কবি জন কিট্স শহরে আটকে থাকা মানুষের খোলা আকাশ দেখার আকুলতা লিখেছিলেন। টমাস হার্ডি তাঁর Wessex-এর মাঠ, খামার, মেষপালক আর কৃষিজীবনের দিকে ফিরে তাকিয়েছিলেন। আমাদের বাংলায় বিভূতিভূষণ আর জীবনানন্দও শহরকে গাল দেননি। তাঁরা শুধু মনে করিয়ে দিয়েছেন— মানুষের পৃথিবী ফুটপাথ আর দেওয়ালে শেষ হয় না।
এই কারণেই বিভূতিভূষণ একটা বাঁশবন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন যখন, তখন দাঁড়িয়ে পড়তে হয়। নিত্যানন্দপুরে গ্রামের ছাতিমফুলের গন্ধ ছেলেবেলায় যে ফেলে এসেছে; আজও কখনও হঠাৎ তার ঘ্রাণ-সংবেদনে আঘাত হানে সেই স্মৃতি। কাটোয়া লাইনের ট্রেন খামারগাছির মাঠের কাশফুল ভেঙে ছুটে যেত। সেই দৃশ্য যে দেখেছে, বহু বছর পরেও তা বুকের মধ্যে রয়ে যায়। অনুঘটক হন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
মানুষ চলে যায়, ট্রেন চোখের আড়াল হয়, কিন্তু দূরের বাঁশি কানে থেকে যায়। ছেলেবেলাও বোধহয় তেমনই। বিভূতিভূষণ আমাদের সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলাটাকেই আবার চিনিয়ে দেন।
আজ তাঁর জন্মদিন। তাঁর জীবনপঞ্জিতেও পথ কম নেই। ১৮৯৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর আজকের কল্যাণীর কাছে মুরাতিপুরে মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম। বাবা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় সংস্কৃত ও পুরাণ জানতেন, গ্রামে গ্রামে কথকতা করতেন। বিভূতিভূষণ শিক্ষকতা করেন, গোরক্ষিণী সভার কাজে পূর্ববঙ্গ, অসম, ত্রিপুরা, আরাকান ঘোরেন; পরে খেলাতচন্দ্র ঘোষের উত্তর বিহারের এস্টেট দেখাশোনা করতে ভাগলপুর যান।
অপুর প্রতি কি বিভূতিভূষণ আদতে নিষ্ঠুর?
লিখছেন যশোধরা গুপ্ত…
সেখানেই ১৯২৫ নাগাদ ‘পথের পাঁচালী’ লেখা শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ‘বিচিত্রা’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপে। ভাগলপুরের বন আর বনবাসী মানুষের জীবন পরে ‘আরণ্যক’-এর ভেতরে ফিরে আসে। পাশাপাশি তিনি স্মৃতির রেখা, তৃণাঙ্কুর, ঊর্মিমুখর, উৎকর্ণ-র মতো দিনলিপিও লিখেছেন। মানুষটি যেন লেখার মধ্যেও হাঁটতে-হাঁটতে পৃথিবী দেখতেন।
তাঁর গদ্যের আসল জোর কোথায়? রিমলি ভট্টাচার্য আরণ্যক অনুবাদ করতে গিয়ে বিভূতিভূষণের ভাষাকে বলেছেন, ‘deceptively simple, both tender and unsparing’— দেখতে সহজ, অথচ একই সঙ্গে মমতাময় ও নির্মম।
