মেঘে মেঘে বেলা: পর্ব ১২

চশমাচরিত

চন্দ্রবিন্দুর চ, বেড়ালের তালব্য শ, রুমালের মা— হল চশমা।

‘আচ্ছা, ওপরের বাঁ দিকে ওই তিন নম্বর শাড়িটা দেখাবেন তো!’ শাড়ি সামনে এসে ঢেউ খেলতেই চোখ-মুখ চকচকে। মনে-মনে ঠিক করেই ফেলেছি যে এটা তো নেবই. অষ্টমীর দিন রাতে যা মাঞ্জা দেব না! তারপর হালকা করে একটা পাট তুলে শাড়ির দামটা দেখে নিলাম। এই শাড়ি এই টাকায় পাচ্ছি! দোকানটা ভাল তো! মাত্র ৪৫০০। খুব উদাসীন মুখ করে বললাম, ‘এটা প্যাক করে দিন। এটাই নেব।’ শাড়ি-ম্যান শাড়িটা নিয়ে তারঁ অ্যাসিস্ট্যান্টকে বললেন— ‘ইয়েওয়ালা প্যাক কর দেনা আর বিল কাউন্টারে বললেন, এক ৪৫০০০-কা বিল হোগা।’

পিলে চমকে, হৃদয় খসে কোলের ওপর এসে পড়েছে। বলে কী! এই যে দেখলাম ৪৫০০!

ওপরের অ্যাখ্যানের নীতিকথা হল, আমি চশমা পরিনি। প্লাস পাওয়ার-সমৃদ্ধ চশমা না-পরেই আমি শাড়ির দাম দেখার মতো গর্হিত কাজটি করেছি। এবং যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। তখন কোনওমতে পছন্দ তেমন হয়নি বলে শীঘ্র দোকান ত্যাগ। এবং আমি হলফ করে বলছি, এই সমস্যা শুধু আমার নয়, আমার মতো হাজার-হাজার ডক্টর হাজরার!

মাঝবয়সে মা হওয়া লজ্জার?
পড়ুন ‘মেঘে মেঘে বেলা’ পর্ব ১১…

আমার বলতে একটুও দ্বিধা বা লজ্জা কোনওটাই নেই যে, মধ্যবয়সি মহিলাদের একটা অদ্ভুত সমস্যা আছে। তাঁরা বয়স বাড়া নিয়ে ভয় পান না। ভয় পান বয়সটা দেখাতে। বয়স পঁয়তাল্লিশ হোক, পঞ্চাশ হোক, বাহান্ন হোক, সাতান্ন হোক— ক্যালেন্ডারের ধার ধারলে আমরা যথেষ্ট পরিণত মানুষ। ক্যালেন্ডারে তারিখ বদলাবে, জন্মদিন আসবে, কেক কাটবে— আমাদের আপত্তি নেই। আপত্তি একটাই— মুখটা যেন বিশ্বাসঘাতকতা না-করে।

এইখানেই চশমা এসে আমাদের ব্যক্তিগত শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। চশমা পৃথিবীকে পরিষ্কার দেখায়। রাস্তার গর্ত, বাসের নম্বর, রেস্তোঁরার মেনু, ওষুধের নাম— সব। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত চশমা নিজের মুখটাকেও পরিষ্কার দেখায়। আর তখনই সভ্যতার পতন। চোখের কোণে দুটো সূক্ষ্ম রেখা, কপালে একটু ভাঁজ, গাল আগের জায়গায় নেই, চিবুকের নীচে এমন কিছু দেখা যাচ্ছে, যার সঙ্গে আমার কোনও পূর্বপরিচয় ছিল না। চশমা পরে আয়নায় তাকালে মনে হয়, এতদিন আমি মুখ দেখিনি— জীবনের হিসেব দেখেছি।

তাই সেলফি তোলার সময় চশমা খুলে ফেলি। চশমা ছাড়া মুখটা একটু নরম লাগে। চোখ দুটো বড় দেখায়। পৃথিবী ঝাপসা হয়ে যায়, কিন্তু আত্মবিশ্বাস আশ্চর্যজনকভাবে HD হয়ে ওঠে। ফোনটা একটু ওপরে, মুখ সামান্য কাত, চিবুক যতটা সম্ভব কুড়ি বছর বয়সের মতো, হাসি— না-বেশি, না-কম। ক্লিক! আবার ক্লিক। আবার। প্রথমটায় আলো খারাপ, দ্বিতীয়টায় হাসি বেশি, তৃতীয়টায় চোখ বন্ধ, চতুর্থটায় চোখ খোলা, কিন্তু সেটা বোধহয় আরও খারাপ সিদ্ধান্ত।

