সামথিং সামথিং: পর্ব ৮০

Representative Image

পাঁচ প্রশ্ন

প্রথম প্রশ্ন, কমবয়সিরা আন্দোলন করলেই কি তা ঠিক-আন্দোলন, ঠিক-প্রতিবাদ? নিশ্চয়ই নয়, আন্দোলনের যাথার্থ্য আন্দোলনকারীর বয়সের উপর নির্ভর করে না। কিন্তু নাগরিকেরা খুব কম বয়সেই রাষ্ট্রের উপর প্রবল ক্ষুব্ধ হলে এবং নিজেদের বঞ্চিত মনে করলে, তাদের প্রতি বাড়তি মনোযোগী ও যত্নবান হওয়া প্রয়োজন। নইলে তারা অবাক হয়ে দেখবে, সভ্যতা ও সুবিচারের মূল ভিত্তি যে যুক্তির আদান-প্রদান, আলোচনা— তাতে বিশ্বাস না-করে এ-দেশে উপেক্ষা বা ঔদাসীন্যকে একটা উচিত-জবাব বলে মেনে নেওয়া হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, তারা সমস্যায় পড়লে গুরুজনেরা আকুল হন না, তাদের রক্ষা করতে ছুটে আসেন না, বরং নির্মমভাবে পেটান। এতে, ন্যায় সম্পর্কে ধারণা টলে যাবে। এবং তারা এও শিখবে, অধিকার অর্জন করতে গেলে সত্যের জোরে নয়, গায়ের জোরে বড় হতে হয়। পুলিশ যদি নিরস্ত্র ছাত্রকে পেরেক-গাঁথা লাঠি হাতে মারে, এবং বিচারক যদি এসব শুনে বলেন আমার-আপনার সময় নষ্ট করবেন না, তাহলে তারা বুঝবে এই দেশে ভাল থাকতে গেলে নীতি ও ভদ্রতাকে গুলি মেরে টাকা ও ক্ষমতার জোরে বড় হতে হবে। এই কথাগুলো বেশি-বয়সিদের আন্দোলনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, তাদের মারলেও খুব লাগে, মনে প্রকাণ্ড রোষ এবং অসহায়তা ফুঁসতে থাকে, দাবিকে পাত্তাই না দিয়ে গালাগাল করলে তারাও বোঝে এ-গ্রহে ন্যায়ের জয় সিনেমা ছাড়া অন্যত্র হয় না, কিন্তু সেগুলো ১৫ বা ১৮ বছরের ছেলেমেয়ের বুকে অনেকগুণ দীর্ঘ শেল হানে, কারণ তারা এখনও অতটা পোড় খায়নি, মানুষের প্রতি তাদের বিশ্বাস অতটা তলানিতে ঠেকেনি। এই বয়সেই হৃদয়ে কালশিটে পড়ে গেলে তা মোছা শক্ত, তারা নৈরাশ্যের প্রজা হয়ে গড়ে উঠবে। তাছাড়া, জীবনের প্রায় গোড়া থেকেই তারা রাষ্ট্রের খরখরে শত্রু বনে গেলে, পরে সম্পর্ক সহজ হওয়া মুশকিল (এবং শাসকদলের পক্ষে তা বিপজ্জনকও, কারণ এরা অনেকদিন ধরে ভোট দেবে)।

