যে ছোট্ট বাচ্চাটিকে তার বাবা স্টেজ থেকে ছুড়ে-ছুড়ে ফেলত কখনও মিউজিশিয়ানদের বক্স-এ, কখনও অডিয়েন্সের মাঝখানে, মোটামুটি দশ-পনেরো ফিট দূরত্বে, তার নাকি ‘ন্যাক’ ছিল যে-কোন দূরত্বে, প্রায় শূন্য থেকে শরীরটাকে ঘুরিয়ে, পাকিয়ে ঠিক হাত বা পায়ের ওপর পারফেক্ট ল্যান্ড করার। বেড়ালরা যেমন করে আর কী! বাচ্চাটার কোটের পিছনে একটা সুটকেসের হাতলের মতো হাতল সেলাই করা থাকত, যাতে ছেলেটার বাবা জো কিটন, সেই সময়ের একজন নামী ভডভিলে কমেডিয়ান, হাতলটি ধরে ঘুরিয়ে তাকে আকাশে উড়িয়ে দিতে পারে। সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার, এমন ‘ঘাতক’ পারফরমেন্স-এ, বাচ্চা ছেলেটির নাকি হেব্বি মজা লাগত। ওই শূন্যে উড়তে-উড়তে খলখল করে হাসতে শুরু করত।
কিন্তু এমন খেলা দেখেও দর্শক খুব একটা মাতোয়ারা হত না। মহা মুশকিল! কমেডি অ্যাক্টো বলতেই তখন ‘স্টান্ট’ অথবা ‘স্ল্যাপস্টিক’— এমন এক হাস্যরস, যেখানে শারীরিক আনাড়িপনা দড়াম হোঁচট খেয়ে এই যেমন ‘পা পিছলে আলুর দম’ বা পাহাড় থেকে কুমড়োর মতো গড়িয়ে পড়া দেখে দর্শক হেসে কুটিপাটি হত। সেখানে কিটন ফ্যামিলি বা থ্রি কিটনস— বাবা জো কিটন, মা মাইরা কিটন আর খোকা ফ্রাঙ্ক কিটনের, এহেন ঘাতক অ্যাক্টও জমছে না দেখে, জো কিটন এক উপায় বের করেন। যেখানে মানুষ আসল মজাটা পাচ্ছে অন্য মানুষের হেনস্তা হওয়ায়, সেখানে ছোট্ট ফ্রাঙ্ক কিটন যে এই স্টান্ট উপভোগ করছে, নিজেই হিহি করে হাসছে এটা তো ঠিক হচ্ছে না! জো, ছোট্ট ছেলেটিকে বলে দিল, পরের শো থেকে একদম না হাসতে, উল্টে ভয় পেতে। ভয় তো সে ছেলে একটুও পায় না, তাহলে উপায়? জো মাথা খাটিয়ে বের করেন, ফ্রাঙ্ককে থাকতে হবে ভাবলেশহীন মুখে, প্রায় একটি জ্যান্ত মানুষের মৃত মুখের মতো। তাকে ছুড়ে দেওয়া হবে দশ ফুট দূরত্বে, সে কায়দা করে ল্যান্ড করবে, উঠে কোটটোট ঝেড়ে চারদিকটা দেখে নিয়ে আবার গুটগুট করে স্টেজেই উঠে যাবে, আর আবার তাকে তুলে নিয়ে ছুড়ে ফেলা হবে কুড়ি ফুট দূরত্বে… এই সবটাই করতে হবে কোনও অভিব্যক্তি ছাড়া, অদ্ভুত পাথরের মতো মুখ নিয়ে। ব্যস! স্ট্র্যাটেজি দারুণ হিট।



ছোট্ট ছেলেটির এমন ভাবলেশহীন মুখ— তার বারবার এমন হেনস্তা হওয়ায় ফেটে যায় হল, হাসতে-হাসতে গড়াগড়ি খেতে থাকে দর্শক। হু হু করে বেড়ে যায় থ্রি কিটনসের জনপ্রিয়তা ও তাদের শো-এর টিকিটের দাম। একবারের জন্যও পা হড়কায় না এই খুদের। আশি বছরের বুড়োর মতো গোমড়া মুখে সে দেখতে থাকে, তাকে দেখে হাসতে-হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়া আবালবৃদ্ধবনিতা।
