উৎসব শেষের বিষাদ

পুজো এল, আপনি একঘেয়েমির ক্লেদ ভুলে ফুর্তির সমুদ্রে ডুব দিলেন। পুজো শেষ। কিন্তু আপনি কি ফ্রেশ? না ছোটবেলার মতো ঝাড়া আধাঘণ্টা চেবানোর পর চুয়িং গামটাকে যেমন ফুলিয়ে বেলুন বানাতেন, ঠিক তেমন করেই উৎসবের দিনগুলোকেও ফুলিয়েফাঁপিয়ে বাড়িয়ে নিতে চাইছেন? পুজো শেষ, উৎসব শেষ; এই ভাবনাটাই কি আপনার কাছে অসহ্য ঠেকছে? শুধু মনে হচ্ছে, এবার আসবে সেই কেজো দানবটা! কখনও টার্গেট আর ডেডলাইনের চোখরাঙানিতে ভয় দেখাবে, ইনসেন্টিভের আর তাতে কাজ না হলে প্রমোশনাল লিফটের গাজর ঝোলাবে; আর নেহাতই কপাল খারাপ হলে ইনফ্লেশনের নামে সার্ভিস উইথড্রয়ালের চাবুক মারবে। তাই পুজোর পরেই শুরু হল মনখারাপ। এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যদি আপনার মন উৎসবের দিনগুলোর ইউটোপিয়ান জীবনের ঝলমলে মেটাল আলো ভুলে দৈনন্দিন জীবনের টিমটিমে ডুমলাইটে ফিরে আসতে না পারে, তাহলে কিন্তু বিস্তর গন্ডগোল। মনোবিদরা এই পরিস্থিতির নামকরণ করেছেন ‘উৎসব পরবর্তী মনখারাপ’ বা ‘পোস্ট ফেস্টিভ্যাল ব্লুজ’। চলুন, ব্যাপারটার গভীরে গিয়ে সমস্যার শেকড় সন্ধান করি। 

আচ্ছা, বলুন তো— এবারের শারদ-উৎসবের আগমন বার্তা প্রথম ঠিক কীভাবে আপনার মনে উন্মাদনা জাগিয়েছিল? আপনার ইন্টেরিয়র করা ড্রয়িংরুমের দেওয়ালে তো এ’পাড়ার নবদুর্গা বস্ত্রালয়ের ক্যালেন্ডার টাঙানোর গজাল নেই। শরতের সেই চিরচেনা নীল আকাশটা দেখার ফুরসত কি এ-বছর আপনার সত্যি হয়েছিল? কাশফুলের  আলতো ছোঁয়া গায়ে মাখা বা শিউলিঝরা ভেজা উঠোনের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার সৌভাগ্যই বা ক’জনের ভাগ্যে জুটেছে? তবে কি আধুনিক ‘কাকেশ্বর  কুচকুচে’-র মতো ছ’-তলার ঝোলানো ব্যালকনিতে বসে স্মার্টফোনের স্ক্রিনের ক্যালেন্ডার অ্যাপে আঙুল ছুঁইয়ে খুঁজে দেখতে হয়েছিল পুজোটা এবার কবে? কেউ অবশ্য তা করতেও পারেন, তবে আপামর ছুটন্ত শহরবাসীর স্মার্টফোনের ড্রপডাউন নোটিফিকেশনে ভেসে ওঠা অনলাইন শপিং অ্যাপের  ‘মেগা সেল’ আর ‘ফেস্টিভ্যাল ধামাকা’-ই তাদের মনে করিয়ে দেয়— পুজো চলে এসেছে। তবে রোডসাইড হোর্ডিংজুড়ে পুজোর কেনাকাটার বিজ্ঞাপনের প্রলোভন কিন্তু আজও প্রাসঙ্গিক। এরপর থেকেই শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডজুড়ে ‘হোমকামিং’-এর অন্তহীন জোয়ার— ভিনরাজ্য, এমনকী ভিনদেশ থেকেও ট্রেনে-প্লেনে কেটে পড়া বাঙালির ঘরে ফেরার ব্যাকুলতা; এয়ারপোর্টে এক্সিট গেট পার করেই একহাতে পাহাড় সমান লাগেজ টানতে-টানতে অন্য হাতে প্রিয়জনকে বুকে জড়িয়ে ধরার ক্লিপিংস। তার পর একে-একে কুমারটুলির রিলস, রবিবারের দৈনিকের পাতাভর্তি জুতোর বিজ্ঞাপন, শহর জুড়ে বাঁশের ম্যারাপ আর প্যান্ডেলে-প্যান্ডেলে লাইট লাগানোর তোড়জোড় সোজা গিয়ে ধাক্কা মারে আমাদের বাঙালিয়ানায়। উৎসবের আবহের অন্তরালে চাঙ্গা হয় কর্পোরেট বিজ্ঞাপনের বাজার অর্থনীতির এক বিরাট চক্র— চারপাশে জমে ওঠে বিকিকিনির এক বিশাল হাট, ‘a big shopping centre’। 

আরও পড়ুন: বাঙালিরা কিছুই ফেলে দেয় না!
