আরগস নগরীর রাজা অ্যাগামেমনন ট্রয় যুদ্ধের পরে রাজধানীতে ফিরলে তার স্ত্রী ক্লিটেমনিস্ট্রা নিজের প্রেমাস্পদ আইগিসথোসের সঙ্গে মিলে তাকে হত্যা করে। রাজা হয়ে ব’সে আইগিসথোস আগের রাজা অ্যাগামেমননের ছেলে ওরেস্টিসকে হত্যার নির্দেশ দেয়, আর মেয়ে ইলেক্ট্রাকে বাঁদি বানিয়ে রাখে। গ্রিক মিথের ধাঁচ অনুযায়ী জল্লাদের দয়ায় বেঁচে যায় ওরেস্টিস, অন্য রাজার ঘরে মানুষ হতে থাকে। ওরেস্টিস একদিন নিজের জন্মভূমি খুঁজতে বেরিয়ে পরে। এর পরের ঘটনা জানা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তী সময়ে জাঁ পল সার্ত্রে ইলিয়াডের এই কাহিনিটিকেই বেছে নিয়েছিলেন, কীভাবে রাষ্ট্র আতঙ্কের গণ-হিস্টেরিয়া তৈরি করে, কীভাবে আপামর মানুষের স্বকীয় ভাবনার ক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়, সেই কথা জানাতে। কঠিন সেন্সরশিপের মধ্যে তাঁর ‘দ্য ফ্লাইজ’ নাটক এই মিথের আবডালে সে কথা বলে। তখন ফ্রান্সের ভিচি সরকার নাৎসি জার্মানির ‘কোল্যাবরেটর’ কাম হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছে। ‘লিবার্টি ইক্যুয়ালিটি ফ্রেটারনিটি’-কে ‘ওয়ার্ক ফ্যামিলি ফাদারল্যান্ড’-এ বদলে দিয়ে ফ্রান্স পুরোদমে ইহুদি হত্যায় শামিল।
সার্ত্রে-র ওরেস্টিস জন্মভূমি খুঁজতে-খুঁজতে একদিন আরগসে পৌঁছে দেখে আরগসের রাজা আইগিসথোস সেখানে কায়েম করেছে মৃতের উৎসবের। আর নগর বিপুল সব মাছিতে ভরে গেছে। পাহাড়ের গুহার মুখে বসিয়ে রাখা পাথরটাকে প্রধান পুরোহিত সরিয়ে দিলে সেই অশুভ সংকেতে মৃত মানুষেরা বেরিয়ে আসে। পুরো একটা দিন-রাত তারা বাইরে থাকে, ফিরে যায় তাঁদের পূর্বতন জীবনের মানুষদের খুব কাছে। এই মানুষরা, তাদের প্রতি যে অন্যায় হয়েছিল, তার ক্ষমাহীন স্মৃতি ফিরিয়ে আনে অন্যায়কারীর কাছে। পাপস্খালনের জন্য আরগসের জনগণকে নিদান দেওয়া হয়েছে যে, তারা মৃতের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে ওই ২৪ ঘণ্টা ধরে তারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা সোচ্চারে ঘোষণা করে যাবে, বারে-বারে, নাগাড়ে। এই রিচ্যুয়াল মানতে-মানতে আরগসের মানুষের মনের মধ্যে ভয় এমনভাবে গেঁড়ে বসে গেছে, তারা এতটাই আতঙ্কিত যে, আইগিসথোস যে পাপ করে সিংহাসনে বসেছে, এ-নিয়ে তারা ভাবে না।

আরও পড়ুন: মেয়েগুলো সব গেল কোথায়? ডিসটোপিক ছবি ‘মাত্রুভূমি’ ও মহিলাদের নিরাপত্তা! লিখছেন চৈতী মিত্র…
