উল্টো দূরবিন: পর্ব ৩১

অন্য ব্যাকরণ

আমাদের সময়ে ক্লাস নাইন থেকে বিভাগ ভাগ হয়ে যেত। সায়েন্স, আর্টস, কমার্স। যারা বিজ্ঞান পড়ত, তাদের অঙ্ক ছিল আলাদা। অর্থাৎ, অঙ্কের সিলেবাসে পাটিগণিত বাদ। জ্যামিতি, সলিড জ্যামিতি বা ত্রিমাত্রিক জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, অ্যালজেবরা ইত্যাদি ছিল। তবে ‘কোর গণিত’ নামে একটা বইও ছিল, সেখানে আবার পাটিগণিত ছিল। আগেকার ম্যাট্রিক বা স্কুল-ফাইনাল সিলেবাসে আর্টসের পড়ুয়াদেরও ‘কোর গণিত’ ছিল। কিন্তু পাশ না করলে ফেল হত না। সোশ্যাল স্টাডি নামে আরেকটা বিষয় ছিল। সেটা আবার সায়েন্স-আর্টস-কমার্স— সবাইকেই পড়তে হত। ক্লাস নাইন এবং টেনেই এসব ছিল, ইলেভেনে আবার ছিল না। ফলত দাদুর কাছে নাইন-টেনেও পাটিগণিত কষেছি। জ্যামিতির এক্সট্রাও দাদু করাতেন। অ্যালজেবরারও প্রথমদিকের অঙ্ক করাতেন। আর দারুণ পড়াতেন বাংলা ব্যাকরণ।

ক্লাস এইট হবে, দাদু বলছেন, ‘একই শব্দ কিন্তু অবস্থাভেদে নানা অর্থ হয়। যেমন ধরো সৈন্ধব। এর অর্থ লবণও হয়, আবার ঘোড়াও হয়। জনৈক পণ্ডিত ভোজনে বইস্যা যদি কয়, ‘সৈন্ধব আনয়’, তখন কি তুমি একখান ঘোড়া হাজির করবা? আবার যুদ্ধে প্রস্তুত কোনও রাজা যদি একই হুকুম করে, তখন কি লবণের আচ্চি লইয়া আসবা (নারকেলের খোলাকে ‘আচ্চি’ বলা হত। এতে নুন রাখা হত)? আবার ঋতু শব্দের প্রধান দুই অর্থ আছে। প্রাকৃতিক ঋতু, যেমন গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ ইত্যাদি। দ্বিতীয়টিও প্রাকৃতিক। তবে ভিন্ন অর্থ, এই ঋতু-র অর্থ নারীদের মাসিক, রক্তস্রাব।’ বলে দাদু আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি তখনও সত্যিই কিছু বুঝিনি। আমি বলি, ‘মানে?’

‘মানে?’, দাদু কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, ‘বালিকাগণ কিশোরী হয়। তখন স্তন নির্গমন হয়। হেইডা লক্ষ করছ তো?’

দাদুর কাছে অঙ্ক করার স্মৃতি আজও মনে আছে!
পড়ুন ‘উল্টো দূরবিন’ পর্ব ৩০…

আমি ঘাড় নাড়ি। স্তন তো ভাল শব্দ। ইস্কুলের ছেলেরা বলে, ম্যানা বা চুচি। মাই-ও বলে। দাদু বলতে থাকে, ‘কিশোরী বালিকাগণ ক্রমে যুবতী হয়। তখন তাদের প্রতি মাসে রক্তস্রাব হয়। চারদিনব্যাপী এই স্রাব। এর ভাল নাম রজঃ।’

আমই সত্যিই জানতাম না। তবে ‘স্রাব’ শব্দটার মধ্যে কিছু একটা আছে। তার মধ্যে আবার রক্ত! কিন্তু কোথা থেকে এই স্রাব হয়? নিশ্চয়ই নাক-মুখ-কান দিয়ে নয়। তবে আন্দাজ করতে পেরেছিলাম। দাদুকে জিজ্ঞাসা করি, ‘প্রতি মাসে স্রাব হয়? শরীর দুর্বল হয় না? কষ্ট হয় না? এজন্য কি ওষুধ খায়?’ দাদু বললেন, ‘কইলাম না এইটা প্রাকৃতিক। ঔষধে কী হইব? এটা স্বাভাবিক। তবে খুবই সামান্য রক্ত-রস নির্গত হয়। এই প্রাকৃতিক ব্যাপারটা শুরু হইলেই কিশোরী ঋতুমতী হইল।’

রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টের গায়ে, দেওয়ালে ছোট-ছোট পোস্টার দেখতাম, ‘ঋতুবন্ধ? পাঁচ মিনিটেই সমাধান।’ মানে বুঝতাম না। দাদুর সঙ্গে যখন হেঁটে-হেঁটে চিৎপুরের বাড়ি যেতাম, দেওয়ালে এইসব পোস্টার দেখে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘এর মানে কী দাদু? ঋতুবন্ধ?’ দাদু বলেছিলেন, ‘এখন বুঝবা না। পরে বুঝবা।’

একদিন তারপর নিজে থেকেই বললেন, ‘সেদিন জিজ্ঞাসা করছিলা, ঋতুবন্ধ মানে কী? মনে আছে? এইবার ব্যাখ্যা করি। নারী ঋতুমতী হয়। প্রতি মাসেই এই স্রাব হয়, কিন্তু গর্ভধারণ করলে হয় না। ঋতু বন্ধ হয়। যদি কেউ গর্ভনাশ বা গর্ভমোচন অনৈতিকভাবে করতে চায়, তারই বিজ্ঞাপন এইসব। গর্ভ কেওমন কইর‍্যা হয়, হেইডা বুঝো তো? এখন এইসব বুঝার বয়স তোমার হইছে।’

