দায়বদ্ধ শিল্পী

যোগেন চৌধুরীর কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে ছয়ের দশকের বাংলার সেই নবজাগরণের কথা। সাহিত্য, নাটক, সংগীত, সিনেমা— শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তখন এক অসাধারণ উন্মেষ ঘটেছিল। প্রত্যেকেরই চেষ্টা ছিল, নিজেকে সামনের সারিতে নিয়ে আসার। এবং সেই লড়াই ছিল কোনওরকম প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন। প্রত্যেকে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে কোনও বাজার-প্রত্যাশা না রেখেই কাজ করে যাচ্ছিলেন। আজকাল যেমন অনেকেই আগে থেকে ভাবেন, ‘আমি সিনেমা করব, সিরিয়াল করব, নাটক করব’— সে-সময়ে কিন্তু এ-ধরনের প্রবণতা একেবারেই ছিল না। খ্যাতির জন্য ছুটোছুটি করেননি কেউই।

শিল্পচর্চা যাঁরা করতেন, তাঁরা মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা দরিদ্র পরিবার থেকেই উঠে আসতেন। সচ্ছল বাড়ির ছেলেরা ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং বা কমার্স পড়তে যেত। শিল্পচর্চাকে তখন অনেক পরিবারই মনে করত হাস্যকর। কিন্তু যোগেন চৌধুরী, বিকাশ ভট্টাচার্য, গণেশ পাইন, শ্যামল দত্ত রায়, সুহাস রায়, লালুপ্রসাদ সাউ— এঁদের অনেকেরই জীবন ছিল অত্যন্ত কষ্টের। টিউশন করে, কখনও চল্লিশ-পঞ্চাশ টাকা মাইনে পেয়ে, তাঁরা শিল্পকে স্বপ্নের মতো দেখতেন। যে-কোনও অবস্থায়, যে-কোনও জায়গায় তাঁরা কাজ করতেন।

যোগেন চৌধুরী ’৪৭ সালে প্রথম উদ্বাস্তু হয়ে শহীদনগরে এসে উঠেছিলেন। তখন এ-বাংলার অনেকেরই ধারণা ছিল, পূর্ববঙ্গের লোকেরা কিছু জানে না। তবে এই ধারণা একেবারেই ভুল, তাঁদের মধ্যে শিক্ষার একটা ধারা ছিল। যোগেনদা ছিলেন জমিদার পরিবারের সন্তান। তাঁর মধ্যে উদ্বাস্তুজীবনের দারিদ্র্য যেমন ছিল, তেমনই ছিল প্রখর শিল্পবোধ। তিনি খুব কষ্ট করে আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সে-সময়ে কলকাতার আর্ট কলেজে বাস্তববাদী ছবি আঁকারই চল ছিল। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে কলকাতার শিল্পীসমাজের তেমন যোগাযোগ ছিল না। লাইব্রেরিতে যা পাওয়া যেত, তা মূলত পাশ্চাত্য শিল্পকলার বই। আমরা সবাই প্যারিসের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। যোগেন চৌধুরীও পরে স্কলারশিপ নিয়ে প্যারিস গিয়েছিলেন।

আরও পড়ুন: ভাঙার সাহস দিয়েছেন যোগেনদা!
লিখছেন জয়শ্রী বর্মন…

বাস্তববাদী ছবি আঁকার ফলে আর্ট কলেজের একটা রীতিই ছিল, প্রচুর আউটডোর স্কেচ করার। আমরাও সপ্তাহের শেষে প্রচুর স্কেচ করতাম, সোমবার মাস্টারমশাইদের কাছে নিয়ে গিয়ে দেখাব বলে। যোগেনদাও করতেন। শিয়ালদা স্টেশন বা অন্যান্য জায়গায় গিয়ে-গিয়ে মানুষের ছবি আঁকতেন। ফলে অবয়ব কিংবা প্রতিকৃতি আঁকায় ওঁর দক্ষতা প্রশ্নাতীত। এবং যোগেনদার ছবিতে যে এত কালো দেখা যায়, তার মূলে কিন্তু ওই সময়টাই, যে-সময়ে তিনি অন্ধকারে আলো জ্বালিয়ে ছবি আঁকতেন। ব্রাউন পেপারে, কালো কালিতে। অন্ধকারের প্রতি সেই থেকেই তাঁর একটা বিশেষ টান।

