ভাঙন ও উত্তম

বাংলা ছোটগল্পের নিপুণ কারিগর ছিলেন সুবোধ ঘোষ। তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি ছোটগল্প নিয়ে পরে ছবি হয়েছে বাংলায়। তবে ১৯৬০ সালে যখন তাঁর লেখা ‘জতুগৃহ’ প্রকাশ পেল— বাংলার পাঠকরা ‘আধুনিক শহুরে একাকিত্ব’-র এক বাস্তব পরিচয় পেল গল্পের দুই মুখ্য চরিত্র শতদল আর মাধুরীর মধ্যে। দম্পতির সম্পর্কে বিতৃষ্ণার উচ্চকিত প্রকাশ ছাড়াই দুই মনের মধ্যে যে শত যোজন দূরত্ব তৈরি হতে পারে, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল এই গল্প। 

‘জতুগৃহ’ পড়ার পর থেকেই বিশিষ্ট পরিচালক তপন সিংহ-র মনে-মনে ইচ্ছে ছিল, এই গল্পকে সিনেমার রূপ দেবেন। সেই সুযোগ পেতেও খুব দেরি হল না। প্রযোজক হিসেবে পেলেন উত্তমকুমারকে। বাংলা ছবির মধ্যগগনে তখন মহানায়ক। তাঁর সঙ্গে পরিচালকের পরিচয় পাঁচের দশক থেকেই (প্রথমে তপন সিংহ-র ‘উপহার’ ছবিতে এক পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করেছিলেন উত্তম)। তারপরে ১৯৬১ সালে দু’জনে জুটি বেঁধেছিলেন ‘ঝিন্দের বন্দী’-তে। তবে ‘জতুগৃহ’-তে কেবল অভিনেতা নয়, ছবির প্রযোজকও ছিলেন তিনিই। অবশ্য ছবি তৈরির আগে তপন সিংহ-কে বলেছিলেন, প্রযোজনা করছেন বলে, তাঁকেই কেন্দ্রচরিত্রে নিতে হবে এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। পরিচালক নিজের পছন্দে চরিত্রের সঙ্গে যাঁকে মানাবে, তাঁকেই যেন কাস্ট করেন। কিন্তু তপন সিংহ ততদিনে মনে-মনে ঠিক করে ফেলেছেন, উত্তম-অরুন্ধতী জুটি নিয়ে আরেকটি ছবি করবেন— এবং ‘জতুগৃহ’-র থেকে ভাল গল্প আর পাবেন না। তবে শুধু এরা দু’জন নয়, ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিকাশ রায়, বিনতা রায়, অনিল চট্টোপাধ্যায়, গীতা দে, কাজল ঘোষ ও আরও অভিজ্ঞ অভিনেতারা।

১৯৬৪ সালের ২০ মার্চ ‘জতুগৃহ’ মুক্তি পায়। উল্লেখ্য, সেই একই বছর মুক্তি পায় সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘চারুলতা’-ও। ‘উত্তমকুমার ফিল্মস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর তৃতীয় ছবি মুক্তি পেতে না পেতেই শোরগোল ফেলে দেয় দর্শকমহলে। শুধু উত্তম-অরুন্ধতীর জুটি এবং সকলের অভিনয় নয়, এই ছবির আর-এক মূল আকর্ষণ ছিল এর গল্প। আগেই বলেছি, দাম্পত্যে থেকেও অপূর্ণতা ও একাকিত্ব তৈরি হতে পারে, তাই গল্পটির প্রেক্ষিত। ছয়ের দশকে তৈরি এই ছবির বিষয়বস্তু এতটাই আধুনিক, যে মুক্তির ছয় দশক অতিক্রান্ত হয়ে গিয়েও তা সময়োপযোগী থেকে গিয়েছে।

