ফিল্ম সোসাইটির উপকথা

দেখতে-দেখতে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি একটা পাঠ্যবস্তু হয়ে উঠল আমাদের জীবনে। যদি আমরা কমলকুমার মজুমদারের কথা উল্লেখ করি, কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হিসেবে নয়, একজন লেখক হিসেবে, তিনি বলেছিলেন— “ঠাকু’মার ঝুলি” একটি আলাদা সভ্যতা।” আমার মনে হয়, কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-ও আদতে চলচ্চিত্র আস্বাদনের ক্ষেত্রে এক আলাদা সভ্যতা, এক আলাদা ইতিহাস, একে শুধু ফিল্ম ক্লাব বলে মনে করলে ইতিহাসের প্রতি অবিচার হয়।

সিনেমার একটা বড় সমস্যাই বলা যায় যে, সিনেমার তেমন আড়াল নেই। সিনেমা জন্মক্ষণেই দাবি করেছে সামাজিক আকাঙ্ক্ষার, সিনেমা জন্মসূত্রেই জনপদবধূ। ফলে কবিতা বা উপন্যাস, চিত্রকলা বা সংগীত যে সম্ভ্রম ও সমীহ আদায় করে, সিনেমা তো তা নয়। সিনেমা গোড়া থেকেই অনভিজাতদের জন্য অপেরা। এই যে তুচ্ছ গুজব বা কাহিনির মোহ, তা কিন্তু সিনেমার একমাত্র সম্পদ ছিল না। বস্তুত, সিনেমার ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যাবে, ইউরোপে, ফরাসি দেশে এবং ইতালি ও জার্মানিতে কাহিনি কিন্তু সিনেমার ভাগ্য নির্ধারণ করেনি। ফ্রান্সে তা পৌঁছেছে দৃশ্যকলার কাছাকাছি, জার্মানিতে তা হয়ে উঠেছে আতঙ্ক ও উদ্বেগের এক অন্যরকম ধারাবিবরণী, যার সঙ্গে বরং ফ্রানৎস কাফকা ও গটফ্রিড বেনের লেখার অনেক মিল পাওয়া যায়। এই যে নাট্যধর্মিতা ও চিত্রধর্মিতা, তা ইউরোপকে ভুলিয়ে দিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। চলচ্চিত্রর মানচিত্র বদল হয়ে তা চলে গেল আটলান্টিকের ওপারে, আটলান্টিকের পূর্বদিক থেকে সে সরে গেল হলিউডে। আর সেখানে মোটামুটি সিনেমা বলতে যে রুচির প্রবর্তন হল, তা হল গরিব, নিম্নবিত্ত ও ছন্নছাড়া শ্রমিকদের জন্য এক ক্ষণিকের বিনোদন। এই বিনোদন সিনেমার তেমন স্থায়ী চিত্র নয়। কেননা, সেসময় ইউরোপে দেখা যাচ্ছে ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ এবং ‘আঁশিয়েঁ আন্দালু’-র মতো ছবি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপ যে অন্যরকম ভাবে, তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, যখন লুই দেলুক, জার্মেন দেলুক, জঁ আপস্তাঁ-র মতো প্রতিভাবান চলচ্চিত্রকর্মীরা ১৯২০ সালে সিনে ক্লাব বা ফিল্ম সোসাইটির উদ্ভাবন করছেন, যেখানে চলচ্চিত্র কেবল অভিজ্ঞতার প্রদর্শনযোগ্য উপস্থাপনা নয়, বরং একধরনের শিল্পের মহিমা পাচ্ছে, এবং গিয়োম অ্যাপোলিনিয়ের তাকে স্বাগত জানাচ্ছেন।

আরও পড়ুন : ইন্দিরা হত্যার পরের শুনশান কলকাতায় হেঁটেছিলাম প্রেমিকার খোঁজে! লিখছেন মৃদুল দাশগুপ্ত

