দুর্গাদালানে দেবী দশভুজা, আর তাঁরই পাশের কুলুঙ্গিতে ধ্যানমগ্ন দুই বুদ্ধ। হুগলির জিরাট-পাটুলি গ্রামের মঠবাড়িতে এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখা যায় বহুকাল ধরে। একই ছাদের নীচে এই সহাবস্থান শুধু ইতিহাসের অলংকার নয়, আমাদের কাছে এক গভীর অমীমাংসিত প্রশ্নও বটে।
সপ্তমীর রাত পেরিয়ে অষ্টমীর প্রবেশক্ষণে, অর্ধরাত্রে পুরোহিত ডাকিনী ও যোগিনীকে আবাহন করেন, চৌষট্টি যোগিনীর উদ্দেশে নিবেদন সাজান। এমনকী চালের তৈরি মানবপ্রতিকৃতির প্রতীকী বলিও হয়। একটি প্রাচীন বাঙালি পরিবারের দুর্গাপুজোয় এসবই চেনা আচার। কিন্তু প্রশ্ন হল— এই বেদিতে বুদ্ধের আগমন ঘটল কীভাবে? তাঁরা কি কোনও বিলুপ্ত বৌদ্ধ মঠ থেকে এলেন, না কি তাঁদের আসার পথটা ছিল অন্যরকম? এবং দুর্গাপুজোর এই ব্যতিক্রমী রীতির সঙ্গে কি বুদ্ধমূর্তির কোনও ঐতিহাসিক যোগসূত্র আছে?
বীরভূমের তারাপীঠের শাক্ত তারার সঙ্গে বৌদ্ধ তারা-সাধনার যোগ গবেষকদের কাছে আজ স্বীকৃত। উত্তরবঙ্গের পালযুগীয় মূর্তিতে আমরা ‘অপরাজিতা’ নামে এক বৌদ্ধ দেবীকে পাই; অনেকের অনুমান, তাঁর ছায়া আজও পড়ে বিজয়া দশমীর অপরাজিতা পুজোয়। তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরের কাঠামোর সঙ্গে প্রাচীন বৌদ্ধস্তূপের সম্পর্কের কথাও লোকমুখে ফেরে— যদিও প্রত্নতত্ত্ববিদরা এখনও তার চূড়ান্ত প্রমাণ পাননি। তবে এই দৃষ্টান্তগুলি একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে: বৌদ্ধধর্ম যখন বাংলায় তার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি হারাল, তখন তার দেবী, মন্ত্র, মুদ্রা ও সাধনার কী গতি হল? সেগুলির কোন-কোন অংশ নতুন রূপ নিয়ে জায়গা করে নিল শাক্তধর্ম বা দুর্গাপুজোর অভ্যন্তরে?
আরও পড়ুন: প্রতি বছর গুপ্তিপাড়ার ভাণ্ডার লুট আসলে এক ধরনের পুণ্য? লিখছেন অয়ন মুখোপাধ্যায়…
অষ্টম শতাব্দী থেকে পাল রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ও বিহারে বৌদ্ধ জ্ঞানচর্চা চূড়ান্ত অবস্থায় পৌঁছায়। গুপ্তযুগে প্রতিষ্ঠিত নালন্দা এবং পালযুগে গড়ে-ওঠা বিক্রমশীল ও সোমপুর মহাবিহারের যোগাযোগের জাল তিব্বত থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। মহাযানের কোল ঘেঁষে বিকশিত হয় বজ্রযান, সহজযান ও তান্ত্রিক সাধনা। এই ধর্মীয় রূপান্তরের নেপথ্যে ছিল রাজক্ষমতা, ভূমিদান ও অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। রাজশক্তি বদলালে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মও রূপ বদলায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের গভীর বিশ্বাস একই গতিতে বদলায় না। নৃতত্ত্ববিদ এডওয়ার্ড বার্নেট টাইলর এই টিকে থাকাকেই বলেছেন ‘সাংস্কৃতিক অবশেষ’। পুরনো সমাজের রীতি নতুন সমাজে বেঁচে থাকে— কখনও নতুন দেবীর নাম নিয়ে, কখনও-বা নতুন পুজোর রীতি হয়ে ওঠে।

পালযুগে বৌদ্ধতন্ত্রের পাশাপাশি শৈব ও শাক্ততন্ত্রও সমান্তরালে বিকশিত হচ্ছিল। মন্ত্র, মুদ্রা, মণ্ডল, ডাকিনী-যোগিনী ও দেহসাধনার নানা উপাদান দুই ধারাতেই ছিল সচল। সংস্কৃততন্ত্রের গবেষক অ্যালেক্সিস স্যান্ডারসন দেখিয়েছেন, বৌদ্ধ চক্রসংবর ধারার মূল তন্ত্র ‘লঘুসংবর’-এর বহু অংশ শৈব যোগিনীতন্ত্র (বিশেষত জয়দ্রথযামল-এর ‘যোগিনীসঞ্চার’ অংশ) থেকে প্রায় অবিকল গৃহীত। এই ঋণ প্রমাণ করে, দুই তান্ত্রিক ধারার সীমানা ছিল ভেদ্য; একের পাঠ ও আচার অনায়াসে অন্যের ভিতরে জায়গা করে নিত।
