নিখিলদার সঙ্গে প্রথম আলাপ
আমার সঙ্গে নিখিলদার প্রথম দেখাটা খুবই ইন্টারেস্টিং। তখন আমি ‘সানডে’ পত্রিকায় কাজ করি। একদিন হঠাৎ খবর পেলাম, কমলকুমার মজুমদার আনন্দবাজারে এসেছেন এবং অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটরদের ঘরে, যেখানে নিখিলদা অর্থাৎ নিখিল সরকার বসতেন, সেখানেই আছেন।
কমলদার সঙ্গে তখন আমার আলাপ ছিল, যাতায়াতও ছিল। খালাসিটোলার আড্ডায় ওঁর সঙ্গে আমাদের প্রচুর গল্প-আড্ডা হত। সেই আড্ডার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল সাহিত্য, বিশেষ করে ফরাসি সাহিত্য। দু’জনে দুটো ড্রিঙ্ক নিয়ে একটা কোণায় দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাবেক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে পারতেন। বলা যায়, কমলকুমার মজুমদার ছিলেন ফরাসি সাহিত্যের শেষ দিগ্গজদের একজন।
তাই কমলদা আনন্দবাজারে এসেছেন শুনে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তখন কমলদা আমাকে ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করতেন। বললেন, ‘আপনাদের এখানে এসেছি, নিখিলবাবুর সঙ্গে একটা দরকার আছে। একটা লেখার ব্যাপারে।’
আরও পড়ুন : পুলিনবিহারী সেনের কৃতিত্বেই প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্র রচনাবলি?
লিখছেন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্য়ায়…
নিখিলদা বললেন, ‘হ্যাঁ, ওকে তো আমি চিনি। আনন্দবাজারের ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করে। আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে এখানে-ওখানে নানা বিভাগে দৌড়দৌড়ি করে, কিন্তু সেভাবে আলাপ হয়নি।’
কমলদা বললেন, ‘তাহলে এবার আলাপ করে নিন। ওর সঙ্গে মাঝে মাঝে আমার দেখা হয়।’

আমি যোগ করলাম, ‘কমলদার সঙ্গে একটু ফরাসি সাহিত্য নিয়ে কথাবার্তা হয়।’
নিখিলদা বললেন, ‘আপনার সময়-সুযোগ হলে আসুন, একটু গল্প করা যাবে।’
প্রথমদিকে নিখিলদাও আমাকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করতেন। এটা ওঁর স্বভাব ছিল— প্রায় সবাইকেই ‘আপনি’ বলতেন। পরে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলেও চট করে ‘তুমি’ বলতেন না।
একদিন সাহস করে ওঁর ঘরে গেলাম। প্রথমে স্বাভাবিক কথাবার্তা— কেমন আছেন, কী করছেন ইত্যাদি। হঠাৎ নিখিলদা বললেন, ‘আচ্ছা, আপনি বাংলায় উপন্যাস লিখেছেন? বাংলা লেখালিখি করেন? আপনি আমাদের এখানে আসেন না কেন?’
আমি বললাম, ‘আপনাদের চারের পাতার সঙ্গে তো আমার কোনও সম্পর্ক নেই। রমাপদবাবু আমার লেখা পুজোর সংখ্যায় এবং মাঝে মাঝে রবিবাসরীয়তে ছাপেন, তাই ওদিকে যাই। এখানে তো সেভাবে আসা হয় না।’
উনি বললেন, ‘এক কাজ করুন, মাঝে মাঝে আসবেন। আমার আপনাকে একটু দরকার আছে।’
এই ছিল ওঁর সঙ্গে আমার প্রথম আলাপ।
এর কিছুদিন পর আমি লন্ডনে গেলাম রবিশঙ্করের ‘রাগ অনুরাগ’ বইটি লেখার জন্য। সেখান থেকে ‘আনন্দবাজার’-এ কয়েকটি লেখা পাঠিয়েছিলাম। তার মধ্যে ছিল মোহাম্মদ আলির একটি সাক্ষাৎকার এবং ইহুদি মেনুহিনের সঙ্গে সাক্ষাৎকার-সহ আরও নানা লেখা।
ফিরে আসার পর একদিন নিখিলদা আমার ঘরে ফোন করে বললেন, ‘আপনি আসুন, আমি অপেক্ষা করছি।’
গেলাম। প্রথম দিনই উনি আমাকে একটা লেখা লিখতে বললেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘লেখার ব্যাপারে কোনও নির্দেশ আছে?’
