ওষ্ঠচিহ্নে গোষ্ঠীক্রোধ
আমরা যখন ছোট ছিলাম, ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ বাথরুমে গাইলেও বাবা-মা রেগে কাঁই। স্কুলে তো প্রশ্নই উঠত না। প্রেম শব্দটা ছিল পাপের সমার্থক, যদিও (সব পাপের মতোই) তার মধ্যে বেহদ্দ পুলক বোনা, সিনেমা দেখলেই বোঝা যেত। অবশ্য সেইজন্যই বহু পরিবারে ছোটদের হিন্দি সিনেমা দেখা বারণ ছিল। যখন নিজেরা প্রেম করার মতো বড় হলাম, বাড়ির কাছে প্রেম লুকিয়ে রাখতে হত। আমাদের কলেজ ছিল সল্টলেকে। পুলিশ যদি রাস্তায় কোনও ছেলে ও মেয়েকে একসঙ্গে দেখতে পেত, তাদের ধরে টাকা চাইত, নইলে মা-বাবাকে ফোন করে দেবে, ভয় দেখাত। তারা তাদের সমস্ত টাকা দিয়ে, কলেজে ফিরে বন্ধুদের কাছে টাকা ধার করে, বাড়ি ফিরত। অনেকদিন পর যখন প্রেমের কথা বাড়িতে জানানো হত (ছেলেটা চাকরি পেয়েছে, ফলে বিয়ের যোগ্য) উভয়েরই বুক ধড়াস-ধড়াস করত, হয়তো শুধু প্রেমজ বলেই এই প্রস্তাব নাকচ হয়ে যাবে। আজকাল যুবক-যুবতী, এমনকী কিশোর-কিশোরীও বলতে পারছে, তার অমুককে ভাল লাগে, তমুকের সঙ্গে সম্পর্ক আছে। কিন্তু সর্বত্র নয়, শুধু শহুরে কয়েকটা বর্গের মধ্যে এই স্পষ্ট ফ্র্যাংকতা সম্ভব। হয়তো সমাজের বড় অংশেরই অন্তত মেয়েরা তাদের প্রেমের কথা পরিবারে বলতে পারছে না, বা খাপ পঞ্চায়েতের ভয় পাচ্ছে, কিংবা অন্য সম্প্রদায়ের কাউকে ভালবাসলে অনার কিলিং-এরও ভয় আছে। মোদ্দা কথা, ‘বেশ করেছি প্রেম করেছি’ দাপিয়ে বলার দিন ভারতীয় সমাজে আজও আসেনি। অধিকাংশ ভারতীয় হয়তো মনে করেন, তা আসাটা ঠিকও নয়।
গোয়ালিয়রে, এক বান্ধবী তার পুরুষবন্ধুর গাড়িতে চুমু খেয়েছে ৩৪০০টা, এবং সেই লিপস্টিকের দাগে গাড়িটা রগরগিয়ে সেজে উঠেছে। কাণ্ডটার উদ্দেশ্য অবশ্য: ভাইরাল হওয়া। ব্যাপারটা ভাইরাল হয়েছে বটে, কিন্তু পুলিশ ডেকে গাড়ির মালিককে ৫৫০০ টাকা জরিমানা করেছে এবং পুলিশের সামনেই (থানার চৌহদ্দির মধ্যে) তাকে দিয়ে এই গাড়ি ধুইয়ে দাগহীন করিয়েছে। পুরুষটি কথা দিয়েছে, সে আর কক্ষনও এমন কাজ করবে না, মানে, গাড়িতে এমন কারুকাজ কাউকে করতে বলবে না। তার অপরাধটা কী? সে পুলিশের অনুমতি না নিয়েই গাড়ির বাহ্যিক রূপ পালটেছিল, আর তার গাড়ি দেখে অন্য গাড়ি-চালক বা পথচারী মনোযোগ-ভ্রষ্ট হতে পারে। অবশ্য এ-কথাও বলা হচ্ছে, সে গাড়ি জোরে চালিয়ে রিল-এর শুটিং করছিল। সম্ভবত সকলেই শান্তি পেয়েছে তার শাস্তিতে।
