বিবাহ-অমঙ্গল
‘দ্যাখ, তোর চেয়ে কত ছোট বোনটারও বিয়ে হয়ে গেল। এবার তুই নিজের জন্য কিছু ভাব। এখন তো তোর চেয়েও কত বয়সে মেয়েরা বিয়ে করছে। ওই তো সুহাসিনী মুলে ষাট বছর বয়সে বিয়ে করল!’
এটা চল্লিশ পেরনো বা চল্লিশের কাছাকাছি যে কোনও মেয়ের কাছে বড়দের— অর্থাৎ, সমাজের— একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মাঝবয়সি অবিবাহিত মেয়েদের একটা অদ্ভুত সুপারপাওয়ার আছে। তারা কোনও পারিবারিক অনুষ্ঠানে ঢুকলেই অন্তত তিনজন আত্মীয়ের মধ্যে সুপ্ত অবস্থায় থাকা ‘ম্যারেজ কনসালট্যান্ট’ জেগে ওঠে। পাঁচ মিনিট আগেও যারা গ্যাসের দাম, হাঁটুর ব্যথা কিংবা পাশের বাড়ির ছেলের চাকরি নিয়ে আলোচনা করছিল, হঠাৎ করেই তারা মানবজীবনের চূড়ান্ত পরিণতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠে। দেশের অর্থনীতি কোথায় যাচ্ছে, পরিবেশ দূষণ কতটা ভয়ংকর, শিক্ষাব্যবস্থা কেন ক্রমশ ভেঙে পড়ছে, ছেলেমেয়েদের চাকরি হবে কি না— এসব নিয়ে তারা সারা বছর বিশেষ মাথা না ঘামালেও, এই মেয়েটির বিয়ে না হওয়া নিয়ে তাদের উদ্বেগ দেখে মনে হয় বিষয়টা কোথাও না হোক, অন্তত রাষ্ট্রসংঘে তোলা উচিত। মেয়েটি হয়তো শান্তভাবে প্লেটে ফিশ ফ্রাই তুলছে। অথবা এককোণে দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে গল্প করছে। হঠাৎ করেই কেউ এসে গলা নামিয়ে বলবেন— ‘আচ্ছা, এখনও কিছু ভাবছ না?’
যৌবনের শরীরটাকে খুব মিস করি! সঞ্চারী মুখোপাধ্যায়ের কলমে পড়ুন ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ৪…
এই ‘কিছু’ শব্দটা বাংলা ভাষার সবচেয়ে বেশি গোপন সংকেতগুলোর একটা। সবাই জানে, এর অর্থ বিয়ে। কিন্তু উচ্চারণটা এমনভাবে করা হয় যেন সরাসরি শব্দটা বলে ফেললে ধুরন্ধর ধরা পড়ে যাবে। আর যদি মেয়েটি হেসে বলে, ‘না, বিশেষ কিছু ভাবছি না’, তাহলে প্রশ্নকর্তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, যেন তিনি এইমাত্র জানতে পারলেন মেয়েটা আসলে একটা খুন করেছে, কিন্তু এখনও ধরা পড়েনি তদুপরি ফিশফ্রাই খাচ্ছে!

আসলে, আমাদের সমাজে মেয়েদের জীবন নিয়ে একটা অদৃশ্য সিলেবাস আছে। জন্মাবে, পড়াশোনা করবে, চাকরি করতে পারে, না-ও করতে পারে, কিন্তু গল্পটা শেষ পর্যন্ত গিয়ে থামবে বিয়ে, সন্তান আর সংসারের ঘাটে। সেখানেই নাকি পূর্ণচ্ছেদ। সেখানে পৌঁছতে না পারলে জীবনকে অনেকে অপূর্ণ বলে মনে করে। যেন পরীক্ষার খাতায় সব প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক লেখা হয়েছে, কিন্তু উত্তরপত্রে নাম লেখা হয়নি।অতএব পুরোটাই ফেল। সমস্যা হল, সব মানুষ একই গল্পের চরিত্র নয়, তা সত্ত্বেও মাঝবয়সি অবিবাহিত মেয়েদের নিয়ে একটা নেভার-এন্ডিং অস্বস্তি কাজ করে। কারণ তারা প্রচলিত গল্পের নিয়ম ভেঙে দেয়। তারা প্রমাণ করে দেয়, জীবনের প্লট অন্যরকমও হতে পারে।
