মহারাষ্ট্রের মেয়ে সালোনি তোদকরি। ২০২০ সালে, মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকে থানে, পালগর, মানগাঁও-সহ বিভিন্ন শহরে অনশন শুরু করে এই খুঁদে মেয়ে। তার দাবি ছিল দেশে যাতে কোনও শিশু আগামিদিনে ভিক্ষা না করে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমে সালোনি জানায়, এই পদক্ষেপ গ্রহণে তার মূল অনুপ্রেরণা মহাত্মা গান্ধী। আমরা যাদের ‘জেনারেশন জেড’ বলি, ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা, সেই দলেই পড়ে সালোনি। কিন্তু তার প্রতিবাদের ভাষা মিলে যায় জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে। ১০০ বছরের বেশি ব্যবধান থাকলেও, সালোনির বিশ্বাস এই অহিংস অনশনকে হাতিয়ার করেই যাবতীয় সমস্যার সমাধান সম্ভব।
এমন দৃঢ়তা দেখে মনে পড়ে যায় ‘লগে রহো মুন্নাভাই’ সিনেমার কথা। যে-চিত্রনাট্য গান্ধীর অবয়বকে মূলস্রোতের আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছিল। গান্ধীগিরির মোদ্দা কথা, জটিল বিষয়গুলিকে কিঞ্চিৎ সহজ করে সিনেমার পর্দায় দেখে দর্শকদের ভাল লেগেছিল। আমরা তখন মিলেনিয়ালরা স্কুলে পড়ি, বন্ধুদের দেখেছি মজা করা গান্ধীগিরি প্রয়োগ করতে ক্লাসের মধ্যে। হালকা চালে মুন্নাভাই কথা বলছে স্বয়ং জাতির পিতার সঙ্গে, এই সখ্য আমাদের মন কেড়েছিল। কিন্তু তারপর? আর মনে হয় এমন গান্ধীগিরির প্রতিফলন দেখা যায়নি সিনেমা, সাহিত্যে বা ওটিটি-তে। অনেকে তাই প্রশ্ন করে— আজকের সোশ্যাল মিডিয়া, এ-আই বা গেমিংয়ের যুগে গান্ধীবাদের আদৌ কোনও তাৎপর্য আছে? ২ অক্টোবর মানেই সারা ভারতে হলিডে আর ড্রাই ডে। এবারে সপ্তাহান্তে তিনদিন পরপর ছুটিও পাওয়া গেছে। পুজোর আগে কেনাকাটা, খাওয়াদাওয়া আর একটু বিশ্রাম; এই অলস মেজাজ বাদ দিয়ে আর কি কিছু অবশিষ্ট আছে গান্ধী-জয়ন্তীর? বিশেষ করে জেন জি বা জেন আলফাদের কাছে? এর উত্তর খোঁজাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য, যদি তিনটি প্রশ্ন প্রথমেই রাখা যায় পাঠকদের সামনে।
আরও পড়ুন: গান্ধী যখন সাংবাদিক! লিখছেন নীলাঞ্জন হালদার…
এক, আজকের চূড়ান্ত ভোগবাদী, ব্র্যান্ড-সচেতন সমাজে গান্ধীর অনাড়ম্বর জীবন কি নতুনভাবে পথ দেখায়?
দুই, তাঁর সর্বোদয়া এবং আত্মনির্ভর প্রকল্প আজকের স্টার্ট-আপ যুগে কতটা জরুরি জেন-জির কাছে?
তিন, গান্ধীর অহিংস অনশন কীভাবে জেন জি আন্দোলনে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছে?

