সীমানার খেলা

Representative Image

হাইতি। অকল্পনীয় দারিদ্র্যে ধুঁকতে থাকা একটা দেশ। পাঁচ বছর আগে খুন হয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট জোভলেন মোয়েজ। তারপর থেকেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। অর্থনীতি, আইনব্যবস্থা, স্বাস্থ্য ধসে পড়েছে সম্পূর্ণ। ওষুধ নেই, খাদ্য নেই, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নেই। দেশের রাজধানী পোর্ট-ও-প্রিন্সে দাপিয়ে বেড়ায় কুখ্যাত আর দুর্ধর্ষ সমস্ত গ্যাং। আছে অসংখ্য ড্রাগ-কার্টেল। বেআইনি অস্ত্রশস্ত্রের লেনদেন। সংগঠিত অপরাধ। সম্প্রতি শোনা গেছে, কলেরার প্রাদুর্ভাব। সমগ্র হাইতি জুড়েই ফিরে এসেছে। এছাড়া, প্রতি বছর নিয়মমাফিক এক বা একাধিক বন্যা। কখনও বিধ্বংসী সাইক্লোন। অথচ, দীর্ঘ ৫২ বছর পরে, হাইতি, ফুটবল বিশ্বকাপের মূলপর্বে!


পরিসংখ্যান বলছে, শেষ পাঁচ বছরে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন— ১.৪ মিলিয়ান মানুষ। ভৌগলিকভাবেই যেহেতু আমেরিকা নিকটবর্তী দেশ, তাই অধিকাংশ হাইতিয়ান আশ্রয় খুঁজেছেন সেখানে। খিদে ও ঘুমের তাগিদে। মূলত চারটি শহর, মায়ামি, নিউ ইয়র্ক, ওহায়ো, ম্যাসাচুসেটস— সবমিলিয়ে, হাইতিয়ান অভিবাসীর সংখ্যা, প্রায় ১.১ মিলিয়ান। তেমনই একজন, এমিলি। অভিবাসনের কাগজ নেই। বয়স চল্লিশ। ট্রাক ড্রাইভার। এমিলির মন গর্বে আপ্লুত! পাশাপাশি, ভীষণরকম সন্ত্রস্ত। কেন?
স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে হাইতির গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ। ম্যাসাচুসেট্স শহরের জিলেট স্টেডিয়ামে। সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে, গোটা পৃথিবীর সামনে, নির্ভয়ে নিঃসংশয়ে, দেশের জাতীয় সংগীত গাইতে পারবেন না এমিলি। এবং আরও আরও হাইতিয়ান। কারণ, তাঁরা সকলেই অভিবাসী।


আমরা অবগত যে, দ্বিতীয়বারের জন্য আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হওয়ার পর, ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশের অভিবাসনের যাবতীয় নীতি আমূল পাল্টেছেন। নির্দ্বিধায় বলেছেন, যাদের অভিবাসনের বৈধ কোনও কাগজ নেই, আপাতদৃষ্টিতে, আমেরিকার নাগরিক নয়, যারা অনুপ্রবেশকারী— সকলকেই ফেরত পাঠানো হবে। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন!’ এও জেনেছি, দেশচ্যুত, সর্বস্ব হারানো, হাজার-হাজার শরণার্থীর অধিকার— ‘রাইট টু অ্যাসাইলাম’, সেই সব উৎখাত করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