আমাদের দেশেও, সিনেমা শিল্পে কীভাবে উত্তীর্ণ হতে পারে, সে-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি উপদেশ দিয়েছিলেন শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অনুজ মুরারি ভাদুড়ীকে, বলেছিলেন, সাহিত্যের নকলনবিশি থেকে তাকে মুক্তি পেতে হবে। ১৯৩১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ‘নবশক্তি’ পত্রিকায় চিঠির দপ্তরে একটি যুক্ত ঘোষণায় গিরিজাকুমার বসু এবং নরেন্দ্র দেব জানালেন হরেন ঘোষ প্রতিশ্রুত সিনেমার লাইব্রেরির কথা। এপ্রিল মাসে স্বয়ং অবনীন্দ্রনাথ এই লাইব্রেরির উদ্বোধনকালে প্রকাশ্যেই জানালেন— ‘সিনেমা আমাদের দেশে এসে গেছে। এসে যখন গেছে, তখন সে বিষয়ে জ্ঞান আমরা লাভ করব না কেন? সে জ্ঞানসঞ্চয়ে আমাদের বাধা হবে কেন?’ বলা বাহুল্য, শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথের বাক্যরাশি কলকাতার চলচ্চিত্র-সংস্কৃতিকে অন্য মাত্রা দিল।

আমরা অবশ্যই বলব ‘কানু বিনে গীত নাই’— কলকাতার সিনেমা-আলোচনায় ঠাকুরবাড়ির অবদান অনস্বীকার্য ছিল। ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ভারতী’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পরে রবীন্দ্রনাথও এই পত্রিকা সম্পাদনাকার্যে ব্রত ছিলেন। পরে, ১৯১৬ সাল থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায় যখন এই পত্রিকা সম্পাদনার ভার নেন, তখন সৌরীন্দ্রমোহন ছদ্মনামে ও স্বনামে সে-কাগজে চলচ্চিত্র বিষয়ে কতগুলি প্রবন্ধ লিখেন। যেমন, ‘ভারতী’-র শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৩০ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘বাংলা বায়োস্কোপ’। সৌরীন্দ্রমোহনই প্রথম বাংলা ছায়াছবিতে শিল্পের প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন।

কিন্তু আমরা যদি হঠাৎ, ফ্ল্যাশ ফরওয়ার্ডে আধুনিককালে চলে আসি, তাহলে দেখব, বাংলা ছবির প্রাপ্তবয়স্কতা যখন আসন্ন, আমাদের উপলব্ধি ও রুচি ব্যাকুল হয়েছিল ভাষাগত পরিবর্তনের বাসনায়। পাঁচের দশকের সবচেয়ে বড় দু’টি ঘটনা, একদিকে সত্যজিৎ রায় ও ঋত্বিক ঘটকের মতো অলোকসামান্য স্রষ্টার আবির্ভাব, অন্যদিকে উত্তম-সুচিত্রার মেলোড্রামার সৌজন্যে প্রেমের অদৃষ্টপূর্ব প্রচ্ছদ। সিনেমা যে শুধু বিনোদনভাষা নয়, যে-কোনও ভাষার মতোই জরুরি, তাও যে আত্মার স্বরলিপি হতে পারে— একথা রীতিমতো তর্ক করে বোঝানোর জন্য সত্যজিৎ ও তাঁর বিখ্যাত বন্ধুদল প্রতিষ্ঠা করলেন কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র, যেখানে চলচ্চিত্রের শিল্পসৌন্দর্য নিত্যচর্চার প্রকাশ হয়ে দাঁড়াল। সত্যজিৎ লিখেছেন, “In the year of India’s Independence, we formed the first film club of Calcutta thereby shackling ourselves willingly to the task of disseminating film culture even amongst the intelligentsia.” এই চলচ্চিত্ররুচির উদ্বোধনের জন্যই দেবীপদ ভট্টাচার্য ও গোপাল সেন প্রমুখ ‘চলচ্চিত্র’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এখানেই সিনেমায় মেলোড্রামা বা দৃশ্যের গুরুত্ব নিয়ে ধ্রুপদী নানা বক্তব্য প্রকাশিত হত। লেখা ছাপা হত চলচ্চিত্রে শব্দ বা গানের প্রয়োগ নিয়ে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই সাময়িকীর পাতায় ঋত্বিক ও কমলকুমারের মতামত সবান্ধব সত্যজিতের চেয়ে অন্যরকম। আসলে চলচ্চিত্র আধুনিক শিল্প হিসেবে সদ্যস্বাধীন একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কত দূর কার্যকর, চলচ্চিত্র-নির্মাতার সামাজিক দায় ইত্যাদি সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়েছে এই কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-তে। পরে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি তার মুখপত্র ‘চিত্রপট’ প্রকাশ করে।