না, সার্ত্রে-র ‘মক্ষিকা’-কে একটা ডিসটোপিয়ান আখ্যান বলা চলে না। ডিসটোপিয়া একধরনের আখ্যানবর্গের বিষয়, যেখানে কাল্পনিক ভবিষ্যৎ সমাজে মানুষ স্বৈরাচারী শাসক বা সরকার বা কোনও কর্পোরেশনের দমনমূলক নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত অমানবিক, ভয়াবহভাবে মর্মান্তিক জীবন কাটায়। আমরা ‘মক্ষিকা’-য় সেই থিম-কেই খুঁজে পাব আর ডিসটোপিয়াকে একটা হাড় হিম করা ত্রাসের শাসন পরিস্থিতি হিসেবে চিনতেও পারব। ডিসটোপিয়ান কাহিনি ইতিহাসের নানা সময়ে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রে তৈরি হওয়া আতঙ্ক ও ত্রাস ও অবিশ্বাস পরিস্থিতি থেকেই উদ্রিত হয়েছে। সেখানে স্বৈরশাসকের সংশয় ও অবিশ্বাস চরম। সেই চরম অবিশ্বাস ও সন্দেহের বশে কোনও রাষ্ট্র মানুষের জীবনকে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় রেখে দেয়। স্বকীয় চিন্তার কোনও জায়গা থাকে না। সেই সমাজে পারস্পরিক বিশ্বাস আস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। টোটালিটারিয়ান রাষ্ট্র ভিন স্বরকে শত্রু বা দ্রোহী হিসেবে খুঁজে বের করে নিজের যুক্তিতে, প্রচণ্ড সন্দেহ ও অবিশ্বাসের প্রতিবেশে অন্যদের নিকেশ করে দেওয়ার প্রবল যৌথ উন্মাদনা তৈরি করে। সেই সমাজে বা রাষ্ট্রে কোনও অন্য স্বরের বা জীবনের আর কোনও সম্ভাবনাই থাকে না। ত্রাসের উল্লাস মঞ্চ হল ডিসটোপিয়া।
হঠাৎ খটকা লাগে, যখন আইগিসথোস মঞ্চে এসে নিজেই তার অনুতাপের স্বীকারোক্তি দিয়ে বসে। তাহলে তো দেশের লোকের কাছে সে স্বীকারই করে বসল যে, সে পাপ করেছে। আমাদের সঙ্গে-সঙ্গেই মনে পড়ে যায় ফরাসি বিপ্লবের ‘রেইন অফ টেরর’-কালীন গিলোটিনে হত্যার ভয়াবহতা নিয়ে জর্জ বুশনারের লেখা ‘দাঁতোঁর মৃত্যু’ নাটকে দ্বিতীয় অঙ্কে পঞ্চম দৃশ্যের কথা। যেখানে বিপ্লবের চরমপন্থী জ্যাকোবিন দলের নেতা দাঁতোঁ এসে স্বীকারোক্তি দিতে থাকেন। ফরাসি বিপ্লবে প্রতিশ্রুত ‘মুক্তি’-কে দ্রুত হাসিল করার জন্য বাস্তিল দখল করে অভিজাতদের গিলোটিনে মুণ্ডচ্ছেদ ক্রমে রাজতন্ত্রকামী নানা স্তরের অভিজাত সামন্তদের ও অন্য বিপ্লবীদের হত্যালীলায় পরিণত হয়। বিপ্লব তো একটি ইউটোপিয়া। ফরাসি বিপ্লবের তরিকা যখন গণহত্যা, সন্দেহের বোঝা বাড়তে থাকে জ্যাকোবিন বিপ্লবীদের মনে, যে পাশের বিপ্লবীটি একইরকম বিশ্বস্তভাবে চরমপন্থী আছে কি না। শেষে ত্রাসের দমনে ফ্রান্সের শহরে-শহরে নদীতে-নদীতে পঞ্চাশ মাইল জুড়ে রক্ত বয়ে যেতে থাকে।


ঐতিহাসিকরা দেখিয়েছেন বিপ্লবের স্পেকট্যাকল গিলোটিনে মুণ্ডু কেটে ফেলা পরিণত হয়ে গেছিল জনগণের হিংস্র আমোদে। জনগণ এইসময়েই ক্রূর মৌতাতে বিচারবুদ্ধিহীন মেতে ওঠা ‘মব’ হয়ে গেছিল। ক্যুইন মারি আঁতোয়ানেতের সঙ্গিনী প্রিন্সেস দ্য লামবালকে তুলে দেওয়া হয়েছিল পারি শহরের নিচুতলার শ্রেণি থেকে আসা ‘স্যন কিউ লট’-দের হাতে, যারা ছিল বিপ্লবের পয়দল জঙ্গি জনতা। লেয়োঁ-ম্যাক্সিম ফেভ্র-র পেইন্টিং ‘দ্য ডেথ অব দ্য প্রিন্সেস দ্য লামবাল’-এ (১৯০৮) এক সোল্লাস ভিড়ে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা দ্য লাম্বালের নগ্ন নিথর বডি দেখলেই আঁচ করা যায় কী হয়ে পড়েছিল সামগ্রিক হত্যাকাণ্ডের চেহারা। সেখানে বাচ্চা-বুড়ো-মহিলা-বালিকার