আমার মনে হয়, দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের চাকরিটাই যোগেনদার ছবিজীবনে একটা নতুন বাঁকবদল এনে দেয়। সে-সময়ে তিনি অনেক নেতা, মন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখেছেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর ক্যারিকেচারধর্মী কাজগুলোয় এসেছে। সুকুমার রায়ের ‘আবোল-তাবোল’-এর একটা প্রভাবও তাঁর মধ্যে ছিল। ছিল একটা রসবোধ, একটা কার্টুনিস্টের চোখ। সব কিছুতেই একটা নিজস্ব ছন্দ ছিল ওঁর। প্রতিটি স্ট্রোকের মধ্যে স্বকীয়তা, যা কালো-সাদা বা ধূসরের মধ্যেই ঘোরাফেরা করত। এবং আরও একটা বিষয়, ওই সময়েই যোগেনদা এমন কিছু কাজ করেন, যা পরবর্তীকালে আর দেখা যায় না। যেমন, ওই বাঘ লাফানোর ছবিটা। দিল্লির শিল্পীসমাজের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক খুব ভাল ছিল। দিল্লির শিল্পীরা এতটাই আন্তরিক ছিলেন, ওঁরা সবাইকে নিয়ে চলতে জানতেন। যোগেনদার নামটা দিল্লি থেকেই আস্তে-আস্তে সর্বভারতীয় স্তরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তখন কলকাতায় তাঁর ছবি ততটা দেখা যেত না। আটের দশকের মাঝামাঝি রাখী সরকার যখন তাঁর লেডিজ স্টাডি গ্রুপ থেকে ‘ভিশনস’ নামের প্রদর্শনী করেন বিকাশ ভট্টাচার্য, সোমনাথ হোড়, গণেশ পাইন এবং যোগেন চৌধুরীর কাজ নিয়ে— তখন থেকেই কলকাতায় সে-অর্থে যোগেনদার পরিচিতি। পরে তো ১৯৮৭ সাল নাগাদ তিনি শান্তিনিকেতনে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। রবীন্দ্রনাথের ছবির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। তিনি বলতেন, রবীন্দ্রনাথ তাঁকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেন। রবীন্দ্রনাথ যেরকম সারা পৃথিবীর ছবি দেখে এসে শিল্পের এক সরলতা আয়ত্ত করেছিলেন, যোগেনদাও ধীরে-ধীরে সেই সরলীকরণের দিকে এগিয়ে গেলেন।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভাল শ্রোতা। ছাত্র-ছাত্রীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। নিজের উদ্যোগে একটি চারতলা বাড়ি করে তরুণ শিল্পীদের জন্য গ্যালারি, লাইব্রেরি, কমিউনিটি হল করে দিয়েছিলেন। যে-কোনও সমস্যায় শিল্পীরা তাঁকে পেত। তিনি সহযোগিতা করতেন। চারুকলা পরিষদেও তাঁর ভূমিকা ভোলবার নয়। বামফ্রন্ট আমলে যে-কাজ শুরু হয়েছিল, তিনি এসে সেসব খোলনলচে বদলে ফেলেন। শিল্পীদের পুরস্কারের অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দেন। জেলায়-জেলায় ওয়ার্কশপ চালু করেন। শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

আমি নিজে ওঁর সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, যোগেনদা সব সময়ে নতুন কিছু করার কথা ভাবতেন। কখনও চুপচাপ বসে থাকতেন না। একটা ছোট ঘটনা বলি। বামফ্রন্ট সরকার যামিনী রায়ের প্রচুর ছবি কিনেছিল এক সময়ে। যোগেনদা আমাদের একদিন ডাকলেন। গিয়ে দেখি, ছবিগুলো ডাঁই করে গোডাউনে ফেলে রেখা। শুধু যামিনী রায়ই নন, অন্যান্য অনেক শিল্পীর ছবি। কী করা যায়, মিটিং হল। যোগেনদাই সেগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন। এসি ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রতিটি ছবির ক্যাটালগিং— সব কিছু তিনি দাঁড়িয়ে থেকে করেছেন।
চারুকলার দায়িত্বে যখন তিনি বহাল, সে-সময়ে নিরন্তর চেষ্টা করে গেছেন শিল্পকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে। নামী শিল্পীদের ছবির প্রিন্ট অত্যন্ত কম দামে সে-সময়ে পাওয়া যেত। অনামা শিল্পীদের জীবনী লেখাতেন খুঁজে-খুঁজে। মাসে মাসে সেমিনার, শিল্পীদের জন্মদিন পালন— সব কিছুতেই তিনি উপস্থিত। যোগেনদাকে দেখে মনে হত, অনন্ত সময়ের মধ্যে বসে যেন তিনি অনন্ত কর্মযজ্ঞে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।

আজ যখন দেখি শিল্পের মান কমে যাচ্ছে, সিনেমা-সাহিত্য-সংগীত সব ক্ষেত্রেই একটা শূন্যতা— তখন যোগেন চৌধুরীর মতো মানুষের অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়। তিনি শুধু ছবি এঁকে অর্থ রোজগারই করেননি, শিল্পের জন্য, শিল্পীদের জন্য, বাংলার শিল্পচর্চার জন্য একটা কাঠামো তৈরি করে গেছেন। সেই কাজগুলো অনেকেরই জানা নেই। আমি তাঁর সঙ্গে দিল্লি, বাংলাদেশ-সহ অনেক জায়গায় গেছি। দেখেছি, মানুষের সঙ্গে কত সহজে তিনি মিশতে পারতেন। যোগেনদা আমার গুরু ছিলেন না, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এখন বারে বারে মনে হচ্ছে, একজন কাজের মানুষ চলে গেলেন। সেই জায়গাটা কি আর কেউ পূরণ করতে পারবে এখন?