প্রথম বই
ধারাবাহিকের শেষ পর্বে পৌঁছে, ফিরে দেখতে ইচ্ছে করে বিগত উনিশটি পর্বের যাত্রা। কত ব্যক্তি, কতই-না চিঠি! তা কখনও বন্ধুত্বের, কখনও বিরোধিতার, কখনও নিছক সাহিত্যকেন্দ্রিক। আবার কেজো চিঠির সংখ্যাও কম নয়। এই বিচিত্র পত্রসম্ভারের মধ্যে ধ্রুব একজনই— সুবিমল বসাক। তাঁর বিভিন্ন জবাবি চিঠির খসড়াও আমাদের কথোপকথনের ক্রম বুঝতে সাহায্য করেছে। তাঁর ডাইরি, লেখালিখি ও অন্যান্য হাংরি টেক্সটও বয়ান বুনতে সহায়ক হয়েছে। সেই প্রয়াসেরই শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আমরা।
এই পর্বে যে-চিঠিগুলির উল্লেখ করব, তাঁর প্রেক্ষিত একটিই— সুবিমলের প্রথম বই ‘ছাতামাথা’। ১৯৬৫ সালের জুন মাসে বেরোয় সেটি এবং প্রকাশের প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই হাংরি গদ্যের অন্যতম নিদর্শন বলে পরিচিত হয়। পূর্ববঙ্গের ঢাকাইয়া কথ্যভাষায় লেখা সেই বই অনেকের কাছেই দুর্বোধ্য ঠেকে, অনেকে আবার ভাষা-ব্যবহারের নতুনত্বের জন্য চমৎকৃত হন। প্রকাশের পর, অনেককে বইটি পড়তে পাঠিয়েছিলেন সুবিমল। কোনও-কোনও প্রতিক্রিয়ার চিঠি আমরা তুলে ধরেছি ইতিপূর্বেই। এবার এমন কয়েকজনের চিঠি আলোচনায় আসবে, যাঁরা সাহিত্য ও সংস্কৃতিমহলে বিশিষ্ট বলেই পরিচিত। কী প্রতিক্রিয়া ছিল তাঁদের?
আরও পড়ুন: ‘আপনার কোন কাজে লাগতে পারলে গর্ব বোধ করব’,
সত্যজিৎ রায়কে চিঠিতে লিখেছিলেন সুবিমল বসাক…
এই যে এত চিঠি রয়েছে সুবিমলের সংগ্রহে, মাত্র একজনের চিঠি পেয়েই আমি চমৎকৃত হয়েছিলাম। আশা করিনি, তাঁর চিঠিও থাকবে সেই ভাঁড়ারে। তিনি, সৈয়দ মুজতবা আলী। একটি কার্ডে, তাঁর বিখ্যাত সবুজ কালিতে লেখা বক্তব্য।
13.12.65
নিচুপটি,
P.O. BOLPUR
সবিনয় নিবেদন,
উপহারে প্রাপ্ত আপনার প্রেরিত ‘ছাতামাথা’র জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই। বইখানি পড়ে মনে হল আপনার সত্যই আপনার নিজের ভাষার প্রতি দরদ আছে। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সিলেটের উপভাষা আপনার ব্যবহৃত ভাষা থেকে অনেক দূরে এবং আমি আপনার অঞ্চলে বসবাস করার সুযোগ পাইনি বলে আমি এ-ভাষার সম্যক রসগ্রহণে অসমর্থ। যেটুকু পেয়েছি তার থেকে মনে হয়েছে এ পুস্তিকা আপনার সমভাষাভাষীদের মধ্যে সম্যক স্বীকৃতি পাবে।
কিন্তু আপনাকে বলি, আমি লেখক। লেখকের মতামতে কি যায় আসে? The man in the street, সাধারণ পাঠক কি বলে সেইটেই আসল, সেইটেই স্থির করে পুস্তিকা গ্রহণ করবে না বর্জন করবে।
নমস্কারান্তে, সৈয়দ মুজতবা আলী

মুজতবা আলীর জন্ম সিলেটে। ফলে সেখানকার কথ্যভাষায় তিনি স্বচ্ছন্দ। অন্যদিকে, চিঠিতে সুবিমলের ‘অঞ্চল’-এর ভাষা হিসেবে বইটিকে চিহ্নিত করা হলেও, সুবিমলের জন্ম আদতে পাটনায়। তাঁর পূর্বপুরুষরা অবশ্য ছিলেন ঢাকার বাসিন্দা।
দ্বিতীয়ত যাঁর চিঠি তুলে ধরব, তিনি মৈত্রেয়ী দেবী। বিষয় সেই একই— ‘ছাতামাথা’।

