‘প্রজেক্ট-মেসি’

Representative Image

‘বুড়ো তুই অনেক নাচলি, অনেক বাঁচলি এবার থাম…’— সুমনের গান। ক্লান্ত ৪০ ছুঁইছুঁই লিও মেসি। বুড়ো আর থামে না কিছুতেই। তাঁর বেঁচে নেওয়ার স্বপ্নও ফুরোয় না যেন। বিশ্ব দেখছে। দেখেই চলেছে। যুগ কেটে পরের যুগ— এককালে তাঁর যে-সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বীরা ছিলেন, সকলেই চলে গেছেন মাঠ ছেড়ে। এসেছে নতুন প্রজন্ম। কিন্তু তিনি এখনও এক-একই বিস্ময়-আর্লিং হ্যালান্ডের ভাষায়— ‘মেসি ইজ আ ম্যাডম্যান!’। বিশ্বজয় হয়ে গেছে চারবছর আগেই। বিশ্বকাপের ইতিহাসের রেকর্ডবুকে তাঁর উপস্থিতি সবচেয়ে উজ্জ্বল, তবু খেলছে লোকটা। গত বিশ্বকাপ থেকে এই বিশ্বকাপ অবধি সময়টায় কেউ ভেবেছিল মেসি আবার খেলবেন? নাহ্‌,। কারও ভাবায় কিছু যায় আসে না। মেসি ভেবেছিলেন। শুধু ভাবেননি— মেসি তাঁর কেরিয়ারের শুরু থেকে নিজের পিঠে সপাটে চালানোর যে-অদৃশ্য চাবুক ধরেছিলেন, তা আরও শক্ত করে ধরেছেন। যেন অস্ফুটে বলে ওঠা— ‘আমি এই বিছানায় শুয়ে একটার-পর-একটা খেলা খেলে যাব। শেষ সুযোগ সবসময়ে আমার সামনে থাকবে চিরকাল।’

মেসি ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সই করলেন ‘ইন্টার মায়ামি’তে। ততদিনে সকলে জেনে গেছে ২০২৬-এর বিশ্বকাপ হতে চলেছে মার্কিন মুলুকে। মেসি, যিনি সারাজীবন কাটিয়েছেন বার্সিলোনার ক্লাইমেটে, আমেরিকার গরমে বিশ্বকাপ খেলতে হলে তাঁর শরীরকে অভ্যস্ত হতে হবে ডালাস-নিউজার্সি-মায়ামির গরমের সঙ্গে। তাই খুব ঠান্ডা মাথায় এ-সিদ্ধান্ত নেন মেসি। ইউরোপের ক্লাব ফুটবলে খেলার ফিটনেস থাকা স্বত্বেও, তিনি বেছে নেন ‘এম এল এস’।

আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে তিনি তিনবছর ধরে ‘এম এল এস’-এ খেলেছেন, সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন জাতীয় দলের সতীর্থ ডি পল-কে। মেসি ও ডি-পল রাইট চ্যানেলে অপারেট করার প্রস্তুতি একসঙ্গে নিয়েছেন মায়ামিতে, যার সুফল পাচ্ছে আর্জেন্টিনা।

২০১৪ সালে সাতাশ বছরের মেসির খুব পছন্দের জিনিস ছিল পিৎজা ও কোক। সে-সময়ে তাঁর নিউট্রিশানিস্ট ইটালিয়ান জিউলিয়ানো পোজার, তাঁকে বেঁধে দেন কড়া ডায়েট প্ল্যান। কারণ, মেসির ফিজিও-র মতে তাঁর মূল সমস্যা ওজন কমে যাওয়া— মাসল ব্রেকডাউন হলেই বেড়ে যায় চোটের সম্ভাবনা। তাই খাবার থেকে চিনি ও গ্লুটেন সম্পূর্ণ বাদ দেন তিনি। ২০২৩ সাল থেকে মেসি নিজের নিউট্রিশনিস্ট হিসেবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তিনজনকে নিয়োগ করেছেন। এছাড়া তাঁর ফিজিও হিসেবে আছেন আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের ফিজিও, ওয়াল্টার ইনসোরালদে। এই বিশ্বকাপের জন্য মেসির স্ট্রেংথ-কন্ডিশনিং মনিটরিং করছেন মার্সেলো ডি-আন্দ্রেয়ার মতো অভিজ্ঞ ফিজিও। মোট পাঁচজন ফিজিও-এর একটি টিম চব্বিশ ঘণ্টা মেসিকে মনিটরিংয়ে রাখছেন। ৩৯ বছর বয়সে, মাসল ভেঙে যাওয়া বা মাসলে ফ্যাট বেড়ে যাওয়া অতিসাধারণ ঘটনা। সে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ঠেকিয়ে, মেসিকে ফিট রাখার জন্য নিঃশব্দে লড়াই চলছে গত তিনবছর ধরে।

বিপ্লবী ফুটবলারের ট্র্যাজিক পরিণতি! মাঠের বাইরের খেলায় হারলেন মারাদোনা!
পড়ুন: বিতর্কিত একাদশ পর্ব ৭…

