দায়বদ্ধ
শুনতে আশ্চর্য ঠেকতে পারে, কিন্তু ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ শব্দটার সঙ্গে সেই সপ্তদশ শতাব্দী থেকে জড়িয়ে আছে ধর্মের সঙ্গেই। হেনরি মোর নামে এক সাহিত্যিক, ১৬৬৪ সালে ‘আ মডেস্ট এনকোয়ারি ইনটু দ্য হিস্ট্রি অফ ইনইক্যুইটি’ বইটিতে প্রথম ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন যখন, তিনি লিখেছিলেন ‘দ্য হেড অ্যান্ড দ্য ইনফ্লুয়েন্সার অফ দ্য হোল চার্চ’। অর্থাৎ কিনা, ধর্মীয় একটি প্রতিষ্ঠান তাঁর কথায় প্রভাবিত হয়। এখন এই প্রভাব বিস্তার করার ধারণার সঙ্গে এই শব্দটির জড়িয়ে থাকাটা, কালক্রমে আন্তর্জালিক অভিধানে জুড়ল। একুশ শতকে, ইন্টারনেট থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার চত্বরে শব্দটার মানে দাঁড়াল এই, নেটপাড়ায় যাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে বাকতাল্লা করেন বা নানারকম কনটেন্টের উৎপাদন প্রক্রিয়ায় যাঁরা অংশ নেন, তাঁদের বহু মানুষের কাছে যেহেতু চুটকিতে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা আছে, ফলে তাঁদের মতামত বা কথারও খানিক অভিঘাত আছে জনমানসে। সাম্প্রতিকে যখন একটি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ভোটের আগে অর্থ নিয়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তিতে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক বাঙালি ইনফ্লুয়েন্সারের বিরুদ্ধে, তখন আবার এই শব্দের উৎসের কাছেই ফিরে যেতে হবে কি?
‘সেলেব্রিটি’ শব্দটি বিশ শতক থেকে একুশ শতকে, পাশ্চাত্য থেকে প্রাচ্যে একরকমভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল। আর ‘পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বলতে যা বোঝায়, তাঁরা ছিলেন আরেকদিকে। নোয়াম চমস্কি থেকে এডওয়ার্ড সাইদ-রা এই পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল বা বিদগ্ধ সমাজের ভূমিকা নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন বিভিন্ন প্রেক্ষিতে। গ্রামশির প্রসঙ্গ টেনে দু’জনেই যে আদত কথাটা বলেছিলেন, তা হল ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্যি বলাটাই বুদ্ধিজীবীর কাজ। কিন্তু সেলেব্রিটিদের সেই ভূমিকা নিয়ে খুব একটা তুলকালাম হয়নি, বরং খানিকটা ধরেই নেওয়া হয়েছিল, সেলেব্রিটি বা তারকারা চারপাশ নিয়ে খানিক নীরবই থাকবেন। কিন্তু দেশকালভেদে তারও তারতম্য দেখা গেছে বারবার। নোয়াম চমস্কি আমেরিকার ভিয়েতনাম আক্রমণের প্রেক্ষিতে বুদ্ধিজীবীদের নীরবতা ও শাসকের প্রতি আনুগত্য নিয়ে কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমেরিকাতেই বিভিন্ন সময় সেলেব্রিটিরা তাঁদের নিজস্ব আলোকবৃত্তের বাইরে বেরিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জানিয়েছেন। সাম্প্রতিকে ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন সংঘর্ষের প্রেক্ষিতে সরাসরি প্যালেস্টাইনের পক্ষ নিয়েছেন হাভিয়ের বার্ডেম থেকে মার্ক রাফেলো, অ্যাঞ্জেলিনা জোলি থেকে পেড্রো পাস্কাল! আবার ইজরায়েলের পক্ষে সওয়াল করেছেন গ্যাল গ্যাডোটের মতো তারকারা, সম্প্রতি এড শিরান এই বিষয়ে ঔদাসীন্য দেখিয়ে বিতর্কের সম্মুখীন হয়েছেন। কিন্তু এই ঘটনাগুলো ঘটছে সমাজমাধ্যম এসে যাওয়ার পর। এ-দেশে, এ-রাজ্যেও আমরা দেখেছি, শিল্পী-বুদ্ধিজীবী থেকে তথাকথিত অরাজনৈতিক ‘সেলেব্রিটি’-দের অবস্থান নেওয়া না-নেওয়ার প্রশ্ন কতটা জ্বলন্ত।
মানুষকে বোকা বানাচ্ছে এআই?