তবে অবিবাহিত হওয়াটা আসল সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হল, অবিবাহিত থেকেও যদি মানুষটা সুখী হয়। কারণ সমাজ অবিবাহিত মেয়েদের জন্য সাধারণত দুটো চরিত্র লিখে রেখেছে। হয় সে নিরূপা রায় টাইপ অত্যন্ত দুঃখী, নয় সে অত্যন্ত অপূর্ণ। তৃতীয় কোনও সম্ভাবনা জাস্ট নেই। তাই যদি দেখা যায়, সে দিব্যি নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যাচ্ছে, নিজের উপার্জিত টাকা নিজের ইচ্ছেমতো খরচ করছে, নতুন শহরে একা ঘুরে আসছে, রবিবার দুপুরে চার ঘণ্টা ঘুমিয়ে উঠে একটুও অপরাধবোধে ভুগছে না— তখন সামাজিক অঙ্কে গরমিল শুরু হয়। মানুষ তখন মরিয়া হয়ে তার জীবনে একটা অভাব খুঁজতে শুরু করে। যেন সে একজন মানুষ নয়, গোঁজামিল দেওয়া অডিট ফাইল। নিশ্চয়ই কোথাও একটা গন্ডগোল আছেই। শুধু সেটা খুঁজে বের করতে হবে।
এতেও যখন হয় না, তখন, ‘এখন বুঝছ না। বয়স হলে টের পাবে।’ এই বাক্যটার প্রতি সমাজের বিশ্বাস অবিচল। এমনভাবে বলা হয়, যেন বুড়ো বয়সটা কোনও মহাজাগতিক দুর্যোগ, যার রেড অ্যালার্ট কেবল অবিবাহিত মেয়েদের মোবাইলেই আসে। বিবাহিত মানুষরা বোধহয় সরকারি সুরক্ষা-বলয়ের আওতায় পড়ে। তাদের সেফ জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হয়। এরা ভাবে, দাম্পত্য মানেই নিঃসঙ্গতার বিরুদ্ধে আজীবন গ্যারান্টিযুক্ত বিমা। বাস্তবের সঙ্গে এই ধারণার সম্পর্ক যতটা, ফেসবুকের সুখী পারিবারিক ছবির সঙ্গে বাস্তব পারিবারিক সম্পর্কের সম্পর্কও বোধহয় ততটাই।

আসলে সমাজের অস্বস্তির জায়গাটা অবিবাহিত মেয়ে নয়। স্বাধীন মেয়ে। যে মেয়ে নিজের সুখের সংজ্ঞা নিজে লিখতে শুরু করে। ছোটবেলা থেকে মেয়েদের শেখানো হয়, সুখ একটা বাইরের ব্যাপার, উহা খুব পিচ্ছিল এবং অন্যের আনন্দের মধ্যে অবিরত পিচ্ছিল ড্রপ খাওয়া বস্তুটিকে খপ করে ধরে ফেলাই হচ্ছে মেয়েদের সুখ। সেটা থাকে স্বামীর মধ্যে, সন্তানের মধ্যে, পরিবারের মধ্যে, অন্যের ভাল করার মধ্যে। সেখানে যদি কোনও মেয়ে একদিন খুব স্বাভাবিক গলায় বলে, ‘আমার সুখের একটা অংশ আমার নিজের মধ্যেও আছে’— তখনই গোলমাল। কারণ এই কথাটা বহু পুরনো সমীকরণে ধাক্কা দেয়। তখন তাকে স্বার্থপর বলা সহজ। আত্মকেন্দ্রিক বলা সহজ। ‘নিজেকে নিয়েই বেশি ব্যস্ত’ বলা সহজ। মজার কথা হল, একজন পুরুষ যদি নিজের জন্য সময় বের করে, নিজের শখকে গুরুত্ব দেয়, একা বেড়াতে যায়, দামি ক্যামেরা কিনে পাহাড়ে ঘুরে বেড়ায়, তাকে বলা হয়— He is living his life to the fullest. একজন মেয়ে একই কাজ করলে প্রশ্ন ওঠে— ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বা ‘সব ঠিক আছে তো?’ যেন দার্জিলিং যাওয়ার আগে একজন মেয়ের থানায় জিডি করে যাওয়া উচিত। আসলে মেয়েদের স্বাধীনতার ব্যাখ্যা সবসময়ই চাওয়া হয়, এটাই যেন দস্তুর।
আর যদি সেই মেয়ে চাকরি করে, তাহলে সমালোচনার ভাষা আরও উন্নত সংস্করণে পৌঁছয়। ‘শোন মেয়ে, কেরিয়ারটাই সব নয়।’ এই উপদেশ সাধারণত কোনও সফল পুরুষকে দেওয়া হয় না। দেশের কোনও সিইও-র কাঁধে হাত রেখে কেউ বলেন না— ‘দ্যাখো বাবা, বোর্ড মিটিং তো অনেক হল। এবার একটু বাচ্চার টিফিন বানানোর আনন্দও উপভোগ করো।’ কিন্তু একজন অবিবাহিত মেয়ে যতই সফল হোক না কেন, তার পরিচয়ের পাশে সমাজ একটা অদৃশ্য স্টার বসিয়ে রাখে। অর্থাৎ কিনা, একটি ফুটনোট আছে। সে যে চাকরিই করুক—অধ্যাপক, লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী, সাধারণ কেরানি— নিচে ছোট হরফে লেখা থাকে— ‘তবে বিয়ে করেনি।’ এই ফুটনোটটাই পাঁচিলে গাঁথা কাচের টুকরোর মতো উঠে থাকে। মনে হয় মুখের ওপর বলা দরকার, ‘বিয়ে যখন এত ভাল আর জরুরি, তখন আপনি আর একটা বিয়ে করুন না। আরও ভাল থাকবেন!’

