাসীকরণ’ যে মসৃণ সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে গেছে বা যাচ্ছে, এমনটা নয়। নিজের দেশের দক্ষিণপন্থী নেতা বা নেত্রীদের কাছ থেকে, গায়ের রক্ত তুলে, জাত-ধর্ম তুলে, যথেষ্ট ফরাসিপনার অভাব তুলে খোঁটা শুনতে হয়েছে জিনেদিন জিদানদের, করিম বেঞ্জিমাদের— এখনও শুনতে হচ্ছে এমবাপে-ডেম্বেলেদের। শুধু স্বদেশি জাতিবিদ্বেষীরাই নয়, এই সেদিন প্যারাগুয়ের সঙ্গে প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালে, এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে গরম ম্যাচের পরে, লাতিন আমেরিকান দেশটার এক মহিলা সেনেটরও এমবাপেকে বর্ণবিদ্বেষী গালি দিয়েছেন। সেনেগালের সঙ্গে ৮৬ মিনিট অবধি ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পরে যার দুর্ধর্ষ গোলে বেলজিয়ামের চেগে ওঠা বা ‘কামব্যাক’ শুরু, সেই রোমেল লুকাকু ফুটবলের এই অভিবাসন বা বিশ্বায়ন নিয়ে তাঁর গোলের মতোই একটা দামি কথা বলেছেন। ‘আমি যখন গোল করে ম্যাচ জেতাই, তখন আমি বেলজিয়ামের গর্বিত জাতীয় মুখ। আর গোল ফসকালেই হয়ে যাই স্রেফ কঙ্গোর অভিবাসী।’ ২০২০-তে ইউরো ফাইনালে টাইব্রেকারে গোল করতে না পেরে সাকা-র্যাশফোর্ডরাও হারে-হারে এই সত্যিটা টের পেয়েছিলেন।
এখন এসব তো ‘চলতাই রহেগা’। এবারেও ৩২-এর বেড়া টপকাতে না পেরে জার্মানিতে গুঞ্জন উঠবে, অভিবাসী-ভেজালেই চিরকালের সেই নাছোড় লড়াকু জার্মান ব্র্যান্ড স্পিরিটে টান পড়ছে। তার পরেও তো এই দুই-আড়াই দশকে ফুটবল-ইতিহাসের অনেক পুরনো গল্প নতুন করে লেখা হচ্ছে, হবে। অভিবাসনের উলটো রথযাত্রায় জন্মাচ্ছে অনেক নতুন রূপকথা। যেমন কাতার বিশ্বকাপে মরক্কো বা ২০২৬-এ আফ্রিকার মানচিত্রের পাশে কয়েকটা ফুটকির মতো, মধ্য অতলান্তিকের কালো বুকের ভেতর ভেসে থাকা কয়েকটা আগ্নেয়দ্বীপের পুঞ্জ বা আর্কিপেলাগো— কেপ ভার্দে বা কাবো ভার্দে। সে-রূপকথায় ঘরছাড়া, শিকড়হারা অনাবাসী যুবকরা কয়েক সমুদ্র পেরিয়ে আবার কুলায় ফিরছেন দেশের মাটি আর ফুটবলের টানে। সে-দলে চল্লিশ-পেরনো বিষণ্ণ মুখের কোনও গোলরক্ষক আছেন, যার বাকি ফুটবল-জীবনটা হয়তো তাদের প্রাক্তন ঔপনিবেশিক প্রভু পর্তুগালের দ্বিতীয় বা তৃতীয় ডিভিশনের কোনও দলের শেষ রক্ষণ আগলাতে-আগলাতেই কেটে যেত। আছেন আইরিশ মা আর কেপ ভার্দিয়ান বাবার সন্তান— আয়ারল্যান্ডের মাঝারি একটা টিমের রক্ষণের পাশাপাশি যাকে বন্ধকী এজেন্সির পার্ট-টাইম চাকরিটাও সামলাতে হয়।
২০২৬-এর বিশ্বকাপ ফুটবল, এই দেশছাড়া-ঘরছাড়া মানুষদের জীবন-অস্তিত্বকে একটা নতুন তাৎপর্য, মর্যাদা, মহত্ত্ব তো দিল! হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপও তো ফুটবলের হাত দিয়েই গৃহহীন মানুষদের সেই মর্যাদাই ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে। এই জায়গা থেকেই আমরা ‘দ্য বিউটিফুল গেম’ ছবিটাকে খানিক পড়তে পারি। কেপ ভার্দের কোচ ব্রিটো, যাঁর আদরের নাম বুবিস্তা, তিনি যেভাবে ‘লিঙ্কড ইন’-এ বিজ্ঞাপন দিয়ে জাতীয় দলের জন্য ফুটবলার খুঁজছিলেন, তার সঙ্গে ছবিতে ম্যালের মরিয়া স্কাউডিং-এর মিল পাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু ২০২৪-এর ওটিটি প্ল্যাটফর্মের ছবি ‘দ্য বিউটিফুল গেম’, ২০২৬-এর বিশ্বকাপের ময়দানে থেকে যাচ্ছে একটু অন্যভাবে। এটা ঘটনা যে, গতব বারো বছর ধরে হোমলেস ওয়ার্ল্ড কাপের আসর থেকে খালি হাতে ফেরত আসা ম্যাল ব্র্যাডলি এবার ট্রফিটা জিততে চেয়েছিল। সেখানে স্ট্রাইকার হিসেবে ভিনি-র স্কিল তাঁর কাজে লাগবে, এটাও ঠিক। কিন্তু ভিনি যখন একদা ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেডের যুব দলে খেলার দেমাকে দলের বাকি সদস্যদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়, তখন ম্যাল প্রতিবাদ করে।

ম্যাল ভিনিকে বোঝাতে চেয়েছিল, ফুটবল শুধুই দারুণ ড্রিবলিং, নিখুঁত পাসিং বা জাল-কাঁপানো দুর্ধর্ষ গোল নয়। একদা হেরোইনাসক্ত নাথান, ভবঘুরেদের হোমে বড় হওয়া জেসন, শিশুপুত্রের প্রতি দায়িত্বপালন না করার জন্য অভিযুক্ত ক্যাল বা প্রাণ বাঁচাতে দেশ-ছেড়ে-আসা সিরিয়ান-কুর্দ আলবার— এদের প্রত্যেকেরই কোনও-না-কোনও গল্প আছে। ফুটবল সেই অতীত পেরিয়ে তাদের জীবনের একটা নতুন ন্যারেটিভ তৈরি করছে। এই যে রোমের রাস্তায় দাঁড়িয়ে, খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে আলবারের মনটা ভাল হয়ে যাচ্ছে, কারণ আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো বোমা নেমে আসছে না— এই তফাতটুকুও তো কোথাও ফুটবলই তৈরি করছে। তাই ফুটবলের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় না। ভিনিও তাই শেষ অবধি তার চেপে রাখা জীবনের গল্প, বাকিদের সঙ্গেই যোগ করতে পারে। দলের মধ্যে সে তখন আর একা, বিচ্ছিন্ন থাকে না।
‘দ্য বিউটিফুল গেম’ এভাবেই শুধু গৃহহীনদের বিশ্বকাপের আখ্যান হয়ে থাকে না। কোথাও একটা হেরো, কমজোরি, প্রান্তিক মানুষ কিংবা ভূখণ্ডের নিজের-নিজের মতো করে জিতে যাওয়ার গল্পও হয়ে ওঠে। ছবিতে প্রথমবার বিশ্বকাপে খেলতে আসা জাপানের ফুটবলার ইংল্যান্ডের কাছে ১০ গোল খেয়েও, মাত্র দুটো গোল করে যখন আনন্দে মেতে ওঠে, তখন কোথাও হয়তো এই বিশ্বকাপের হাইতি, পানামা, কুরাসাও, জর্ডন বা উজবেকিস্তানের কথা মনে পড়ে যায়। কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা দলের সদস্য, জিম্বাবোয়ের এক উদ্বাস্তু ফুটবলার যখন ভিসার গোলমালে বিমানবন্দের আটকে থাকে, তখন এই বিশ্বকাপে এই দক্ষিণ আফ্রিকারই এক সম্মানিত রেফারির দুর্ভোগ আর অপমানের ঘটনাটাও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দুনিয়ার সব খেলার সেরা, আবেগ আর আনন্দের দীপ্তিতে সুন্দরতম ফুটবল তাই গড়িয়েই চলে— সিনেমা থেকে জীবনে, জীবন থেকে ময়দানে। ফুটবল তাই গৃহহীনের মাথার ছাদ, দেশহারার নতুন দেশ— দ্য বিউটিফুল গেম।