Council For Promotion of Communal Harmony
13/1, Palm Avenue, Calcutta-19, Phone: 44-3261
General Secretary: Maitraye Devi
18.9.65
কল্যাণীয়াসু,
আপনার বই ‘ছাতামাথা’ পেয়েছি। সাধারণত যে কোনো লেখা হাতে এলেই আমি পড়ে ফেলি তবে বর্তমানে নানা কাজে বড় ব্যস্ত থাকায় সবটা পড়তে পারিনি— যা হোক যেটুকু পড়েছি তাতে নিশ্চয় বুঝেছি আপনি যে ভাষায় যে সব কথা ভাবেন, তাই লিখেছেন। সেটা একটা গুণ বটে। অর্থাৎ বানিয়ে না লিখে যা আপনার কাছে সত্য তাই লেখা। তবে এটাও জানবেন যে দৈবাৎ ঐ ভাষায় ঐভাব আপনার নিজস্ব হয়েছে— কারণ ঘটনাক্রমে যে পরিবেশে আপনি জন্মেছেন সে আবহাওয়া আপনাকে এটা দিয়েছে কিন্তু আরো তো নূতন ভাষা ও ভাব আছে যা আপনার এখন জানা নেই, তার সন্ধান করুন। গাছ তো মাটির ভিতরে জন্মায় কিন্তু সে তো সেখানেই মুখ গুঁজে পড়ে থাকে না। আকাশে ডাল-পালা বিস্তার করে প্রকাণ্ড হয়ে ওঠে। আপনারাও বড় হন। যার মধ্যে জন্মেছেন শুধু তাই নিয়েই সন্তুষ্ট হবেন না। অসন্তোষ এবং বিচিত্রের প্রতি আগ্রহ মানুষের প্রয়োজন।
শুভার্থিনী
মৈত্রেয়ী দেবী

অন্যদিকে, কবি মণীশ ঘটকের চিঠিটি সংক্ষিপ্ত—
১৪/৯/৬৫
সবিনয় নিবেদন,
‘ছাতামাথা’ পেয়েছি, পড়েছি এবং বলতে পারি যে, বইটি মনে গভীর দাগ কেটেছে।
ভাষা? অন্তত আমি ত পড়ে বুঝেছি ও উপভোগ করেছি।
ভবদীয়
মণীশ ঘটক

শুধু সুবিমল বসাককে লেখা চিঠি হিসেবেই নয়, হাংরি জেনারেশনের দলিল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হল আইএএস অশোক মিত্রের চিঠি। ভারতের প্রথম জনগণনা কমিশনার তিনি। ছিলেন রাষ্ট্রপতির সচিবও। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রশাসনের বিভিন্ন দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি, প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিপ্রেমী ও ইতিহাসপ্রেমী হিসেবেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সুবিমল তাঁকে কয়েকটি হাংরি বই ও পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন। কী জবাব ছিল অশোক মিত্রের?
Secretary
Ministry of Information & Broadcasting
New Delhi – 1
32682
Information
15 Pandit Pant Marg
New Delhi 1
20 July 1968
সবিনয় নিবেদন
বেশ কয়েকমাস হলো আমি নিম্নলিখিত বই কখানি ডাকযোগে পেয়েছি। আমি বিশেষ লজ্জিত যে কার্যগতিকে উল্টেপাল্টে পড়তে পারিনি। সম্প্রতি সামান্য অবকাশে পড়েছি।
অশ্লীলতা বিষয়ক আলোচনায় আমার স্বভাবত ক্লান্তি আসে। সংস্কৃত, চিনে, জাপানি, গ্রীক এবং ল্যাটিনে যে সব অশ্লীল রচনা আছে তার তুলনায় ১৭ শতকের পর তন্মূল্য রচনা বিশেষ হয়নি। ইতর রচনা অবশ্য অনেক হয়েছে। সুতরাং অশ্লীলতা আমার উপর বিশেষ রেখাপাত করেনা।
আমি বিশেষ আকৃষ্ট ও আগ্রহান্বিত হয়েছি আপনাদের বন্ধুগোষ্ঠীর ভাষার ব্যবহারে। ধ্বনি, বাক্যসংযোগ, ছন্দ, স্থানীয় বুলির প্রয়োগ এসব বিষয়ে দক্ষতা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। একএক সময়ে মনে হয়েছে কালীপ্রসন্ন সিংহের পর এ ধারা কেন শুকিয়ে গেছলো। শ্রীকমল মজুমদার এবং অমিয়ভূষণ মজুমদার অনেকাংশে নানা ধরণের পরীক্ষার অবতারণা করেছেন অবশ্য। কিন্তু বাংলাভাষার সাবলীলতাবৃদ্ধির সাহায্যে আপনারা নিযুক্ত হয়েছেন বলে আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।
আমার ভিয়েৎনাম, ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি-র সংহত ধ্বনি ও ছন্দ বিশেষ আনন্দ দিয়েছে। আমার ধন্যবাদ জানবেন ও সকলকে দেবেন, ইতি
ভবদীয়
অশোক মিত্র
1. Malay Roychoudhury: The Poet of Our Time
2. Subimal Basak: Chhatamatha
3. Hungry Generation: Malay Roychoudhry
4. Amar Vietnam: Samir Roychoudhury
5. Jharnar Pashe Shue Achhi: Samir Roychoudhury
6. Subhash Ghosh: amar Chabi
7. Unmarga No. 3