উল্লসিত বদলা নেওয়ার রক্তপিপাসু ভিড়ে এক ড্রাম বাজনদারের উপস্থিতিতে আঁচ করে নেওয়া যায়, একের পর এক হত্যা, গণহত্যা হয়ে গেছিল রাস্তার কোনও একটা আমোদগেঁড়ে কার্নিভালের মতো। মারি আঁতোয়ানেতকে নিয়ে চটি পর্নোগ্রাফি বই হিড়িক নিয়ে ‘স্যন কিউ লট’-দের হাতে-হাতে ঘুরত। সেই গণ-সাইকোসিসে জল্লাদের শহরে পরিণত হওয়া পারিতে কি আর শুধু ক্যাঁচ করে গলা কেটে অভিজাত মহিলাদের হত্যা করা হয়েছিল। সেই হিংস্রতা কি গণ যৌন অত্যাচারও ছিল না?
তবে যতই অঙ্গচ্ছেদ, গণধর্ষণ, অবাধ লুঠ, ভাঙচুর, নাশকতা ও হত্যার অভাবনীয় মাত্রাকে স্বতঃস্ফূর্ত মবের হাতে ঘুলিয়ে যাওয়া নষ্ট বিপ্লব বলে ভাবা হোক, বিপ্লবের আদর্শ যারা তৈরি করেছেন, তাদের দায় কমে যায় না। গিলোটিন অভিজাত, রয়্যালিস্ট, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রকামীদের মুহূর্তে নিকেশ করে বহু আশার সাম্য (equality) আচমকা এনে দেবে— চরমপন্থার এই বিশ্বাস ভুল ছিল, দাঁতোঁ-র এই স্বীকারোক্তি ও মূল চরমপন্থী নেতা রোবস্পিয়রকে বারবার পরামর্শ যে, মধ্যপন্থী গিরার্দিনদের পত্রপাঠ গিলোটিনে না চাপিয়ে তাদের সঙ্গে অ্যালায়েন্স দরকার, এই কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। রেইন অফ টেররের কালকে ডিসটোপিয়া বলে চিনতে পারার মানে এটাই বোঝা যে, ত্রাস, সন্দেহ, গণ-প্যারানইয়া তৈরি হয় রাজনৈতিক দলের বা নেতার বা শাসকের ক্ষমতার নারকীয় প্রকাশে। বোঝা যে, ইউটোপিয়া আর ডিসটোপিয়ার মধ্যে আছে একচুলের ফারাক, ইউটোপিয়া উল্টে গেলেই ডিসটোপিয়া। সন্দেহ, ত্রাস, নাশকতা ও গণহত্যার ডিসটোপিয় রাষ্ট্র আদতে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া বিপ্লবের ইউটোপিয়া।

তেমনই সামন্তপ্রথার রাশিয়া পুঁজিবাদের দিকে যাওয়ার অবশ্যম্ভাব্যতা ভেঙে প্রলেতারিয়েত রাজের ইউটোপিয়া কায়েম করার নভেম্বর বিপ্লব হয়েছিল লেনিন-ট্রটস্কির নেতৃত্বে। একক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সমগ্র সোভিয়েতে সাম্যবাদ আনার লেনিনীয় চেষ্টা পরে স্তালিনের জমানায় একনায়কতন্ত্রে পরিণত হয়ে যায়। সেই ডিসটোপিয়ার রাষ্ট্রে পার্টির সাম্যবাদী রাষ্ট্রের খোলনলচে ও আবেগ তৈরির জন্য যে কেন্দ্রীয় নিয়মগুলো তৈরি হয়েছিল লেনিনের হাতে, তা স্তালিনের ব্যবস্থায় ভয়াবহভাবে একনায়কতন্ত্রী হয়ে পড়ে। সেই স্বৈরাচারী পুলিশ নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে বিপ্লবের পরিপন্থী হিসেবে একদিকে অভিজাত ও বুর্জোয়া শ্রেণি, অন্যদিকে চলনে, আচারে, লেখায় যদি সাম্যবাদী আদর্শ থেকে একটুও চ্যুতি হয়েছে মনে হয়, তাহলে অকথ্য জেরা-অত্যাচার, সাইবেরিয়ায় পাচার ও কারাবন্দি। অতি তড়িঘড়ি শিল্পায়নের জন্য প্রত্যন্ত এলাকা থেকে খনিজ উত্তোলনে, ক্যানেল, রেলওয়ে, তাপ-জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে, রাস্তা ও শহর নির্মাণে বাধ্যতামূলক শ্রমিক হিসেবে এদেরই কাজে লাগানো হয়। তা সম্ভবপর হয়েছিল গুলাগ (Gulag) শ্রম শিবির (লেবার ক্যাম্প), ট্রানজিট কারাগার এবং বন্দিশালাগুলোর একটি বিশাল ব্যবস্থায়। পুরীষপূর্ণ, উকুন ও পোকা ছয়লাপ দূষিত পরিবেশে, প্রায় অভুক্ত থেকে, নরকঙ্কাল বনে এরা নির্বংশ হলেও ক্ষতি ছিল না। কারণ বন্দিদের আমদানি ছিল অব্যাহত।
১৯২৯ থেকে ১৯৫৩-র মধ্যে প্রায় দু’কোটি মানুষ গুলাগ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গেছেন আর ১৫-১৭ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে গুলাগ অর্থনীতিতে। ১৯৫৩-য় স্তালিনের মৃত্যুর পরে এই ডিসটোপিয়া থেকে স্থিতাবস্থা আনতে গুলাগ ব্যবস্থা লোপ করতে নিকিতা ক্রুশচেভের প্রায় এক দশকের ওপর লেগে যায়। তখন আলেকজান্দার সলঝেনিৎসিনের সংক্ষিপ্ত নভেলা— ‘ইভান দেনিসোভিচের জীবনের একটি দিন’ প্রকাশের ছাড়পত্র পায়। এই নভেলায় ইভান দেনিসোভিচ শুখভ নামে একজন কৃষক গুপ্তচরবৃত্তির মিথ্যা অভিযোগে কাজাখস্তানের একটি লেবার ক্যাম্পে দশ বছরের কারাদণ্ড পায়। তার জীবনের একদিনের কাহিনিতে গুলাগ লেবার ক্যাম্পের বা ক্যানসার ওয়ার্ড, মাত্রিওনার বাড়ির মধ্য দিয়ে ডিসটোপিয়ান রাষ্ট্রের শারীরিক-মানসিক অত্যাচারের ভয়াবহতা আর্কাইভ করা আছে।
আজ আর নাৎসি পোগ্রোমে ইহুদি নিধনের ডিসটোপিয়া নিয়ে নতুন কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি ডিসটোপিয়ার সন্দেহ, দমনপীড়ণ, ত্রাস, সেন্সরশিপ, নির্বাসন, গণহত্যা প্রণালীর একটা মূল ছক থাকলেও, প্রতিটি ডিসটোপিয়ার মতো নাৎসি আগ্রাসনের যুক্তি ছিল ভিন্ন। নাৎসি জার্মানির মতাদর্শের কেন্দ্রে ছিল আর্য জাতির হিসেবে জার্মানদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা এবং তার বিপরীতে ইহুদিদের জাতিগত শত্রু হিসেবে নির্মাণ। সেমিটিক একটি এথনিক-ভাষাগত পরিচয়। নাৎসি রেসতত্ত্বে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে, একটি খাপছাড়া অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ইহুদিদের সেমিটিক রেস হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। যে রেসকে ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া, কমজোরি অনুন্নত জীনের রেস হিসেবে প্রতিপন্ন করা হয়। এই মনগড়া সেমিটিক রেসতত্ত্ব ইহুদিদের নিয়ে ইউরোপে চরম ভীতি, ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি করে। প্রাত্যহিক বিশদ নাৎসি ভাষণ, ভয়াবহ প্রোপ্যাগান্ডা, কুচকাওয়াজ সাধারণ জার্মানদের মনে ইহুদি ঘৃণা তৈরির জন্য মোক্ষম রিচ্যুয়াল ছিল।