রাস্তায় যদি সে শুটিং না করত, তাহলেও কি তার শাস্তি হত? যদি সে গাড়িটা চালিয়ে ঘুরত আর সবাই আঙুল দেখিয়ে বলত, ‘এটাই সেই চুমুওলা গাড়িটা না?’, তাহলে? সম্ভবত হত। কিন্তু কেন? একটা স্বাধীন দেশে কেউ কেন তার বান্ধবীকে বলতে পারবে না, আমার গাড়িতে অনেকগুলো চুমু খা, যাতে সকলে গাড়িটা দেখে চমকে ওঠে, আর আমরা একটা ভিডিয়ো-ও করব, তাতে আমোদ হবে। বান্ধবী যদি রাজি থাকে এই কাণ্ড করতে, অসুবিধেটা কোথায়? সত্যিই কি এই গাড়ি রাস্তায় বেরোলে সারে-সারে গাড়ি ঘ্যাঁঅ্যাঁঅ্যাঁচ ব্রেক কষত বা ওষ্ঠাধর-ছাপ্পু শোভাপত্তর ঝুঁকে দেখতে গিয়ে লোককে চাপা দিয়ে দিত, কিংবা অন্য গাড়ির পেটে গোঁত্তা মারত? তাহলে তো রূপবান পুরুষ বা রূপসি নারীর রাস্তা পেরোনো বন্ধ করে দিতে হয়। কিংবা শিব বা কালী বা চার্লি চ্যাপলিন সেজে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে থাকা লোককে জেলে পোরা ভাল। কত গাড়িতে সাধ করে কাদার দাগ, বুলেটের দাগ-মার্কা ডিজাইন, বা ঝলমলে ভগবানের স্টিকার সাঁটা, কোথাও নীল গাড়ির ওপরে হয়তো আচমকা কমলা রঙের পোঁচ। লরি বা ট্রাকে লেখা প্রবচন ও আঁকা বাহারি ছবি নিয়ে তাড়া-তাড়া প্রবন্ধ ও গবেষণা অবধি ঘটেছে। লরির পেছনের চমকদার ছড়া পড়তে গিয়ে যদি কোনও ড্রাইভার অন্যমনস্ক হয়, তার দায় কি ট্রাক-মালিক নেবে? অটো বা রিকশার পিছনের লেখা-আঁকা নিয়ে আজ অবধি কাউকে আপত্তি জানাতে দেখা গেছে? বাসে কেন ‘বাবলি+পাপাই’ লেখা, কেন ঝ্যাকম্যাকে সিনেমার পোস্টার লাগানো, কেউ তা নিয়ে আপত্তি করেছে?

সন্দেহ হয়, গাড়ির বহিরঙ্গ বদলেছে বলে পুলিশ রাগ করেনি। রাগের কারণ: এই কেরদানির মধ্যে যৌনতার বেপরোয়া আড়ম্বর রয়েছে। এখানে একজন নারী সেধে তিন হাজারের বেশি চুমু খাচ্ছে (যদিও মানুষকে নয়, কিন্তু একজন মানুষের গাড়িকে, গাড়ি লোকটিরই প্রক্সি দিচ্ছে) এবং সেই চুমুর স্বাক্ষর সে প্রকাশ্যে চলমান প্রদর্শনীর মতো জাহির করতে ডরাচ্ছে না। এই চুম্বনচিহ্নভর্তি গাড়ি নিয়ে এক পুরুষ বেশ গর্ব ও উল্লাস-সহ ঘুরে বেড়াচ্ছে, গাড়ির ভিডিয়ো প্রচুর ভিউ সংগ্রহ করছে। ফলে, এক যুগলের বেলাগাম আনন্দ, ফাজলামি, এবং ‘বেশ করেছি’ আস্ফালন স্পষ্ট। আপত্তিটা এইখানে। চুমু তুমি গোপনে খেতে পারো বটে, তা নিয়ে গোটা শহরের সামনে এমন জাঁক করার মানে কী? তোমরা যৌবন যাপন করলে মিনমিনিয়ে করো, তা দাবড়াচ্ছ কেন? অন্যদের (প্রেম-উপোসি) মনে ব্যথা লাগে না? ভিডিয়োটা ভাইরাল হয়েছে মানে এই যুগলের উদ্দেশ্যও সফল হয়েছে। সেখানেও রাগ বাড়ে। তার মানে লোকে এই ‘পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া’ দেখছে চাখছে ও হইহই করছে? অশালীনতার জনপ্রিয়তা তো ভাল কথা নয়। আরও এক রক্ষণশীল আপত্তি: তবে কি সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সবই করা যায়? একটা ব্যক্তিগত আনন্দের অভিজ্ঞানকে গাড়িময় লেপে দেওয়া কি নিজেদের গোপন আবেগ বিক্রি করে দেওয়া নয়?