এ তো গেল ফিটনেস প্রসঙ্গ। আর স্টাইল অফ প্লে? যেখানে বিশ্বকাপে তাবড় দলেরা হাইপ্রেস কিংবা দুরন্ত কাউন্টার প্রেসে খেলছে, বিশ্বফুটবল ক্রমশ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ‘উইথ দ্য বল’-এর সঙ্গে সমান গুরুত্বপূর্ণ, ‘উইদাউট দ্য বল প্রেসিং’— ফাস্ট রিকভারি, সেখানে মেসি এই বয়সে কীভাবে সফল হচ্ছেন? এখানে আসে লাওনেল স্ক্যালোনির ব্রিলিয়ান্সের গল্প। মেসির মতো খেলোয়াড় যিনি বল পায়ে বিশ্বের যে-কোনও রক্ষণে নাভিশ্বাস তুলে দিতে পারেন, সেই ৩৯ বছরের মেসিকে আক্রমণে ধারালো রাখতে গেলে দরকার— মেসির ‘অফ দ্য বল গেম’-এর যে-জরুরি ওয়ার্করেট, তাকে বাকি দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া। তা করেছেন স্ক্যালোনি। মেসির উইদাউট দ্যা বল প্রেসিং, এক্সট্রা ওয়ার্কলোডে ভাগ করে নিচ্ছেন ডি-পল, এঞ্জো-ম্যাক আলিয়েস্টাররা।

স্ক্যালোনি

২০২২ বিশ্বকাপে মেসির বয়স ছিল ৩৫ বছর, সেবার মেসির উইদ্যাউট দ্য বল মুভমেন্টে সমস্যা হয়নি। এবার যে মায়ামি-ডালাস-নিউজার্সির গরমে তা হবে তা বহু আগে থেকেই জানতেন স্কালোনি। তাই ২০২৪ কোপা আমেরিকা থেকেই এই রিলেশনিজম মডেল অর্থাৎ একজনের খামতি অন্যজন ঢেকে দেবে এক্সট্রা এফর্ট দিয়ে- এই মডেলটিকে আরও জোরদার করেন।

মেসির ফুটবলের গোড়াপত্তন হয় বার্সেলোনার বিখ্যাত ‘লা-মাসিয়া অ্যাকাডেমি’-তে। লা-মাসিয়ার শিক্ষা মেসি আত্মস্থ করেছেন কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে। তাই মাঠের পেরিফেরাল ভিশন, উইথ দ্যা বল এবং উইদাউট দ্যা বল স্পেস খোঁজা তাঁর সহজাত। বিশ্বের যে-কোনও খেলোয়াড়ের সাথে এই তাঁর তফাত। তা তিনি নিজেও জানেন। এবং, তিনি এ-ও জানেন- এই অর্জন বয়স বাড়লেও তাঁকে ছেড়ে যাবে না।

২০১৮ সাল থেকে লিওনেল স্ক্যালোনি, আর্জেন্টিনার কোচ হওয়ার পর যে-আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট তিনি শুরু করেন, তা বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সফল প্রজেক্ট। কেরিয়ারের শুরুর দিকে জাতীয় দলে প্রায় নিস্ফলা থাকা মেসি, এই শেষ সাত-আট বছরে নীলসাদা জার্সি গায়ে দুনিয়া জয় করে ফেলেছেন। ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর মেসি বলেছিলেন, তিনি আবার বিশ্বকাপ খেলবেন কি না, তিনি জানেন না৷ কারণ, তিনি তখনই খেলবেন যখন তিনি মনে করবেন তাঁর শরীর ও পারফরম্যান্স সঠিক জায়গায় আছে এবং তিনি দলকে সাহায্য করতে পারছেন।
বলাই বাহুল্য, মেসি সেটুকুই করছেন৷ তাঁর এই বয়সে এই ঐশ্বরিক খেলা কোনও ম্যাজিক নয়, ঘোরতর বিজ্ঞান। প্রবল প্ল্যানিংয়ের ফসল।

মেসি কি আবার বিশ্বজয়ী হবেন? অঙ্কের বিচারে নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন কাজ। আধুনিক ফুটবলে পরপর দু’বার বিশ্বজয়ের নজির প্রায় কোনওদলেরই নেই। তাই মেসি জিতুক বা না-জিতুক, ‘মেসি-প্রজেক্ট’ কিন্তু নিঃশব্দে বিশ্বের কাছে হয়ে থাকছে উদাহরণ। সেখানে মেসি একা নেই। আছেন স্ক্যালোনি। আছে পুরো একটা টিম। মেসি কেবল মুখ। যে-মুখের আদলে বয়স-রেখা থাবা ফেলতে পারছে না আজও। ঘড়ির কাঁটা উল্টোদিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন মেসি— উত্তরপ্রজন্মের কাছে রেখে যাচ্ছেন একটা গাইডবুক— ‘প্রজেক্ট-মেসি’!