জানি না, এই চিঠি আগে প্রকাশ্যে এসেছে কিনা। তবে অশোক মিত্রের মতো ব্যক্তির কাছ থেকে এই দরাজ সার্টিফিকেট হাংরি আন্দোলনকারীদের যে বিশেষ প্রাপ্তি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
চিঠির পর্ব আপাতত এখানেই শেষ করা যাক। সুবিমলকে চিঠি লেখেননি, কিন্তু সুবিমলের সংগ্রহে থাকা বইয়ে তাঁদের স্বাক্ষর রয়েছে— এমন ব্যক্তির সংখ্যাও কম নয়। বেশ কয়েকটি উদাহরণ আগের পর্বগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে। তা ছাড়াও অ্যালেন গিন্সবার্গ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, স্বদেশ সেন, অনন্য রায়, রাহুল পুরকায়স্থ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তেমন কয়েকটি ছবিও সংযুক্ত করা হল শেষ লগ্নে।



যে-সমস্ত চিঠি ‘প্রিয় সুবিমল’ ধারাবাহিকে আলোচিত হল, তাঁর বাইরেও থেকে গেল অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ চিঠি। বাংলায় তো বটেই, হিন্দি-ইংরাজিতেও। সেসব আদৌ কোনওদিন প্রকাশ্যে আসবে কি না, এলেও কোন আঙ্গিকে— তার উত্তর লুকিয়ে রইল ভবিষ্যতের গর্ভেই। দীর্ঘ ৮৬ বছরের জীবন কাটিয়ে, গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রয়াত হন সুবিমল। তারপর, তাঁর তেতলার ঘর ঘেঁটে উদ্ধার করা এইসব চিঠি ছয়-সাত-আটের দশকের বাংলা সাহিত্যের এক অজানা দিক তুলে ধরল। সমৃদ্ধ হলাম আমরা, সমৃদ্ধ হলেন পাঠকও। আর সুবিমল তো তাঁর ‘হাবিজাবি’ কাব্যগ্রন্থে লিখেইছিলেন—
‘সুবিমল বসাকই আমার একমাত্র হুঁশ আত্মা
সুবিমল বসাকই একমাত্র সুবিমল বসাকের উত্তরাধিকারী
সুবিমল বসাকই একমাত্র সুবিমল বসাকের ধর্ম
সুবিমল বসাকই একমাত্র সুবিমল বসাকের ইতিহাস
সুবিমল বসাকই একমাত্র সুবিমল বসাকের সংস্কৃতি।’
সেই সংস্কৃতি বহমান থাকুক, অপেক্ষাকৃত কম চর্চিত এই সাহিত্যিককে নিয়ে আরও আলোচনা হোক, নতুন-নতুন দিক উঠে আসুক— চাওয়া বলতে এটুকুই!
(ডায়েরি ও চিঠির বানান অপরিবর্তিত)
ছবি সৌজন্যে: তন্ময় ভট্টাচার্য



