কালীঘাটের গুপ্তধন
ষাট পয়সার টিকিটের গ্যালারিতে খেলা দেখেছেন কখনও? লক্ষ্মী-গণেশ-সরস্বতী মাঝে মাঝেই আমাদের কালীঘাট চত্বরে তেমনই ষাট পয়সার গ্যালারিতে চড়েন। গ্যালারিতে চড়েই তাঁরা খেলা দেখেন। রাস্তার ধার জুড়ে সারি-সারি গ্যালারি বাঁধা হয় চৈত্রের শেষে। এটা হয় রাতারাতি। পরেরদিন বেলাবেলি তাঁরা চড়ে বসেন, সারারাত সেই গ্যালারিতেই থাকেন। সারাদিন ধরে তাঁরা দামি, রাত গভীর হলে দাম কমে। রাত হলে বাবার সঙ্গে যেতাম কম দামে সরস্বতী কিনতে। ওইজন্যেই পরীক্ষার নম্বরও কম হত পরে বুঝেছি।
বাবা অবশ্য কালীপুজো-লক্ষ্মীপুজোর আগের দিনগুলো সারারাত স্বেচ্ছাশ্রম দিত জ্যাঠার দশকর্ম্মা দোকানে। চোখে চশমা চেপে লম্বা রোল কাগজে টাকার অঙ্ক লিখে টাকা জমা নিত। বাবা ক্যাশিয়ার। সেই ক’টা দিন সন্ধে থেকেই বাবা কালীঘাট বাজারে, ভোরে কখনও বাড়ি ফিরত, আমি জানতাম না।
কিন্তু চৈত্র সংক্রান্তির সময় বাবার ভবানীপুরের দোকানের গুরুদায়িত্ব। আমি জানতাম, ভোররাতে বাবা ওঠার সঙ্গে-সঙ্গে উঠে পড়তে হবে। বাবা চান করলেই, আমাকেও চান করে নিতে হবে। যত ভোরই হোক সেদিন আমার চান করতে কোনও ঝামেলা নেই। চান করেই নতুন জামা মানে পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে রেডি। চলো বাবার সঙ্গে। প্রথমে রাস্তায় এসেই নির্দিষ্ট দোকানে। আগে থেকেই বলা থাকে, ঠিক সাইজমতো গণেশ-লক্ষ্মী কেনা হল। কোনও দরাদরি নয়। একে বলে একডাকের ঠাকুর। তার আগে জ্যাঠার দোকান থেকে বড় একটা ঝুড়ি, বড় দুটো খেরো খাতা। একপাতা সিঁদুর। বাবা সঙ্গে করে নিয়ে যেত একটা রুপোর টাকা। ঝুড়ি ভরে উঠবে ফুলে। সবই নির্দিষ্ট দোকানে গেলেই হাতে দেবে। সঙ্গে-সঙ্গে মূল্য।
এবার কালীঘাট। সেখানে প্রবল ভিড়। জনসমুদ্র। সমুদ্র আটকাতে বাঁশ বাঁধা, দড়ি ফেলা। আমরা চলে যাব এক জ্যাঠার দোকানে। এদিন পায়ে চটি-জুতো নেই। এদিন পায়ে আমার কাঁকর ফুটবে না! পেরেক ঢুকবে না! গুঁপো হয়ে যাবে না! অন্য কোনওদিন পিচের রাস্তায় ফুটবল-ক্রিকেট খেললে কত জ্ঞান শুনতাম! কানমলা খেয়ে খেয়ে কান লম্বা হয়ে গিয়েছিল, সেদিন কোনও দোষ নেই! কী আশ্চর্য সব বড়রা ছিল!