আরও পড়ুন: আঞ্চলিকতার ময়দানে পথহারা ফুটবল? লিখছেন শান্তনু চক্রবর্তী…


এহেন ফেরত পাঠানোর আদেশ নতুন নয়। জো বাইডেন যখন প্রেসিডেন্ট, ২০২৪ সালেই, আমেরিকা থেকে বিভিন্ন দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল যে-সকল অভিবাসীদের, তাদের সংখ্যা— ২,৭০,০০০। পাশাপাশি, এমন একটি নীতি চালু হয়েছিল, যার দ্বারা হাইতি, কিউবা, নিকারাগুয়া এবং ভেনেজুয়েলা— চারটি দেশের সর্বমোট ৩০,০০০ অভিবাসীদের, প্রতি মাসে গ্রহণ করবে আমেরিকান সরকার। এখন আমেরিকার গৃহমন্ত্রকের একটি বিশেষ এজেন্সি, ইমিগ্রেশান অ্যান্ড কাস্টম্স এনফোর্সমেন্ট (ICE)— শহরে শহরে ঘোরাফেরা করে। যদি কোনও নাগরিকের ভাষা, বর্ণ, লিঙ্গ, চেহারার আদলের প্রতি সন্দেহ জাগে কিঞ্চিৎ, গ্রেপ্তার তৎক্ষণাৎ। এমিলি দেখেছেন, পাশবিক এনফোর্সমেন্ট অফিসার। সাধারণ পুলিশের মতো নয়, মুখ ঢাকা। ভীষণ আগ্রাসী। অনুমতি ছাড়াই ইমিগ্র্যান্ট কলোনিতে ছানবিন। কখনও বাড়িতে। কখনও কর্মক্ষেত্রেও। কাগজ দেখানোর পরেও হঠাৎ করেই গ্রেপ্তার হয়েছেন কেউ-কেউ। অথচ, তার জন্মস্থান— আমেরিকা, ট্যাক্স দেন নিয়মিত, এবংদু-তিন দশক ধরে আমেরিকায় স্থায়ী।

এমিলি শুনেছেন, শেষ এক বছরে, এনফোর্সমেন্ট কাস্টডিতেই ১৮ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। আর আমেরিকান নাগরিকের মৃত্যুসংখ্যা? অগুনতি! এমিলি জেনেছেন, সম্প্রতি মিনেসোটায়, অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ মিছিল থেকে প্রশ্ন উঠেছিল— কোনও অভিবাসীর আপাতকালীন নিরাপত্তার ছাড়পত্রটি, কেন সরকার খারিজ করে দিতে চাইছে? তারপর মিছিলের ভেতরেই, দু’জন আমেরিকানকে গুলি করে হত্যা করে এনফোর্সমেন্ট বাহিনী। যে বিষয়টি দারুণ ভয়ানক— ম্যাচের দিন এবং পরবর্তী সময়েও, আমেরিকার এগারোটি স্টেডিয়ামের বাইরে মোতায়েন থাকবে এনফোর্সমেন্ট বাহিনী।

এহেন ফেরত পাঠানোর আদেশ নতুন নয়। জো বাইডেন যখন প্রেসিডেন্ট, ২০২৪ সালেই, আমেরিকা থেকে বিভিন্ন দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছিল যে-সকল অভিবাসীদের, তাদের সংখ্যা— ২,৭০,০০০। পাশাপাশি, এমন একটি নীতি চালু হয়েছিল, যার দ্বারা হাইতি, কিউবা, নিকারাগুয়া এবং ভেনেজুয়েলা— চারটি দেশের সর্বমোট ৩০,০০০ অভিবাসীদের, প্রতি মাসে গ্রহণ করবে আমেরিকান সরকার।

ফুটবল, জন্মলগ্ন থেকেই সমস্ত ভয় আর অত্যাচারের বিপ্রতীপে দৃঢ়। যারা লাথি খেয়েছেন, না-মানুষ হয়ে বেঁচে আছেন ভ্যাপসা কোনও পৃথিবীতে, হয়তো এমিলির মতোই জাতীয় সংগীত গাইতে পারবে না বুক চিতিয়ে— ফুটবল আসলে সেই মানুষগুলোর আত্মপরিচয়। সম্মিলিত চিৎকার। একে অন্যের সঙ্গে জাপ্টে থাকার ৯০ মিনিট। আমেরিকান ফুটবল দলের তারকা স্ট্রাইকার— ফোলারিন বালোগান। জন্ম ব্রুকলিনে। কিন্তু শরীরে বইছে নাইজেরিয়ান রক্ত। ২০২৪ সালে, কোপা আমেরিকার তিনটে ম্যাচের মধ্যে, দুটিতেই গোল করেছেন। আসন্ন বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে, সেনেগালের বিরুদ্ধেও জয়সূচক গোল দিয়েছিলেন ফোলারিন। এনফোর্সমেন্ট বাহিনী তাঁকে নিশ্চয়ই গ্রেপ্তার করবে?