গাড়ির মালিক পুরুষটি অবশ্য প্রেম নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি (সে বুদ্ধিমান), জানিয়েছে, তার বান্ধবী এমনিই, মজার জন্য, নিজ উদ্যোগে এই কাজ করেছে। পুলিশ যতই চিরকালীন জ্যাঠামশায় হোক, একটা গাড়িতে চুমুদাগ থাকলে সেই গাড়ি ট্র্যাফিক-আইন ভাঙে, এ-কথা তারাও বিশ্বাস করে বলে মনে হয় না। কিন্তু প্রেমের (বা, আরও খারাপ: কামের, চুম্বনের) নির্লজ্জ বিজ্ঞাপন করে রাস্তাঘাটে যাতে মাথা উঁচিয়ে ঘোরা না যায়, তার বন্দোবস্ত তারা করেছে। ঠিকই করেছে, কারণ এই সমাজ বারে বারে নিজেকে প্রেমবিরোধী ও যৌনতাবিরোধী বলে প্রতিষ্ঠা করেছে ও সেই চরিত্রকে গৌরবজনক ইস্পাতবিশিষ্ট মনে করেছে। নির্জন দুপুরে দাঁড়-করানো গাড়ির মধ্যে বসে যুগল চুমু খেলে, তাদের ধরে পাড়ার ছেলেরা হ্যারাস করেছে। পার্কে চুমু খেলে দারোয়ান তেড়ে এসেছে। সিনেমায় নায়ক-নায়িকা অনেকক্ষণ ধরে চুমু খেলে শুচিবাদী ও মৌলবাদীরা ছাদের সমান লাফ দিয়েছে, সেন্সর বোর্ড কাঁচি চালিয়েছে, পোস্টারেও নায়িকার শরীরের বিশেষ স্থানে আলকাতরা লেপা থেকেছে। এখন একটা অদ্ভুত সপ্রতিভ ও স্পর্ধিত শহুরে জেন-জি’র উত্থান হয়েছে বলে এবং তারা মোক্ষম মিম নিক্ষেপিয়ে ও ‘দূর মশায়’ শ্রাগান্তে জড়াজড়ি করতে-করতে সূর্যাস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে বলে সমাজ বাধ্য হয়ে কিছুটা বাহ্য-সহিষ্ণুতা দেখাচ্ছে বটে, কিন্তু তাতে অন্দরের ক্রোধটা মিলিয়ে যায় না। পুলিশ এখানে সেই ক্ষোভেরই প্রকাশ ঘটিয়েছে।
কত গাড়িতে সাধ করে কাদার দাগ, বুলেটের দাগ-মার্কা ডিজাইন, বা ঝলমলে ভগবানের স্টিকার সাঁটা, কোথাও নীল গাড়ির ওপরে হয়তো আচমকা কমলা রঙের পোঁচ। লরি বা ট্রাকে লেখা প্রবচন ও আঁকা বাহারি ছবি নিয়ে তাড়া-তাড়া প্রবন্ধ ও গবেষণা অবধি ঘটেছে। লরির পেছনের চমকদার ছড়া পড়তে গিয়ে যদি কোনও ড্রাইভার অন্যমনস্ক হয়, তার দায় কি ট্রাক-মালিক নেবে?