‘Youth talk’ নামক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে, (যেখানে জেন-জি বা আলফাদের নানা সমস্যা নিয়ে আলোচনা হয়) ‘Minimalism কেন জরুরি ভারতে’: এই শিরোনামে একটি লেখা ছাপা হয়। ‘মিনিমালিজম’ শব্দটা আজকের সোশ্যাল মিডিয়ার পরিভাষায় বেশ জনপ্রিয়। একদিকে যেমন পণ্যের বাজারে হাজারও নতুন ব্র্যান্ড, জাঁকজমক, হাতছানি— তেমনই জেন জি বা আলফাদের মধ্যে বাড়ছে minimalism-এ ঝোঁকার প্রবণতা। আনমোল নেগি নামে এক জেন জি ব্লগার ইউথ টকে লিখছেন যে, যতই minimalism শুনে আমরা পাশ্চাত্যের দিকে তাকাই কিংবা জাপানি লেখিকা মারি কণ্ডোর কথা ভাবি (যিনি ‘মিনিমাল লিভিং’ নিয়ে বই লিখে সারা বিশ্বে সমাদৃত) কিন্তু এই সবকিছুর অনেক আগে আমাদের minimalism শিখিয়ে গেছেন মহাত্মা গান্ধী। নবীন লেখক আনমোল minimalism-এর সঙ্গে মিল পেয়েছে গান্ধীর ‘অপরিগ্রহ’ মতাদর্শের। নন-পজেশন বা আত্মনিয়ন্ত্রণের এই চিন্তাধারা গান্ধী নিয়েছিলেন বৌদ্ধ ও জৈন দর্শন থেকে। তাঁর আশ্রমে অংশগ্রহণ করতে হলে বাধ্যতামূলক ছিল ১১টি ব্রত। যার মধ্যে প্রধান ও অন্যতম হল অপরিগ্রহ।
তিনি মনে করতেন, যদি প্রয়োজনের থেকে অত্যাধিক আমার কাছে থাকে, তার মানে সেটা চৌর্যবৃত্তি করেই এসেছে। যে চুরি সবসময় চোখে দেখা যায় না; মালিকপক্ষ যে শোষণ চালায় শ্রমিকের ওপর, জমিদার চালায় চাষির ওপর, অতিরিক্ত সেই শ্রমের মূল্য আসলে একপ্রকার হিংসা। তাই গান্ধীর অহিংস আন্দোলন শুধু শারীরিক প্রহার বা গা-জোয়ারি থেকে ব্রাত্য থাকা নয়, বরং consumption বা অবাধ ভোগকেও হিংস্রতা বলে মেনে নেওয়া। আনমোল নেগির মতো জেন-জিরা আজ যখন গান্ধীর মতাদর্শকে ফেসবুকে উদ্ধৃত করছে, তেমনই এর পরিপন্থী দৃশ্য দেখতেও আমরা অভ্যস্ত। দিল্লি, মুম্বইয়ের পাঁচতারা মলে রাত তিনটে থেকে যখন আইফোন ১৮ কেনার লাইন পড়ে, তখন গান্ধীর ‘অপরিগ্রহ’ কিঞ্চিৎ হাস্যস্পদ ঠেকে। কিন্তু মনোবিদরা বলছেন, সকলে যে তিন লাখি ফোন কেনার ক্ষমতা রাখে, তা হয়তো নয়, প্রতিযোগিতামূলক ভোগবাদ বা conspicuous consumption-এর যুগে এই প্রদর্শন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। এখানে আবারও এসে পরে গান্ধীর ট্রাস্টিশিপ বা সমবায়ের ধারণা।
তিনি বলছেন: ‘Ownership can be seen as a species of violence’ (Cambridge Companion to Gandhi, p.146).
অর্থাৎ, ব্যক্তিগত মালিকানা হিংসার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়। গান্ধীর অভিধানে গুরুত্ব পেয়েছে ‘সর্বোদয়া’ (welfare for all) এবং আত্মনির্ভরতার (self-sufficiency) দর্শন। আজকের স্টার্ট আপের যুগে ‘আত্মনির্ভর’ কথাটা বহুল-প্রচলিত। জেন জি-দের সামনে স্টার্ট আপ ব্যবসার নানা কৌশল রাষ্ট্রযন্ত্র বারবার তুলে ধরতে চাইছে। কম শুল্কে লোন, ছোটখাট ব্যবসা, ডিজিটাল মানি ট্রান্সফার— এমন বিবিধ উপায়! সরকার বলছে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা। কিন্তু গান্ধী যে আত্মনির্ভরতার কথা বলতেন, যার মূলে ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি ও পঞ্চায়েত, তার সঙ্গে এই আত্মনির্ভর বয়ানের কোনও মিল আছে কি? বর্তমানে ‘স্টার্ট আপ’ শব্দটা এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যেন অর্থনীতির যাবতীয় সমস্যার সমাধান লুকিয়ে রয়েছে ওই জিয়নকাঠিতে। গান্ধী কিন্তু তাঁর ‘হিন্দ স্বরাজ’ বইতে গ্রাম আর শহরের এক অভূতপূর্ব সম্পর্কের কথা বলেছেন। যেখানে কেউ কারও ওপর পরজীবী বা পরাশ্রয়ীর (parasite) মতো নির্ভর করবে না। গ্রামে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা নয়। উনি লিখছেন:
‘Every village is a complete, self-sustaining, independent republic.’

