ডেটলাইন: পর্ব ৫৯

বিরহবিধুর ফরিদপুর

‘সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে

সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে’

সুদূর ফরাসি দেশের ভার্সাইতে বসে লিখছেন স্মৃতিকাতর মধুকবি। বাংলা সাহিত্যের আকাশে ধূমকেতু, বেপথুগামী এক বিষণ্ণ প্রতিভা। কিন্তু যে কপোতাক্ষ নদ নিয়ে মাইকেলের সূত্রে বাঙালির রোম্যান্টিসিজম, তার কাছে পৌঁছনো বেশ কঠিন ছিল সেই ২০০৮ সালে। যশোর শহর থেকে পায় ৪৫ কিলোমিটার দূরে সাগরদাঁড়ি গ্রাম। বাস বা অটো নামিয়ে দেবে কেশবপুর উপজেলা সদরে। এই পর্যন্ত সমস্যা নেই। কিন্তু তার পরের দশ কিলোমিটারের কথা ভাবলে আজও দুঃস্বপ্ন মনে হয়। বাস থেকে নেমে একে-তাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ভাড়ার বাইকের পিছনে বসে সবচেয়ে তাড়াতাড়ি পৌঁছনো যাবে। তখন কিন্তু অ্যাপ রাইড চালু হয়নি। এখন বাংলাদেশের নানা শহরে ‘পাঠাও’ অ্যাপে মোটরসাইকেল রাইড বুক করা যায়। কেন জানি না, অনেকে অ্যাপের বাইককে ওদেশে ক্ষ্যাপের বাইক বলেন, হয়তো ‘খেপ’ অর্থে। তবে সেদিন আমরা যশোরে যে দু-চাকায় চড়েছিলাম, তা প্রকৃত অর্থেই ক্ষ্যাপের বাইক। আমরা বিকল্প কিছু যানের সন্ধান করার আগেই দেখলাম, সামনে বুলেট নিয়ে হাজির দুই যুবক। অগত্যা আমি ও ক্যামেরাম্যান দু’টি বাইকে সওয়ার হলাম। প্রথমে বেশ ফুরফুরে লাগছিল। একটু পরেই যখন মেঠো রাস্তায় পড়লাম, হৃদপিণ্ড গলার কাছে উঠে এল। দু-পাশে ধানক্ষেত, মাঝখানে একদম সরু আলপথ। সেখান দিয়ে কীভাবে বাইকের চাকা ব্যালেন্স করে তীব্র গতিতে ছুটতে পারে, সেই কৌশল আমার বোঝার বাইরে। প্রবল হাওয়ার দাপটে উড়ে যাওয়া গলা কোনওমতে তুলে যত বলি, ‘ভাইয়া, একটু আস্তে চালান’, সে ঘাড় না ঘুরিয়েই জবাব দেয়, ‘আপা, স্পিড কমাইলেই চাকা পিছলাইব। অ্যাক্সিডেন্ট অইব।’ অতএব, বাইক তার নিজস্ব গতিতে ছুটতে থাকে এবং আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলি। ক্যামেরাম্যান যে কী অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ওই অবস্থায় পথের ছবি তুলেছিল, জানি না। সামনের বাইকে আমার বিপন্ন ছবি আমি দেখেছিলাম পরে রাশ ফুটেজে।