সত্যি কথা বলতে কী, কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র আগে তৎকালীন বম্বে-তে ১৯৩৭ সালে ও ১৯৪৩ সালে দু’টি ফিল্ম ক্লাব তৈরি হয়েছিল, যথাক্রমে ‘অ্যামেচার সিনে সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’ ও ‘বম্বে ফিল্ম সোসাইটি’। কিন্তু বম্বের ফিল্ম সোসাইটিদু’টি খানিকটা শৌখিন চিত্রপ্রদর্শক সংস্থা হিসেবে কিছুদিন কাজ করে। অন্যদিকে, কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি চলচ্চিত্র ও শিল্পের সম্পর্ক, চলচ্চিত্রশিল্পের স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে অত্যন্ত মনস্বী আলোচনার প্রবর্তন করে। এছাড়াও সাহিত্য আর সমাজের সঙ্গে চলচ্চিত্রের প্রকৌশলগত আত্মীয়তা ও সংযোগ পরীক্ষা করা তো তাদের অন্যতম কর্মপদ্ধতি ছিলই। যেমন ধরা যাক, ছবিতে শব্দ ও গানের ব্যবহার। সবান্ধব সত্যজিৎ মনে করতেন, শব্দের অতিপ্রয়োগ দৃশ্যসৌন্দর্যের ক্ষতি করে, গানের প্রয়োগও যথাসম্ভব কম থাকা উচিত। অন্যদিকে ঋত্বিক একেবারে বিপরীত মতামত পোষণ করতেন, তাঁর কাছে শব্দই ব্রহ্ম। কমলকুমার মজুমদারও গানের প্রয়োগের ব্যাপারে সত্যজিতের মতামত মেনে নেননি। এই তর্কগুলো ক্রমেই আমাদের চলচ্চিত্ররুচি তৈরি করছিল।

এমন নয় যে, পথটা ছিল খুব মসৃণ। সিনেমা আলোচনার জন্য ঘর পাওয়াও ছিল বিরাট সমস্যা। চিদানন্দ দাশগুপ্ত জানিয়েছেন, দু’-একটি বাড়িতে সোসাইটির বৈঠক করতে গিয়ে কী বিপত্তি হয়েছিল। সে-বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা থাক, কিন্তু মোদ্দাকথা, শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত তখনও পর্যন্ত সিনেমাকে অন্দরমহলে ঠাঁই দেওয়ার উপযুক্ত বলে মনে করেনি।

মুম্বইয়ে আয়োজিত প্রথম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ঝলক

তবে, ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনকে একেবারে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-র মতো থরথর করে কাঁপিয়ে দিল ১৯৫২ সাল। স্বাধীন ভারতে প্রথমে বম্বে, তারপর কলকাতা, দিল্লি ও মাদ্রাজ— এই চারটি মহানগরীতে অনুষ্ঠিত হল আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। এই চলচ্চিত্র উৎসবের সংগঠনে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই চলচ্চিত্র উৎসব উপলক্ষে দেখানো হল ইতালীয় নব বাস্তববাদের প্রধান দুটো ছবি, ডি সিকা-র ‘বাইসাইকেল থিভস’ ও রোসেলিনির ‘রোম ওপেন সিটি’। এই প্রথম আমরা জানলাম, ছবি করার জন্য বিরাট মাপের কোনও বিষয় বা সুদক্ষ অভিনেতার প্রয়োজন নেই, জীবন নিজেই নিজের গল্প বলতে পারে। ডি সিকা-র ছবিতে ক্যামেরা যখন রোমের রাস্তা দিয়ে ঘোরে, আমরা বুঝতে পারি, একটি সাইকেল চুরির মতো তুচ্ছ ঘটনা কীভাবে মুসোলিনির সমুদ্রশাসনের দম্ভকে ছাপিয়ে যায়! ক্যামেরাকে যে স্টুডিওর বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব, অপেশাদার অভিনেতারাও যে জীবনের এলোমেলো ছন্দে স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেন, একথা জানার পর ভারতে ছবি বানানোর ধরনটাই পাল্টে যায়। আর তার অলক্ষ্যে ছিল কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র উসকানি।