লিখছেন অমিতাভ মালাকার…

এই ভাইরাল আবেগ আর অনলাইন উন্মাদনার পারদ চড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে আমাদের উদযাপনের প্রত্যাশার ইমারতের উচ্চতা। আর অনলাইন সেলের স্ক্রিনশট দেখামাত্রই বা কার্ট-এ জিনিস জমার সঙ্গেই মস্তিষ্ক থেকে হু হু করে ক্ষরিত হতে শুরু করে ‘ডোপামিন’, যার ডাকনাম ‘হ্যাপি হরমোন’। আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের অন্দরে ‘ডোপামিন রাশ’ পুজোর ক’দিনের আনন্দ-উৎসবের এক মনস্তাত্ত্বিক পূর্বাভাস তৈরি করে। আমাদের পুরো জীবনটাই একটা বিরাট থিয়েটারের মঞ্চে পরিণত হয়। দুর্গাপুজোর ক’দিনের আনন্দময় ‘পুজো ভ্যাকেশন’ যেন  এক আলো-ঝলমলে স্টেজ শো; যার কাস্টিং চমৎকার, আলোকসজ্জা চোখধাঁধানো, আবহসংগীত মনমাতানো। চার-পাঁচটা দিন ধরে আমরা সবাই সেই রঙিন জীবনের একেকজন চরিত্র হয়ে উঠি। রোজকার লোকাল ট্রেনের গুঁতো-গুতি, প্রজেক্ট কমপ্লিট করার ডেডলাইন, আলু-উচ্ছে আর কাটা-বাটার একঘেয়ে দর কষাকষি ভুলে রেখে ভেসে চলি এক অলৌকিক মায়াস্রোতে। কিন্তু আইসক্রিমতো খেলে ফুরবে আর না খেলে গলে শেষ হবে। বিজয়া দশমীর  সিঁদুর খেলার পর প্রতিমা নিরঞ্জনের মধ্যে দিয়ে হয় নাটকের ‘কার্টেইন কল’;  উৎসবের যবনিকা পড়ে।  কুশীলবরা তাদের মেকআপ তুলে ফেলে, সেট খোলা শুরু হয়— কিন্তু তখনই আমরা কেউ-কেউ নিজেদের আবিষ্কার করি এক অপার শূন্যতার মাঝসমুদ্রে। রক্তে ডোপামিনের উত্তাল প্রবাহ ক্রমশ শ্লথ হয়ে আসে। পুজোর ছুটির এই রূপকথা থেকে বাস্তবের তপ্ত পিচ রাস্তায় আবারও নেমে আসার মুহূর্তটি নিঃসন্দেহে বিষাদের। কিন্তু কেন ঘটে এই মন খারাপ? কেন আলো নেভার পর আমাদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে? এর নেপথ্যে কি শুধু আবেগের খেলা, না কি লুকিয়ে আছে মনস্তত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান ও গাট-ব্রেন অক্ষের জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া? এবার চলুন, নেওয়া যাক সেই শূন্যতার হাঁড়ির খবর।

মনস্তত্ত্ববিদ ও স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বলছেন, পুজো-পরবর্তী এই মনখারাপ কোনও কাল্পনিক বা সাময়িক খেয়াল নয়; এর পিছনে রয়েছে আমাদের মাথার ভেতরে কাজ করা এক নিখুঁত ও চমৎকার স্নায়বিক রসায়নের খেলা। এই মনখারাপ আসলে  আমাদের আনন্দ ও উত্তেজনার এক বিরাট ডামাডোলের পর হঠাৎ করে নেমে আসা এক গভীর নীরবতা। আমাদের মস্তিষ্কে থাকা ‘লিম্বিক সিস্টেম’, বিশেষ করে আনন্দ ও সুখের অনুভূতির কেন্দ্র ‘নিউক্লিয়াস অ্যাকামবেন্স’ এবং ভয় ও উদ্বেগকে পাহারা দেওয়া ‘অ্যামিগডালা’— পুজোর চার-পাঁচ দিন ধরে আক্ষরিক অর্থেই উৎসবের আলোয় উদ্ভাসিত থাকে। এই ক’দিন যখন আমরা