ডিসটোপিয়া: ৩
আমাদের পাড়ায় একটু-আধটু ছবি আঁকতে পারত অসিত দাস। আমাদের ছোটবেলার সময় তখন, ৭৬-’৭৭ সাল। কলকাতাটার এতটা মেদবৃদ্ধি হয়নি তখনও। দক্ষিণ শহরতলিতে গজিয়ে-ওঠা আমাদের পাড়ায় কালীপুজো শুরু করে দিল বড়রা। পাড়ার উত্তর-পূর্ব প্রান্তে থাকতেন কালীপদ গাঙ্গুলি। উনি একটু-আধটু তন্ত্রচর্চা করেন। নিদান দিয়েছিলেন শ্যামাপুজো করার। কালীপুজোতে পাড়ার অমঙ্গল হতে পারে। তাই আমাদের পাড়ায় শ্যামাকালী পুজো হত। এই শ্যামা আর কালীর তফাত আজও পরিষ্কার নয় আমার কাছে। বেণীমাধব ভট্টাচার্যের কাঠখোদাই কালী নিয়েও বিতণ্ডা হয়। হাতগুলো কালো না হওয়ায় তাকে অনেকেই ফিরিঙ্গি কালী বলত। সাদা-কালো সদা দ্বন্দ্বময়, তবু্ও হাত-ধরাধরি। আলো-অন্ধকার যেমন ভাই-ভাই বোন-বোন।
যাই হোক, কথা হচ্ছিল অসিত দাসের আঁকা নিয়ে। শ্যামাপুজোয় বিশাল সিনারি আঁকত। আমি তার স্যাঙাৎ। সেই শেখা চাটাইয়ের ওপর ব্রাউন পেপার মারা। আঠাতে তুঁতে মেশানো। জিঙ্ক অক্সাইড গঁদের আঠার বদলে বেলের আঠায় গুললে সাদা বেশি হয়। সিনারি বলতে খানিকটা আকাশে, এক টুকরো নদী, দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের চূড়া আর দুই প্রান্তে রামকৃষ্ণ আর সারদা মা। পুজোর দশ বছর বয়সে মাঝখানে স্বামী বিবেকান্দ-র স্থান হয়েছিল। এই সিনারির সামনে কখনও সত্য চক্রবর্তীর, কখনও কানাই পালের, পরের দিকে আমার বানানো শ্যামাকালী জিভ কেটে দাঁড়িয়ে থাকত।
আরও পড়ুন: নাচে শরীরের মুক্তি, তাই সমাজের কাছে তা বিপজ্জনক! লিখছেন কিউ…
বিসর্জনের তিনদিন পরে ওই সিনারির সামনেই থিয়েটার হত ফি বছর। শুরুর আগে পাড়ার কয়েকজন গান শোনাত। অসিত দাসের একটা বিখ্যাত গান ছিল, ‘কমলায় নৃত্য করে ঠকমকিয়া ঠমকিয়া’। তারপর পাড়ার বাসিন্দাদের করা থিয়েটার। নির্দেশনায় সন্তোষ ঘোষাল। ‘রক্তে বোনা ধান’ হিট হয়েছিল। পিছনে কিন্তু সিনারিতে দক্ষিণেশ্বর আর সস্ত্রীক রামকৃষ্ণ দেব অধিষ্ঠিত। এই চালচিত্র নিয়ে বেড়ে ওঠা আমাদের। যদিও একে কালচিত্র বললে মনে হয় ঠিক হবে। কলকাতায় কালযাপনে বিপন্নতা-বিষণ্ণতা-উচ্ছ্বাস-উল্লাস সবই দেখা। সেই বিপন্নতার কাঠামোয় লাল-সাদা-নীল-হলুদ কাপড় খাটিয়ে কিছুটা সময় মুখ ফিরিয়ে থাকা জীবনের আঁধার থেকে। বেঁচে থাকার এও এক ওষুধ। কালো-সাদার ফাঁকফোকর দিয়ে লাল-নীল-সবুজ-হলুদের উদযাপন।
আমি ঠাকুরমার কাছে শুতাম ছোটবেলায়। তিনি আমার বাবার পিসিমা। শান্তিলতা সেনগুপ্ত। মাতৃ-পিতৃহীন ভাইপো-ভাইঝিদের মানুষ করতেই তার জীবন কেটেছে। শেষ বয়সে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায়। স্বপাক আহার। ভাগ পেতাম আমি। ঘি-ছেটানো আলোচালের সেদ্ধ ভাত কয়েক গ্রাস আমার বরাদ্দ। কালো পাথরের থালা আলো করে আলোচালের মণ্ড। জানালার পাশে একটা চৌকিতে শোয়ার ব্যাবস্থা। ঠাকুরমা জানলা বন্ধ করত না কোনওদিন। তাতে নাকি আলো আসে না। অন্ধের আলোর প্রয়োজন কী, পরে বুঝেছিলাম। ঝড়ের রাতে তীব্র বাজ পড়লে আমাকে হাতড়ে-পাকড়ে জড়িয়ে রাখত প্রবলভাবে। জানালা বন্ধ হত না। ওই জানলা দিয়েই এক নম্বর বাসের হর্নের আওয়াজ আসত। চিত্তরঞ্জন স্কুলের মাথার ন’টার সাইরেন, শ্মশানযাত্রীদের হরিধ্বনি, রসরাজ মাস্টারমশায়ের জুতোর শব্দ, ৭০ পল্লির দুর্গাপুজোর বোধন-বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজ সব ঢুকে পড়ত।