প্রথম বদল এল হিন্দি ছবিতে। বিমল রায়ের ‘দো বিঘা জমিন’ ছবিতে বলরাজ সাহনি ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে পিচগলা রাস্তায় রিকশা চালালেন। এমনটা আগে কখনও ঘটেনি। এরপর তো বিশ্ববন্দিত ‘পথের পাঁচালী’। একটি শিশুর চোখ দিয়ে দেখা নড়বড়ে গ্রাম্য জীবন, কাশবনের সৌন্দর্য, নাটকীয়তাহীন গল্প। সত্যজিৎ রায় নিজেও বহুবার ‘বাইসাইকেল থিভস’ ছবিটির প্রতি তাঁর ঋণ প্রকাশ করেছেন।

অবশ্যই আমাদের মনে রাখা উচিত, মূলত কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র উৎসাহে ও সত্যজিৎ রায়ের উদ্যোগেই, একটি লং টার্ম লোনে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকেই যে সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ ছবিটিকে ধারে আনা হয়েছিল, তা বারংবার দেখায়, আমাদের এখানে প্রায় ভূতগ্রস্তর মতো চলচ্চিত্র সংসদের কর্মীরা বুঝতে পারেন, ছবি দেখার অন্য এক ধারা হতে পারে। সোভিয়েত চলচ্চিত্রকার পুদভকিন যে নিমাই ঘোষের ‘ছিন্নমূল’ দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন, সেই নিমাই ঘোষ কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-রই সদস্য। পুদভকিন যে ‘ছিন্নমূল’-এর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই স্তালিন যুগেই ‘প্রাভদা’ পত্রিকায় একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লেখেন, তা বোধহয় কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র প্রতি শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধার্ঘ।

কিন্তু এই প্লাবনও কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারল না। আসলে তাদের প্রাণপুরুষ সত্যজিৎ সিনেমায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তাঁর সহযোগীদের সোসাইটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো ধৈর্য ও সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল না। তবে ‘পথের পাঁচালী’-র সাফল্য নতুন করে সদস্যদের মধ্যে উৎসাহ সঞ্চার করেছিল। এই সময় ভারত সরকারের অতিথি হয়ে বিবিসি থেকে প্রখ্যাত ইংরেজ চলচ্চিত্র-আলোচক মারি সিটন এদেশে এলেন। ইনি সত্যজিৎ রায়-সহ অন্যদের সোসাইটির কর্মসূচি প্রণয়নে অনুঘটনের ভূমিকা নিলেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগও শুরু হল। ১৯৫৬-র ২৯ জানুয়ারি সোসাইটির সিনেমাহলে মার্ক ডনস্কয় নির্মিত গোর্কির আত্মজীবনী অবলম্বনে তিন পর্বের ছবির শেষ অংশ ‘পৃথিবীর পাঠশালায়’ দেখিয়ে সোসাইটির পুনর্যাত্রা শুরু হয়। সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক নির্মল সিদ্ধান্ত, স্বয়ং মারি সিটন এবং সুইডিশ পরিচালক আর্নে সুকসডর্ফ। ছবির শিল্পরূপ কী হবে, তাই নিয়েই তাঁরা প্রধানত ভাবিত ছিলেন। ছবি জোগাড় করা হত বিদেশি দূতাবাসগুলির সাহায্যে। এছাড়া কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক তখন একটি ফিল্ম লাইব্রেরি চালু করেছিল, সেই সংগ্রহ থেকেও ছবি নেওয়া হত। কেন্দ্রীয় সরকার যখন বিদেশ থেকে নানা ছবি আনানোর কথা ভেবেছে, তখন তারা কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-র মতামত তারা জানতে চেয়েছিল। সোসাইটির তরফ থেকে প্রথমেই যে নামগুলো পাঠানো হয়, তা ছিল আইজেনস্টাইন, ভিগো, ডি সিকা, রোসেলিনি, ভিসকন্তি, রেনোয়াঁ। অবশেষে, ১৯৫৯ সালে গড়ে ওঠে ফিল্ম সোসাইটিগুলির নিজস্ব কেন্দ্রীয় সংগঠন ‘ফেডারেশন অফ ফিল্ম সোসাইটিজ অফ ইন্ডিয়া’।