তারপর একজনের সঙ্গে প্রবল ধ্বস্তাধস্তির মধ্যে কেমন যেন ফাঁক গলে টুক করে ঢুকে যেতাম গর্ভগৃহে। সেখানে পুজোপাঠ মিটিয়ে বাড়ি ফেরা। বাড়ি ফিরে রুপোর টাকায় সিঁদুর মাখিয়ে খেরো খাতায় ছাপ দেওয়া।
তবে মন্দির থেকে এই ফেরার সময়টা ছিল খুব ইন্টারেস্টিং। বাবার ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখতাম, আর টেনশনে থাকতাম— বাবা ভুলে যাবে না তো? আমি পা টিপে-টিপে হাঁটতাম। প্রায় স্লো মোশন। বাবা ভুলত না। এসে দাঁড়াত মন্দির থেকে এগিয়ে একটা দোকানের সামনে। কচুরির দোকান। বেশ বেশি-বেশি নিরামিষ কচুরি কিনত, আর জিলিপি। সেটা দেওয়া হত বাঁশের চাঁচড়ের ঝুড়িতে শালপাতা পেতে। নীচের ঝুড়িতে জিলিপি, ওপরের ঝুড়িতে কচুরি। আমার পেটের সামনে থেকে সেটা মুখ পর্যন্ত উঠে উঁচু হয়ে থাকত। আমি ভুরভুরে গন্ধ পেতাম—আর তখনই দু-পায়ে জোর ফিরে পেতাম। রণপায়ে বাড়ির দিকে চলতাম। ‘‘মন বলে আয় ‘খাব খাব’, মুখ চলে তায় খেতে,/ মুখের সঙ্গে খাবার চলে পাল্লা দিয়ে মেতে।’’ সে-সময় আমাকে সুকুমার রায়ের আঁকা ‘খুড়োর কল’ কবিতার খুড়োর মতো লাগত নিশ্চয়ই!
সন্ধেবেলা ভবানীপুরের দোকানে।

কিন্তু একটু বড় হতে আর ভবানীপুরের দোকানের দিকে ঘেঁষতাম না। এদিন বাবা চলে গেলে রাজা। রথের দিনে পটুয়াপাড়ায় কাঠামো বাঁধা শুরু হয়। এই নববর্ষের সকালেও পটুয়াপাড়ায় অন্য একটা কিছু হত— সরায় মাটি দিয়ে তার ওপর আমপল্লব, ভেজানো চাল, ডাল, ফুল, পাতা। সেখানেই আমাদের বেলা গড়িয়ে যেত। হুড়মুড়িয়ে বড় হওয়ার সময়ে দুটো জিনিস আমার দারুণ লাগে— একটা গড়ের মাঠের বারপুজো। বেশ কয়েকবার বাবাকে ফাঁকি দিয়ে বারপুজোয় গিয়েছি। আর ছিল দুপুরবেলা আদ্দির পাঞ্জাবিতে গিলে করা। আমি গিলে ফল টিপে গিলে করতেও জানি পাঞ্জাবিতে। তেমন পাঞ্জাবি আছে, গিলে ফলও আছে, শুধু গিলে-করা আদ্দির পাঞ্জাবি পরার মতো উত্তম-সৌমিত্ররা নেই!