উনি বললেন, ‘আপনাকে একটা নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে লিখতে বলছি, কারণ আমি মনে করি বিষয়টা আপনি পারবেন। তাই আলাদা করে কী বলব? আপনি আগে লিখুন। তারপর যদি কোনও প্রশ্ন থাকে, আমি আপনাকে প্রশ্ন করব।’
সাধারণত পেজ এডিটররা নিজের জায়গা বোঝাতে গিয়ে অনেক নির্দেশ দেন—’এটা করুন, ওটা করুন’— নিখিলদা একেবারেই তা করলেন না।
কিছুদিন পর লেখা নিয়ে গেলাম। উনি পড়ে বললেন, ‘খুব সুন্দর হয়েছে। আমার কিছু বলার নেই। এই লেখাটাই আমি ছাপছি। তবে একটা কথা— আপনি যদি অনেক ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করে থাকেন, সেগুলোর বাংলা বানান একবার দেখে দেবেন? কোনও ইংরেজি শব্দের তো দু’-তিন রকম বানান হতে পারে। প্রুফটা একবার পড়ে দিলে ভাল হয়।’
এইভাবেই আমাদের যোগাযোগ চলতে থাকল।

আনন্দবাজারে যোগদান
এরপর একদিন অভীক সরকার আমাকে বললেন, ‘তুমি আনন্দবাজারে এসো। আনন্দবাজারে জয়েন করো।’
আমি খুব খুশি হলাম। কোথায় কাজ করব, কোন বিভাগে— এসব ভাবছিলাম। তখন উনি বললেন, ‘তুমি নিখিল সরকারের সঙ্গে কথা বলো।’
তখন আনন্দবাজারের বাড়িটাও আজকের মতো ছিল না। পরে বাড়িটি ভেঙে নতুন করে তৈরি হয়েছে। সেই সময় তিনতলার যে ঘরগুলো ছিল, সেখানেই আমাদের কাজ চলত।
নিখিলদার সঙ্গে দেখা করতে গেলে উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনাকে আমার সঙ্গে কাজ করতে হবে। এখানে আমাদের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও বসেন। আপনিও এখানে বসবেন। গৌরকিশোর ঘোষ আছেন, নিরঞ্জন হালদার আছেন। একটা সিট খালি আছে— আপনি সেখানে বসবেন।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কবে থেকে?’
উনি বললেন, ‘যেদিন আপনার ইচ্ছে করবে।’
আমি অবাক! বললাম, ‘মানে?’
উনি বললেন, ‘আপনি তো অনেক জায়গায় অনেকরকম লেখেন। কোথায় কী লেখা জমে আছে, আমি তো জানি না! সেগুলো মিটিয়ে নিয়ে আসুন।’
দু’দিন পরেই আমি চলে এলাম।
উনি বললেন, “সকালবেলা অভীকবাবুর সঙ্গে একটা মিটিং হয়। আপনিও আসবেন। সেখানে কী করব, কী করব না, কী কী এডিটোরিয়াল পরিকল্পনা আছে, কে লিখছে, কে লিখছে না— সব আলোচনা হয়। আপনাকে একটা পেজ মেক-আপের দায়িত্ব দেব। আপনি তো ‘সানডে’-তে কাজ করেছেন, পেজ মেক-আপ জানেন।”
এরপর ধীরে-ধীরে কাজ শুরু করলাম। পেজ মেক-আপ, লেখা, প্রুফ— সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেলাম।
মাসদুয়েক পর অমিয়বাবু বললেন, ‘শংকর, তুমি চিঠিপত্রের দায়িত্বটা নাও। অনেক চিঠি জমে যায়। বাকিটা নিখিলবাবুর সঙ্গে কথা বলে নেবে।’
একদিন আমি বলেই ফেললাম, ‘আপনি-আপনি আর ভাল লাগছে না। আপনি আমার থেকে সিনিয়র, আমাকে তুমি বলুন।’
উনি হেসে বললেন, ‘আস্তে-আস্তে হয়ে যাবে। এটা একদিনে হয় না।’
আমি বললাম, ‘বলতে-বলতেই তো আপনি-আপনি করে যাচ্ছেন!’
