ইস, যদি
আমরা অর্জুন নয়, কর্ণর দলে। যিনি সফল হতেই পারতেন, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর কারচুপিতে, হলেন না। ফুটবল বিশ্বকাপে আমরা প্রায় সকলেই চাই, ছোট দল জিতুক, বড় দল হারুক, আশ্চর্য উলটপুরাণ রচিত হোক (যদি না আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের সমর্থক হই)। এবং ছোট দল জিতলে মনে হয়, আমাদের হয়ে কেউ প্রতিশোধ নিল। আমরা পরাজিত, তাই পরাজিতদের পক্ষে গলা ফাটাতে ভাল লাগে। যদি শেষ বাঁশি বাজার পর দেখি অঘটন ঘটেছে, আমাদের পানসে জীবনকে সেই রূপকথা এসে বলে যায়, ওরে, ভরসা আছে, তুইও একদিন মার্সিডিজ কিনবি। মুশকিল হল, খেলায় এক-আধটা অঘটন হয় না তা নয়, প্যারাগুয়ে জার্মানিকে হারায়, কিন্তু পরের ম্যাচে হিসেব আবার সেই প্রচলিত খোপে ফিরে আসে।
‘ছোট বনাম বড়’ ম্যাচ শুরুর আগে মনে হয়, ধুর, ভাবছি বটে, কিন্তু ছোট দল তো আর সত্যি-সত্যি জিতবে না। যদি একেবারে বিচ্ছিরিভাবে সে বড় দলের কাছে হেরে যায়, মেনে নিতে অত কষ্ট হয় না। কিন্তু খেলাটা চলতে চলতে যদি দেখা যায়, ছোট দল সমানে-সমানে লড়ছে, এমনকি কিছু সময় বেশি ভাল খেলছে, তারপর গোলও করে বসল, মনে হয়, আরিব্বাস, যোগ্য দল হিসেবেই আজ জিতবে। কিন্তু খেলা-শেষ-হয়-হয় অবস্থায় দড়াম করে গোল শোধ হয়ে গেল এবং শেষমেশ বড় দলটা জয়সূচক গোলও দিয়ে দিল, এ-কাণ্ড দেখলে মন একেবারে বসে যায়। সেনেগাল বেলজিয়ামকে নির্ঘাত হারিয়ে দিচ্ছিল, খেলা শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেও ২-০ এগিয়ে ছিল, বেলজিয়াম গোল শোধ করল ৮৬ মিনিটে আর ৮৯ মিনিটে, এ-জিনিস চোখের সামনে দেখেও হজম করা শক্ত। মিশরের কাছে দু-গোলে হারতে-হারতে আর্জেন্টিনা ১৪ মিনিটে তিন গোল করে (৭৯, ৮৩ আর ৯৩ মিনিটে) খেলা জিতল, এই তথ্যও প্রায় হলিউডি চিত্রনাট্যের মতো দেখায়। সেনেগাল বা মিশরের বহু লোককে ওই খেলাগুলোর স্মৃতি বহুদিন, হয়তো আজীবন যন্ত্রণা দেবে। নরওয়ের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনাল জেতার পর ইংল্যান্ডের কোচ বলেছেন, আমাদের ভাগ্য আজ ভাল ছিল। সত্যি, খেলার দ্বিতীয়ার্ধ প্রায় পুরোটাই নরওয়ে শাসন করেছে। নরওয়ের সমর্থকেরা বহুদিন ধরে ভাববে, ইস রে, যদি অমুক সুযোগটা কাজে লাগাতে পারত, তমুকের ওই শটটা গোলে থাকত। এই ‘প্রায় পেরে গেছিলাম’-এর বেদনা ‘একদম পারিনি’-র চেয়ে অনেকটা বেশি। কারণ দু’দিন বাদে অন্যরা শুধু খেলার ফলাফলটা মনে রাখবে। কয়েকজন ঘা-খাওয়া লোক মনে রাখবে খেলার ধরন ও গড়ন। অন্যরা বলবে, কাঁদুনি গেয়ে কী হবে, হেরেছিস তো, চুপ করে বোস। শুধু স্বগোত্রীয়দের মধ্যে গুনগুন করা যাবে, আমরা কিন্তু জিতেই গেছিলাম, বল?