তাদের বক্তব্যে এও মিশে আছে: সব কিছু নিয়ে রসিকতা চলে না। এ-পৃথিবীর পথে চলছ-নড়ছ-টলছ, সবটাই কি ইয়ার্কি? সমস্ত নিয়েই এমন লঘু চালে ফেলে-ছড়িয়ে ঠা-ঠা করে হেসে ওঠা যায়? এইখানে আছে আরও এক সমাজ-চক্কর: মজা ভাল নয়। প্রেমও, শেষ অবধি, গম্ভীর। তাতে মাধুর্য থাকবে অবশ্যই, দীর্ঘশ্বাস, আকুলতা, ক্রমাগত টেক্সটিং, ব্রীড়া, লজ্জাসুখ, অভিমান, এমনকী নেটফ্লিক্স দেখতে গিয়ে থ্রিলারের খুন মিস করে যাওয়াও, কিন্তু হাহাহিহি বিশেষ থাকবে না। ওতে প্রণয়ের গুরুত্ব, আবেগের নিবিড়তা কমে যায়। যৌনতাও, জান্তব, আমিষ (ও আদর্শ-জীবনে পরিত্যাজ্য), উগ্র নেশাময়, কিন্তু সেখানে খিলখিল-খ্যালখ্যাল আসছে কোত্থেকে? সঙ্গমের সময়ে খুনখারাবি উত্তেজনা ও পড়িমরি আশ্লেষ চলবে, কিন্তু মুচকি, বা চুটকি-বিনিময়, বা নিজস্ব কৌতুক-নির্মাণ, বা একটা হালকা মুহূর্ত বান্ধবাড্ডায় এমনকী ফেসবুকে রটিয়ে মেগা-হিল্লোল তোলা— কখনও কাঙ্ক্ষিত নয়, এখানে ব্যক্তিগতকে অপবিত্র করা হল। অথচ কৌতুক যেখানে খুশি সেঁধিয়ে যেতে পারে এবং মেলতে পারে তার বহুবর্ণ ভিটভিটে ও ডানপিটে পাখা। প্রণয়ে ও রিরংসায় যে-লোকগণ হাস্যরস আমদানি করে, যারা হৃৎপিণ্ড ও মাংসপিণ্ডে আলগা ঠাট্টার ট্যাটু ফলিয়ে জীবনকে অধিক সাপ্টে ভোগ করছে।
তবে সবচেয়ে বড়: গাড়ির গায়ে চুমুর দাগ— এর মধ্যে বিরাট কিছু অন্তরঙ্গ সত্যও নেই, ‘গোপনো কথাটি’র ভ্রমরও আদৌ লুকোনো নেই। অনায়াসেই এ নিয়ে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসা যায়, কারণ ১৩০০ চুমু বাস্তবেও কেউ কাউকে একদানে খায় না, ঠোঁট ধরে গিয়ে ভাল করে কথাই বলতে পারবে না। তাই এটা একটা দেখন-আহ্লাদ, ভাইরাল-ভজনা, পাতি খ্যাতিপ্রয়াস। এর জন্য কাউকে শাস্তি দিলে, নিজেদের অতি বিটলে কড়া ও ধর্ষকামী মোড়ল হিসেবে প্রমাণ করা হয়, ওই যে-লোকগুলো যেই দ্যাখে ছোট বাচ্চারা কালীপুজোয় বাজি পোড়াচ্ছে আর আনন্দে আটখানা হয়ে যাচ্ছে, অমনি রেলিং থেকে ঝুঁকে ভৌ-ভৌ বকুনি মারে, ‘অ্যায়, ভাগো, অন্য জায়গায় যাও। এখানে রামগরুড়ের আরতি চলছে।’