বাংলা ভাষার আদি দলিল ‘চর্যাপদ’-এও এই ধর্মীয় আবহের স্পষ্ট ছাপ আছে। পঞ্চাশ নম্বর পদে শবরপাদ লিখছেন— ‘গঅণত গঅণত তইলা বাড়ী হিএঁ কুরাড়ী। কণ্ঠে নৈরামণি বালি জাগন্তে উপাড়ী॥’ আকাশের ঘর, হৃদয়ের কুঠার কিংবা নৈরামণির চিত্রকল্প আসলে বৌদ্ধ সহজযানের সাধনতত্ত্ব। পণ্ডিতেরা ‘নৈরামণি’-কে যুক্ত করেন ‘নৈরাত্ম্যা’-র ধারণার সঙ্গে, যা কোনও স্থায়ী আত্মার অস্তিত্ব স্বীকার করে না। তান্ত্রিক সাধনায় এই দর্শনই দেবীর প্রতীকী রূপ পায়। ‘চর্যাপদ’-এ সরাসরি দুর্গাপুজোর কোনও উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে না, তবে এটি ইঙ্গিত দেয়, বাংলার প্রান্তিক সমাজে নারীশক্তির প্রতীক ও তন্ত্রসাধনা কত গভীরে প্রোথিত ছিল।
দুর্গা অবশ্য একদিনে গড়ে ওঠেননি। স্থানীয় দেবীচর্চা, রাজক্ষমতা এবং ব্রাহ্মণ্য সাহিত্য— সব মিলিয়ে তাঁর উপাসনাকে রূপ দিয়েছে। ইতিহাসবিদ বিহানি সরকার দুর্গা-উপাসনার সঙ্গে রাজশক্তির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। অন্যদিকে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, কীভাবে স্থানীয় মাতৃকা উপাসনা, শৈব সাধনা, বৌদ্ধতন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ্যধারা মিলেমিশে বাংলার শাক্ত সংস্কৃতিকে এক নতুন রূপ দিয়েছিল। এর সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত ‘তারা’। বৌদ্ধ সাহিত্যে তারার উপস্থিতি হিন্দু তান্ত্রিক সাহিত্যের চেয়ে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন। হিন্দু তান্ত্রিক কাহিনিতে আছে, ঋষি বশিষ্ঠ মহাচীনে গিয়ে বুদ্ধের কাছেই তারা-সাধনা শেখেন। এটি ইতিহাস না হলেও দুই ধারার আদান-প্রদানের জীবন্ত লোককথা। কালক্রমে অসম ও বাংলায় সেই বৌদ্ধ তারাই শাক্তদেবী হিসেবে নতুন পুরাণ ও পীঠস্থান লাভ করেন।

বৌদ্ধ তারার মন্ত্র— ‘ওঁ তারে তুত্তারে তুরে স্বাহা’; অন্যদিকে শাক্ত চামুণ্ডার উপাসনায় মন্ত্র— ‘ওঁ ঐং হ্রীং ক্লীং চামুণ্ডায়ৈ বিচ্চে’। পাঠের এই ভিন্নতা সত্ত্বেও উভয় ধারাই বীজধ্বনি, ধ্যান ও মুদ্রাকে একইভাবে গুরুত্ব দেয়। পালযুগের পঞ্চরক্ষা পাণ্ডুলিপির রক্ষাকারী নারীদেবীদের আরাধনা কিংবা বজ্রযানের মণ্ডল-ন্যাসের সঙ্গে শাক্তদের আবাহন, ন্যাস ও যোগিনী পুজোর গভীর মিল রয়েছে।
বাংলার দুর্গাপুজোও তাই শুধু পৌরাণিক গল্পে আটকে থাকেনি। এতে স্থান পেয়েছে নবপত্রিকা, যোগিনীপুজো, রক্তবলি বা প্রতীকী বলির স্থানীয় ঐতিহ্য। এখানেই পাটুলির মঠবাড়ির পুজো অনন্য। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের ‘মঠের মা’-র প্রতিমায় সামনের দুটি হাত স্পষ্ট, বাকি আটটি হাত চুলের আড়ালে গোপন থাকে। সন্ধিপুজোর বদলে এখানে হয় অর্ধরাত্রির বিশেষ তান্ত্রিক পুজো, যেখানে চালের তৈরি মানব প্রতিকৃতি বলি দেওয়া হয়। পরিবারের নথিতে মদনমোহন তর্কালঙ্কার নামে এক সাধকের ভাঙা মঠে সাধনার উল্লেখ মেলে। গবেষক বিনয় ঘোষও এই পরিবারের সঙ্গে বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধনার সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথা লিখেছেন।