শেষ পর্যন্ত একটা ছবি পাওয়া যায়। মুখটা বেশ তরুণ। গর্বে বুক ফুলে ওঠে। তারপর ছবিটা দেখতে চশমা পরতে হয়।

জীবন মাঝে-মাঝে এমন irony লিখে দেয় যে কোনও লেখকের দরকার পড়ে না। বয়স লুকোতে চশমা খুললাম, বয়স কতটা লুকোতে পেরেছি দেখতে আবার চশমা পরলাম।

মধ্যবয়স আসলে এমনই। নিজের সঙ্গে একটা দীর্ঘ লুকোচুরি। চশমার সঙ্গে অবশ্য আমাদের সম্পর্ক আরও বহুমাত্রিক। চশমা ছাড়া দূর থেকে কেউ হাত নেড়ে ডাকলে আমরা ধরে নিই, নিশ্চয়ই পরিচিত। আমরাও হাত নাড়ি। বেশ আত্মীয়তাপূর্ণভাবে। লোকটা এগিয়ে আসে, আরও কাছে। তারপর বোঝা যায়— সে আমাদের দিকে তাকায়ইনি। রাস্তার ওপারে অন্য কাউকে ডাকছিল। এই মুহূর্তে হাত নামানো যায় না। কারণ হাত নামালে প্রমাণ হয়ে যাবে যে, আমরা ভুল করেছি। তাই সঙ্গে-সঙ্গে হাতটাকে চুল ঠিক করার অঙ্গভঙ্গিতে রূপান্তরিত করতে হয়। চুল ঠিক করার মতো চুল না থাকলেও। মধ্যবয়সি মহিলার এই অভিনয় কোনও আন্তর্জাতিক পুরস্কার পায় না— এটাই পৃথিবীর অবিচার।

ওষুধের ক্ষেত্রেও চশমা ছাড়া জীবন বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস। সকালের ওষুধ, রাতের ওষুধ, খাবার পরের ওষুধ, খাবার আগের ওষুধ— সবক’টা পাতাই চশমা ছাড়া দেখতে এমন যে, মনে হয়, ওষুধ কোম্পানিগুলো আমাদের বয়সের বিরুদ্ধে কোনও ব্যক্তিগত ষড়যন্ত্রে নেমেছে। একদিন ভুল করে সকালের ওষুধের জায়গায় রাতের ওষুধ খেয়ে ফেললাম। আরেকদিন একটা স্ট্রিপ হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম— ‘এটাই হবে।’ চশমা পরে দেখা গেল, এটাই হবে না। এই জায়গায় শরীরের ওপর বিশ্বাস রাখা ছাড়া উপায় নেই। শরীরও মাঝে-মাঝে খুব স্পষ্ট ভাষায় প্রতিবাদ করে— ‘তুমি আমাকে কী খাওয়ালে?’

রান্নাঘর আরও বিপজ্জনক। ধনে আর জিরে পাশাপাশি থাকলে দুটোকে আইডেন্টিকাল টুইন মনে হয়। জিরে আর মৌরি— তখন তো আর কোনও আশা নেই। আর পোস্ত আর তিল? এরা দু’জন তো হরিহর আত্মা। ফলে রান্নায় কখনও ধনের বদলে জিরে, জিরের বদলে মৌরি, পোস্তর বদলে তিল। তারপর সবাই খেতে বসে চুপ। এই চুপটাই সবচেয়ে ভয়ংকর। স্বামী অত্যন্ত কূটনৈতিক গলায় বলেন, ‘আজ রান্নাটার স্বাদটা… একটু অন্যরকম।’ ‘কী রকম?’ ‘না না, ভালই।’ ভারতীয় সংসারে ‘ভালই’ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী শব্দ। এর প্রকৃত অর্থ— কী হয়েছে বুঝিনি, কিন্তু তোমাকে এখনই বললে আজ রাতে আমার খাওয়া বন্ধ। চশমা পরে মশলার শিশিগুলোর গায়ে তাকালে অবশ্য রহস্যের সমাধান হয়। ধনে নয়— জিরে। জিরে নয়— মৌরি। পোস্ত নয়— তিল। এইভাবে মধ্যবয়সে এসে আমরা রান্নাঘরে নতুন একটি আন্তর্জাতিক খাদ্যধারা আবিষ্কার করি— অ্যাক্সিডেন্টাল ফিউশন কুইজ়িন।