উনি হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, আস্তে-আস্তে হয়ে যাবে।’
শেষ পর্যন্ত সত্যিই ‘তুমি’ হয়ে গেল।

লেখালিখির গুরুত্ব
চিঠিপত্রের দায়িত্ব নেওয়ার পর নিখিলদা আমাকে বললেন, ‘পাতা-পাতা করছ বলে ভেবো না যে তোমার লেখালিখি কমে যাবে। লেখালিখিটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
উনি লেখালিখিকে ভীষণ গুরুত্ব দিতেন। বললেন, ‘ফাঁকা সময়ে চা নিয়ে আমরা বসে গল্প করব। তুমি এক কোণে, আমি আর এক কোণে।’
তারপর জানালেন, তিনি পুরনো কলকাতা এবং সাহেবদের নিয়ে একটা লেখা লিখছেন। বললেন, ‘তুমি তো ইংরেজি সাহিত্য পড়ো। তোমার সঙ্গে একটু পরামর্শ করব।’
এইভাবেই আমাদের নিয়মিত আলোচনা শুরু হল।
একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী মনে করো, ইংরেজি উপন্যাস কবে থেকে শুরু হয়েছে?’
আমি বললাম, ‘প্রায় ১৭৫০-এর দিকে যেতে হবে।’
উনি বললেন, ‘কিন্তু বাংলায় আমরা ইংরেজি উপন্যাসের প্রভাব কবে থেকে পাচ্ছি? সাহেবদের নানা ঘটনা, তাদের জীবন, গণ্ডগোল-ঝামেলা— এসব নিয়েও তো অনেক লেখা ছিল।’
আর-একদিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘ইংলিশ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল-এ তোমার কতটা ইন্টারেস্ট?’
বললাম, ‘ভীষণ।’
ওয়ারেন হেস্টিংস, লর্ড ক্লাইভ, কর্নওয়ালিস, ওয়েলেসলি— এই সময়ের ইতিহাস আমার বরাবরই আগ্রহের বিষয় ছিল। উনি জানতে চাইলেন, ‘কী কী বই পড়ো?’
আমি কয়েকটি বইয়ের নাম বললাম। উনি খুব খুশি হলেন। বললেন, ‘এই বইগুলোই তো আসল বই। সবাই তো এগুলো থেকেই টোকে!’
আড্ডা, রসিকতা এবং স্মৃতিশক্তি
অফিসের কাজের বাইরে আমাদের চা খেতে খেতে নানা বিষয় নিয়ে গল্প হত—পড়াশোনা, লেখালিখি, পুরনো আনন্দবাজারের ইতিহাস।
আমি আনন্দবাজারে যোগ দিয়েছিলাম ৮ ডিসেম্বর ১৯৭১। তখন বাংলাদেশের যুদ্ধ চলছে। সকালে অফিসে আসতাম, ফিরতে-ফিরতে অন্ধকার হয়ে যেত। আমি সিআইটি রোডে থাকতাম। নিখিলদা থাকতেন কর্নফিল্ড রোডে এবং অফিস থেকে গাড়ি পেতে শুরু করেছিলেন।
মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতেন, ‘কোথায় যাচ্ছ?’