কালীঘাটে মন্দির সকালে যদি দখল হয় ব্যবসায়ীদের হাতে, বিকেলে তবে গৃহস্থদের ভিড়। বছর শুরুর দিনে শুভাশুভ কামনা করে মায়ের কাছে পুজো। নববর্ষে দিনে লুকুকে নিয়ে এই কালীমন্দিরেই একটা ঘটনা ঘটে, যা তিক্ত-কশা, তা শেষপাতেই বলি, আগেভাগে বলে মুড-অফ করব না।
আমাদের বাংলা নতুন বছরের নড়াচড়া শুনি আগে থেকেই, যখন দেখি মোটা শিব, পটকা শিব, ভোটকা শিব, খেঁচা শিবরা সেজেগুজে বেরিয়ে পড়েছে। সবাই যাবে নকুলেশ্বর তলায়। বাবার কাছে গাজন হবে। কালীঘাটে সারা বছর কালীর চেলাদের বড় বাড়ন্ত। এই ক’টাদিন গেঁজুড়ে নন্দী-ভৃঙ্গিরা দখল করে। বুকের হাড়-জিরজিরে খাঁচা সম্বল করে কী তাদের প্রতাপ! সবগুলোর পাছায় রংচটা বাঘছাল। মাথায় পরচুল দোদুল-দোদুল করে। বেচারারা হবিষ্যি আর গাঁজায় থাকে। তখনও ওদের দেখিয়ে মায়ের চ্যালারা বলির পাঁঠার মাথা খায় কালীমাসির চোলাইয়ে।
আমাদের পাড়ার গায়েই ঘাসহীন ছোট্ট সাদা মাঠের একদিক ছিল গভীর রহস্যে ঘেরা। ছোটবেলায় যদি জানতাম, বড় হয়ে ডিটেকটিভ নভেল, থ্রিলার নভেল লিখতে হবে, তবে নির্ঘাত ছোটবেলায় একবার ওদিকে অভিযান চালাতাম।
আমাদের সাদা মাঠের ঠিক শেষদিকের কোণের জায়গাটা মাটির ঢিবি। তার নীচের অংশে বেশ ঢাল। আর ছিল ডুমুর, জগ্গি ডুমুর আর টক ঢ্যাঁড়শের গাছের ঝোপ। শোনা কথা, ওখানেই থাকত কালীমাসির চোলাইভরা ব্ল্যাডার, জারিকেন। সন্ধেবেলা ওখানে লোক ঢোকে, মাল খালাস করে, রেখেও যায়। কেউ-কেউ বলে, ওখানে তোর দাদার বোম রাখা থাকে। ওটা নাকি বাঘাদার বোমের কোল্ড স্টোরেজ। বেশ ভয়ের জায়গা। এই মাঠটা ছিল আমাদের হোম গ্রাউন্ড।
এ-মাঠের আরও একটা বিপজ্জনক জায়গা ছিল দুটো বড়-বড় মাটির গামলা। খাটা পায়খানা। এদিকে বল গেলে সর্বনাশ। তাই ফুটবল খেলার সময় ওখানে বাড়তি দু-চারজন না-খেলোয়াড় মোতায়েন থাকত। মাঠে কাটা ছিল গাদির কোর্ট। মাঝেসাঝে বিকেলবেলা বড় থেকে খুচরো মস্তানদের দেখতাম গাদি খেলছে। তবে রাতের দিকে ওই মাঠ অনেকেই পার হত না। বিশেষত মেয়েরা, কারণ ভূতের ভয়!

সাদা মাঠ থেকে যে রাস্তাটা চক্রবর্তীপাড়ার দিকে গড়িয়ে যাবে সেখানেই ছিল একটা মস্ত পোড়োবাড়ি। তার মোটা-মোটা দেওয়ালগুলো ইটের পাঁজরা বের করে হাসছে। বট-অশ্বত্থ ঝুরি নামিয়েছে। সাপও নাকি আছে! তবে দিনের বেলা ভেতরে ঢুকে দেখেছি— বেশ পরিষ্কার করা। ছেঁড়া একটা মাদুর পাতা। না, না, ওখানে কোনওদিন মালের ঠেক বসত না, বরং পাড়াতুতো পেতনিদের সন্ধেরাতে ফুটুস-ফাটুস ঢুকতে-বেরতে অনেকেই দেখেছে। পাড়াতুতো কিছু পেতনি থাকে সব পাড়াতেই। কয়েকজন মুখ-ফসকা বুড়ি এদের দেখলেই বলত— এগুলান ছেনাল মাগি।
ওই মাঠের ধারে দু’টি উল্লেখ্যযোগ্য ‘পোতিবাদ’ ছিল আমাদের বিরুদ্ধে। যা সারাজীবন ভুলব না। এক ‘শ্রীমাল রমণী’-র ঘর ছিল মাঠের ধারে। আমরা খুব হইহট্টগোল করি বলে সেই শ্রীমাল রমণী নিত্যদিন তার লাল-নীল, সাদা-কালো গুচ্ছের ব্রেজিয়ার কেচে দড়ি টাঙিয়ে, ক্লিপ এঁটে ঝুলিয়ে দিত মাঠের মাঝখানে। মাঠ সবার।
খেলা যার যার— মাঠ সবার। সেই মাঠে আমরা খেলাধুলো করে মারাত্মক মহাদোষের কোপে পড়তাম। পাড়াতুতো দিদিরা এমন ঘটনা ঘটতে দেখলেই— আমাদের ‘অসভ্য’ বলে কান ধরে টেনে এনে বাড়িতে ঢুকিয়ে দিত। সেইসঙ্গে মা-দিদিকে ফিসফিস করে লাল-কালো-সাদার খবরও দিয়ে যেত। মা-ও কড়া শাসনে আটকে রাখত, যদি ব্রায়ের ফাঁদে পড়ি!