তেমনই একজন স্ট্রাইকার, রিকার্ডো পেপি। প্রথম একাদশে সুযোগ পাচ্ছেন। জন্মসূত্রে, মেক্সিকান! পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমেরিকার সর্বমোট জনসংখ্যার ২০% মানুষ হিস্প্যানিক সম্প্রদায়ভুক্ত। অর্থ হয়, যে-সমস্ত মানুষের মাতৃভাষা স্প্যানিশ। রিকার্ডো পেপি সেই সম্প্রদায়ের একজন। এনফোর্সমেন্ট বাহিনীর নৃশংসতায় গোটা হিস্প্যানিক সম্প্রদায় ভীত। তটস্থ। কোন নিশ্চয়তায় খেলা দেখতে যাবেন? স্টেডিয়ামে এবং স্টেডিয়ামের বাইরে? নানা ধরনের ফ্যান জোনে?


রাষ্ট্র চায়, এই ভয়ের কারবার দীর্ঘজীবী হোক। যে-কোনও দিন, যে কোনও ছুতোয়, তোমাদের ঘাড়ধাক্কা দিয়ে দেশছাড়া করতে পারি কিংবা উচ্ছেদ করতে পারি রাতারাতি— ভাষ্যের পরিবর্তন হয় না। মধ্যিখানে লুকা মদ্রিচ, নিকো উইলিয়ামস কিংবা ইব্রাহিমোভিচের মতো খেলোয়াড় জ্বলে থাকেন। নক্ষত্রের মতো। ড্রিবল করেন। বাইসাইকেল কিকে গোল করেন। বিস্মিত হয় আপৃথিবী। রন্ধ্রে-রন্ধ্রে বয়ে চলে অভিবাসনের আশ্চর্য আখ্যান। ডোনাল্ড ট্রাম্প তা বুঝবেন না কখনওই। তাঁর ভাবনায় দেশের যে-ধারণা, তা একটা চৌখুপিতে আবদ্ধ। অথচ ফুটবল বিশ্বকাপের রোশনাই-মঞ্চ যখন প্রস্তুত, আগামী একমাসের সমস্ত স্পটলাইট যখন আমেরিকার গায়ে, সেই মোক্ষম মুহূর্তে অভিবাসনের প্রসঙ্গে আমেরিকান সরকারের উদার মনোভাব এবং সেই সংক্রান্ত কর্মসূচী—অনায়াসেই তৈরি করতে পারত অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। সাময়িকভাবে মুছে যেত, যা-কিছু সমালোচনা। তবেই না, ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন!’


কিন্তু আমেরিকা? গত বছর, ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যে-সময়ে, নিউ জার্সির স্টেডিয়ামের গেটে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন একজন অভিবাসী। ক্রমাগত মৃত্যুর হুমকি দিয়েছিল এনফোর্সমেন্ট বাহিনী। কয়েকদিন পরে, দুই সন্তান-সমেত নিজের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কেউ-কেউ বলবেন, নিজের দেশ যখন ছেড়েছ, ধাক্কা তো খাবেই! আমার দেশে পাঁয়তাড়া করলে, সহ্য করব কেন? আমেরিকার প্রতিটি স্টেডিয়ামে, স্টেডিয়ামের কাছাকাছি অসংখ্য হোটেলে, হস্টেলে যারা কর্মরত, প্রায় সকলেই অভিবাসী। আর লাতিন আমেরিকান অভিবাসী যারা? যাদের ঘুম ভেঙেছে ফুটবলের জলহাওয়ায়! স্টেডিয়ামের বাইরে, এনফোর্সমেন্ট বাহিনী রুখে দেবে তাদেরও?


লস অ্যাঞ্জেলসের একটি স্টেডিয়ামের সামনে বিক্ষোভ করছিলেন ২,০০০ শ্রমিক। জানিয়েছেন, অনর্গল ভয়ের আবহে কাজ করবেন না কেউ! ওয়াশিংটনে তৈরি হয়েছে, ‘সেফ জোন’। যেখানে এনফোর্সমেন্ট অফিসারেরা প্রবেশ করতে পারবেন না। বিশ্বকাপের প্রাক-মুহূর্তে, আমেরিকার বেশ কিছু মানবাধিকার সংগঠন শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত শেখাচ্ছেন, এনফোর্সমেন্ট বাহিনীর সঙ্গে আইনি পথেই, কোন-কোন কৌশলে মোকাবিলা সম্ভব। আর সকলেই বলছেন: Kich ICE Out!
সারা পৃথিবী থেকে ফুটবল-পাগলের ঢল নামছে আমেরিকায়। ৭, ৫০, ০০০ মানুষ। যারা এনফোর্সমেন্ট বাহিনী বোঝে না। কাগজ বোঝে না। একমাত্র ফুটবল বোঝে।