আরও পড়ুন: ‘শুন বরনারী’-র উত্তমকুমার কোথায় অন্যরকম?
লিখছেন শান্তনু চক্রবর্তী…

শতদল ও মাধুরী প্রেমে পড়ে বিয়ে করেছিল। কিন্তু ছবি শুরু হচ্ছে এমন একটা সময়ে, যেখানে তাদের দাম্পত্যে প্রেম সরে গিয়ে মানসিক দূরত্বের এক থমথমে আবহ তৈরি হয়েছে। বৃষ্টিধোয়া শহরে, অফিস-শেষে আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে বাড়ি ফিরছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অফিসার শতদল দত্ত (উত্তমকুমার)। আইনি পরামর্শ জরুরি, কারণ মাধুরীর (অরুন্ধতী দেবী) সঙ্গে তার বিবাহবিচ্ছেদ আসন্ন। ফাঁকা বাড়িতে ফিরে এককাপ চা চাইছে চাকরের কাছে। আধো অন্ধকার ঘরে একা বসে চা খাচ্ছে শতদল, বাইরে কোনও এক নাইটক্লাবের বাজনা ভেসে আসছে হালকা। নাগরিক নিঃসঙ্গতা আর আধুনিক জীবনের এর চেয়ে উপযুক্ত প্রতীক বোধহয় আর হয় না। মাধুরীর সঙ্গে তার রোজকার কথোপকথন কেমন যেন সাধারণ আলাপচারিতায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু তাই বলে এমন মনে করার কোনও কারণ নেই যে, তারা একে-অপরের প্রতি উদাসীন। মাধুরী এখনও শতদলের নিত্য প্রয়োজনের প্রতি, ও নিজের টিকে থাকা সংসারের প্রতি সচেতন। শতদলও তার পারিবারিক দায়িত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কিন্তু তাদের মধ্যে আনন্দদায়ক গার্হস্থ্য জীবনের কোনও আভাস খুঁজে পাওয়া যায় না।

এই ফাটল কেন ধরল তাদের সংসারে? 

তপন সিংহ তাঁর ‘আমার জীবন আমার ছবি’ বইয়ে লিখছেন, ‘আঘাত এল সেদিন, যেদিন মাধুরী জানল, সন্তান ধারণের শক্তি ওর নেই। চিকিৎসা বিজ্ঞান এখানে অক্ষম। সেই সঙ্গে তার মনে এক জটিল অপরাধবোধের সৃষ্টি হল।… আসলে শতদল বাচ্চা ভালবাসে। আর সন্তান না দিতে পারার অপরাধবোধ মাধুরীকে গ্রাস তো করলই, সেই সঙ্গে জন্ম নিল স্বামীর প্রতি চরম অবিশ্বাস।’

এই ছবি এমন একটা সময়ে মুক্তি পাচ্ছে, যখন বাঙালি দর্শকের কাছে উত্তম কেবল ম্যাটিনি আইডলই নয়, আদ্যোপান্ত রোম্যান্টিক হিরো-র আদর্শ ছাঁচও বটে। সেইখানে দাঁড়িয়ে তাঁর শতদল চরিত্রটি একেবারেই আলাদা। সে একজন আধুনিক এবং শহুরে পেশাজীবীর বাস্তবসম্মত ও সূক্ষ্ম প্রতিচ্ছবি। সে তার দাম্পত্যজীবনে এক ধীর ও নীরব ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমন এক চরিত্রেও কিন্তু তিনি সমান স্বচ্ছন্দ।

শতদলের সমৃদ্ধ বাহ্যিক জীবন ও তার শূন্য, আবেগবর্জিত সাংসারিক বাস্তবতা দুই মেরুতে বিচরণ করে। সে বাচ্চা ভালবাসে। একদিন তার আর মাধুরীরও সন্তান হবে, এই আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। প্রতিবেশী দম্পতির সন্তান শমীককে সে ভীষণ স্নেহ করে। কিন্তু এমন মনে করার কোনও কারণ নেই যে, মাধুরী তাকে সন্তান দিতে অক্ষম বলে, সে এই বিবাহ-বন্ধন থেকে মুক্তি চায়। তবে স্ত্রীয়ের অপরাধবোধ ও ব্যর্থতার গভীর অনুভূতি ভীষণভাবে তাদের মধ্যে এক আবেগীয় দূরত্ব তৈরি করে, যা অতিক্রম করতে শতদল ও মাধুরী দু’জনেই অক্ষম।