সর্বজয়ার অভাবকে বিভূতিভূষণ ব্যাখ্যা করেন না। ইন্দির ঠাকরুণের অপমানের পাশে কোনও তত্ত্বের মোড়ক বসান না। দুর্গা মারা গেলে বাক্যের গলায় কান্না ঝুলিয়ে মেলোড্রামা বানান না। তিনি মানুষগুলোকে পাঠকের সামনে দাঁড় করান। আমরা নিজেদের মতো করে তাদের আপন করি, নিজেদের জীবনের সঙ্গে মেলাই। তিনি নৈতিকতার নির্দেশ দেন না; বরং মাথার ভেতর একটা প্রশ্নের সুর বাজিয়ে দেন। বাকিটা পাঠক নিজেই শোনে।

‘পথের পাঁচালী’-কে তাই বোধহয়, কেবলই দারিদ্রের উপন্যাস বলা যায় না, বলা যায় না এ কেবলই গ্রামবাংলার ছবি। অপু গরিব, আমাদের অনেকের ছেলেবেলাও খুব সচ্ছল ছিল না। আমরাও লাঠিকে তরোয়াল বানিয়েছি, গাছকে সৈন্য ভেবে যুদ্ধ করেছি। কিন্তু অপুর আসল শক্তি তার কৌতূহল। অ্যারিস্টটল Metaphysics-এর শুরুতেই মানুষের জানার ইচ্ছাকে তার স্বভাবের মধ্যে রেখেছিলেন। অপুর ভেতরে সেই পুরনো প্রশ্ন নতুন করে জন্মায়— রেললাইন কোথায় যায়? গ্রামের শেষে কী আছে? আকাশের ওপারে কী? দুর্গার ঘরে অভাব আছে, কিন্তু তার পায়ের দৌড় থামে না। সে ফল কুড়োয়, বৃষ্টিতে ভেজে, ভাইকে নিয়ে ট্রেন দেখতে যায়। অভাব তাদের আটকে রাখে; কৌতূহল বেড়া টপকাতে শেখায়।
এখানেই বিভূতিভূষণের দর্শন। মানুষ শুধু যা পায়, তা দিয়ে বাঁচে না; যা জানে না, তার দিকেও হাঁটে। অপুর কাছে রেলগাড়ি তাই শুধু যন্ত্র নয়। ট্রেন তার জানার সীমা ভাঙে। নিশ্চিন্দিপুরের একটা ছেলে প্রথম বুঝতে শেখে— তার গ্রামের বাইরেও একটা আস্ত পৃথিবী আছে। উপন্যাসের শেষে তাই পথের দেবতার সেই উচ্চারণ— ‘পথ তো আমার শেষ হয়নি।’ এই কথায় শুধু ভ্রমণ নেই। জ্ঞানও শেষ হয় না, মানুষও কোনও শেষ সংজ্ঞায় আটকে থাকে না। বাড়ি ছাড়ার কষ্ট আছে, আবার অপরিচিতের ডাকও আছে। এই দুইয়ের মাঝখানেই অপু বড় হয়। আমরাও বড় হই।
এই কারণেই ‘পথের পাঁচালী’-কে শুধু ‘বাংলার গ্রামের ছবি’ বলে বিশ্বসাহিত্যের বাইরে রাখা যায় না। অমিত চৌধুরী উপন্যাসটিকে Virginia Woolf-এর ‘Mrs Dalloway’-এর পাশে রেখেছেন। তাঁর মতে, narrative technique-এর দিক থেকে পথের পাঁচালীও এক বড় departure। কথাটা জরুরি। Woolf যেমন ঘটনার চেয়ে মানুষের চেতনার চলাচল ধরেন, বিভূতিভূষণও অনেক সময় অপুর চোখ দিয়ে পৃথিবী দেখেন। একটা পাখি ডাকল, অপু আকাশে তাকাল, হঠাৎ দূরের কোনও দেশ তার মাথায় এল। বাইরে কয়েক পা, ভেতরে অনেক মাইল। আধুনিক উপন্যাসের বড় শক্তি এখানেই।