আমি ‘এইসব’ হালকাভাবে বুঝতাম। স্কুলে পরাগ-মিলন পড়েছি। ফুলের পুংকেশর দণ্ডে থাকে পরাগরেণু, আবার গর্ভমুণ্ডও থাকে। গর্ভমুণ্ডে পরাগরেণু যাওয়ার পর নিষিক্তকরণ হয়, তারপর বীজ হয়। আমাদের স্কুলের টুটলে, প্রশান্ত পোদ্দার— এদের সবার কাছেই শুনেছি, ছেলেদের ওইটা মেয়েদের ওইখানে ঢুকে যায়, ছেলেদের ওটার থেকে ‘মশলা’ বের হয়। সেই মশলা মেয়েদের ওখানে চলে গেলে বাচ্চা হয়। রাস্তার কুকুরদের, ছাগলদের দেখেছি। তাছাড়া, এটাও তো দেখেছি, বিয়ে হওয়ার পরই বাচ্চা হয়। তার মানে বিয়ের পরই মানুষের পরাগমিলন হয়। মানুষের পরাগমিলনের একটা চার অক্ষরের নামও আছে, ততদিনে সেটা জেনে গেছি। একটা হাতের দুটো আঙুলের কায়দায় একটা মুদ্রা তৈরি করে অন্য হাতের আঙুল নাড়িয়ে যেটা হয়, সেটাই যে ওই চার অক্ষরের ক্রিয়া, সেটাও জেনে গেছি। তাছাড়া নিজের শরীরেও তো পরিবর্তন হচ্ছিল। নাকের নীচে হালকা গোঁফ দেখা দিয়েছে। তলপেটে, তেকোনা জায়গায় রোম গজাচ্ছে। পুংদণ্ড টনটন করে মাঝে মাঝে। এমনকী, কুমোরটুলিতে কুমোররা যখন দেবীমূর্তির বুকটা ফিনিশিং করে, জলহাত বুলিয়ে মসৃণ করে, তখনও ওরকম হয়। মন বলে, ঠিক হচ্ছে না, তবু হয়। নাড়াচাড়া করতে ভাল লাগছে খুব। একদিন নাড়াতে-নাড়াতে মশলাও বেরোল।

দাদু সমার্থক শব্দ-সমোচ্চারিত শব্দের উদাহরণ দিতেন, আবার সিলেবাসের বাইরে গিয়ে উপমা, অলংকার— এসবও বোঝাতেন। অনুপ্রাস বুঝিয়েছিলেন ক্লাস এইটেই।

‘হাঁসি কয় হাঁসা হাঁসা, হাঁসা ডাকে হাঁসি
এ বলিয়া হাঁসি-হাঁসা করে হাসাহাসি
চরি কয় চরা চরা, চরা ডাকে চরি
এ করিয়া চরাচরি করে চড়াচড়ি
বকি কয় বকা বকা, বকা কয় বকি
এ বলিয়া বকাবকি করে বকাবকি’

সেই কবেকার কথা, সেই যুগান্তে, কিন্তু মনে আছে আজও।

উপমা বোঝাতে গিয়ে হরিণাক্ষী, বিল্বস্তনী, মরালগ্রীবা এইসব শব্দ বলতেন এবং বোঝাতেন অনায়াসেই। একবার এক টিপ নস্যি নাকে গুঁজে উপমান এবং উপমেয় প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘আলংকারিকগণ তো রসিক ছিলেন নিশ্চয়, বৈয়াকরণগণ-ও কম রসিক ছিলেন না। বিসর্গ সন্ধির আগে বিসর্গ অক্ষরটা কী সেটা বুঝাইতে হইব। বিসর্গ একটা ধ্বনি। শ্বাসবায়ু অকস্মাৎ ত্যাগ করলে একটা ধ্বনি তৈয়ার হয়। সেই ধ্বনিটা কী রূপ?’ এই বলে দাদু ‘অঃ, আঃ’ এইসব ধ্বনি শোনালেন। এবার মনঃ+রম, ‘সন্ধি হইলে মনোরম, নিঃ+গত একসঙ্গে উচ্চারণ করলে নির্গত। ধ্বনিগুলিই অক্ষর দ্বারা লেখা হয়। বিসর্গ অক্ষরটা কী রূপ? কলাপ ঋষি বলেন, ‘বিসর্গ ইতি কুমারী স্তনযুগলাকৃতি বর্ণৌ বিসর্গ সংজ্ঞা ভবতি। মানে বুঝোনি? অঃ— এই স্তনযুগলাকৃতি বিশিষ্ট বর্ণদুইটির নাম বিসর্গ। নরঃ শব্দের মতো বর্ণ প্রথমার দ্বিবচনে বর্ণৌ। কুমারীর স্তনযুগল যেমন, বর্ণদুইটিও তেমন। বৈয়াকরণরা কোনও বেশি শব্দ ব্যবহার করতেন না। ঠিক-ঠিক যে-শব্দ দরকার, ততটুক। স্তন তো বুঝো। জোড়া স্তনও বুঝো। তবে কুমারী স্তনযুগলাকৃতিতে কুমারী কওয়ার দরকার কী? দরকার আছে। এক্কেবারে সমান-সমান। একটা এইধারে, আরেকটা ওইধারে হইলে হইব না। শুধু স্তনযুগলাকৃতি কইলে বৃদ্ধার স্তনের ন্যায়ও হইতে পারে। একটা এইপাশে, অন্যটা হেইপাশে। তোমার ঠাকুমারটা দেখো না?’