১৯৪৬ সালে ‘হরিজন’ পত্রিকায় গান্ধী এই ভিলেজ রিপাবলিককে সামুদ্রিক ঘূর্ণির (ওশিয়ানিক সার্কেল) সঙ্গে তুলনা করেছেন। গ্রামে পিরামিডীয় বিন্যাসে সবার ওপরে জমিদার, তারপর মধ্যস্বত্ত্বভোগী আর চাষিরা অবস্থান করবে না। প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় ও তৃতীয়ের ওপর আধিপত্য কায়েম করবে না। বরং একটা জলের বৃত্তের মতো গ্রামকে কল্পনা করেছিলেন গান্ধী। যে বৃত্তে ক্ষমতার আস্ফালন নেই, সহাবস্থান আছে। এই গ্রাম্য জীবনের বিষয় পড়ে আজকের শহরতলির দিকে তাকালে চোখে পড়ে কেবল পরিযান। হাজার-হাজার শ্রমিকের মুম্বই, ব্যাঙ্গালোর বা দিল্লিতে শহুরে গরিব হয়ে থাকার গল্প। গান্ধীর আত্মনির্ভর গ্রামের সঙ্গে আজকের মফসসলের কোনও সাযুজ্য নেই।
যদিও ইদানীং, গ্রামের মানুষ আর শহরের মানুষের একটা বিষয় দারুণ মিল। দু’জনেই যথেচ্ছ ইন্টারনেট ব্যবহার করে এবং শ্রেণি-বৈপরীত্য ঘুচিয়ে, রিল বা মিমের দর্শক শহুরে-পাড়াগেঁয়ে সকলে। হাজার-হাজার ফোনে পৌঁছে যাওয়া এই রিলে গ্রামকে দেখানো হয় অ্যাস্থেটিক ফিল্টারে। ঘোমটা দেওয়া গ্রামীণ বধূ মাটির উনুনে রান্না করছে, সুন্দরবনের বাওলিরা মধু সংগ্রহ করছে কিংবা জেলেরা নৌকায় মাছ ধরছে, সকলের নিজের নিজের ভ্লগে অগুনতি লাইক ও সাবস্ক্রাইবার। এর মধ্যে অধিকাংশই জেন জি বা মিলেনিয়াল। কেউ-কেউ টাকাও উপার্জন করছে গ্রামের সংস্কৃতি সারা বিশ্বের সামনে তুলে ধরে। তবু মনে হয়, এই প্রদর্শন গ্রামীণ সমাজকে ঠিক কতটা স্বয়ংসম্পূ্র্ণ করে তুলতে পারল? ব্যাঙ্গালোর, মুম্বই বা দিল্লির বস্তিতে শত শত পরিযায়ী শ্রমিক যায় বাংলা, বিহার, উত্তরপ্রদেশের অখ্যাত গ্রাম থেকে। অনেকেরই বয়স কুড়ি, বাইশের দোরগোড়ায়। গান্ধীর বাণী তারা স্কুলপাঠ্যে নিশ্চয়ই পড়েছে, কিন্তু পরিযান-পর্যুদস্ত এই ভারতে oceanic circle-এর মতো সহযোগিতার অভিজ্ঞতা তারা পায়নি।
এলাহাবাদে একটি ভাষণে গান্ধী বলেছিলেন: The test for the progress of a country would not be measured by the number of millionaires, but by the well-being of the masses.— (Muir College Economic Society, 22 December 1916). গান্ধীর এই উক্তির সঙ্গে যদি ২০২৬-এর একটি রিপোর্ট মিলিয়ে দেখি: ভারতে বিলিওনিয়রদের সম্পত্তি বেড়েছে ২২৭% (২০১৯ থেকে ২৫) এবং তারই সাথে পাল্লা দিয়ে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে নেমেছে ভারতের নাম। এই প্রবল শ্রেণি-তারতম্যের জবাবও আমরা গান্ধীর দর্শনে পাই। একদিকে যেমন তিনি ট্রাস্টিশিপ বা অছি পরিষদ গঠনের কথা বলছেন, যেখানে একক ব্যক্তির হাতে মূলধন বা সম্পত্তি না থেকে ভাগ হবে একটি সংস্থার মধ্যে, তেমন জমিদার বা ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করার জন্য। এই সমস্তটাই তিনি নৈতিকতা বা মরালিটির নিরিখে ভেবেছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এমন নীতিবোধ বা সততা ধনী ব্যক্তিদের থেকে আশা করা কি সম্ভব? আসলে এর থেকেও জরুরি প্রশ্ন হল, জেন জি-দের সামনে যে অর্থনৈতিক আদর্শ তুলে ধরা হচ্ছে, কোনও এক সফল ব্যবসায়ীর (Wow momo, Swiggy-র মালিকের) বীরগাথা, যা প্রণিধানযোগ্য পদে-পদে (একটা অলীক স্বপ্ন যে, স্টার্ট আপ সংস্কৃতিতে লক্ষ টাকা উড়ছে খোলা বাজার অর্থনীতিতে, শুধু লুফে নেওয়ার পালা) তা কতটা বাস্তবসম্মত বা সুস্থ সমাজের পরিচায়ক? গান্ধীর ট্রাস্টিশিপ বা বড়লোকের ভলেন্টারি কাজের (বিনা পারিশ্রমিকে) ধারণা আজকের নয়া উদারনৈতিক সমাজে খানিক বেমানান, কিন্তু অর্থনীতি বাদ দিয়ে নব্য প্রজন্মের রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা করলে সেখানে গান্ধীবাদের ছায়া দেখা যায়।
জুলাই মাসে যখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে জেন জি আন্দোলন তুঙ্গে, তখন অভিজিৎ দিপকে দেখা করেন মহাত্মা গান্ধীর বংশধর তুষার গান্ধীর সঙ্গে। গান্ধীর প্রপৌত্র জানান:
“…যন্তর মন্তরে যা হচ্ছে, তা সত্যাগ্রহের পুনর্জন্ম। জেন-জিরা যা করে দেখালো, তার জন্য অভিনন্দন জানাতে চাই।”
জুলাই মাসের আন্দোলনে নানা ধরনের অভিনব পোস্টার দেখা গেছে, কোনওটাতে গান্ধীর বাণী ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’, কোনওটাতে মহাত্মার ছবি। শুধু পোস্টার কেন, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীরা নিজেই গান্ধী সেজে, হাতে সংবিধান নিয়ে চলে এসেছিল যন্তর মন্তরে।
কাল্পনিক দৃশ্যপটে বোঝানো হচ্ছিল, আজকে গান্ধী বেঁচে থাকলে কীভাবে তিনি সংবিধান আঁকড়ে লড়াই করতেন। সোনম ওয়াংচুকের ২৬ দিনের অনশন মঞ্চে পাশে ছিল গান্ধীজির ছবি। সোনমই বোধহয় এখন সবথেকে জনপ্রিয় নাম, যিনি ২০২৬ সালের অনেক আগে থেকেই অনশন, অহিংসা এবং আত্মনির্ভরতার মতো গান্ধীর গুরুত্বপূর্ণ মতাদর্শগুলি প্রচার করে আসছেন। ওয়াংচুকের আইস স্তূপ প্রজেক্ট (যা শীতের বরফ জমিয়ে বসন্তে চাষবাসের কাজে লাগানো হয় লাদাখে) যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে আত্মনির্ভর করার এক প্রচেষ্টা। যন্তর মন্তরের আন্দোলন সফল হওয়ার পর, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে সোনম সবার আগে পৌঁছে যান দিল্লির রাজঘাটে। গান্ধীর সমাধিতে প্রণাম জানিয়ে তিনি বলেন: “আমি বাপুকে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে চেয়েছিলাম, তাঁর দেখানো পথ ১০০ বছর পরেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই প্রচেষ্টা (অনশন/অহিংসা) সফল হয়েছে আজ।”