ফোনের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কম জটিল নয়। ফোন বাজছে, চশমা নেই, নাম দেখা যাচ্ছে না। আন্দাজে ফোন ধরা হল। ‘হ্যালো?’ ওপাশে নীরবতা। ‘হ্যালো? বলো।’ ‘আমি…’ কণ্ঠটা চেনা লাগছে না। তবু মধ্যবয়সি আত্মবিশ্বাস বড় ভয়ংকর জিনিস। আমরা এমন একটা কথা বলে ফেলি, যা বলা উচিত ছিল না। ‘হ্যাঁ, কাল যে কথাটা বলছিলাম…’ ওপাশ থেকে ভদ্র স্বর— ‘আপনি বোধহয় ভুল নম্বরে ফোন করেছেন।’ এই একটি বাক্যের পর মানুষের আত্মা কয়েক সেকেন্ডের জন্য শরীর ছেড়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।

আসলে একজনকে ফোন করতে গিয়ে অন্যজনকে ফোন করেছি। চশমা ছিল না। নাম পড়িনি। আর তার মধ্যে এমনভাবে ব্যক্তিগত কথা বলে ফেলেছি, যেন লোকটির সঙ্গে আমাদের যৌথ পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে। ফোন কেটে চশমা পরে দেখি— সত্যিই অন্য মানুষ। কনট্যাক্ট লিস্ট-ও এই বয়সে একপ্রকার মহাভারত। ‘মৌদি’, ‘মৌদি অফিস’, ‘মৌদি নতুন নম্বর’, ‘মৌদি পুরনো’— কে কোন মৌদি, সেটি বুঝতে গেলে নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর অত্যাচার করতে হয়। কখনও ভুল মানুষকে ফোন করি। কখনও ঠিক মানুষকে ফোন করতে গিয়ে ভুল মানুষকে নিজেদের গোপন কথা বলে ফেলি। তারপর মনে হয়— চশমাটা পরলেই তো পারতাম!

কিন্তু চশমা পরব কী করে? চশমা পরলে বয়স দেখা যায়, এই ভেবে পাইরে যাওয়ার সময় চশমা পরি না, আর তাই বাড়িতেও মাঝে-মাঝেই চশমা পরতে ভুলে যাই! এই সমাজে মহিলার বয়স হওয়া অপরাধ নয়। বয়স দেখা যাওয়া অপরাধ। পুরুষের চুল পাকে— ‘দারুণ ব্যক্তিত্ব!’ মহিলার চুল পাকে— ‘ডাই করো না কেন?’ পুরুষ চশমা পরলে— ‘খুব আঁতেল।’

মহিলা চশমা পরলে— ‘পাওয়ার কত?’ পুরুষের মুখে ভাঁজ— ‘অভিজ্ঞতার ছাপ।’ মহিলার মুখে ভাঁজ— ‘কোনও ক্রিম ব্যবহার করো?’ অর্থাৎ পুরুষের মুখে জমে জীবনের অভিজ্ঞতা, মহিলার মুখে প্রকাশ পায়— ত্বক পরিচর্যার ব্যর্থতা।

এই সমাজ আমাদের এমনভাবে বড় করেছে যে, আয়নায় নিজের মুখ দেখার আগে আমরা ভাবি— অন্যরা কী দেখবে? তাই চশমা খুলে রাখি। সেলফির সময়, পার্টিতে, অনুষ্ঠানে, কখনও-কখনও রাস্তা পার হওয়ার সময়ও। কারণ সুন্দর দেখানো জরুরি। দেখতে পাওয়া নয়। এবং এখানেই সবচেয়ে বড় কৌতুক। চশমা ছাড়া রাস্তার দূরের গাড়ি দেখা যায় না, দোকানের সাইনবোর্ড পড়া যায় না, সামনের মানুষটি পরিচিত না অপরিচিত বোঝা যায় না। কিন্তু রাস্তার গর্ত? আহা! সেটি যেন আমাদের পরম বন্ধু। নিখুঁতভাবে চোখ এড়িয়ে পায়ের নীচে এসে হাজির হয়।