উত্তমের শতদল তাঁর অন্যান্য অনেক চরিত্রের থেকে আলাদা। এখানে তাঁর অভিনয় আবেগপ্রবণ তো বটেই, কিন্তু তাঁর চরিত্রের এক অসহায়তাও প্রকাশ পায়। শতদল বা মাধুরীকে, কাউকেই এখানে নেতিবাচক বলে মনে করার কোনও কারণ নেই। বরং তাদের অপারগতা দর্শকের থেকে সহানুভূতি আশা করে। ছবির শুরুতে দেখা যাচ্ছে, শতদল ও মাধুরী তাদের স্বপ্নের বাড়ি তৈরি করতে শুরু করেছে। একদিন ভাড়া বাড়ি ছেড়ে সেই বাড়িতে ভালবাসার সংসার পাতবে, এই আকাঙ্ক্ষায়। অথচ বাড়ি তৈরি শেষ পর্যায়ে পৌঁছতে-পৌঁছতে শতদলের ঘরের ভিতটুকু নড়বড়ে হয়ে যায়। তার সংসার ভেঙে যায়। এখানে ঘর ভাঙার ও ঘর গড়ার সমান্তরাল প্রক্রিয়াকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করেছেন লেখক ও পরিচালক দু’জনেই। 

‘কাবুলিওয়ালা’ দেখতে গিয়ে ছোট্ট মিনি-র নাচ দেখে বাকি দর্শক যখন আনন্দ পাচ্ছে, তখন শতদলকে বিমর্ষ দেখাচ্ছে। সে তখন মনে-মনে নিজের সন্তান ও সুখের সংসার কল্পনা করছে, যা তার কোনওদিনও হওয়ার নয়। উত্তমের অভিনয়ে সেই হতাশা ফুটে উঠেছে অনায়াসে। সেই সঙ্গে ফুটে উঠেছে শতদলের দৃঢ় নৈতিক সত্তাও। এককালে যাকে ভালবেসে বিয়ে করেছিল, তার সঙ্গে সংসার ভেঙে গেলেও উকিলের পরামর্শ অনুযায়ী বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য সে মাধুরীর ওপর কোনও মিথ্যে দোষ চাপাতে রাজি নয়। কেবল উদাসীনতা ও মানসিক দূরত্ব যে বিচ্ছেদের সংগত কারণ হিসেবে যথেষ্ট, সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে এই গল্প। 

বিচ্ছেদের পর কেটে গিয়েছে সাতটা বছর। তারপর আবার শতদল আর মাধুরীর দেখা রাজগির স্টেশনে। বিচ্ছেদের পর মাঝের বছরগুলিতে কী হয়েছে, সেসবে ঢোকে না এই গল্প, কারণ সেগুলি অপ্রয়োজনীয়। তারা বরং ফিরে যায় স্মৃতিচারণে। দু’জনের মধ্যে যে ভালবাসা ও স্নেহ অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছে, তা ফুটে ওঠে। পরিচালক লিখছেন, ‘অন্তরে কিন্তু ওদের বিচ্ছেদ হয়নি। সেই কথাটাই ওরা জানল— সাত বছর পরে বিহারের এক স্টেশনের ওয়েটিং রুমে।’ কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা আবার সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছে। তাদের কাটিয়ে আসা ভাল সময়গুলির স্মৃতিচারণ করছে কেবল। তারপর দু’জনে দুই বিপরীতগামী ট্রেনে উঠে পাড়ি দিচ্ছে নিজস্ব গন্তব্যে। কারণ অতীতের ক্ষত সহজে মিলিয়ে যায় না। 

১৯৬৪ সালে ‘জতুগৃহ’ যখন মুক্তি পাচ্ছে, তখন দর্শকের তো বটেই, সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে এই ছবি। আর তার মধ্যে শতদল দত্তর চরিত্রে উত্তমকুমারের অভিনয় অন্যতম। আগাগোড়া সংবেদনশীল এবং সহজ অথচ ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিনয়ের সাক্ষর রেখেছিলেন তিনি এখানে। জাতীয় পুরস্কারের মঞ্চে ‘সার্টিফিকেট অফ মেরিট’-ও পায় এই ছবি। 

১৯৮৭ সালে গুলজারও একই গল্প থেকে পরিচালনা করেন ‘ইজাজত’ (মুখ্য ভূমিকায় নাসিরুদ্দিন শাহ ও রেখা)। হিন্দি ছবি, অনেক বেশি সংখ্যক মানুষ এই ছবি দেখেছেন। সেখানেও গল্পের জোরালো বার্তার সঙ্গে একাত্ম হতে পেরেছিল দর্শক। তবে তার অনেক আগেই, ছয়ের দশকে তপন সিংহর ছবিটি কেবল এই গল্পের রূপায়ণের জন্য নয়, চেনা ইমেজ ভাঙা উত্তমকুমারের জন্যও স্মৃতিধার্য হয়ে রয়ে গেল।