পড়ুন ‘চোখ-কান খোলা’ পর্ব ৪১…
কিন্তু একটা বড় বিবর্তনের প্রশ্ন নিয়ে এসেছিল ইউটিউব, ফেসবুক এবং শেষত, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক। সেলেব্রিটিদের নিজস্ব ব্লগ পোস্ট বা এক্স, এককালের টুইটারে তাদের মতামত কিছুটা গুরুত্ব তাও বহন করত একটা সময় পর্যন্ত। পরিস্থিতি দ্রুত বদলাল যখন কনটেন্টের গণতন্ত্র স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করল। একটি মোবাইলের ক্যামেরা, সহজলভ্য লাইটস্ট্যান্ড বা ট্রাইপড-মোনোপড বুঝিয়ে দিল, ঘরে বসে কনটেন্টের বৈচিত্র্য দিয়ে সেলেব্রিটিতন্ত্রের দেওয়ালে সহজেই চূড়ান্ত আঘাতটা দেওয়া সম্ভব। হলও তাই। বিশেষ করে অতিমারী, লকডাউন বহু মানুষকে বিকল্প উপার্জনের রাস্তা দেখাল। রান্নার রেসিপি থেকে একেবারে রোজযাপন, দিন গুজরানের ইতিকথা— নানা মোকামে দেখা গেল সেলেবদের বু়ড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হল বিখ্যাত হওয়ার যৌথখামার। তাতে লাভ কী হল, বা কতটা ক্ষতি— ইত্যাদি নিয়ে তর্ক তামাদি হয়ে গেল ক্রমে। বরং, সমাজতাত্ত্বিকরা দেখাতে শুরু করলেন, বিলবোর্ড বা বড়পর্দা বা টেলিভিশনের পর্দা তো সাধারণ মানুষের সঙ্গে তারকাদের দূরত্বই তৈরি করত। কিন্তু ইনফ্লুয়েন্সারদের চাবিকাঠিই হল তাৎক্ষণিক গণসংযোগ।
ফলে, নতুন নর্মাল তৈরি হয়েছে ইনফ্লুয়েন্সারদের হাত ধরেই, যার যত বেশি সাবস্ক্রাইবার, যত বেশি ফলোয়ার, তার পরিচিতি তত বেশি। চিরকালীন সেলেব্রিটি-ক্ষমতাকাঠামোয় বক্স অফিস-জাতীয় কিছু অঙ্ক ছিল, টিআরপি ছিল, কিন্তু এই কোনওকিছুই বিশ্বাসযোগ্যভাবে মানুষের চোখের সামনে আয়না মেলে ধরা থাকত না। এখন সরাসরি, স্পষ্ট ও স্বচ্ছ অঙ্ক কথা বলছে।

এবার, ইনফ্লুয়েন্সাররাই যদি সেলেব্রিটি তকমার নবতম ধারকবাহক হয়ে থাকেন, তাহলে বুদ্ধিজীবী থেকে সেলেব্রিটিদের ওপর যে দায় চাপে, তা তাদের ওপরেও চাপে না কি? মাথায় রাখতে হবে, এটা কিন্তু একটা সমান্তরাল মিডিয়া-বাস্তুতন্ত্রও বটে। এখন, এই মুহূর্তে মিডিয়ার থেকে মানুষ কী চায়? একটা সহজ উত্তর ভেসে বেড়াতে পারে হাওয়ায়, তা হল নিরপেক্ষতা। কিন্তু নিরপেক্ষতাও এই পৃথিবীতে ক্রমে একটি বায়বীয় ধারণা হয়ে উঠছে। যে মিডিয়া একসময় ‘কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার’ বা জনসম্মতির নির্মাণ করার মতো ক্ষমতাধর ছিল, এখন কিন্তু তাকেও, কেবলই শাসক বা পুঁজি নয়, জনমনের স্নায়ুচলাচল বুঝেও চলতে হয়। একই কথা ইনফ্লুয়েন্সারদের ক্ষেত্রেও খাটে। হিমবাহ গলে যাওয়া থেকে ধুমাধার খুনখারাপি, ধর্ষণের মতো বীভৎস ঘটনা থেকে একটি মিমের চুটকি নিয়ে তোলপাড়— হেন কোনও বিষয় ত্রিভুবনে নেই, যা ট্রেন্ডিং হতে পারে না। কাজেই ‘ডাইনোসর আক্রমণ করার সময় আপনি কেন ডালগোনা কফি বানাচ্ছিলেন ভিডিও করে?’ এই প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার আগেই ডাইনোসর নিয়ে একটা কমেডি বা ট্র্যাজেডি বানাতেই হবে আপনাকে! কিছু না কিছু বক্তব্য রাখতেই হবে।