আর যদি সে চাকরি না করে? পরিবারের সঙ্গে থাকে? বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনা করে? তবুও রেহাই নেই। তখন সে হয়ে ওঠে ‘বেচারি’। এই ‘বেচারি’ শব্দটার মধ্যে এমন এক করুণা থাকে, যেন সে প্রতিদিন জানলার ধারে বসে বৃষ্টি দেখে আর দূরে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। কেউ ভাবতেই পারে না, একজন মানুষ পরিবার নিয়ে থেকেও সুখী হতে পারে। নিজের মতো করেও বাঁচতে পারে। এরপর আসে শেষ অস্ত্র— সন্তান। মাতৃত্বকে এমনভাবে নারীর চূড়ান্ত পরিচয় বানানো হয়েছে যে, অনেক সময় মনে হয় এটা অনুভূতি নয়, আধার কার্ড। না থাকলে পরিচয় অসম্পূর্ণ। অথচ কেউ প্রশ্ন করে না— একজন শিক্ষক, যিনি বছরের পর বছর ছাত্রছাত্রীদের মানুষ করছে; একজন মেয়ে, যে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে; একজন বন্ধু, যে অন্যের কঠিন সময়ে আশ্রয় হয়ে উঠেছে—তাদের ভালবাসার মূল্য কি কম? হ্যাঁ কম।
কারণ আমরা এখনও নারীর অবদানকে ব্যক্তিসত্তা দিয়ে নয়, সম্পর্ক দিয়ে মাপতে বেশি স্বচ্ছন্দ। এই কারণেই সুখী অবিবাহিত মাঝবয়সি মেয়েরা সমাজকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। তারা খুব চুপচাপ একটা বিপজ্জনক কাজ করে। তারা প্রমাণ করে দেয়, জীবনের একটাই ছক নেই। সম্পূর্ণ হওয়ার একটাই পথ নেই। সুখেরও একটাই ঠিকানা নেই। আর এই সত্যিটাই বোধহয় সবচেয়ে অস্বস্তিকর। তাই সমাজ আশাবাদ ছাড়ে না। পঞ্চাশে প্রশ্ন আসে— ‘কী রে, বিয়েটা তাহলে সত্যিই করলি না? শ্যামলীর ডিভোর্সি দাদাটা কিন্তু ভালই ছিল!’ শ্যামলীর সেই দাদাটি কে, তাঁর চরিত্র কেমন, তিনি আদৌ আগ্রহী ছিলেন কি না— এসব তথ্য অবশ্য কেউ জানে না। কিন্তু সমাজের একাংশ এখনও বিশ্বাস করে, পৃথিবীর সমস্ত অবিবাহিত মহিলার জন্য কোথাও না কোথাও একটা ‘শেষ সুযোগ’ অপেক্ষা করে বসে আছে। এই প্রশ্নটা শুনে মেয়েটির মনে হয়, দু-চারটে পরমাণু বোমা প্রশ্নকর্তার মাথায় ফেলে দিলে হয়তো মানবসভ্যতার খুব একটা ক্ষতি হবে না। কিন্তু সে মুচকি হাসে। কারণ সে জানে, তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের প্রতি সমাজের এই অবিচল আগ্রহই বোধহয় আমাদের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ঐতিহ্য। এবং সম্ভবত সবচেয়ে সফল ফ্যামিলি এন্টারটেনমেন্ট।