আর এখন যেমন ফেসবুক। মানুষ সেখানে এঁটো হাড়-কাঁটা ছোড়ে, ওখানেও তেমন, ফেসবুকীয় কায়দায় একটা বড়লোক বাড়ির ফাটা-রসগোল্লার মতো মিষ্টি ঠাকুমা জানলা দিয়ে বড়-বড় মাছের বড় বড় কাঁটা ছুড়ে দিত মাঠে। পায়ে ফুটে মরি আমরা আর কী! আমরা তাই পাড়ার মাঠ ছেড়ে চলো জেলগ্রাউন্ডে। কালীঘাট পার্কে।
আমাদের বাড়িতে সব চারাপোনা, বাটামাছ, পারশে, ট্যাংরা। ওইসব মাছের কাঁটা দেখে আমরা ভাবতাম— ওরা নির্ঘাত তিমি মাছ খায়! আমি খাওয়ার ব্যাপারে আগাগোড়া একটু লোভী ও ছোঁচা। একদিন একটা বড় মাছের কাঁটা তুলে এনে মাকে বলেছিলাম— এটা কী মাছের কাঁটা! বাবাকে বলবে তো, একদিন এই মাছ নিয়ে আসতে।
পুরো বাক্যটা মনে হয় সেদিন শেষ করতে পারিনি। তার আগে সপাং-সপাং করে সুন্দর ঝালর দেওয়া হাতপাতার ডান্ডা হাওয়া দিয়েছিল পিঠে।
দোষ আমার অনেক ছিল। আমি মায়ের কাছে বায়না করেছিলাম— মাকে বলেছিলাম, টাকা দাও, আমি বলির পাঁঠার একটা মাথা কিনে আনব।
মা-দিদি হাঁ করে তাকিয়েছিল মুখের দিকে।
আমিও এক পয়লা বৈশাখে জুতো ভাসিয়েছিলাম লেকের জলে। খুব ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখের দিন ভোরবেলা আমাদের পাশের বাড়ির প্রতাপদা পাড়ার বেশ কয়েকজন বাচ্চাকে নিয়ে যেত বেড়াতে। একবার নিয়ে গিয়েছিলাম লেকে। লেকের ভেতর লিলিপুল। আমরা ছোটরা প্রতাপদার নেতৃত্বে লেকের জলের বুকে লিলিপুলে দাঁড়িয়ে। নীচে ছোট-বড় মাছ। ওরা ওপরের দিকে আমাদের দেখছে। আমরা নীচের দিকে ওদের দেখছি। এবার চলে আসার পালা। হাত দিয়ে টা-টা করলে ওরা কতটা দেখতে পাবে? আমি তাই রেলিংয়ের ভেতর দিয়ে একটা পা গলিয়ে টা-টা করতে গেলাম। আর তখনই আমার পায়ের থেকে এক পাটি নাগড়াই খুলে টপ করে লেকের জলে। সঙ্গে-সঙ্গে মাছেদের কী উল্লাস!