বলতাম, ‘টাইগার হলে সিনেমা দেখতে।’
উনি বলতেন, ‘চলো, তোমাকে নামিয়ে দিচ্ছি।’
এমনও হয়েছে, আমাকে নামিয়ে দিয়ে তারপর নিজের বাড়ি গেছেন। ১৯৭৪ সালে আমি ‘রূপসা’ পত্রিকায় লেখালিখি করি। গীতা মুখোপাধ্যায়, যিনি পরবর্তীতে আমার শাশুড়ি হলেন, তিনি ওই পত্রিকাটা সম্পাদনা করতেন। এরপর ১৯৭৫ সালে আমার উপন্যাস বেরয়, সে আলাদা কথা। কিন্তু সেই ‘রূপসা’-য় লেখালিখি করার সময়েও উনি আমাকে ওই পাড়ায় নামিয়ে দিতেন। সেই সূত্রেই আমার গিন্নির সঙ্গে প্রথম আলাপ— সেটা অবশ্য অন্য গল্প। আমার পাতা করার দিনগুলো উনি সাতটা পর্যন্ত অপেক্ষা করে যেতেন। আমাকে মৌলালি ধরে সিআইটি রোডে নামিয়ে উনি ফিরতেন কর্নফিল্ড রোডে।
নিখিলদার সঙ্গে আড্ডা জমত, কারণ নানা বিষয়ে তাঁর অসাধারণ জ্ঞান ছিল। আরও আশ্চর্যের বিষয়, কারও বলা গুরুত্বপূর্ণ কোনও কথা উনি খুব মন দিয়ে শুনে মনে রাখতেন এবং পরে প্রয়োজনে ব্যবহার করতেন।
তাঁর রসবোধও ছিল অসাধারণ। তবে কাউকে নিয়ে ঠাট্টা করলেও তা কখনও নিন্দায় পরিণত হত না। অনুপস্থিত কাউকে ছোট করা বা তাঁর দোষ নিয়ে আলোচনা করা তাঁর স্বভাবে ছিল না। মনে আছে কেউ জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কি ভগবানে বিশ্বাস করেন? নিখিলদা বললেন, হ্যাঁ করি। তিনি বোধহয় প্রশ্ন করেছেন ফের, কে আপনার ভগবান? উনি বললেন, কেন, অশোকবাবু! অর্থাৎ, অশোক সরকার।
উনি লাইব্রেরিও খুব ব্যবহার করতেন। কোনও তথ্য নিয়ে লিখছেন বা বলছেন—সেটা নিশ্চিত করার জন্য লাইব্রেরিতে গিয়ে বই দেখে নিতেন। বলতেন, ‘জাস্ট টু মেক শিওর।’
আমিও বড় লেখার সময় লাইব্রেরির বড় টেবিলে বসতাম। উনি জানতেন আমি সেখানে আছি এবং কেউ আমাকে খুঁজলে বলতেন, ‘উনি বাইরে আছেন’ —যাতে কেউ লাইব্রেরিতে গিয়ে আমাকে বিরক্ত না করে।
‘সেই সময়’, ‘রাগ অনুরাগ’ এবং লোডশেডিংয়ের আড্ডা
রবিশঙ্করের ‘রাগ অনুরাগ’ ধারাবাহিকভাবে বেরোচ্ছিল। নিখিলদা প্রতিটি লেখা খুব মন দিয়ে পড়তেন এবং আমাকে নানা প্রশ্ন করতেন।
পরবর্তীকালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন ‘সেই সময়’ লিখছেন, তখনও নিখিলদা ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য নিয়ে তাঁকে প্রশ্ন করতেন। সুনীলদাও কোনও তথ্য বা ঘটনার ব্যাপারে প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতেন।
‘সেই সময়’-এর প্রতিটি অধ্যায় পড়ে আমি নিখিলদাকে একবার বলেছিলাম, ‘প্রত্যেকটা অধ্যায় যেন আলাদা গল্পের মতো শেষ হয়ে যাচ্ছে। রানিং স্টোরির ক্ষেত্রে অধ্যায়গুলোর মধ্যে প্রবাহটা আরেকটু মসৃণ হওয়া দরকার।’
উনি কথাটা খুব গুরুত্ব দিয়ে শুনেছিলেন।
এরই মধ্যে একসময় প্রচণ্ড লোডশেডিং শুরু হল। ঘরে মোমবাতি জ্বেলে কাজ করতে হত। প্রত্যেক টেবিলে আট-নয়টা মোমবাতি জ্বলত। পড়াশোনা বা লেখালিখি কঠিন হয়ে যেত, ফলে এক ঘণ্টা বা দেড় ঘণ্টার জন্য কাজের চেয়ে গল্প-সাহিত্যই বেশি হত।
নিখিলদা কখনও বলতেন, ‘তাড়াতাড়ি কাজগুলো শেষ করো। চারটের সময় লোডশেডিং হবে!’