তালপাতার মূল পুঁথি নষ্ট হলেও পরিবারের নতুন পুঁথির সঙ্গে বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ-এর মিল পাওয়া যায়। পাটুলির দুর্গাপুজোর মূল শক্তি এই যে, এখানে ধর্মীয় অতীতের বস্তুরূপ (বুদ্ধমূর্তি) এবং আচারের বৈচিত্র্য একসঙ্গে টিকে আছে। পুথির পূর্ণাঙ্গ পাঠ উদ্ধার হলে হয়তো এর বৌদ্ধ উত্তরাধিকারের পরিমাণ আরও স্পষ্ট হবে।
শুধু পাটুলিই নয়, উত্তরবঙ্গের বরেন্দ্রভূমিতে পাওয়া পালযুগের অপরাজিতা মূর্তি এবং বিজয়া দশমীর শাক্ত অপরাজিতা পুজো— দুটিই রক্ষাকর্ত্রী নারীশক্তির উপাসনার সাক্ষী। আবার তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরে দেবী আরাধনা পান কালী, দুর্গা ও জগদ্ধাত্রী রূপে। প্রাচীন তাম্রলিপ্তের বৌদ্ধ ইতিহাস এবং মন্দিরের তলায় বৌদ্ধস্তূপের অস্তিত্বের কথা বহুদিনের লোকশ্রুতি। অন্যদিকে কঙ্কনদিঘিতে পাওয়া বৌদ্ধ ‘জম্ভল’ মূর্তি ইঙ্গিত দেয়, দক্ষিণবঙ্গেও একসময় বৌদ্ধধর্ম সক্রিয় ছিল। এই বিচ্ছিন্ন নিদর্শনগুলি পাশাপাশি রাখলেই বাংলার এক হারিয়ে যাওয়া ধর্মীয় মানচিত্র ভেসে ওঠে।

এই প্রসঙ্গে আমাদের সামনে প্রশ্ন উঠতেই পারে, বাংলার এই সমৃদ্ধ বৌদ্ধমঠগুলি শেষপর্যন্ত মিলিয়ে গেল কেন? পঞ্চম শতাব্দীর গোড়ায় ফা-হিয়েন তাম্রলিপ্তে ২২টি বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীতে হিউয়েন সাং দেখেন প্রায় ১০টি, আর একই শতকের শেষভাগে ই-চিং-এর বিবরণে সংখ্যাটা আরও কমে আসে। অর্থাৎ অন্তত তাম্রলিপ্ত অঞ্চলে বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ক্ষয় শুরু হয়েছিল পালযুগেরও আগে, তুর্কি অভিযানের বহু আগে। পালযুগে বরেন্দ্র ও মগধে নতুন মহাবিহার গড়ে উঠলেও শেষপর্যন্ত রাজপৃষ্ঠপোষকতার অভাব, গ্রামীণ সমাজে ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থার প্রসার এবং অর্থনৈতিক সংকট বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলির পতন ত্বরান্বিত করে; ত্রয়োদশ শতকের তুর্কি আক্রমণ তাতে শেষ আঘাত হানে।
তবে এই পতনকে এক ধর্মের জয় এবং অন্য ধর্মের পরাজয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ মঠ ভাঙলেও মানুষের অভ্যাস আর সংস্কৃতি কিন্তু পাশাপাশি থেকে গিয়েছিল; তার সঙ্গে থেকে গিয়েছিল পুরনো বিশ্বাস। সংস্কৃতিচিন্তক রেমন্ড উইলিয়ামস তাঁর Marxism and Literature গ্রন্থে একেই বলেছেন ‘Residual Culture’ বা ‘অবশিষ্ট সংস্কৃতি’। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম মুছে গেলেও তার আচার ও ঐতিহ্য তখন বেঁচে থাকে তার নতুন পরিচয় নিয়ে।
ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপ কেবল অতীতের অবসান ঘটায় না, নতুন জন্মের বীজও সযত্নে লুকিয়ে রাখে। এই সমন্বয়ের দীর্ঘ যাত্রায় যেমন অনেক কিছু গৃহীত হয়েছে, তেমনই অনেক কিছু রূপেরও বদল ঘটেছে। ইতিহাস কেবল একটি মঠ ধ্বংসের বা ক্ষমতার পালাবদলের সন-তারিখ নথিভুক্ত করতে পারে; কিন্তু অন্তহীন স্রোতের মতো বয়ে চলা বিশ্বাস ঠিক কোন সময়ে পুরনো রূপ বদল করে নতুন আবহে মিশে যায়, তার কোনও দিনপঞ্জি থাকে না। পাটুলির কুলুঙ্গিতে বসে থাকা বুদ্ধমূর্তিগুলি তাই নিছক অতীতের ভগ্নাবশেষ নয়; তারা বাংলার ধর্মীয় ইতিহাসের সেই জীবন্ত দলিল, যেখানে ইতিহাস নীরব হলেও সংস্কৃতি আজও কথা বলে।