আমি তখন বোঝাচ্ছিলাম— বলির পাঁঠার মাথা মানে শুধু পাঁঠার মাথা নয়। জানো, পাঁঠা বলি দেওয়ার টেকনিক আছে। ওরা পাঁঠার মাথা ধরে এমন টানে যে গলাটা লম্বা হয়ে যায়। আর যে বলি দেয়, সে সূক্ষ্মভাবে যতটা পারে গর্দানে মাংস রেখে কোপ মারে। ফলে মাথার সঙ্গে গর্দানের অনেক মাংস থাকে। শুধু পিঁয়াজ-রসুন ছাড়া বলির মাংস রান্না করতে হবে।
সেদিন আমার কথা শেষ করেছিলাম। কেননা আমার মা তার একমাত্র ছেলের কাছে টেকনিক শুনে হাঁ। টেকনিক ওয়ান— পাঁঠার গর্দানে মাংস থাকা, টেকনিক টু— রন্ধন পদ্ধতি। মা যখন বিহ্বল। মেজদি তখন হড়হড় করে বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছিল।
আমিও এক পয়লা বৈশাখে জুতো ভাসিয়েছিলাম লেকের জলে। খুব ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখের দিন ভোরবেলা আমাদের পাশের বাড়ির প্রতাপদা পাড়ার বেশ কয়েকজন বাচ্চাকে নিয়ে যেত বেড়াতে। একবার নিয়ে গিয়েছিলাম লেকে। লেকের ভেতর লিলিপুল। আমরা ছোটরা প্রতাপদার নেতৃত্বে লেকের জলের বুকে লিলিপুলে দাঁড়িয়ে। নীচে ছোট-বড় মাছ। ওরা ওপরের দিকে আমাদের দেখছে। আমরা নীচের দিকে ওদের দেখছি। এবার চলে আসার পালা। হাত দিয়ে টা-টা করলে ওরা কতটা দেখতে পাবে? আমি তাই রেলিংয়ের ভেতর দিয়ে একটা পা গলিয়ে টা-টা করতে গেলাম। আর তখনই আমার পায়ের থেকে এক পাটি নাগড়াই খুলে টপ করে লেকের জলে। সঙ্গে-সঙ্গে মাছেদের কী উল্লাস! ভেবেছ লেড়ো বিস্কুট পড়েছে। সেটা নিয়ে ঠোক্কর মারতে মারতে দখলদারি চলছে। ওপরে আমি কাঁদছি। দাদা বলল, এই জুতো তোলা যাবে না। চল বাড়ি যাই। নতুন জুতো কিনে দেব। পয়লা বৈশাখে সবার জামা হয়, এবার তোর নতুন জুতোও হবে। কী মজা!