ঝোড়ো এক যাত্রার পর রাজনারায়ণ দত্তর বাড়িতে এসে প্রাণ জুড়িয়ে গেল। কী ছিমছাম বর্ধিষ্ণু বাঙালি বাড়ি! এই বাড়ি মধুসূদনের বটে, তবে মাইকেলের নয়। জন্ম, শৈশব, কৈশোরের কিছুটা জড়িয়ে আছে এই আঁতুড়ঘরে, উঠোনে, ঠাকুরদালানে, কিন্তু উনিশ বছর বয়সে স্ত্রী-ধর্ম গ্রহণের পর থেকে দুঁদে উকিল রাজনারায়ণ মধুকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন। মা জাহ্নবী দেবীর চোখের জলেও যার নড়চড় হয়নি। বাবা কলকাতায় ওকালতি করার সুবাদে তেরো বছর বয়সেই যশোর ছেড়ে মধুসূদন কলকাতার বাসিন্দা হন। না হলে হয়তো নবজাগরণের হাওয়া তাঁর গায়ে লাগত না। হিন্দু কলেজ তাঁকে অন্য এক আলোর সন্ধান দিয়েছিল, যার দিশারী ডিরোজিও। বছরপাঁচেকের মধ্যেই আমূল বদলে যায় মধুসূদনের জীবনদর্শন। বিলেত যাওয়া, ইংরেজি ভাষায় কবিতা লেখা তখন তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ত্যাজ্যপুত্র করলেও কয়েক বছর পড়াশোনার খরচ দিতেন রাজনারায়ণ, একসময় তাও বন্ধ হয়ে গেল। সেই শুরু মাইকেলের অনটনের জীবন, মাত্র ৪৯ বছরে নিভে যাওয়ার পিছনেও বড় কারণ অর্থাভাব।

চৈতন্যর জন্মস্থান আসলে বাংলাদেশে? পড়ুন আগের পর্ব…

যেভাবে শিকড়ের টানে বাংলা ভাষার কাছে ফিরতে চেয়েছিলেন মাইকেল, ঠিক সেভাবেই ফিরতে চেয়েছিলেন নিজের বাড়িতে। সেটা ১৮৬২ সাল। দ্বিতীয় স্ত্রী ফরাসি আঁরিয়েতাকে নিয়ে নৌকো ভিড়িয়েছিলেন কপোতাক্ষ তীরে। মনে আশা, এতগুলো বছরের ব্যবধানে আত্মীয়-পরিজনের রাগ নিশ্চয়ই কমবে। ঘরের ছেলেকে তাঁরা বুকে টেনে নেবেন আগেকার মতো। কিন্তু না, আশা পূরণ হয়নি। তাঁর নিজের কবিতার মতোই ‘আশার ছলনে ভুলি কী ফল লভিনু হায়, তাই ভাবি মনে’।

সরকারি উদ্যোগে সুন্দরভাবে সংরক্ষিত মধু কবির বাড়ির সদর দরজায় দাঁড়িয়ে গাইড বলেন, ‘এই দেউড়ির এপারে পা রাখতে পারেননি মধুসূদন। খ্রিস্টান বলে আত্মীয়-প্রতিবেশীরা প্রবল বাধা দিয়েছিলেন।’ অসুস্থ মাকে দেখার কাকুতি-মিনতিতেও বরফ গলেনি। মতান্তরে অবশ্য, জাহ্নবী দেবী এর আগেই প্রয়াত হয়েছিলেন। একদিন, দু-দিন নয়, টানা সাতদিন কপোতাক্ষ তীরে গাছের নিচে তাঁবু খাটিয়ে অপেক্ষায় থেকেছিলেন মধু। তারপর নিরাশ হয়ে ফিরে গেছিলেন। সেই থেকে ওই জায়গার নাম বিদায় ঘাট। বিদায়বেলার করুণ বাঁশি অবশ্য তিনি শুনতে পেয়েছিলেন অন্তিমের আগেই, তাই নিজের এপিটাফ নিজেই লিখে রেখে গেছিলেন ‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব। এ বঙ্গে। তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধিস্থলে…’, কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোডের সমাধিক্ষেত্রের বাইরে তাঁর মূর্তির সঙ্গে এই আর্তি অবশ্য ফুটপাথবাসীদের মেলে রাখা কাপড়ে প্রায় অদৃশ্য।