লোডশেডিং যেন তখন আড্ডার সংকেত। সুনীলদা তিনটের সময় এলে বলা হত, ‘আগে একটু কাজ-টাজ করে নিই, তারপর চারটের সময় আড্ডা।’
সেই দিনগুলো সত্যিই রোমান্টিক ছিল।

১৯৭৯: বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার দ্বিশতবর্ষ
১৯৭৯ সালে ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’-র উদ্যোগে কলকাতায় বাংলা মুদ্রণ ও প্রকাশনার দ্বিশতবর্ষ উপলক্ষে যে বিশাল আয়োজন হয়েছিল, তার সঙ্গে নিখিলদা গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে পুরনো বই, পত্রিকা, নথি সংগ্রহ করা, তালিকা তৈরি করা— সবই চলছিল।
আমাদের একটি বড় গাড়ি থাকত। নিখিলদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। কারণ তখন আমি খুব দ্রুত পড়তে পারতাম এবং পড়া অনেকটাই মনে থাকত। পুরনো সংবাদপত্র ও পত্রিকার পাতা ঘেঁটে আমরা প্রয়োজনীয় জিনিস বের করতাম। কোন ছবি রাখতে হবে, কোন পাতা ফোটোগ্রাফ করতে হবে— তা ঠিক করতাম। ফোটোগ্রাফার পীযূষ ব্যানার্জিও আমাদের সঙ্গে কাজ করতেন।
এই গবেষণার সূত্রেই ডেভিড হেয়ারের ‘Grammar of the Bengal Language’-এর মতো দুর্লভ বই ও নথিও আমরা খুঁজে বের করেছিলাম।
একবার নিখিলদা Nathaniel Brassey Halhed-এর নাম নিয়ে আমাকে বললেন, “বাংলায় ‘হ্যালহেড’ লেখা হলেও ইংরেজি উচ্চারণ ‘হ্যালেড’। তুমি এটা জেনে রাখো।”
এই ধরনের ছোটখাটো তথ্যের প্রতিও তাঁর প্রবল সচেতনতা ছিল।
পুরনো উডকাট টাইপ ও মুদ্রণপদ্ধতি নিয়েও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। বলতেন, ‘আগেকার উডকাট টাইপের মধ্যে একটা চরিত্র আছে। আধুনিক স্টিল লেটারের মধ্যে থেকে সেই চরিত্রটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।’
তিনি পুরনো জিনিসের সৌন্দর্যকে মূল্য দিতেন। তাঁর ধারণা ছিল, নতুন মানেই যে পুরনোর চেয়ে ভাল, তা নয়।

সত্যজিৎ রায় ও ২০০ বছরের বাংলা মুদ্রণ
নিখিলদার খুব ইচ্ছে ছিল, এই প্রদর্শনীর সঙ্গে সত্যজিৎ রায়কে যুক্ত করার। সত্যজিৎ রায় মুদ্রণ, প্রকাশনা ও ক্যালিগ্রাফির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।
নিখিলদা তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে অনুষ্ঠানের কথা বলেছিলেন। সত্যজিৎবাবু খুব উৎসাহিত হয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, ‘দুশো বছরের প্রিন্টিং নিয়ে আপনারা যে কাজ করছেন, এটা একটা রিয়েল সর্ট অফ অ্যাচিভমেন্ট। খুব ভাল কাজ করছেন। আমি যাব।’
প্রদর্শনীতে এসে সত্যজিৎবাবু মাঠে বসে বই দেখেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একটু মাঠে বসব না?’ তখন একটি বড় শতরঞ্চি পেতে দেওয়া হয়। সত্যজিৎবাবু সেখানে বসে বইটি দেখতে শুরু করেন। সেই ছবিটিই আনন্দবাজারে ছাপা হয়েছিল— অসাধারণ একটি ছবি। হ্যালহেডের ব্যাকরণের প্রথম কপিটা কিন্তু সত্যজিৎবাবুকেই দেওয়া হয়েছিল।
ইংরেজ আমলের বাংলার ইতিহাস নিয়েও নিখিলদার সঙ্গে আমাদের প্রচুর আলোচনা হত। ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে লর্ড কার্জন পর্যন্ত সময়পর্ব ছিল আমাদের বিশেষ আগ্রহের বিষয়। হেস্টিংসের একটি বড় জীবনী আমি কিনেছিলাম। নিখিলদা বইটি দেখে বললেন, ‘তুমি কিনেছ? আমাকে পড়তে হবে।’
আমি বললাম, ‘আপনি রেখে দিন। আমার পড়া হয়ে গেছে। পরে দরকার হলে আপনার কাছ থেকে নিয়ে নেব।’
পরে উনিও আমাকে কার্জনের ওপর একটি বই দিয়েছিলেন। আমাদের মধ্যে বইয়ের আদান-প্রদানও চলত। তাঁর নিজের লেখা বইও আমার কাছে আছে।
ছবি, স্মৃতি এবং লেখা
নিখিলদা বইয়ের ছবি বা কোনও ইন্টারেস্টিং ফোটোগ্রাফ খুব মন দিয়ে দেখতেন। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন। মনে হত, ছবিটাকে তিনি প্রায় মনের মধ্যে ফটোগ্রাফ করে নিচ্ছেন।
একদিন জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি এত তন্নতন্ন করে ছবি দেখেন কেন?’
