উল্টো দূরবিন: পর্ব ৩৩

কবিতার খাতা

দাদুর হাতের লেখা ছিল ভারি সুন্দর। উপমায় বলে, মুক্তোর মতো। একটি সম্পাদিত বই ছিল, ‘চরিতাভিধান’। বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্র ও আরও বিভিন্ন চরিত্র, যেমন হাজি মহম্মদ মহসিন, ঈশা খাঁ, পঞ্চানন তর্কালংকার, নাদির শাহ, কবীর, কালীপ্রসন্ন সিংহ— এরকম নানা বিখ্যাত চরিত্রগুলোর অভিধান। বইটা সম্ভবত ১৯৩০ সালের আশপাশে ছাপা। ওটাই ছিল আমাদের গুগল। বেশ মোটা বই। বইতে কিছু সংশোধন ছিল দাদুর হাতের লেখায়। দশ বছর আগেও দেখেছি সেই মুক্তাক্ষরের সংশোধন।‌ বইটা এখন খুঁজে পেলাম বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে গেছে। আফসোস হয়, যত্নে রাখিনি বলে।

আমার বাবা সংসার সামলানোর জন্য মাস্টারি ছাড়াও টিউশনি করতেন। একটা বিখ্যাত টিউশনি ছিল শ্যামবাজারের বিখ্যাত গোলবাড়ির কষা মাংস গোলবাড়ির মালিকের বাড়িতে। ওদের ছেলেমেয়েরা সব বাবার ছাত্রছাত্রী ছিল। রোজই যেতে হচ্ছে। আশ্চর্য ব্যাপার, মালিকদের রান্নাঘরে আমিষ ঢুকত না। এঁরা ছিলেন নিরামিষাশী পাঞ্জাবি। বাবাকে বইপত্র পড়তে দেখিনি। তবে দাদু পড়তেন। বাগবাহারের শিশিরকুমার লাইব্রেরির মেম্বার ছিলেন। বেশ ছোটবেলায় দেখেছি, সেখান থেকে বইপত্র আনতেন। পরে যখন আমি এইট-নাইন, বাইরের বই পড়ার বয়স হয়েছে, তখন আর আনতেন না। হয়তো চোখের অসুবিধা হত। তবে দাদুর বেশ কিছু কবিতা মুখস্থ ছিল। নবীন সেনের ‘পলাশীর যুদ্ধ’ থেকে, মাইকেল মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে আওড়াতেন।‌ রবীন্দ্রনাথকে খুব একটা পছন্দ করতেন না। বলতেন, ‘রবিবাবুর কবিতায় অশ্লীলতা দোষ আছে।’ একটু ব্যঙ্গ করেই বলতেন, “‘কেন যামিনী না যেতে জাগালে না বেলা হলো মরি লাজে। শরমে জড়িত চরণে কেমনে চলিব পথের মাঝে…’, অবৈধ রাত্রিবাস নিয়া গান।” অথচ, এই দাদুই আমাকে ‘রতিসুখসারে গতমভিসারে’ বলতে গিয়ে বলেছেন, ‘রতি বুঝ বোধ হয় এতদিনে।’ সেই দাদুরই আবার এই গান নিয়ে আপত্তি! 

সেই কোন যুগান্তে দাদুর শেখানো ব্যাকরণ এখনও মনে আছে! পড়ুন ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৩২…