হুডিনির অমোঘ রহস্যময় সিন্দুকের অতল থেকেই বোধহয় ফট করে আবির্ভূত হয়েছিল এই অদ্ভূত বাচ্চা, “the little boy who can’t be damaged”, সেই ছোট্ট ছেলেটি, যার কোনও ক্ষয় বা ক্ষতি করা অসম্ভব।
শোনা যায়, দোতলার সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়েও ছোট্ট শিশুটির গায়ে আঁচড়টিও লাগেনি। বেদম ঝড়ের দমকা তাকে একবার চার-চারটি ব্লক উড়িয়ে, আছড়ে ফেলেছিল মাটিতে— তবু সে অক্ষত ছিল, অবিচলিতও। পরে তাঁর নিজের কথায় শোনা যায়, ‘কত হাজার বার যে আমি মরে যেতাম যদি না ঠিক ভাবে মাটিতে ল্যান্ড করার ম্যাজিকটা আমি না জানতাম, দারুণ একটা বেড়ালের মতো…’
জো কিটনের বন্ধু, কালজয়ী ম্যাজিশিয়ান হ্যারি হুডিনি, ফ্রাঙ্ক কিটনের নাম দেয় ‘বাস্টার’! এমন একটি মানুষ, যে যে-কোনও বিপদআপদকে ‘bust’ বা গুঁড়িয়ে দিতে পারে। হুডিনির জাদুদণ্ড জগতের ইতিহাসে এমন এক চরিত্রর উপস্থাপনা করল, যার সত্যিই বিনাশ নেই— এক ও অসামান্য বাস্টার কিটন।
এত কিছুর সঙ্গে আরেকটি ব্যাপারও ঘটে যায় অবশ্য জাদুজগতের রহস্যে। তিন বছরের ছোট্ট ছেলেটা আর কোনওদিন হো হো করে হেসে উঠতে পারে না; না স্টেজে, না সিনেমায়, না জীবনে। বাস্টার কিটন-এর অপার জনপ্রিয়তা আর স্টারডমের মূল্য তার হাসিটি। ‘The great stone face’ অথবা ‘ডেড প্যান ফেস’ নামে খ্যাত বাস্টার কিটন তাঁর মারাত্বক স্টান্ট এবং স্ল্যাপস্টিক কমেডির রাজা আজ ও।


স্টেজ থেকে নির্বাক চলচ্চিত্র, বাস্টার কিটন কমেডি জঁরের পথিকৃৎ। সর্বকালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা, পারফর্মারদের একজন। ১৯১৭ থেকে ১৯২৮, একটার পর একটা দারুণ হিট ছবির প্রযোজক-পরিচালক-অভিনেতা বাস্টার কিটন। কিটন স্টুডিওতে নির্মিত হচ্ছে ‘Cops’, ‘Sherlock Jr.’-এর মাইলফলক ছবি। স্টুডিওর শেষ তিনটি ছবির হোঁচট খায় বক্স অফিসে।
কিছুটা বাধ্য হয়েই বাস্টার কিটন, MGM studio-র সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। MGM-এর প্রতিপত্তি হলিউডে তখন বিগ ব্রাদারের মতোই। এই সন্ধি বা ‘কোলাবরেশন’ সুখকর হয়নি বাস্টার কিটনের জন্য। বলা হয়, এই চুক্তি তাঁকে প্রায় গলা টিপে, দম বন্ধ করে মারার মুচলেকা ছিল। এমনকী, যে ‘মরণকে বুড়ো আঙুল’ দেখানো যে স্টান্ট বাস্টার কিটনের সহজাত জিনিয়াস, সেখানেও ব্যাগড়া দিয়েছিল কর্পোরেট ফিলিম কোম্পানি। তারা চুক্তিতে বলে, স্টান্টের জন্য স্টান্টম্যান নিতে হবে। উত্তরে, কিটন বলেছিলেন, “Stuntmen can’t make you laugh!” স্টান্টম্যানরা মানুষকে হাসাতে পারে না।