প্যান্ডেলে হইচই করি, নতুন জামার সুবাস নিই, কিংবা প্রিয়জনদের সঙ্গে হাসিমুখে আড্ডা দিই, তখন ব্রেনের এই বিশেষ কারখানাগুলো থেকে হু হু করে ক্ষরিত হতে থাকে ‘ডোপামিন’— যা আমাদের মনে আনন্দ জাগায়। তার সঙ্গে দোসর হয় ‘সেরোটোনিন’— যা আমাদের মনটাকে ফুরফুরে ও চাঙ্গা রাখে। কিন্তু এই আনন্দ আর আলোর খেলা চিরকাল তো আর চলতে পারে না! উৎসব ফুরলেই ব্রেনের এই হরমোনের কারখানাগুলোতে হঠাৎ করে নেমে আসে এক বিরাট ধস, মনোবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডোপামিন ক্র্যাশ’। ভাবুন তো, কোনও বিশাল কারখানায় একটানা চারদিন ধরে দ্বিগুণ গতিতে কাজ চলার পর হঠাৎ করে যদি মেইন সুইচটা অফ করে দেওয়া হয়, তবে যেমন হুলুস্থুল কাণ্ড ঘটে, ব্রেনের অন্দরেও ঠিক তেমনই এক ছন্দপতন ঘটে। ডোপামিনের এই আচমকা পতন ঘটামাত্রই আমাদের হরমোন ক্ষরণের আর আবেগ নিয়ন্ত্রণের কারখানা ‘হাইপোথ্যালামাস-পিটুইটারি-অ্যাড্রেনাল’ অক্ষ কেঁপে ওঠে এবং রক্তে হু হু করে বাড়তে থাকে আমাদের খুশির নৌকোর খোলে ফুটো করা স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’। এই কর্টিসল আমাদের মনে অজানা আতঙ্ক আনে, খিটখিটে মেজাজ এবং এক অদ্ভুত চাপা অস্থিরতা তৈরি করে।

শুধু কি মগজ? এই জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের অন্ত্র-রও রয়েছে এক নিবিড় যোগসূত্র, যাকে আধুনিক বিজ্ঞানে বলা হয় ‘গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস’ বা অন্ত্র ও মস্তিষ্কের অদৃশ্য সেতু। আমাদের শরীরের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সেরোটোনিন আসলে তৈরি হয় আমাদের অন্ত্রে! পুজোর চার-পাঁচ দিন ধরে রাত জেগে ঠাকুর দেখার ফাঁকে ফুঁচকা-আলুকাবলি, প্যান্ডেলের লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে কোল্ড ড্রিংকস এবং ভোর-রাতে ঘরে ফেরার আগে বেশি করে মিষ্টি দিয়ে মোষের দুধের চা খাওয়ার ফলে আমাদের অন্ত্রের ভেতরে থাকা কোটি-কোটি ভাল ব্যাকটেরিয়া বা উপকারী মাইক্রোবায়োমগুলো যেন দিশেহারা হয়ে যায়। অন্ত্রের এই বিপর্যয়ের বার্তা তখন সরাসরি ‘ভেগাস নার্ভ’-এর মাধ্যমে সোজা গিয়ে পৌঁছয় মস্তিষ্কের অ্যামিগডালাতে। ফলে ব্রেন ভুল করে ভেবে বসে যে শরীর হয়তো কোনও মারাত্মক বিপদে কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। এখন ভেবে দেখুন, একদিকে আধুনিক বহুতল আবাসনের নিঃসঙ্গ ফ্ল্যাটে সেই ডোপামিন ক্র্যাশ, অন্যদিকে রক্তে লাফিয়ে বাড়তে থাকা কর্টিসল হরমোনের চাপ এবং পেটের ভেতরের গোলমালের কারণে সেরোটোনিনের আকাল— এই তিনের মারাত্মক জাঁতাকলে পড়ে সাধারণ মন খারাপ তখন আর নিছক বিষাদ থাকে না, তা রূপ নেয় এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতায়। এই মন খারাপ নিছক মানসিক দুর্বলতা নয়, এটি অতিরিক্ত আনন্দের রেশ কেটে যাওয়ার পর শরীরের ভেতর ঘটে চলা এক জটিল জৈব-রাসায়নিক ও স্নায়বিক লড়াইয়েরই স্বাভাবিক পরিণতি।