অনেক পরে বুঝেছিলাম, দাদু ছিলেন মনে-মনে, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ, সুরেশ সমাজপতিদের দলের চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। রবীন্দ্র-বিদ্বেষীদের এক সময়ে বেশ বাড়বাড়ন্ত ছিল। সেই ১৮১৮ সালের কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ থেকে ১৯৩০-’৩৫ পর্যন্ত অনেক সমালোচনা-কটূক্তি শুনতে হয়েছে রবীন্দ্রনাথকে। কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ এমনও লিখেছেন— ‘চুনোগলি হার মেনেছে মৌলিকতা দোষে/ যত মুদি-মালা বাংলা পড়ে রবি ঠাকুর লেখে।’ এরকম কত। আমার হাতের কাছে একটা বই আছে, ‘জ্যোতির্ময় রবি ও কালো মেঘের দল।’ লেখক সুজিতকুমার সেনগুপ্ত। বইটা পড়লে বিবাদ-বিদ্বেষের ব্যাপারটা বোঝা যায় বেশ। ওই প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। সবার মধ্যেই সাদা-কালো থাকে, আলো-আঁধারি থাকে। আমার দাদু খুব যে উদার প্রকৃতির ছিলেন সর্বদাই, এমন নয়। নিয়মিত সন্ধ্যা-আহ্নিক করেছেন, কুষ্ঠি মিলিয়ে বিয়ে দিতেন, পঞ্জিকা মিলিয়ে যাত্রা শুভ না নাস্তি দেখতেন, এয়োদশীতে তে বার্তাকু ভক্ষণ নিষেধ বা চতুর্থীতে অলাবু ভক্ষণ নিষেধ— এইসবও বলতেন। কিন্তু আমাদের কোনও গুরুদেব দেখিনি, রাস্তায় হাঁটার সময় মন্দির-টন্দির দেখে পেন্নাম ঠুকতেও দেখিনি, আমাকেও বলেননি কখনও, নমস্কার করো।

বাড়ির আবর্জনা নেওয়া এবং নর্দমা পরিষ্কার করার কাজ করতে আসতেন একজন ঝাড়ুদার বা মেথর। নোংরা নিয়ে চলে গেলে, তিনি চলে যাওয়ার পথে জল ঢেলে দিত ভাড়াটেরা পালা করে। ওঁর ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে হত। আমার কেমন যেন মনে হত, লোকটা আমাদের সেবা করে, ওঁকে ঘৃণা করাটা ঠিক হচ্ছে না! আমি লিখে ফেললাম, ‘ওহে মেথর, আমাদের তরে তোমার কতই না অবদান/ অথচ আমাদের ঘৃণাই তোমার সেবার প্রতিদান।’ হুবহু এরকম নয় নিশ্চয়ই, তবে খানিকটা এরকমই।

দাদু ইংরেজিটাও পড়াতেন ঠিকই, কিন্তু ইংরেজি পড়ানোর ধরন নিয়ে আগেও বলেছি‌‌। তবে বেশি করে মনে পড়ে স্কুলপাঠ্য কবিতাটবিতাগুলোর অর্থ খুব সুন্দর করে বুঝিয়ে দিতেন। 

একথা বোধহয় আগেও বলেছি, আমাদের সময় আগের ক্লাসের ছাত্রদের কাছ থেকে পুরনো বই কেনার চলছিল। বাংলা মানেবইও কিনতাম। হাফ দামের চেয়েও কম। ওখানে দেখতাম, কবি-সাহিত্যিকদের নামের উল্লেখ করলেই বিশেষণ বসায়। কবিগুরু, বিশ্বকবি, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ, মহাকবি মাইকেল মধুসূদন, পল্লিকবি জসীমউদ্দিন, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, দরদী সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র— এরকম আরও কত! কবি বা সাহিত্যিক হলে সবাই নাম জানে, আমার তাই মনে হয়েছিল, কবি হতে পারলে তো মন্দ হয় না! কিন্তু কবি হতে গেলে তো কবিতা লিখতে হয়। কী নিয়ে লিখি? ঠাকুমার সঙ্গে গঙ্গার পাড়ে যেতাম। ঠাকুমা মাঝে-মাঝে পাঠ শুনতে যেতেন, ভাগবত গীতা, মহাভারত— এইসব পাঠ হত। আমি কিছু বুঝতাম না, শুনতাম। আবার বেরিয়ে গিয়ে গঙ্গার ধারে বসে থাকতাম। কত কী ভেসে যাচ্ছে গঙ্গায়, সূর্যের আলো ঝিকিমিকি, কতটা বড় আকাশ, মেঘের কত রূপ, এইসব দেখতাম, আর বাড়ি এসে কিছু লিখে ফেলতাম। প্রকৃতি নিয়েই তো কবিতা লিখেছেন কত কবি। আমি একবার লিখলাম, গঙ্গার জল করে কত ছল/ কোথা হতে আসে এত জল/ কত কিছু ভাসে/ কোথা হতে আসে/ অবিরল জল।’ দাদু খাতাটা দেখে বলেছিলেন, ‘এরকম যা মনে হয় লিখবা!’ এই যে একটা আ-কার যোগ, এতে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষায় একটা প্রশ্রয় বোঝায়। ‘করবি’ আর ‘করবা’, ‘লিখবি’ আর ‘লিখবা’, ‘যাব’ আর ‘যাবা’-র মধ্যে তফাত আছে একটা। এরপর কিছু মনের কথা লিখলে দাদুকে দেখাতাম। একটা বই ছিল বাড়িতে। ‘মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি’। ওইটা পড়ে ক্ষুদিরামকে নিয়ে একটা কবিতা লিখলাম, শেষ লাইনদুটো ছিল, ‘অবশেষে ক্ষুদিরাম পড়িলেন ধরা/ এই তার দেশের কাজ শেষ হল করা!’