আমার কান্না থামল। দাদা বলল, তা আর একপাটি জুতো হাতে করে বাড়ি ফিরে কী করবি? ওটাও মাছেদের দান করে দে। লেড়ো বিস্কুট ভেবে ওরা আনন্দ পাবে। আমি সঙ্গে-সঙ্গে দ্বিতীয় পাটি জুতোও ছুড়ে দিলাম নীচে লেকের জলে। মাছেদের উদ্দেশে। সেই থেকে আমি দান-ধ্যান শিখলাম। যা এখনও করে চলেছি।
কালীঘাট খোলাতাই হয় কপালে লম্বা করে একটা টিপ পরলে। আমি এমন বেশ কয়েকজনকে দেখেছি, যাদের বারোমাস কপালে লম্বা একটা সিঁদুরের লাল টিপ আঁকা থাকত সর্বদা। এরা বাড়ির মায়ের মতো মা কালীর কাছে সমর্পিত প্রাণ। এরা সাধারণত হাফ পাঞ্জাবি পরত, শ্যামাসংগীত গাইতে পারত। এদের ঘাড় একদিকে কাত করা আর মুখে অমায়িক হাসি। এরা যদি দক্ষিণেশ্বরের দিকে থাকত, তবে নির্ঘাত শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করাত। এরকম অনেককে দেখেছি।
কিন্তু এদের মধ্যে দুটোকে দেখেছি— যারা ‘হারামির হাতবাক্স’।
এদের একজন কপাত করে মেয়েদের হাত ধরে নানা কথা বলত। মা ছাড়া কথা বলত না, হাতও ছাড়ত না। কখনও কখনও মা-মা বলে পিঠেও হাত বোলাত। বদমাইশটাকে বোঝা যেত। কিন্তু আর-একজন—
আমার বড়জেঠি বাঘাদার মা একদিন সেই একজনকে হাতের সামনে পেয়ে একহাতে চুলের মুঠি, অন্য হাতে আচ্ছাসে চটিপেটা করেছিল।
কারণ জানতাম না। বড়জেঠি শুধু বলছিল— অনেকদিন ধরে খুঁজছিলাম। তুই কালীর ছেলের ভেক ধরেছিস? তোর ভেক আমি আজ ঘুচিয়ে দেব।
বড়জেঠিকে আমার একটাই প্রশ্ন ছিল— তুমি নিজে মারলে কেন? বাঘাদাকে বলে দিতে। বড়জেঠি উত্তর দিয়েছিল— ওটা মেয়েদের ব্যাপার, মেয়েদেরই শায়েস্তা করতে হয়। বাঘা মেরে ওর মাথা ফাটালে, পা ভাঙলেও ওই মার ওর গায়ে লাগত না।
মারল কেন? আমার প্রশ্ন ছিল? উত্তর ছিল না! আমি দু-একজন বিশ্বস্ত পাড়াতুতো দিদিদের জিজ্ঞেস করেছিলাম— জেঠি জুতোপেটা করল কেন? সবারই এক উত্তর— ও তুই বুঝবি না।
বুঝিনি, অনেকদিন বুঝিনি। কৌতূহল ছিল। আমি কৌতূহলেই মরি!
কালীঘাট আমার কাছে গোলকধাঁধার মতো। এর পরতে পরতে কৌতূহল। অনেক কিছু আবিষ্কারের উজ্জ্বল সম্ভাবনা এখানে। পুরো গুপ্তধন আছে! একটু বড় হয়ে— চিন্টুর কাছে গোপন একটা সংবাদ পেলাম— কালীঘাটের কোনও এক পূজারীর একটা গোটা বাড়ি আছে গলিতে। সে-বাড়ি এক মাসির আন্ডারে জমা দেওয়া আছে। সেখানে মেয়েরা খাটে। মাসি মাস গেলে টাকা তুলে দেয়। শুনে হাঁ! মনে রাখবেন, পান্ডা নয়, কালীঘাট মন্দিরের মায়ের পূজারী! আর চিন্টু মিথ্যে বলবে না। ওর কাছে খবর ছিল। ও তখন গলির কার্তিক! সারা বড়বেলায় সেই পূজারীকে খুঁজেছি, আবিষ্কার করতে পারিনি।
যেমন বুঝতে পারিনি, নিমাইদা ডেটিং-এ যাবে তো গলির ঘুপচি ঘরে। যাওয়ার আগে কেন গিলে করা সাবুদানা কাজ আদ্দির সাদা পাঞ্জাবি পরত, কেন যে স্নো মাখত? একজন বলেছিল, ওটা নিশিপদ্মের রাজেশ খান্না এফেক্ট! আর গলির মেয়েদের সঙ্গে সঙ্গত করে এসে কেনই-বা ওয়াহিদা রহমান, সায়রা বানুর কথা বলত নিমাইদা?
এটা কোন এফেক্ট? কে জানে, একে হয়তো ড্রিম এফেক্ট বলে!