সোনম নিশ্চয়ই নিজে জেন জি নন, কিন্তু তাঁর গান্ধীবাদী রাজনীতিতে পুরোদমে অংশ নিল কলেজ পড়ুয়া, কমবয়সি শ্রমিক, জেন জি বা জেন আলফারা।
এক মুহূর্তের জন্যও যন্তর মন্তরে অংশগ্রহণকারীদের পক্ষ থেকে কোনও হিংসা, আক্রমণ বা উগ্রতার লেশমাত্র দেখা গেল না। আমরা জানি, গান্ধী স্বয়ং অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেছিলেন চৌরিচৌরা ঘটনার পরে। স্বতঃস্ফূর্ত জনজোয়ার যদি হিংসার পথ নেয়, তবে অনশন বা সত্যাগ্রহের আর কিছু অবশিষ্ট থাকে না। কিন্তু যন্তর মন্তরে এমন কোনও পরিস্থিতি সৃষ্টি হল না। বরং পুলিশের লাঠি, র্যাফের জলকামান উপেক্ষা করেও আন্দোলন চলল কৌতুক বা ব্যঙ্গের সাহায্য নিয়ে। এই অভূতপূর্ব প্রতিবাদের ভাষা আরও একবার গান্ধীর মূল মতাদর্শগুলিকে জনসমক্ষে নিয়ে এল। জেন জি-র আন্দোলন যে অহিংস পথেই এগবে, তার প্রমাণ নেহা বোরা-সহ আরও গবেষক বা ছাত্রছাত্রী, যারা সোনমের সঙ্গেই প্রায় একমাস অনশন করে এবং সফলভাবে তাদের দাবিদাওয়া পূরণে সক্ষম হন।
সবশেষে বলা যায় যে, গত এক বছরে গান্ধীবাদী রাজনীতির পুনরুত্থান, বিশেষ করে নব্য প্রজন্মের হাত ধরে, আমাদের সকলকে আশার আলো দেখায়। ব্রিটিশ রাজত্বে গান্ধী যে রাজনৈতিক হাতিয়ারগুলি ব্যবহার করেছিলেন, তার ফলাফল সুদুরপ্রসারী হয়েছিল (তাৎক্ষণিক নয়), কারণ তিনি জানতেন গায়ের জোরে বা অস্ত্রের সাহায্যে শক্তিশালী ইংরেজদের পরাস্ত করা সম্ভবই নয়। গান্ধীবাদ এমন কিছু বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যেখানে Material superiority (অর্থের জোর) বা Military advancement (সৈন্য সংখ্যা, অস্ত্রের মজুত)-র তুলনা ধর্তব্যের মধ্যে আসবে না। তাই তাঁর প্রতিরোধের ভাষা, ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ছিল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। ঠিক তেমনই আজ আমরা যে ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি (নয়া উপনিবেশবাদে যেখানে শুধু গ্রাম থেকে পরিযায়ী শ্রমিকই বেড়িয়ে যাচ্ছে না, পরিযান ঘটছে মধ্যবিত্ত যুবাদেরও; ব্যাঙ্গালোর, গুরগাঁওয়ের সিলিকন ভ্যালিতে আইটি সস্তা শ্রমিক, যেখানে ভারতের খোলাবাজার অর্থনীতির ভবিষ্যত নির্ভর করছে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ বা চিন, রাশিয়ার বিদেশনীতির ওপর) এই অসম্ভব সময়ে দাঁড়িয়েও গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলন, সত্যাগ্রহ বা আত্মনির্ভরতার পথ আমাদের দিশা দেখাতে পারে। বিশ শতকের উপনিবেশবাদ আর ২০২৬-এর নয়া উপনিবেশবাদ, এই দুই ক্ষেত্রেই গান্ধীবাদকে বিশ্লেষণ ও প্রয়োগ করার আশু প্রয়োজন রয়েছে।