বিভূতিভূষণের গদ্যকে খুব সহজেই কবিতার পাশে বসানো যায়, কিন্তু তিনি কুয়াশা বানান না। Wordsworth প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে মানুষের চোখ নতুন করেন, কিট্স শহর থেকে খোলা আকাশ চান, Whitman পথ ধরে এগোন, Bashō ছোট দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েন। বিভূতিভূষণও ‘প্রকৃতি’ বলে কাজ সারেন না। তিনি মহুয়া বলেন, ছাতিম বলেন, বনঝাউ বলেন, ইছামতী বলেন। গাছকে নাম ধরে ডাকেন। মানুষ কোনও জিনিসের নাম জানলে তার সঙ্গে সম্পর্কও বদলে যায়। ‘গাছ’ কেটে ফেলা সহজ; ছাতিম কিংবা মহুয়াকে চেনার পরে কুড়ুলের শব্দ অন্য রকম লাগে।
সুমনা রায় তাঁর ২০২৪ সালের ‘Plant Thinkers of Twentieth-Century Bengal’-এ বিভূতিভূষণকে এই জায়গা থেকেই নতুন করে পড়েছেন। তাঁর মতে, ‘ইছামতী’-তে গাছের জন্ম, বসতি, মৃত্যু, জমি থেকে হারিয়ে যাওয়াও ইতিহাসের অংশ; ‘পথের পাঁচালী’-র ভেতর তিনি ‘আনন্দ’-র একটি দর্শনও খুঁজে পান। বিভূতিভূষণের কাছে সম্পদ আর প্রাচুর্য এক নয়। সর্বজয়ার ঘরে টাকা নেই, কিন্তু অপুর সামনে আকাশ আছে। এই কথাকে দারিদ্রের রোম্যান্টিকতা ভাবলে ভুল করব। খিদে খিদেই। কিন্তু অর্থের হিসেব দিয়ে মানুষের সমস্ত প্রাপ্তি মাপা যায় না। বিভূতিভূষণ বারবার সেই সীমা দেখান।

তারপর ‘চাঁদের পাহাড়’। নিশ্চিন্দিপুর থেকে সোজা আফ্রিকা। বিভূতিভূষণ নিজে আফ্রিকায় যাননি, অথচ শঙ্করের চোখ দিয়ে কত বাঙালি প্রথম রিখটারসভেল্ড, আগ্নেয়গিরি, সিংহ, ব্ল্যাক মাম্বা আর হীরের খনি দেখেছে। বই বন্ধ করার পরে হিরের দামটা আর মনে থাকে না। মনে থাকে, বিশালতার সামনে দাঁড়ানো একটা মানুষ। এখানেই কান্টের ‘sublime’-এর কথা মনে পড়ে। সুন্দর জিনিস মানুষকে কাছে টানে; বিশাল, ভয়ংকর, মাপের বাইরে কোনও দৃশ্য মানুষকে নিজের ক্ষুদ্রতা বুঝিয়ে দেয়। শঙ্কর আগ্নেয়গিরির সামনে সেই শিক্ষা পায়। সে আফ্রিকাকে জয় করতে পারে না; আফ্রিকা তার অহংকারের মাপ কমিয়ে দেয়। তখন রবীন্দ্রনাথের ‘আকাশভরা সূর্যতারা, বিশ্বভরা প্রাণ’ অনায়াসে পাশে এসে বসে। ‘আরণ্যক’ আরও কঠিন প্রশ্ন তোলে। সত্যচরণ বন ভালবাসে, আবার চাকরির দায়ে সেই বন কেটে জমি বিলি করে। এই লোকটাকে আমরা চিনি। পাহাড় ভালবাসি, আবার পাহাড় কেটে চওড়া রাস্তা চাই। জঙ্গলের ছবি পোস্ট করি, আবার ফ্ল্যাটের জন্য গাছ কাটলে নিজেদের সুবিধার হিসেব করি। সত্যচরণ অন্তত নিজের দিকে তাকায়। শেষে অরণ্যের কাছে ক্ষমা চায়। আমরা কি চেয়েছি? গাছের দাম কি শুধু কাঠের দাম? নদীর মূল্য কি শুধু কত জল তুলব? মানুষ পৃথিবীর মালিক, না বাসিন্দা? বিভূতিভূষণ এই প্রশ্নগুলো সত্যচরণের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিলেন। পাঠকও সেইসব প্রশ্নের মুখোমুখি হন না কি?