এবার সেই তিক্ত কথাটা বলে নিই— একবার পয়লা বৈশাখের দিন আমরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছি। চেনাজানা দোকানে গিয়ে গোলাপি বরফ জল খাচ্ছি। কেউ ক্যালেন্ডার পাইনি। পরে দেবে। আশ্বাস পেয়েছি। অনেক অনেক ক্যালেন্ডার কেন লাগে অন্য সময় বলব। আমাদের বেশ বড়সড় গ্যাং। সঙ্গে বন্ধুদের বোন, পাড়ার কয়েকজন মেয়েও আছে। আমরা এতোলবেতোল ঘুরতে-ঘুরতে চলে গেছি, কুণ্ডুপুকুর পেরিয়ে কখন মন্দির চত্বরে ঢুকে পড়েছি। আগে-পরে হাঁটছি। হঠাৎ দেখলাম, জেঠিমার সেই চটিপেটা করা ‘মায়ের কোলের ছেলে’ আমাদের লুকুর সামনে দাঁড়িয়ে মিটি-মিটি হেসে-হেসে কথা বলছে। চেনাজানা লোক কথা বলতেই পারে। কিছুক্ষণ পরে লুকুকে দেখলাম কাঁদছে। কেঁদেই চলেছে।
লুকু খুব শান্তশিষ্ট ঠান্ডা মেয়ে। কী এমন হল যে, কাঁদছে! আমরা পাড়ার দিকে চলে এলাম। তখন বেশ বড়মতো হয়েছি। পাড়ার এক সাহসী মেয়ে আমাদের কাছে এসে বলল— ওই মায়ের কোলের ছেলে লুকুকে দেখে ডেকে জিজ্ঞেস করেছে— মামণি, মা ভাল আছে? দিদা ভাল আছে? তা তোমাকে এমন শুকনো-শুকনো লাগছে কেন? চোখ মুখ কেমন বসা-বসা! তুমি ভাল আছ তো মা? শুদ্ধ অবস্থায় মন্দিরে এসেছ? তোমার মাসিক হয়নি তো? মাসিক হলে মেয়েরা অশুচি। এ-সময় মেয়েদের কিন্তু মন্দিরে ঢুকতে নেই! ইত্যাদি ইত্যাদি।
ওই কথা শুনেই লজ্জায় লুকু কাঁদতে শুরু করে। বাবা-কাকার বয়সি একটা লোক কী কথা বলছে তাকে, সামনে বলছে, সমানে বলছে? কথাটা শুনেই আমি একনিমেষে বুঝতে পেরেছিলাম, সে সেদিন জেঠিমা কেন ওকে চটিপেটা করেছিল। করে অবশ্য ওর বদমাইশি ঘোচাতে পারিনি।
পরেরদিনই বাজারের সামনে থেকে ওকে তুলে আনা হয়েছিল পাড়ার ভেতর। তারপর গ্যাসপোস্টে বেঁধে রাখা হয়েছিল। আমাদের ইচ্ছে ছিল, ওকে হাড়িকাঠে ফেলে নরবলি দেওয়ার! টুকরে তখনও ফিগারে আসেনি। এলে মায়ের কোলের ছেলে নিশ্চয়ই ক্ষুর খেত। আমার পাড়ার মুখ-ফসকা বুড়ি বলেছিল— আজ তোকে মাছ-কোটা করি। আজ তোকে শিলবাটা করব। ছেলেরা ওকে যা মেরেছিস— আর না, এবার ওকে আমরা দেখব। শুনেছিলাম মাছ কোটা, শিলবাটার পর ওকে ঝাঁটা মেরে মেরে শজারু সাজানো হয়েছিল।
শুধু দীর্ঘদিন লুকু আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলত না, কেমন যেন গুটিয়ে থাকত। দলছাড়া হয়ে গিয়েছিল। যে বলছে তার নয়, যে শুনছে তারই লজ্জা, তারই অপমান, কান্না। সময়টা এমনই ছিল।
তবে এখন কি বদলে গেছে?