সেমিটিক জাতিবিদ্বেষের নেপথ্যে রাজনীতির কারণ ছিল সমধিক। মার্কসবাদী জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি শুধু জাতীয় রাজনীতিতেই হিটলারের পার্টির প্রতিপক্ষ ছিল না, হিটলারের কাছে রাশিয়ার নভেম্বর বিপ্লব প্রলেতারিয়ান জাগরণের একটি মডেলের বদলে লেনিন-ট্রটস্কি কমরেডশিপে বিপ্লব বলশেভিক-ইহুদি আঁতাতে ইহুদি কার্ল মার্কসের আদর্শের আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক-ভৌগোলিক ক্ষমতা বিস্তারের পন্থা হিসেবে এসেছিল। জার্মানিতে ইহুদিদের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়ে যাবতীয় সামাজিক-প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে তাদের অংশ নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়, কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়। পার্টি লিডার, কর্মী, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, লেখক কবি, নাট্যকার-সহ সাধারণ জনগণকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়, আমেরিকায় বা পশ্চিম এশিয়ায় পাড়ি দেন অনেকেই। ইতিহাস মুছে দেওয়ার জন্য, আর্কাইভ নষ্ট করে দেওয়ার জন্য বা নিছক ক্ষমতার বীভৎস মুখ দেখানোর জন্য পুঁথি নথি নষ্ট করে দেওয়ার রেওয়াজ আজকের নয় শুধু। হিটলারের নির্দেশে একলপ্তে ৪০,০০০ কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন বই পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া হয়েছিল। আর বিরাট বড় এক কেল্লায় সেন্সরশিপের অফিসই তৈরি হয়েছিল বই বা পাণ্ডুলিপি বাজেয়াপ্ত করার জন্য।
রে ব্র্যাডবারির ‘ফারেনহাইট ৪৫১’ (১৯৫৩) নভেলে কোনও এক ভবিষ্যতের আমেরিকায় বই পুড়িয়ে আর নিষিদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে যাতে মানুষের ইতিহাসবোধ না থাকে, যাতে কোনও বিষয় নিয়ে প্রতর্কের ক্ষমতা তৈরি না হয় আর তাদের। বাড়ির দেওয়াল থেকে দেওয়ালে টাঙানো টেলিভিশন স্ক্রিনে বুঁদ থেকে যাতে তারা শাসক অনুরক্ত, ভাবনাচিন্তাবিহীন একদল অকেজো তৃপ্ত প্রাণীতে পরিণত হয়। ঠান্ডা যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিতে কমিউনিস্ট ফ্রন্ট বিশ্বরাজনীতিতে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কায় আমেরিকায় ম্যাককারথি আমলে তুঙ্গ স্বৈরাচারে যেভাবে বাম রাজনৈতিক সংগঠন ও মজদুর পার্টি দফতরগুলি গুঁড়িয়ে দিয়ে উইচ হান্ট করার মতো করে কমিউনিস্ট সন্দেহে ধরপাকড় ও অত্যাচার হয়, তা কমিউনিস্টদের প্রতি সাধারণ মার্কিনিদের মনে ঘৃণা ও আতঙ্কের গণহিস্টেরিয়া তৈরি করে। ‘Red Scare’ নামে এই আতঙ্ক আর ঘৃণার রাষ্ট্রনীতির ক্রুদ্ধ ডিসটোপিয়ান প্রতিক্রিয়া ‘ফারেনহাইট ৪৫১’।