দাদু আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘বেশ হইছে, ঠিকই লেখছ, এমনই লিখবা।’

বাড়ির আবর্জনা নেওয়া এবং নর্দমা পরিষ্কার করার কাজ করতে আসতেন একজন ঝাড়ুদার বা মেথর। নোংরা নিয়ে চলে গেলে, তিনি চলে যাওয়ার পথে জল ঢেলে দিত ভাড়াটেরা পালা করে। ওঁর ছোঁয়া বাঁচিয়ে চলতে হত। আমার কেমন যেন মনে হত, লোকটা আমাদের সেবা করে, ওঁকে ঘৃণা করাটা ঠিক হচ্ছে না! আমি লিখে ফেললাম, ‘ওহে মেথর, আমাদের তরে তোমার কতই না অবদান/ অথচ আমাদের ঘৃণাই তোমার সেবার প্রতিদান।’ হুবহু এরকম নয় নিশ্চয়ই, তবে খানিকটা এরকমই। আর রাফ খাতায় নয়, আলাদা একটা খাতা করলাম। তখন একটা খাতা পাওয়া যেত, ঘোড়ায় চড়া, হাতে বর্শা একজন, ওই খাতায় কবিতা লিখতে লাগলাম। কবিতা তো হচ্ছিল না আদৌ, তবে কবিতা না বলে কী-ই বা বলি! ওই খাতায় ঝড়, গঙ্গা, পাখির বাসা এসব নিয়ে কবিতা লিখছি। ক্লাস সিক্সে যখন পড়ি, ইস্কুলের ম্যাগাজিন বেরলো, নিজেদের লেখা জমা দিতে বলা হল। আমিও জমা দিলাম আমার কবিতার খাতা থেকে একটা কবিতা, তা আবার ছাপা হয়ে বেরলো। সেই ম্যাগাজিনটা বহুদিন আগেই হারিয়েছে, তবে প্রথম লাইন গুলো মনে আছে—

ঝড় উঠেছে আজ

করব না রে কাজ

মেঘগুলো সব ডাকছে ঘরঘর

গাছের ডালগুলো সব পড়ে রে কড়কড়

ও রাখাল গরু চরাস নে রে আর

আজি মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল

সূর্যিমামা পালিয়ে গেল

কালো মেঘের ভয়

নানারকম বিকট স্বরে মেঘেরা কথা কয়। 

এই যে রাখাল বালককে গরু চরাতে নিষেধ করছি, আমি কি রাখাল দেখেছি নাকি কখনও! রবীন্দ্রনাথের ‘রাখাল ছেলের সঙ্গে ধেনু চড়াব আজ বাজিয়ে বেণু’ কবিতার অলংকরণে রাখাল ছেলের ছবি দেখেছি। গাছতলায় বসে বাঁশি বাজাচ্ছে, সামনে কতগুলো গরু! মনের রাখাল ওরকমই। আর রবীন্দ্রনাথেরই ‘নীল নবঘন আষাঢ় গগনে’ কবিতাটায় ছিল, ‘রাখাল বালক কি জানি কোথায়?’ আমি ওখান থেকেই নিয়েছিলাম, এখন বুঝতে পারি। দাদুকেই প্রথমে দেখালাম।‌ দাদুর দন্তহীন হাসির গোলাপি মাড়ির ভেতরে কীসের যেন একটা ছটা! উচ্ছ্বাসের বোধহয়! সেটা উপলব্ধি করা যাচ্ছিল।

পরবর্তীকালে কত কবিতার খাতা পাল্টেছিল! কলেজজীবনে অবশ্য বুঝতে পেরেছিলাম, আমি যেসব লিখি, সেগুলো কবিতা নয়। সেসব পরে বলা যাবে।