কিন্তু এহেন নিরপেক্ষ, সব বিষয় নিয়ে সঠিক অবস্থান (সংখ্যাগুরু যাকে ‘সঠিক’ বলে নির্ধারণ করছেন) নেওয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের নাম, নির্বাচন কমিশনের কাছে পেশ করা কোনও এক রাজনৈতিক দলের খরচ-তালিকায় দুম করে দেখা গেলে তা ঠিক তারে বাজবে না, এটাই স্বাভাবিক। হয়তো সাদা রঙের দলের সমর্থক চায়, তার হয়ে কথা বলুন জনৈক ইনফ্লুয়েন্সার, গোলাপি রঙের দলের সমর্থকের মনোবাসনাও কিঞ্চিৎ তেমনই। কিন্তু, সাদা বা গোলাপি, কারও থেকে অর্থ নিয়ে সেই কথা বলাকে, এই নতুন নর্মালের মূল্যবোধেও কেউ ভাল চোখে দেখছেন না। কারণ, সিনেমা মেক-বিলিভ, এ-কথা লুমিয়ের ব্রাদার্সের ছবি প্রদর্শনের দিন দর্শকরা প্রেক্ষাগৃহে বসে না বুঝতে পারলেও, কালক্রমে তো মানুষ হজম করেছেন। কিন্তু রিল আসে আঁকাড়া বাস্তব হয়ে, যা মানুষ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে। যেভাবে মানুষ বিশ্বাস করে বিগ বসে, যেভাবে রিয়েলিটি শো নামক বিষয়টিকে এখনও সকলে রিয়েল বলেই হজম করছে। তাই সেই বিশ্বাসের আঁতুড়ে কোদালের ঘা-টা এসে পড়ে, যখন তার নেপথ্যে অর্থের আভাসটুকু দেখা দেয়। অথচ ইনফ্লুয়েন্সার তেল, টুথপেস্ট, আলপিন থেকে এলিফ্যান্টের বিজ্ঞাপন রাখঢাক না রেখেই করেন। কিন্তু রাজনৈতিক দল তাঁকে টাকা দিয়ে কিছু কথা বলিয়ে নিলেই বুঝে নিতে হয়, তা অনৈতিক।
‘নায়ক’-এর শেষ দৃশ্যের কাছাকাছি এসে দেখা যায়, এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য, যে কিনা পৃথিবীজুড়ে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েছে যে, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। কিন্তু দিনের শেষে বিজ্ঞাপনের জন্য তাকে দ্বারস্থ হতে হচ্ছে এক অসৎ বিজ্ঞাপন-ব্যবসায়ীর, যে নিজের উন্নতির স্বার্থে তার স্ত্রী-কে ঠেলে দিতে চায় একটি অসম্মত ঘনিষ্ঠতার দিকে। কিন্তু সেই দৃশ্য বুঝিয়ে দেয়, এই দু’জনেরই আদতে দু’জনকে প্রয়োজন আছে।
অথচ নির্মম বাস্তব এটাই, ব্র্যান্ড প্রোমোশনের সঙ্গে এই বিষয়টার আর খুব একটা দূরত্ব নেই এখন। সমাজমাধ্যমের নজরটানের জন্য নানাবিধ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবেই, সে তিনি বিজ্ঞানী হোন বা ধর্মগুরু। ‘নায়ক’-এর শেষ দৃশ্যের কাছাকাছি এসে দেখা যায়, এক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সদস্য, যে কিনা পৃথিবীজুড়ে এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েছে যে, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। কিন্তু দিনের শেষে বিজ্ঞাপনের জন্য তাকে দ্বারস্থ হতে হচ্ছে এক অসৎ বিজ্ঞাপন-ব্যবসায়ীর, যে নিজের উন্নতির স্বার্থে তার স্ত্রী-কে ঠেলে দিতে চায় একটি অসম্মত ঘনিষ্ঠতার দিকে। কিন্তু সেই দৃশ্য বুঝিয়ে দেয়, এই দু’জনেরই আদতে দু’জনকে প্রয়োজন আছে। কাজেই, রাজনৈতিক দলকেও মানুষের কাছে পৌঁছনোর অ্যালগরিদম খুঁজতে হচ্ছে, ইনফ্লুয়েন্সারদেরও প্রয়োজনীয় সিঁড়ি খুঁজে নিতে হচ্ছে।
এখন এমন ‘ডিসটোপিয়া’-মার্কা বাস্তবতা, যেখানে কারও কোনও আদর্শগত দায় নেই, তা কি মেনে নিতে হবে আমাদের? না, তা না-ও হতে পারে। আমরা চাইতেই পারি, এই বীভৎসার বিরুদ্ধে নিজেদের ভাষ্য নির্মাণের, এবং তা করতেও পারি। কিন্তু ব্যবস্থার গোড়ায় পচনটা অস্বীকার করা আর যাবে কি? না কি, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের সামাজিক ভূমিকার নতুন ব্যাকরণটা লিখবেন? রাজনৈতিক দলের দায় কি এড়ানো যাবে এক্ষেত্রে, যেখানে তারা মিথ্যে কথার বুদবুদ তৈরি করাবে না ইনফ্লুয়েন্সারদের দিয়ে, এক রেস্তোরাঁর নির্দোষ কর্মচারীর জীবন-জীবিকা বিপন্ন হবে না শুধুই কনটেন্ট ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে? যে প্রতিবাদকে বহু মানুষ মন দিয়ে বিশ্বাস করছেন, তার নেপথ্যে প্রযোজকের মতো পার্টির পুঁজি থাকবে না?
মানুষ যদি এটুকু মূল্যবোধ আশা করেন, তাহলে তাদের তা উপহার দিতে খুব অসুবিধে আছে কি?