ইউটোপিয়ান সাহিত্যে আদর্শ ভবিষ্যতের স্বপ্নের দিকে একটা অন্ধকার প্রতিক্রিয়া ছুড়ে দিতে ভয়াবহ এক ভবিষ্যৎকে নিয়ে ডিসটোপিয়ান উপন্যাস লেখা শুরু। ত্রাসপীড়িত, সন্দেহ-সংকুল ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিপ্লব থেকে প্রযুক্তির আস্ফালনকে একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরাচারের মধ্য দিয়ে দেখা হয়। ডিসটোপিয়ান আখ্যান অন্য কোনও ‘ক্রোনোটোপ’, অর্থাৎ অন্য সময়-পরিসরে ঘটলেও আসলে তা প্রকৃত বাস্তবের ভয়াবহতাই অ্যালিগরি। তার মাত্রাছাড়া গ্রোটেস্ক আদলে সায়েন্স ফিকশন বা স্পেক্যুলেটিভ ফিকশনের ধাঁচ থাকতে পারে। আর মানবজাতির ক্রমাগত পরিবর্তনশীল অন্তহীন উদ্বেগ ধারণ করে অন্তিম হতে পারে অ্যাপোক্যালিপটিক।
চল্লিশ বছর পার করল মার্গারেট অ্যাটউডের হাড়হিম করে দেওয়া ডিসটোপিয়ান (স্পেক্যুলেটিভ) আখ্যান “হ্যান্ডমেইড’স টেল” (১৯৮৫)। এই কাহিনি শুরু হচ্ছে এক সংকটের মুহূর্তে, যখন প্রযুক্তিগত দূষণে, আনবিক রেডিয়েশনে, সার, কীটনাশক, ভাইরাসের ফলে মানুষের প্রজননক্ষমতা বিপজ্জনকভাবে হ্রাস পেয়ে গেছে। তখন চরমপন্থী ধর্মীয় দল ‘জেকবের পুত্রগণ’ সামরিক অভ্যুত্থানে আমেরিকায় কায়েম করে পিতৃতান্ত্রিক, সর্বগ্রাসী এবং ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্র-গিলিয়েড প্রজাতন্ত্র। যেহেতু তাদের ধর্মীয় ধারণায় পুরুষের প্রজননক্ষমতা হ্রাস পেতেই পারে না, মহিলারাই বন্ধ্যা, এটাই চালু হিসেব হয়ে দাঁড়ায়। কমবয়সি ঊর্বর মহিলাদের বেছে নিয়ে নিয়োগ করা শুরু হয় উঁচুপদের আধিকারিক পুরুষদের সন্তান উৎপাদক যন্ত্র হিসেবে। তারাই ‘হ্যান্ডমেইড’। আর পোস্ট-মেনোপজাল স্ত্রী, বুড়ি পরিচারিকা, প্রজননকামী যৌনতায় গররাজি ‘জেন্ডার-বিশ্বাসঘাতক’ লেসবিয়ান, মহিলাদের অধিকার চেয়ে সোচ্চার নারীবাদী, বিপ্লবী আর ঠ্যাঁটা হ্যান্ডমেইডদের ‘আন-উয়োম্যান’ ছাপ্পা মেরে অত্যন্ত বিষাক্ত দূষিত দ্বীপে লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যে মহিলারা বিবাহিত, তারা স্ত্রী তকমার জোরে থেকে যান। কিন্তু তাদের ভূমিকা হ্যান্ডমেইডদের স্বামীর বিছানায় পাঠিয়ে দেওয়াটুকুই।

ডিসটোপিয়ান আখ্যান নিয়ে কথা শুরু করলে এক বাক্যে পাঠক বলে উঠবেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের রাজনৈতিক আগ্রাসনের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা জর্জ অরওয়েলের উপন্যাস ‘নাইনটিন এইটটি ফোর’ (১৯৪৯) এর কথা। এই উপন্যাসে কল্পিত এক ভবিষ্যতের রাষ্ট্রে সর্বগ্রাসী শাসন, অতন্দ্র গণনজরদারি মানুষের চিন্তা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে। এই রাষ্ট্রে চূড়ান্ত শাসক এক রহস্যময় নেতা— বিগ ব্রাদার। তাকে ঘিরে চলে উন্মত্ত ও তীব্র ব্যক্তিত্বকেন্দ্রিক পূজা। কেউ এই শাসনপ্রণালীর সঙ্গে একমত না হলেই নির্মমভাবে দমন করা হয়। থট পুলিশ ও টেলিস্ক্রিন, ক্যামেরা এবং লুকনো মাইক্রোফোনের মাধ্যমে ক্রমাগত নজরদারি চালিয়ে খুঁজে বের করা হয় কারা ভিন মতের মানুষ। এমনকী, মানুষের মনের মধ্যে চলা ভাবনার স্রোত পড়ে ফেলে ‘থট পুলিশ’। সম্ভাব্য ‘থটক্রাইম’-এর দায়ে মানুষকে গ্রেফতার করা করা হয়। যাদের দল থেকে বের করে দেওয়া হয়, বা যারা ভিন্ন মতের, তাদের অস্তিত্বের সব প্রমাণ ধ্বংস করে তাদের ‘অব্যক্তি’ করে দেওয়া হয়।