সাগরদাঁড়িতে গেলে যেমন চোখে জল চলে আসে, অমিতাক্ষর, সনেট, ফরাসি সুরা আর সুগন্ধির বাইরের এক বিপন্ন জীবনের জন্য, তেমন ফরিদপুরের বাতাসেও বিষাদের সুর ফেরে। নয়তো একটা শহরের রাজপথের ক্রসিং-এ লেখা থাকে, ‘কী পাইলাম মোড়’? এরকম দুঃখী নাম, রাস্তার মোড়ের, আমি অন্তত শুনিনি। পরে ভেবে দেখেছি, যেখানে জন্য চিরবিরহিনী গায়িকা গীতা দত্তর, যেখানে আছে সাজু আর রূপাইয়ের হারিয়ে ফেলা দাম্পত্যের নকশিকাঁথার মাঠ, সেখানে কান পাতলে তো দীর্ঘশ্বাস শোনা যাবেই, ব্যর্থ প্রেমের, নিষ্ফল জীবনের, অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার হাহাকার। বিয়ের আগে ছিলেন গীতা ঘোষ রায়চৌধুরী। গীতা রায় নামে অল্প বয়সেই বিখ্যাত হয়েছিলেন বম্বের ফিল্মি দুনিয়ায়। বিয়ে করলেন বিখ্যাত নায়ক-পরিচালক গুরু দত্তকে। মাত্র এগারো বছরের দাম্পত্য জীবন, মদে ডুবে যাওয়া এবং একচল্লিশ বছরেই সিরোসিস অফ লিভারে মৃত্যু। ‘নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে’ থেকে ‘মেরা নাম চিন চিন চু’— এই যাঁর সংগীত-যাত্রার বিস্তার, একসময় যাঁর সৌন্দর্য আর কণ্ঠের লাস্যে মাতাল হয়েছিল গোটা দেশ, তাঁর জীবনের পথ ছিল চোখের জলে ভেজা। বিয়ের কিছু বছর পর থেকে ইগোর লড়াইয়ে দূরত্ব বাড়ছিল, গুরু দত্ত ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোয় ফাটল আরও চওড়া হল। একসময় টাকার অভাবে বাংলো ছেড়ে গুরু দত্ত গেলেন ভাড়ার ফ্ল্যাটে আর গীতা তিন ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাপের বাড়ি গিয়ে উঠলেন। পরে যখন ওয়াহিদাও সরিয়ে নিয়েছেন নিজেকে, মদ আর ঘুমের ওষুধের মারাত্মক মিশেলে গুরু দত্ত একদিন একাই বন্ধ ফ্ল্যাটের ভেতর নিথর হয়ে পড়ে রইলেন। গানের জগতে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ার কারণে আগে থেকেই হতাশা গ্রাস করেছিল গীতাকে। গুরু দত্তর মৃত্যুর পর দিনরাত নেশাগ্রস্ত থাকতেন ফরিদপুরের এই বিখ্যাত কন্যা। তারপর চল্লিশ পেরতেই সব শেষ। ফরিদপুরের সেই জমিদারবাড়ির কথা, ছেলেবেলার সহদের কথা, আড়িয়াল খাঁ নদীর কথা কি মনে পড়ত তাঁর?