উৎসবের ছুটি শেষ হওয়ার এই মানসিক প্রতিক্রিয়া সবার ক্ষেত্রে একরকম হয় না। জীবনের বিভিন্ন মোড়ে দাঁড়ানো মানুষের কাছে এই নাটক শেষের অনুভূতি আলাদা। শিলিগুড়ির আট বছরের রিয়ার কাছে পুজো ভ্যাকেশন মানে এক সপ্তাহের মুক্তি। পড়াশোনা তো বটেই, নাচ-গান-পিয়ানো-ক্যারাটে-সাঁতার সব কিছু বন্ধ। শুধু নতুন জামার গন্ধ, বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রাত জেগে ঠাকুর দেখা আর দেদার চকলেট-আইস ক্রিম। কিন্তু প্যান্ডেলের বাঁশ খুলতে আর মাইকের তার গোটানো শুরু হতেই, রিয়ার মনে হয় তার স্বপ্নের দিনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। ওয়ার্ড্রবে অগোছালো করে রাখা নতুন ড্রেসের তলা দিয়ে উঁকি মারছে হোমওয়ার্কের কপি। আবার মালদার ১৮ বছরের অর্ঘ্যর কাছে পুজো ভ্যাকেশন মানে পাড়ার প্যান্ডেলের কোণে লুকিয়ে থাকা অনুভূতি, আর ভাই-বন্ধুদের সঙ্গে বেপাড়ায় ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে প্রথম নিষিদ্ধ আনন্দের ছোঁয়া। একটানে ছেলে থেকে পুরুষ হয়ে যাওয়ার সাপলুডোর মই। অষ্টমীর অঞ্জলির ভিড়ে লাল শাড়ি পরা মায়াবিনীর একচিলতে হাসি, নবমীতে ইন্সটা-এফবিতে ওরা আরও কাছাকাছি। বিজয়ার বিকেলে ঘাটে প্রতিমা বিসর্জনের ভিড়ে সিঁদুর মেখে ভাসান ডান্স করতে-করতে গভীর চোখের তারায় হারিয়ে যাওয়া।  কিন্তু তার পর থেকেই হতাশার কুয়াশা, অর্ঘ্যর মেসেঞ্জার হাজারও অকাজের মেসেজের ভিড়েও ফাঁকা, হোয়াটসঅ্যাপ-এ মেসেজ আনসিন, আর কারও স্টেটাস এখনও ‘সিঙ্গল’। উল্টে অনলাইনে কোচিং ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্টের মেইলে ইনবক্স ভরে উঠছে। পুজোর শেষটা জুড়ে প্রথম অব্যক্ত ভাললাগা ও না-পাওয়া অভিমানের খেলা। অন্যদিকে করবাবুর বছর আঠাশের মেয়ে, ভিনরাজ্যে টেক-চাকরিজীবী প্রিয়াঙ্কা আর সেনদার ৩০ পেরনো কলকাতা-প্রবাসী বড় ছেলে সুমিতের জন্য পুজো ভ্যাকেশন ছিল টেক-জগত থেকে মহা-নিষ্ক্রমণ। বছরের ৩৬০ দিন ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ আর টার্গেটের চাপ থেকে বাঁচতে তারা এই ক’দিন স্বাধীন মানুষ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বিজয়ার রাত পোহালেই যখন ইমেলের নোটিফিকেশন বাজতে শুরু করে, তখন সেই মনখারাপ রূপ নেয় এক কঠিন যন্ত্রণায়। প্রথম দিন অফিসে জয়েন করে গ্রুপ মিটিং-এ ঢোকার আগেই অফিসের মেশিনজাত কফির কাপে চুমুক দিয়ে তারা টের পায় ছুটি শেষ, রূপকথার