উনি বললেন, ‘কী হয় জানো তো, অনেক সময় কোনও লেখার একটা অংশ মনে পড়ছে না, কিংবা লেখাটাই মনে পড়ছে না। তখন আমি সেই ছবিটা মনে করার চেষ্টা করি। ছবিটা মনে করতে-করতে অনেক সময় লেখাটাও মনে পড়ে যায়।’
অর্থাৎ ছবিটাকে মনে করতে-করতে, ছবির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লেখাটাও ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতিতে ফিরে আসত।
শেষের দিকের একটি স্মৃতি
জীবনের শেষদিকে, যখন আমরা কাজ করছিলাম, লক্ষ করেছিলাম তাঁর একটু মেমরি ফেইল করছিল। আগেরদিন কে কী বলে গেল, কী আলোচনা হল— এসব ভুলে যেতেন। কিন্তু বইয়ের কথা ভুলতেন না। কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য, কোনও বই, কোনও লেখা— এসব আশ্চর্যজনকভাবে মনে থাকত।
একদিন বললেন, ‘জানো তো, কী কাণ্ড! আমি বই কিনতে গিয়েছিলাম। একটা বই পাওয়া যাচ্ছে শুনে ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গেলাম।’
তখন ওয়েলিংটন স্কোয়ারে পুরনো বইয়ের দোকান ছিল। সেখানে গিয়ে দেখা হল কমলকুমার মজুমদারের সঙ্গে। তিনিও বই দেখছিলেন। বই দেখা হয়ে গেলে কমলদা বললেন, ‘চলুন, আমার সঙ্গে চলুন।’
‘কোথায়?’
‘চলুন।’
ওয়েলিংটন স্কোয়ারের পাশেই ‘বারদুয়ারি’ বলে একটি জায়গা ছিল। কমলদা সেখানে যেতে চাইছেন। অন্যদিকে একজন ভদ্রলোক নিখিলদাকে ক্যাফেতে নিয়ে গিয়ে বিস্কুট খাওয়ানোর জন্য ধরেছেন। শেষ পর্যন্ত কোনওরকমে কমলদার হাত থেকে রেহাই পেয়ে নিখিলদা বই না কিনেই সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। কমলদা চলে যান বারদুয়ারির দিকে।
এই গল্পটা আমাকে বলার সময় তাঁর কী আনন্দ! যেন ঘটনাটা চোখের সামনে আবার ঘটে যাচ্ছে।
আর কমলদার সঙ্গে সন্ধেবেলার আড্ডার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করা। দরজার এককোণায়, যেখানে বড়জোর দু’জন দাঁড়াতে পারে, সেখানে কমলদা দাঁড়িয়ে থাকতেন। আর আলোচনা চলত বালজাক, মার্সেল প্রুস্ত, Remembrance of Things Past— বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলি নিয়ে।
তখন আমি প্রুস্ত পড়া সবে শুরু করেছি। কমলদা আমাকে ‘আপনি’ বলেই সম্বোধন করতেন। তিনি প্রুস্তের উপন্যাসের সৌন্দর্য নিয়ে বলতে শুরু করলেন—প্রথমে দু’-চার লাইন ফরাসিতে, তারপর ইংরেজি অর্থ, তারপর বাংলায় তার ব্যাখ্যা। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতাম এবং পরে অফিসে এসে সেই আলোচনা করতাম।
সত্যিই, কী অপূর্ব সময়ের মধ্যে দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম!
সেই সময়টা ছিল আনন্দবাজার পত্রিকার গোষ্ঠীর এক স্বর্ণযুগ। সেই মানুষগুলো, সেই আড্ডা, সেই পড়াশোনা, সেই কাজ— সব মিলিয়ে আজ ফিরে তাকালে মনে হয়, আমরা যেন এক অসাধারণ সময়ের সাক্ষী ছিলাম।
ছবি ঋণ: সুবীর দত্ত