কিন্তু ‘আরণ্যক’ তো শুধু বন কাটার অপরাধের বই নয়। সেখানে ভানুমতী আছে। তার জামরঙের শাড়ি, পুঁতির মালা, কালো জোড়া ভুরু। সে কলকাতা চেনে না, ভারতবর্ষ কোন দিকে, তাও জানে না। বিভূতিভূষণ তাকে কোনও ‘সরল আদিবাসী মেয়ে-র খাপে ঢোকান না। সে নিজের মতো কথা বলে, নিজের মতো হাসে। একদিন সত্যচরণের হাত ধরে বলে, ‘আজ যেতে দেব না বাবুজি।’

এইটুকুই। লেখক প্রেমের কোনও নাম দেন না। অথচ এই পাঁচটি শব্দের আকুলতা আজও আমাদের চিনতে অসুবিধে হয় না। সাহির লুধিয়ানভির গানে পরে একই অনুরোধ অন্য সুর পায়—এখনই যেও না।
‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’-এর হাজারি ঠাকুরকে দেখলেও অন্য এক বিভূতিভূষণকে পাই। সে রাজা নয়, বিপ্লবী নয়, অভিযাত্রীও নয়। সে রান্না করে, অপমান সয়, নিজের হোটেলের স্বপ্ন দেখে। এখানেও দর্শন ঘরোয়া। মানুষ মর্যাদা চায়। নিজের কাজের ওপর নিজের নাম লিখতে চায়। হাজারি তত্ত্ব জানে না, কিন্তু সে জানে তার রান্নার দাম আছে, শ্রমের দাম আছে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর আনন্দ আছে। বিভূতিভূষণ নায়কের সংজ্ঞা চুপচাপ বদলে দেন।
আর ‘ইছামতী’-তে তাঁর চোখ ইতিহাসের দিকে যায়। তিনি লিখেছিলেন, ‘মূক জনগণের ইতিহাস, রাজরাজড়াদের বিজয়কাহিনি নয়।’ ১৯৫০ সালে লেখা এই ভাবনা আজও বিস্মিত করে। পরে ইতিহাসবিদরা কৃষক, শ্রমিক, প্রান্তিক মানুষ আর নামহীন মানুষের জীবনকে ইতিহাসের কেন্দ্রে আনবেন। বিভূতিভূষণ গবেষণাপত্র লেখেননি; কথাসাহিত্যের ভেতর দিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন— যে মানুষ ধান লাগায়, নীলকরের অত্যাচার সয়, নদীর পাড়ে ঘর বাঁধে, ইতিহাস তার কথা কে লিখবে?
সমকালে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লিখেছেন। কিন্তু বিভূতিভূষণের স্বর আলাদা। তিনি চিৎকার করেন না। মানুষের ঘরে ঢোকেন, পাশে বসেন, তারপর তার জীবনটাকে আমাদের সামনে রেখে দেন।
সত্যজিৎ রায় অপুর মুখ পৃথিবীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন, কিন্তু অপুর স্রষ্টার অনেক লেখা এখনও বিশ্বপাঠক পুরো পড়েননি। রিমলি ভট্টাচার্যের ‘Aranyak: Of the Forest’ ইংরেজিতে বেরনোর পরে নতুন পাঠক তাঁর বন, মানুষ ও ইতিহাসকে অন্য চোখে দেখেছেন। আজও গবেষকেরা তাঁর উদ্ভিদ, পরিবেশ, ইতিহাস আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে লিখছেন। Woolf, Wordsworth, Thoreau কিংবা Hardy-র পাশে বিভূতিভূষণকে বসাতে আমাদের কোনও অনুগ্রহ চাইতে হয় না। নিজের গুণেই তিনি সেই জায়গা নিয়েছেন।
তাই ‘আরণ্যক’ পড়ে শুধু হারিয়ে যাওয়া সবুজের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেললে চলবে না। যে গাছের নাম শিখলাম, তাকে কে কাটছে তা দেখতে হবে। যে নদীর কথা পড়লাম, তার জল কেন কালো হল সেই প্রশ্ন করতে হবে। গাছের সঙ্গে মানুষকেও দেখতে হবে। পেট খালি রেখে শুধু সবুজ পৃথিবীর ছবি আঁকা যায় না। একই নদীর জল কৃষকের মাঠে যায়, একই বন দরিদ্র মানুষের জীবিকা দেয়, একই দূষণ প্রথমে গরিব মানুষের শরীরে আঘাত করে।
সারল্য এবং নির্মমতা, নীরবতা ও সহনশীলতার মধ্য দিয়েও পৃথিবীর গণ্ডিগুলো বারবার ভাঙতে চান বিভূতিভূষণ। অভাবের সংকীর্ণতা কখনও পথের দেবতার আকুল ডাককে পরাস্ত করতে পারে না।
সেই পথ এখনও ফুরোয়নি।