একই সঙ্গে সবাক চলচ্চিত্রের সূচনা হয়েছে এই সময়। বাস্টার কিটনের জন্য সেটা ছিল একটা ধাক্কা; কিটনের বিখ্যাত উক্তি— ‘Silence is of the gods, only monkeys chatter!’ আস্তে আস্তে কেমন তলিয়ে যেতে থাকেন কিংবদন্তি শিল্পিটি। MGM-এ নেহাত এক অভিনেতা হয়ে থেকে যান কিটন, যুগজয়ী স্বতন্ত্র শিল্পী হিসেবে না। ক্রমে বিষাদে ডুবে যান কিটন, ঘোর অ্যালকোহলিক হয়ে পড়েন। রিহ্যাবে দিতে হয় তাকে। এলিনিওর কিটন, MGM-এর ই এক তরুণী নৃত্যশিল্পী, অনেক ভালবেসে আর যত্নে, অনেক ধৈর্যে আর একাগ্রতায় কিটনকে ফিরিয়ে আনেন স্বাভাবিকতায়। বিয়ে করেন তাঁরা। কিটন কাজে ফেরেন আবার।

এইবার এক নতুন পথ ধরে। করতে থাকেন ছোট-ছোট আঁভা-গার্দ ছবি। বেশ কিছু অন্য ধরনের ছবির কাজও করেন। করেন তাঁর বন্ধু ও আরেক কিংবদন্তির সঙ্গে তাঁর প্রথম কাজটি— চার্লি চ্যাপলিনের ‘লাইমলাইট’। সেই প্রথম, কিটন তাঁর ‘স্টোন ফেস’-এর মোড়কটি ছেড়ে, হেসেছেন আবার। এমনই আরেকটি ছবি ‘ফিল্ম— আ স্ক্রিনপ্লে বাই স্যামুয়েল বেকেট’ (১৯৬৫)— বেকেটের প্রথম ও একমাত্র অরিজিনাল ফিল্ম স্ক্রিপ্ট, পরিচালনায় অ্যালান স্নেইডার। তুমুল নিরীক্ষামূলক একটি আঁভা গার্দ সিনেমা। দু’টি চরিত্র নিয়ে— O, যে কিনা ক্যামেরা এবং E, যে একজন ধ্বসে যাওয়া চেহারার, মৃত চক্ষুর প্রৌঢ়। এরা দু’জন দু’জনকে দেখছে, বা দেখছে না, বেকেটের দর্শন— to be is to be perceived. এই আশ্চর্য সিনেমাটির বিষয়ে কিটনের নিজের খুব যে উত্তেজনা ছিল, তা না, কিন্ত বেকেট আর স্নেইডারের মতে বাস্টার কিটনের পারফরমেন্স অভূতপূর্ব, তিনি এই ছবিটিতে প্রায় ভূতে পাওয়ার মতো অভিনয় করেছেন। এই ছবিটিই কিটনের শেষ ছবিও। এর ১৮ মাস পরে মারা যান বাস্টার কিটোন, লাং ক্যান্সারে।

তারও কত-কত দশক পর এফটিআইআই-এর এক ইভনিং স্ক্রিনিং-এ ‘ফিল্ম’ দেখে বেরতে-বেরতে, হাসি নয়, হুল্লোড় নয়, এক কালব্যাপী স্তব্ধতা নিয়ে কিছু সিনেমার প্রেমে পড়া ছেলেমেয়ে আলোচনা করছিলাম, কিটনের ওই অতলস্পর্শী, তীব্র চাহনি দর্শকদের গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো অনুঘটক! এক অমোঘ উচ্চারণের মতো— ‘I always want the audience to out-guess me, and then I double-cross them.’