এদিকে আন্ডারগ্রাউন্ড বিপ্লবীদের নেতা ইম্যানুয়েল গোল্ডস্টাইন ইহুদি। তাঁকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখানো হয়। মানুষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঠিক নাৎসি জার্মানির মতোই, প্রতি দিন তার মুখ মনে করে ঘৃণার রিচ্যুয়াল পালন করতে। ভাবা হয়, রাশিয়ার ইহুদি লেওন ট্রটস্কি তাঁর ‘দ্য রেভলিউশন বিট্রেড’ বইতে স্তালিনের একনায়কতন্ত্রের কাঠামোগুলি বিশ্লেষণ করে যেমন সমালোচনা করেছেন, তার একটা উদ্দীপনা ‘নাইনটিন এইটটি ফোর’ উপন্যাসে উল্লিখিত ‘দ্য বুক’ সেভাবেই টোটালিটেরিয়ান রাষ্ট্রের মূল স্ট্রাটেজিগুলো দেখায়। ‘দ্য বুক’ হল গোল্ডস্টাইনের লেখা ‘দ্য থিওরি অ্যান্ড প্র্যাক্টিস অব অলিগার্কিক্যাল কালেক্টিভিজম’। সেই ১৯৪৭-এ জর্জ অরওয়েল ভবিষ্যৎ ডিসটোপিয়ান রাষ্ট্রে সর্বগ্রাসী শাসনের যে হাতিয়ারগুলো উল্লেখ করেছিলেন— ‘ডাবলথিংক’, ‘থট পুলিশ’, ‘থটক্রাইম’ বা ‘নিউস্পিক’— ইন্টারনেট থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সর্বগ্রাসী দুনিয়ায় মধ্যে বাস করতে করতে আর আমাদের মনে আসা ভাবনা থেকে চোখের মণি সব পড়া হয়ে যাচ্ছে, আমরাও কোনও অদৃশ্য বিগ ব্রাদারের ডেটা ব্যাঙ্কে পরিণত হয়ে যাচ্ছি, তারই করা ছাঁচে ঢালাই হয়ে শুধু তারই মেপে দেওয়া ভাবনায় ভাবতে ভাবতে ত্রাসের সঙ্গে আমরা দেখি যে ‘দ্য থিওরি অ্যান্ড প্র্যাক্টিস অব অলিগার্কিক্যাল কালেক্টিভিজম’-এর চ্যাপ্টারগুলি আসলে এখনও আমাদের রোজের জীবনে, রাজনৈতিক পালাবদলে, রাষ্ট্র কী ছিলেন আর কী হয়ে হইয়াছেন, এই বিচারে আজও সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক। চ্যাপ্টারগুলি আসলে পার্টির স্লোগান। তা আমাদের কাছে পেশ করা সত্য। যেমন, অজ্ঞতাই শক্তি (ইগনোরেন্স ইজ স্ট্রেন্থ), যুদ্ধই শান্তি (ওয়ার ইজ পিস ) এবং দাসত্বেই মুক্তি (ফ্রিডম ইজ স্লেভারি)।

‘দ্য বুক’ মারফত স্বৈরশাসনের বিশ্লেষণে আজও জর্জ অরওয়েল অতুলনীয়। তিনি দেখান যে, গোল্ডস্টাইন বলেছেন সমাজ সংগঠনে তিনটি শ্রেণি, উচ্চ, মধ্য ও নিম্ন। মধ্য, যারা বিপ্লব বা রাষ্ট্রশাসনের নিয়ম বানায়, তারা এই নিম্ন শ্রেনিকেই রেখে দেয় আঁধারে। ইতিহাসের নামে ঘোলানো-গোলানো মন গড়া মিথ তাদের আফিমের মতো খাইয়ে রাষ্ট্রের চরম নীতিতে বিশ্বাস করিয়ে নেওয়া হয়। আর বুদ্ধিহীন সেই দাসত্বেই একমাত্র তাদের মুক্তি বা ক্ষমতায়ন— এই বোধ দিয়ে তাদের ভীত করে ও খেপিয়ে নিয়ে চালিয়ে নেওয়া হয় স্বৈরশাসন।
চেনা লাগে না প্রতিপদে, আজও? প্রতিপদে, আজ?