নাট্যাভিনয় শেষ, আবার ফিরে যেতে হবে রুটি-রুজির দাসত্বে। কিন্তু  দু’জনেরই মনে হয়, রামপুরহাটের কলেজ মোড়ের “দীপ’স ক্যাফে”-র কফির স্বাদ আর গন্ধ যেন অফিসের কফি মেশিনটা চুরি করেছে। নবমীর সন্ধ্যায় বছর পঞ্চান্নর স্কুল মাস্টার ভূপেনবাবু বড় মেয়ের দেওয়া নতুন জামা পরে তার বর্ধমানের চার তলার ফ্ল্যাটের রোডসাইড ব্যালকনিতে বসে আছেন। গত দু’দিন দীপালির সঙ্গে বাড়িয়েছিলেন ঠাকুর দেখতে। কিন্তু গিন্নির সঙ্গে দোকানের রুটি কেনা নিয়ে লেগে গেল খুঁটো-খুটি। সেই থেকে মা আর দুই মেয়ে তাকে বয়কট করেছে। চোখের সামনে দিয়ে এগিয়ে চলেছে খুশির সমুদ্র; হাসি, বেলুন, ভাজা পাঁপড়, বাবার দু-হাত ধরে সস্তা লাল-নীল ফ্রক পরা দুই রাজকুমারী। ভূপেনবাবুর মনে হল এটা হয়তো দু’হাজার দুই, ছাব্বিশ নয়। কিন্তু বাধ সাধছে বাহারি উজ্জ্বল এলইডি. আলোকসজ্জা, রাস্তা জোড়া বিজ্ঞাপনের গেট আর মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠা সেলফি স্টিক।  গল্ফগ্রিনের আটতলা ফ্ল্যাটে একাকী থাকা ৭০ বছরের সত্যেনবাবুর কাছে পুজো ভ্যাকেশন মানে ছিল প্রবাসে থাকা ছেলে, মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের কলকাকলি। চারটে দিন তেরোশো স্কোয়ারফিটের ফ্ল্যাটটা গমগম করত। কিন্তু বিজয়ার পর যখন ক্যাবের গাড়ির চাকা গড়িয়ে ওরা নিজেদের জীবনে ফিরে গেল, তখন বড়দিদির ভাঙা হেয়ার ব্যান্ড আর ছোট দাদুর ফেলে যাওয়া লাল বন্দুকটা যেন সত্যেনবাবুকে গিলতে আসে। তাঁর বুকপকেটে গোঁজা থাকে ওদের আঁকা একটি ছবি— লম্বা পাজামা আর ফতুয়ার দু’পাশে দুটো ফুটফুটে ফুল; সামনে কমলা আকাশ, সূর্য ডুবছে? না উঠছে? এই বিষাদ কোনও সাময়িক মনখারাপ নয়, এটি নিজের অস্তিত্বের চরম একাকিত্বকে নতুন করে আবিষ্কার করার ভয়।

বনেদি বাড়ির পুজো থেকে বারোয়ারি, সেখান থেকে থিম পুজো এবং বর্তমানের বহুতল আবাসনের গ্ল্যামারাস পুজো— আমাদের দুর্গাপূজার এই দীর্ঘ রূপান্তর কেবল উদযাপনের ধরনই বদলায়নি, বদলে দিয়েছে মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং উৎসব-পরবর্তী শূন্যতার চেহারাটিকেও। অতীতে বনেদি বাড়ির পুজো মানে ছিল একটি যৌথ পরিবারের অখণ্ড শেকড়, যেখানে কয়েকশো মানুষের কোলাহলে একাকীত্বের কোনো অবকাশ ছিল না। এরপর এল বারোইয়ারি সংস্কৃতি, যা পুরো পাড়াকে একটি বৃহৎ পরিবারে পরিণত করেছিল। সেখানে পুজো শেষ হলে পাড়ার মোড়ে বা দালানে বিজয়ার কোলাকুলি আর মিষ্টিমুখের রেশ চলত আরও দু-সপ্তাহ ধরে। যৌথ এই সামাজিক কাঠামো মানুষের মস্তিষ্ককে এক স্থায়ী নিরাপত্তা এবং সংযোগের অনুভূতি দিত। ফলে পুজো ফুরলেও সেই সম্মিলিত নস্টালজিয়া মনখারাপকে সহজে হজম করতে সাহায্য করত। কিন্তু সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে এল থিম পুজো এবং আধুনিক বহুতল আবাসনের গেটেড কমিউনিটি কালচার। এখনকার পুজো মানে চারটে দিনের ফ্ল্যাটের লিফট দিয়ে নিচে নেমে থিম হপিং করা, সেলফি তোলা এবং সামাজিক মাধ্যমে পারফেক্ট ফেস্টিভ্যাল ভাইবস-এর ডিজিটাল প্রদর্শন। এই অতি-ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও কর্পোরেট সংস্কৃতির ফলে আমাদের ‘পোস্ট-ফেস্টিভ্যাল ব্লুজ’-এর চরিত্রটিও পুরোপুরি বদলে গেছে। আগের যৌথ বা বারোইয়ারি সমাজে মনখারাপ ছিল মূলত একটি সরল আবেগ— ফেলে আসা দিনের নস্টালজিয়া। কিন্তু আধুনিক আবাসনের এই কৃত্রিম ও ঝাঁ-চকচকে উদযাপনের ফলে যে সিন্ড্রোম তৈরি হয়, তার মনস্তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট অনেক বেশি জটিল। বহুতল ফ্ল্যাটের চার দেওয়ালের মধ্যে যখন চারদিনের থিম হপিং আর সমাজমাধ্যমের লাইক-কমেন্টের রোশনাই নিভে যায়, তখন মানুষ এক গভীর বিচ্ছিন্নতার মধ্যে পড়ে যায়। একে মনোবিদ্যার ভাষায় বলা চলে ‘ডিজিটাল ডিসকানেকশন সিন্ড্রোম’। আমরা আসলে এখন এমন এক যুগে বাস করি যেখানে ভিড়ের মাঝেও মানুষ চরম একা। বনেদি বাড়ি বা বারোইয়ারির যৌথ মেলবন্ধন যেখানে মস্তিষ্কের লিম্বিক সিস্টেমে সামাজিক সুরক্ষার আশ্বাস দিত, আধুনিক আবাসন বা থিম পুজোর এককেন্দ্রিকতা সেখানে মানুষের ব্রেনকে এক অনিশ্চিত প্রতিযোগিতায় ফেলে দেয়। পুজো শেষ হওয়ার পর যখন আবাসনের সেই কৃত্রিম আলো নিভে যায়, তখন সোশ্যাল মিডিয়ার তুলনামূলক বিচার এবং কর্পোরেট জীবনের রুটিন একসঙ্গে মানুষের ওপর চেপে বসে। ফলে ডোপামিন ক্র্যাশ অনেক বেশি তীব্র রূপ নেয়। আনন্দের দাঁড়িপাল্লায় নিজের দিকটা বাকিদের থেকে হালকা মনে হয় মনে। মনখারাপ তখন আর নিছক বিষাদ থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় এক তীব্র অস্তিত্বের সংকট— যেখানে মানুষ বুঝতে পারে না সে কার জন্য বা কীসের টানে বাঁচছে। এই সময় সেই অনলাইন সেলের সেই প্রি-ফেস্টিভ্যাল ডোপামিন হুল্লোড় আর সোশ্যাল মিডিয়ার হোমকামিং-এর ভার্চুয়াল রিলস বা ভ্লগসগুলোর উষ্ণতায় ঘাটতি পরে। তখন বহুতল আবাসনের ‘বড় হয়েও ছোট’ ঠাঁই, আমাদের  এক চরম নিঃসঙ্গ পোস্ট-ফেস্টিভ্যাল রিয়েলিটির মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

উৎসবের ছুটি শেষ হওয়ার এই মন খারাপ হওয়া খুব স্বাভাবিক একটি মানসিক প্রক্রিয়া। যুগে যুগে হয়েই আসছে। কিন্তু এখন আমাদের মচকানো পা গর্তে পড়েছে। উৎসবের পর্দা নামার পর আবার স্বাভাবিক জীবনে সানন্দে ফিরে আসার জন্য বিজ্ঞান ও দৈনন্দিন অভ্যাসের কিছু সহজ মেলবন্ধন  আমাদের অনেকেরই প্রয়োজন। পাকস্থলীকে আগে সুস্থ রাখতে হবে। উৎসব শেষের পর কয়েকদিন ‘ঘরকা