এক পা। দ্বিতীয় পা। তৃতীয় পায়ে পৃথিবী সরে গেল। ধপাস। পড়ে গিয়ে প্রথম প্রশ্ন— ‘লেগেছে?’ না। প্রথম প্রশ্ন— ‘কেউ দেখেছে?’ ব্যথা পরে। সম্মান আগে। চারদিকে তাকাই। কেউ দেখেছে? কেউ হাসছে? কেউ ভিডিও করেছে? কেউ যদি এসে বলে, ‘চশমা পরেন না কেন?’ তখন রাস্তার গর্তের চেয়েও বড় গর্ত তৈরি হয় আত্মসম্মানে।

কিন্তু সত্যিটা বোধহয় অন্য জায়গায়। সমস্যা চশমায় নয়। সমস্যা বয়সেও নয়। সমস্যা হল, আমরা এখনও বয়সকে এমনভাবে দেখি যেন তা জীবনের অর্জন নয়, কোনও সামাজিক অপরাধের চার্জশিট। একজন মহিলা যত বয়সি হন, সমাজ তাঁর কাছ থেকে তত বেশি চায় তিনি যেন বয়স্ক না দেখান। যেন বয়সটা শরীরে নয়, চরিত্রে ঢুকে পড়েছে। যেন হাসলে কমবয়সি হতে হবে, চুল পাকলে ব্যাখ্যা দিতে হবে, চশমা পরলে পাওয়ার বলতে হবে, মুখে রেখা পড়লে ত্বকের যত্ন নিই না কেন, তার জবাবদিহি করতে হবে!

আর ভুল ওষুধ খেলে? সেটা কাউকে বলার দরকার নেই। বিশেষ করে পরিবারকে  তো নয়ই। কারণ তখন তারা হাসির খোরাক হিসেবে এবং আমাদের ‘কচি খুকি সাজার’ আপ্রাণ চেষ্টাকে প্রমাণ হিসেবে ঘটনাটি ভবিষ্যতের সব পারিবারিক আলোচনায় ব্যবহার করবে।

তবু বয়সকে লুকিয়ে কত দূর যাওয়া যায়? চশমা খুলে চোখের কোণের রেখা দেখা যায় না। কিন্তু ভুল ওষুধ খেলে শরীর বুঝিয়ে দেয়। চশমা খুলে ধনে আর জিরে আলাদা করা যায় না। কিন্তু রান্না খেয়ে সবাই বুঝে যায়। চশমা ছাড়া দূরের মানুষকে চেনা যায় না। কিন্তু ভুল মানুষকে ব্যক্তিগত কথা বললে সে ঠিকই চিনে যায়— আমরা কে। চশমা ছাড়া রাস্তার গর্ত দেখা যায় না। গর্ত কিন্তু আমাদের বয়সের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল— সে কাউকে ছাড়ে না।

তাহলে হয়তো চশমাটাকে শত্রু না ভেবে বন্ধু বানানোই ভাল। চশমা পরব। নিজের মুখ দেখব। একটা রেখা বেশি দেখলে দেখব। দুটো বেশি হলে আরও দেখব। তারপর হাসব। কারণ মুখে একটা রেখা থাকা মানে এই নয় যে যৌবন চলে গেছে। তার মানে শুধু— জীবন তার ছোঁয়া রেখে গেছে। আর যদি চশমার অভাবে ভুল করে জিরের বদলে মৌরি পড়ে যায়, তাতেও ক্ষতি নেই। জীবন নিখুঁত রান্না নয়। কখনও ধনে বেশি, কখনও জিরে কম, কখনও পোস্তর বদলে তিল, কখনও ভুল মানুষকে ফোন, কখনও ভুল ওষুধ, কখনও ভুল মানুষকে হাত নাড়া, কখনও রাস্তার গর্ত। তারপরও আমরা উঠে দাঁড়াই। চশমা খুঁজি, ফোন খুঁজি, মশলার শিশি খুঁজি, নিজের হাসিটা খুঁজি।

এবং আবারও চশমা ছাড়াই সেলফি তুলি।