কী পাইলাম মোড়

নকশালদের ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরা’-র থিওরি মনে পড়ল ফরিদপুরে গিয়ে। ছোট শহর, সত্যিই গ্রাম দিয়ে ঘেরা। রিকশা করে যখন তখন শহরের রাজপথ ছেড়ে গ্রামে ঢুকে যেতে পারবেন। পল্লিকবি জসীমউদ্দিনের ভিটে অম্বিকাপুর যেমন একেবারে নিরিবিলি গ্রাম, অথচ ফরিদপুর শহর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার বাইরে। সেখানেই আছে নকশিকাঁথার মাঠ আর সোজন বাদিয়ার ঘাট। পাঠ্যবইয়ের বাইরে ক’জন বাঙালি জসীমউদ্দিনের কবিতা পড়েছেন জানি না, তবে কলকাতার গ্রুপ থিয়েটারের সৌজন্যে, গৌতম হালদার-সোহিনী সেনগুপ্তর অসামান্য অভিনয়ের দৌলতে সাজু-রূপাই, দুলি-সোজন— এরা আমাদের চেনা। কৃষ্ণের মতো কালো সুঠাম রূপাই সড়কি চালানো আর বাঁশি বাজানো, দুটোতেই ওস্তাদ। পাশের গাঁয়ের সাজু তাকে প্রথম দেখাতেই মুগ্ধ। বিয়ে হয় তাদের। একরাতে খবর আসে বনগেঁয়োরা পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বিরাট লড়াই হল, তার পর থেকেই ফেরার রূপাই। সাজু রোজ মাটির প্রদীপ জ্বেলে অপেক্ষা করে। একদিন গভীর রাতে রূপাই ফেরে, কিন্তু ঘরে থাকবে কীভাবে? ধরা পড়লেই ফাঁসি কিংবা কালাপানি। সেই শেষ দেখা দু’জনের। আবার অপেক্ষা শুরু, সাজু কাঁথায় ফুটিয়ে তোলে প্রণয়ীর স্মৃতি। কাঁথা বোনা শেষ হলে সাজু তার মাকে বলে, “আমার মরণের পরে কবরের ওপরে বিছিয়ে দিও এই কাঁথাখানা। যদি কোনওদিন রূপাই এসে আমার খোঁজ করে, তাকে ব’লো, তোমার আশায় সাজু ওই কবরের নিচে আছে।” বহুদিন পরে গাঁয়ের লোকেরা গভীর রাতে বাঁশির করুণ সুর শোনে, ভোরে এসে দেখে, সাজুর কবরের পাশে এক ভিনদেশি মানুষ মরে পড়ে আছে। ‘আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে/ নীরবে বসিয়া কোন কথা যেন কহিতেছে কানে কানে।’ এই সহজ সরল প্রেমগাথা আজকের দিনে বেমানান, তবু রবিঠাকুরের প্রেমের গানের মতোই চিরকালের। ‘তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে/ কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে।’ গীতা দত্তর সেই চোখের জলের গান ‘না যাউ সাঁইয়া ছুড়াকে বাঁইয়া’ আর সাজুর সূচসুতোর নকশিকাঁথা ফেঁড়ে গাঁথা হয় ফরিদপুরের ট্রাজিক কাব্য।

জসীমউদ্দিনের বাড়ির সামনে সত্যিই আছে সেই গল্পের নকশিকাঁথার মাঠ। একটু দূরেই কবির দৌলতে বিখ্যাত সোজন বাদিয়ার ঘাট। ‘বাদিয়া’ মানে বাঙাল ভাষায় বেদে। কুমার নদের তীরে সেই বিরহের গল্প, যুগে-যুগে যা পুরনো হয় না। আসলে বোধহয় সফল প্রেম বলে কিছু নেই, ব্যর্থতাই প্রেমের নিয়তি। এখানে হিন্দু-মুসলমানের কাহিনি। শিমূলতলি গ্রামে দুই সম্প্রদায় গলাগলি করে থাকে। সেখানে নমশূদ্র গদাই মোড়লের মেয়ে দুলির সঙ্গে বন্ধুত্ব ছমির শেখের ছেলে সোজনের। ‘ধানের আগায় ধানের ছড়া, তাহার পরে চিয়া/ নমুর মেয়ে গা মাজে রোজ তারই পাখা দিয়া’। দাঙ্গার আবহে দুলির বিয়ে হয় অন্য কারও সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত একরাতে বাঁশির সুরে মিলে যায় দু’জন, মৃত্যুতে এক হয় তারা।

আজকের এই জটিল সম্পর্কের দিনে, সিচুয়েশনশিপ, ন্যানোশিপের গোলকধাঁধায় এরকম সহজ-সরল প্রেমগাথা কেমন অলীক মনে হয়। তবু দিনের শেষে আকাশছোঁয়া ব্যালকনির কোণে দাঁড়িয়ে কার জন্য যে চোখের জল ফেলে জেন আলফা, কে জানে! সাজু-রুপাই, দুলি-সোজন— এরা তো তার কাছে অন্য গ্রহের মানুষ হওয়ার কথা। তবু বুকের ভেতর উত্থালপাথালাটা একই থেকে যায়, যুগে-যুগে।

ফরিদপুর আর ফার্ন রোডে তফাত নেই।