বদলে-বদলে যাওয়া দৃশ্য। আঁধারে সেঁদিয়ে যাওয়া স্মৃতি। দৃশ্যেরা যখন শেষ হয়ে যায়, তখন স্পর্শেরা বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। ঘাপটি মেরে বসে থাকি প্রতিবার পুজোর সময়ে, মাঠনকশার খসড়া নিয়ে। ‘জনগণ কী চায় পাবলিক সেটা বোঝে না’, সম্ভবত তপন রায়চৌধুরী বলেছিলেন। তবে হট্টগোল আছে। টপকে যাওয়া থেকে উতরে যাওয়ার ইতিহাস আছে।
১৩৫০ সালের আশ্বিনের এক উল্লেখযোগ্য পত্রিকার তৎকালীন সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র সেনের সম্পাদকীয়তে চোখ রাখি—
‘সম্মুখেই মহালয়া এবং প্রতিপদাদি কল্পারম্ভ, সুতরাং পূজা আরম্ভ হইয়াছে বলা যায়; কিন্তু সমগ্র বাংলায় আজ অন্নভাবের হাহাকার। চিতা-ধূমে বাংলার আকাশ আচ্ছন্ন হইতে বসিয়াছে। বাংলার পল্লীতে পুত্রহারা জননী, পতিহারা নারী, ভ্রাতৃহারা ভগিনীর রোদনধ্বনি উত্থিত হইতেছে। বহদিনের স্নেহের আশ্রয় পরিত্যাগ করিয়া দলে দলে নরনারী একমুষ্টি অন্নের উদ্দেশ্যে আজ সমাজ ছাড়িয়া বাহির হইয়াছে।—তাই ভাবিতেছি বাঙালী আজ কাহার পূজা করিবে? ঘর যাহার ভাঙিল, সংসার যাহার ধ্বংস হইল, সে আজ কাহাকে ঘরে আনিবে? অন্নহীন যে, সে কাহার অন্ন যোগাইবে?—আজ বাংলাদেশে সত্যই অকালবোধনের সময় আসিয়াছে। বাঙালির আজিকার পূজা আর গতানুগতিক পূজা নয়।’

পুজো তবুও হয়েছিল সেদিন ফুল-বেলপাতায়। হাহাকারের অঞ্জলি হয়েছিল সেদিন। দিনে-কালে বাংলার এ-প্রান্তে আঁধার এসেছে। যে-রাতজাগা পথ মিছিলে সোচ্চার হয়েছে এই সেদিন, সে-পথেই কাঁধে চেপে জগজ্জননীকে মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু মনের এক কোনায় একটুখানি কালি ‘রূপং দেহি জয়ং দেহি’-র দিকে ভ্রূভঙ্গি করেছিল। আজ এই সময়ে, জনগণনায় সংখ্যায়-বেড়ে-যাওয়া বিপর্যস্ত বৃদ্ধের জন্য, পসরা-খোয়ানো দোকানির জন্য কতটা ‘সোহাগের দীপ’ জ্বালতে পারব যদি পুজো-মাঠখসড়ার বরাত পাই!
বেনারসের গঙ্গায় এক কিশোরকে খড়ের দড়িতে বেঁধে সারি-সারি প্রদীপ ভাসাতে দেখেছিলাম। কেন জিজ্ঞেস করতে বলেছিল, তার বন্ধুর জন্মদিনের উপহার ওই আলোর মালা। চমৎকৃত হয়েছিলাম ভালবাসার নমুনায়। আমি যদি পুজোর নকশা করতাম এবার, তাহলে হয়তো ওই স্পিরিটটাকে স্মরণ করে একটা লাইটহাউস বানাতাম। আমার আঁধারপথ, পরিক্রমার আলোকবর্তিকা হয়ে থাকত তা। শ্লাঘা প্রকাশ। কালো পাথরের থালায় ঠাকুরমার হাতে-মাখা আলোচালের মণ্ডের মতো।
আঁধারের দুর্গাপুজো কালীপুজো হয়ে যায়।
ছবি সৌজন্যে: পার্থ দাশগুপ্ত