১৯৫৬ সালে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির পুনর্যাত্রা শুরুর সময়, দর্শকাসনে সত্যজিৎ রায়, দেবকী বসু, হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, অরুন্ধতী দেবী-সহ অন্যান্য বিশিষ্টরা

এই ইতিহাস অনেক বড় করেও লেখা যায়, কিন্তু আসল কথা হল, সিনেমাকে জনচিত্তহারী বিনোদন না ভেবে শিল্প ভাবার যে প্রেরণা, তা প্রথম কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি-ই নেয়। তবে কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির অন্দরের তর্কগুলিই যে সবসময় সফল হয়েছে, তা নয়। চিদানন্দ দাশগুপ্তই স্বীকার করেছিলেন, পারিবারিক ছবিগুলির প্রতি যে অনীহা তাঁরা দেখিয়েছিলেন, তাতে বাংলা ছবির নিয়তি খুব উজ্জ্বল হয়নি। তা হতে পারে, কিন্তু আমরা যে সিনেমাকে নেহাত ‘বায়োস্কোপ’-এর স্তরে না ভেবে ভাবলাম, চলচ্চিত্র আমাদের আত্মার চরিতার্থতা এনে দিতে পারে, তা যে ‘অপরাজিত’ বা ‘সুবর্ণরেখা’-র মতো ছবিকে বিকশিত করতে পারে, তা কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি না থাকলে কি বোঝা সম্ভব হত?

হয়তো সত্যজিৎ রায়ও সাতের দশকে এসে খানিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। তিনি ফিল্ম সোসাইটির অবনমন সম্পর্কে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ ছবিতে একটি মন্তব্য করেন, যা দেখে অভিশাপ ও হাহাকারের স্পন্দন আমাদের স্পর্শ করে। ফিল্ম সোসাইটির ঘোষণা সর্বত্র বাংলা ছবির ক্ষেত্রে সফল হয়নি। আমরা ছবি থেকে ক্রমশ জনতাকে বাদ দিয়ে দিতে শুরু করি, তাতে লক্ষ্মী ও সরস্বতীর বিবাদ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সত্যজিৎ রায় ও মারি সিটন

ফিল্ম সোসাইটির সফলতা ও বিফলতা নিয়ে তর্ক করা যেতে পারে, কিন্তু ফিল্ম সোসাইটি না থাকলে এই যে ফিল্ম স্টাডিজ আজ পড়ানো হচ্ছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়-সহ ভারতের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, তা কি সম্ভব হত? এই যে আজকে চলচ্চিত্র আলোচনার অলংকারশাস্ত্র বদলে গেছে, আজ ছবি দেখার সময় আমরা রবার্ট ব্রেসঁ-র ছবি থেকে ‘নধরের ভেলা’-কে যেভাবে দেখি, তা সম্ভবই হত না, যদি না ফিল্ম সোসাইটির ছোট্ট ঘরে সত্যজিৎ রায় ও নিমাই ঘোষ তর্ক করে যেতেন, যদি চিদানন্দ দাশগুপ্তর উন্নাসিকতা না থাকত, যদি মৃণাল সেন বা ঋত্বিক ঘটক খানিক অপ্রয়োজনেই সেই বৈঠকে ঢুকে পড়তেন। আসলে, আমরা এই যে একধরনের ‘সিনেমা-আঁতেল’ হলাম, এর নানা নেতিবাচক দিক থাকতে পারে, কিন্তু ইতিবাচক দিক হল এই যে, কলকাতা থেকেই এই বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল দেশজুড়ে, সিনেমা, নেহাত-সিনেমা, এক্কেবারে রাস্তার সিনেমাও বড় উপন্যাস বা শিল্পকলার পাশাপাশি নিজের জায়গা করে নিতে পারে। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক থেকে গুরু দত্ত— ভারতীয় সিনেমার অন্যভাষ হয়তো কলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সাহচর্য ছাড়া তৈরিই হত না। তাই এই ফিল্ম সোসাইটির জন্মমুহূর্তে নত হতেই হয়।