খেলার শেষে বহু দৃশ্য রচিত হয়, সেখানে পরাজিত দলের খেলোয়াড়রা কেউ কাঁদেন, কেউ বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে, মনে মনে রি-ওয়াইন্ড করে দেখছেন, কী করে অমন সহজ শটটা মিস করলেন। কখনও পর্তুগালের ফিগো বা রোমানিয়ার হাজি-র মতো মহাতারকার, কখনও অনামী (কিন্তু এই ম্যাচটার প্রায়-নায়ক) খেলোয়াড়ের প্রাণপণ লড়াই বিফলে যেতে দেখে আমাদের মন হু-হু করে ওঠে। কখনও মনে হয়, বড় টিম স্পষ্ট অফসাইডে গোল দিল, রেফারি ও লাইন্সম্যান দেখেও দেখলেন না। কখনও আবার ছোট টিম গোল দেয়, কিন্তু জটিল প্রযুক্তির রেখা টেনেটুনে সে গোল নাকচ করে দেওয়া হয়। আমরা, হয়তো সহানুভূতির বশেই, চেঁচিয়ে বলি, ‘অন্যায়’, ‘চক্রান্ত’, কেউ কেউ ঝাঁঝিয়ে ওঠে, ‘মোটেই না, গণিত’, ‘খেলা বোঝো না, শুধু নাটক বোঝো’। এবারের বিশ্বকাপেই হয়তো ইরান দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারত, যদি না ‘ভার’ এসে তাদের সরিয়ে দেওয়ার ভার নিত। উঠলে, কে বলতে পারে, ইতিহাস রচিত হত। সেনেগাল পরের রাউন্ডে আমেরিকাকে হারাত না, বা মিশর পরের রাউন্ডে সুইজারল্যান্ডকে হারাত না, তা কি নিশ্চিত? ছোট দলেরা একবার আশাতীত সাফল্যের স্বাদ পেয়ে গেলে তা থেকে প্রকাণ্ড উৎসাহ সংগ্রহ করে বড় দল হয়ে উঠতে পারে, অন্তত তার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। যেমন ভারতীয় ক্রিকেট দল আচমকা ১৯৮৩-তে সকলকে (নিজেদেরও) স্তম্ভিত করে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়ের পর ক্রমশ দুর্দান্ত দল হয়ে উঠল। আফ্রিকার একটা দলের বিশ্বকাপ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়া, বা অন্তত সেমিফাইনালে ওঠা, গোটা আফ্রিকা মহাদেশটার কাছে সঞ্জীবনী হতে পারে, মধ্যপ্রাচ্যের একটা দল হইহই ফেলে দিলে তা থেকে তাদের দুরন্ত অভ্যুত্থান শুরু হতে পারে।

শেষ অবধি বিজয়ীরা নিজেদের যোগ্যতায় জেতে, না কি ছোট দলেরা লক্ষ্যের কাছে এসে ভয় পেয়ে যায়, না কি দুটোই হয়, সে-সব তর্ক ছাড়িয়ে, পরাজিতদের বেদনার গাঢ় দাগ আমাদের অনেকের মনেই লেগে থাকে। চলতে-ফিরতে হুটহাট অনেক ছবি ভেসে ওঠে, চকিতে শুরু হয়ে যায় অ্যাকশন-রিপ্লে, যেখানে নিশ্চিত গোল কিন্তু বলে একটা আলতো স্পর্শ লাগাতে অক্ষম হলেন স্ট্রাইকার, আবার অ্যাক্কেবারে সহজ সেভ কিন্তু করতে ব্যর্থ হলেন গোলকিপার। আমাদের মনে হয়, ধুর, যাকেই সাপোর্ট করি, তাকেই কি হারতে হয়? মনে হয়, ইস, যদি শুধু ওই বলটা বার-এ লেগে ফেরত না আসত? গোলকিপার তো মাটিতে পড়েই গেছিল, উঃ, কী হত তাহলে? বারেবারে ‘যদি এমন হত’-র রিল খরখরিয়ে চলতে শুরু করে। যে দলেরা হেরেছে, তাদের দেশের আমরা কেউ নই, অনেক দেশের তো নামও শুনিনি, এবং এখনও বানান করতে বললে তোতলাব, তবু তাদের মতোই আমাদের হৃদয়ে ক্ষরণ হতে থাকে, অনেকদিন পরেও হতে থাকবে, যখন হয়তো আরও তিনটে বিশ্বকাপ হয়ে গেছে, এবং সেখান থেকেও আরও অনেক ‘ইস, একটুর জন্য’ এসে আমাদের বিষাদ-ভাঁড়ারে জমা হয়েছে। আসলে, জীবনেও তো নিজেদের অপমান, পরাভব, বঞ্চনা, নাগালে এসেও হুশ করে সাফল্য ফসকে যাওয়ার পেপারওয়েট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে ও হাতের তেলোয় ওজন করে বেশিরভাগ মুহূর্তগুলো কাটে, সেইজন্যই বোধহয় সদৃশ ব্যর্থতারাও ভাই-ভাই আলপিন হয়ে ওই চুম্বকেই ধেয়ে সেঁটে যায়। হতে পারতাম, হতে পারত, প্রায় হয়ে এসেছিল, শেষকালে দুটো সংখ্যার জন্য লটারিটা পেলাম না, সোমবার খবর দিইনি বলে দক্ষিণ-খোলা ভাড়াবাড়িটা জুটল না, ছয়ের জায়গায় নয় লিখে ফেললাম বলে ফার্স্টক্লাস পেলাম না, এবং স্লাইডিং ট্যাকলটা আর এক সেকেন্ড আগে করলে গোলটা খেত না, শুধু শুধু ব্যাকপাসটা না দিলেই পারত।
বিশ্বকাপ ফুটবল অনেকের কাছেই সর্বোচ্চ থ্রিলার। কারও কাছে নিজের ঘুরে দাঁড়ানোর রসদ সংগ্রহের উৎসও হতে পারে (‘মেসি যদি শেষবেলায় এসে এমন ম্যাজিক’ ইত্যাদি)। আবার অনেকের কাছে, তা অনিচ্ছাসত্ত্বেও হৃদয়ে কালশিটে সংগ্রহের মেলা। যেখান থেকে মাথানিচু লোকের বুক-চিনচিনগুলো নিজের মশারির মধ্যে সটান ডেলিভারি হযে যায়। হতে পারে তা আসলে শৌখিন বিষাদ-বিলাস, আবার এমনও হতে পারে, এই মনে রাখারাখি আছে বলেই কর্ণেরা ক্যালেন্ডারে থেকে যায়।