ডাঁটাচচ্চড়িতে’ সন্তুষ্ট থাকুন। খাদ্যতালিকায় থাকুক টক দই, বাটার মিল্ক, ডাবের জল, ফাইবারযুক্ত শাকসবজি, মরসুমি ফল, আলু-বেগুন-বড়ি আর অনুরাগীদের জন্য নতুন ফুলকপি সহযোগে পাতলা মাছের ঝোল, মাংসের স্টু এবং প্রচুর জল। অন্ত্রের ভাল ব্যাকটেরিয়াগুলো চাঙ্গা হয়ে উঠলে ব্রেনে আবার সেরোটোনিন নির্গমন শুরু হবে, যা দ্রুত মেজাজ ভাল করবে। ছুটি ফুরিয়েই কাজের প্রথম ক’দিনেই নিজেকে ভিজে গামছার মতো নিংড়ে ফেলবেন না। একবারে সব কাজ শেষ করার চেষ্টা না করে ধীরগতিতে রুটিনে ফিরুন। ঘুমের চক্র ঠিক করা অত্যন্ত জরুরি। ঘুমের সঙ্গে মেজাজের সম্পর্ক অনেকটা টুথব্রাশের সঙ্গে পেস্টের মতো; আলাদা-আলাদা করে কাজ চালালেও মন ভরে না। রাতে সাত থেকে আট ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন ঘুম মস্তিষ্কের হরমোন ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। তাছাড়া, সকালে অন্তত কুড়ি-তিরিশ মিনিট রোদে হাঁটুন। সূর্যালোক আমাদের মস্তিষ্কের পিনিয়াল গ্ল্যান্ডকে উদ্দীপিত করে এবং সেরোটোনিন বাড়িয়ে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসল কমায়। অন্যের ‘ইংলিশ চ্যানেল’-সম পুজোর ফুর্তির তুলনায় আপনার নিজেরটা যদি ‘ঢাকুরিয়া লেক’ মনে হয়, তবে ‘প্রিভেনশন ইস বেটার দ্যান ছ্যাঁকা’। সেক্ষেত্রে বিজয়া দশমীর পর সোশ্যাল মিডিয়া ঘাঁটা কিছুদিনের জন্য কমিয়ে দিতে পারেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যের থরে-থরে সাজানো ছুটির ছবি বা আনন্দের মুহূর্ত দেখে নিজের বাস্তব জীবনের সঙ্গে তুলনা করার যে মানসিক প্রবণতা তৈরি হয়, তা বিষাদ বাড়িয়ে দিতে পারে। একটু বেশিমাত্রার ভাবুক হলে মনে করতে পারেন (প্রাচীন স্টোইক দার্শনিকদের মতো) বিশ্বের কোনওকিছুই চিরস্থায়ী নয়। উৎসব আসবে এবং যাবে— এটাই প্রকৃতির নিয়ম। বিসর্জনকে ক্ষয় হিসেবে না দেখে, জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ হিসেবে গ্রহণ করাই আসল মানসিক পরিপক্কতা। একইসঙ্গে জীবনের ছোট-ছোট অতি সাধারণ আনন্দের ওপর ভরসা রাখুন— সন্ধ্যায় পাড়ায় মোড়ে প্রিয়জনের এককাপ চা, কোনও পুরনো প্রিয় বই পড়া কিংবা সামান্য উইন্ডো শপিং। এই ছোট্ট আনন্দগুলোই ব্রেনে ডোপামিনের সুষম জোগান অটুট রাখে।

বেশিরভাগ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রে এই মন খারাপ অত্যন্ত স্বাভাবিক। উৎসব পরিসমাপ্তির পর থেকে প্রথম তিন থেকে সাত দিন পর্যন্ত যদি কারও কাজে আলসেমি লাগে, হালকা মনখারাপ থাকে, আবার পুরনো রুটিনে ফিরতে অনিচ্ছা প্রকাশ পায়— তবে তা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। ব্রেন তার রাসায়নিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনলেই এই মন খারাপ কেটে যায়। তবে এই শূন্যতা কখনও-কখনও স্বাভাবিকের সীমা ছাড়িয়ে মারাত্মক রূপ নিতে পারে তাদের ক্ষেত্রে, যাদের আগে থেকেই ক্রনিক ডিপ্রেশন, প্যানিক ডিসঅর্ডার বা বাইপোলার ডিসঅর্ডারের মতো মানসিক অবসাদ বা অ্যাংজাইটির ইতিহাস রয়েছে— যেখানে উৎসবের হঠাৎ পতন মস্তিষ্কের কেমিক্যাল ব্যালেন্সকে মারাত্মকভাবে নাড়িয়ে দিয়ে আত্মঘাতী চিন্তা বা ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের রূপ নিতে পারে। আবার অন্যদিকে, যারা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত সেই নিউরো-অ্যাটিপিক্যাল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দৈনন্দিন রুটিন হঠাৎ বদলে গেলে তারা চরম মানসিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েন, কারণ পুজোর অনিয়মিত রুটিন এবং তারপর হঠাৎ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার এই ধাক্কা তাদের স্নায়ুতন্ত্র সহ্য করতে পারে না। পাশাপাশি, যাদের ‘সোশ্যাল সাপোর্ট সিস্টেম’ খুব দুর্বল বা যারা দীর্ঘদিন ধরে আইসোলেশনে আছেন, সেই একাকিত্বে ভোগা প্রবীণ ও কোভিডের পর একা থাকা মানুষদের ক্ষেত্রে উৎসবের কোলাহল থেমে যাওয়ার পর নেমে আসা নিস্তব্ধতা সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই বিজয়ার পর যদি দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মন খারাপ স্থায়ী হয়, ঘুম ও খাওয়া সম্পূর্ণ অনিয়মিত হয়ে পড়ে, ব্যক্তি যদি সমাজ থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নেন এবং বেঁচে থাকার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন— তবে আর দেরি না করে অবিলম্বে কোনও সাইক্রিয়াট্রিস্ট বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এমনও তো হতে পারে, যে পুজো ভ্যাকেশনের এই মায়াবী বিরতি আমাদের জীবন-সংগ্রামের ব্যাটারিটাকে নতুন করে রিচার্জ করে দিয়ে গেল। প্রতিমা বিসর্জন হলেও, আমাদের হৃদয়ে যে চারদিনের আনন্দের আলো জ্বলে উঠেছিল, সেই আলোটুকু সঙ্গে নিয়েই কি আমরা পরের বছরের মুক্তির দিন গোনা শুরু করতে পারি না? সুকুমার রায়ের ছড়ার মতো— ‘দিনের শেষে ঘুমের দেশে ঘোড়ার গাড়ি চড়ে/ চলেছি আমরা কেউ তা জানি না তো কার ঘরে’— আমাদের এই জীবনও ক্ষণিকের সুন্দর সফর। যেখানে আনন্দ ফুরলেও তার রেশটুকু বাঁচিয়ে রেখে  নতুন পথের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। আর গন্তব্য স্টেশনে ঠিক সময়ে পৌঁছলেই ট্রেন সফর উপভোগ্য মনে হয়। লম্বা সময়ের লেট ট্রেনের রাজকীয় সফরও বিরক্তি জাগায়। তাই বরং বুকভরা শ্বাস নিয়ে বাস্তবকে আঁকড়ে ধরুন আর বিড়বিড়িয়ে বলুন— ‘আসছে বছর  আবার হবে’!