দ্বিতীয় প্রশ্ন, সেইজন্যেই কি এই আন্দোলনকে এতটা গুরুত্ব দিল দেশের মানুষ, এবং তা বুঝতে পেরে, সরকার? সত্যিই, দেশজুড়ে এতগুলো আন্দোলন চলছিল, চলছে, তাহলে এই লড়াই এভাবে খবরের কেন্দ্রে এল কেন? প্রথমত, এটা রাজধানীতে ঘটছে। দ্বিতীয়ত, মোটামুটি বিখ্যাত একজন মানুষ অনশন শুরু করলেন এবং ২০ দিন ধরে তাঁর আত্মনিগ্রহকে সরকার উপেক্ষা করে, তারপর আচমকা তাঁকে চ্যাংদোলা করে প্রায়-অপহরণ ঘটিয়ে (সাদা চাদর দিয়ে সেই অপকর্ম আড়াল করে) হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে, দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট একটা নায়ক-খলনায়ক বিভাজন উপস্থিত করল। সাধারণ মানুষের মনে হল, এখানে একটা সৎ সংগ্রাম বনাম স্বৈরাচারী চোখরাঙানির লড়াই হচ্ছে। তৃতীয়ত (এবং এটাই সবচেয়ে বড় কথা), এখানে জনতা মোবাইলে ঝুঁকে পড়ে আন্দোলনকারীদের দেখতে গিয়ে নিজেদের চেনা মুখ পেল: তাদের সন্তানদের। জনজাতির আন্দোলনকে অনেকে সম্মান করতে পারে, সমর্থনও, কিন্তু তার সঙ্গে সমাজের সব বর্গের মানুষ একাত্ম বোধ করতে পারে না। কৃষকের বিদ্রোহকে বুঝতে চেষ্টা করতে পারে, মনে-মনে (এমনকি সরাসরি) তাঁদের পাশে দাঁড়াতেও পারে, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে সকলে আত্মপরিচয় একাকার করতে পারে না। কিন্তু সিজেপি-র প্রতিবাদ হল ইংরিজি ও হিন্দি মেশানো। করল যারা, কেউ আমেরিকার বিরাট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে এসেছে, কেউ ইনস্টাগ্রামে সারাদিন মিম টাঙাচ্ছে। এই ছেলেমেয়েদের কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি অনেকেরই চেনা। নিজের বাড়িতে, টিভির সামনে এবং খাওয়ার টেবিলে মোবাইল-নিমজ্জিত অবস্থায় তারা এদের প্রতিদিন দেখছে ও বকুনি দিচ্ছে, এদের জন্য উদ্‌বিগ্ন হচ্ছে। সর্বস্তরের সাধারণ মানুষেরা তাই আন্দোলনটাকে প্রবল সমর্থন করতে শুরু করল, কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পড়বে ও চাকরি পাবে, এ-ই তো তাদেরও আকাঙ্ক্ষা, এর উপর নির্ভর করেই তো তাদের জীবন-আস্তিকতা গড়ে উঠেছে। গলায় ফাঁস লাগানো বা ভেলায় মৃতদেহের মতো ভেসে থাকা জনজাতির মানুষের চেয়ে, টুপি ও জ্যাকেট-পরা, বুদ্ধিদীপ্ত ও কৌতুকমিশ্রিত প্ল্যাকার্ড লিখে দাঁড়িয়ে-থাকা, চোস্ত ভাষায় ও অনাড়ষ্ট ভঙ্গিতে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা-করা, প্রযুক্তি হাতের মুঠোয় নিয়ে মিনিটে হাজারও পোস্ট করতে-দড়, পুলিশ ভ্যানের রাস্তা-আটকানো ও ভ্যানে উঠে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে ব্যস্ত এই অদ্ভুত প্রজন্ম ও তাদের সংকট সকলের অধিক পরিচিত। তাই বিরোধটা হয়ে দাঁড়াল, সরকারের সঙ্গে ভারতের অভিভাবকদের সন্তানদের লড়াই। এখানে জনসমর্থনের জোয়ার নিজেদের দিকে টানতে গিয়ে সরকার বুঝল, হারতে হবে।

অর্জুনের নয়, কর্ণের দলে! পড়ুন: সামথিং সামথিং পর্ব: ৭৯

তৃতীয় প্রশ্ন, কিন্তু গোটাটাই যদি চিনের চক্রান্ত হয়ে থাকে? এই উদ্ভট চক্রান্ত-তত্ত্ব আওড়ানোর ও হাওয়ায় ভাসানোর মূল উদ্দেশ্য দুটো। এক, বোঝানো: এই রাজত্ব এত সুষ্ঠুভাবে চলছে যে এখানে কোনও প্রতিবাদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গজাতেই পারে না। যেখানে কোনও ভুল নেই, অভাব, অন্যায় নেই, সেখানে বিরোধিতা হবে কীসের ভিত্তিতে? তাই অবশ্যই পুরো ক্রোধটাই বানানো, পুরো সমস্যাটাই পরিকল্পিত, এবং গনগনে কথাগুলো অন্য কারও বলে দেওয়া। অন্য কেউ টাকা দিয়ে কু-মতলব বাতলে আন্দোলন তৈরি করে এই দেশকে ধ্বংস করতে চাইছে, অমৃতকাল যাপন তাদের সহ্য হচ্ছে না। দু-নম্বর উদ্দেশ্য (এটা আরও সুবিধের): এতে আত্মসংশোধনের (এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের) কোনও দায়ই থাকে না, তাই কর্তৃপক্ষ বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। যেখানে অভিযোগমাত্রেই বানানো ও মিথ্যে, সেখানে আদৌ নিজেকে কাঠগড়ায় তুলব কেন? যদি আমি অঙ্কে পাঁচ পেয়ে বাড়ি আসি, নির্বোধ অভিভাবকেরা বলতে পারেন, তুমি পড়াশোনা করোনি, বা তোমার মাথায় অঙ্ক ঢোকে না। অতএব আজ থেকে তুমি একজনের কাছে অঙ্ক টিউশন করতে যাবে এবং রোজ অঙ্ক প্র্যাকটিস করবে। কিন্তু আমি যদি চিল্লিয়ে বলি, সমস্তই শিক্ষকের চক্রান্ত, তাহলে আমাকে কোনওটাই করতে হবে না, বরং আধলা ইট ছুড়ে শিক্ষককে মারতে হবে। সেটা অনেক সহজ, এবং তৃপ্তিকরও বটে। তাই, চিন করেছে, না পাকিস্তান করেছে, না কি মঙ্গলগ্রহের প্রাণীরা চুপিচুপি এসেছিল— এই খাতে আলোচনা গড়িয়ে দিলে, সমস্যাটাকে প্রকৃত জ্বলন্ত ও জরুরি বলেই স্বীকার করা হল না, তাৎপর্য উপড়ে বিষয়টাকে প্রসঙ্গের বাইরে ঠেলে দেওয়া গেল, শুধু নেপথ্য-ভিলেনকে ধরার ছমছমে থ্রিলার শুরু হল। এই রটনার বিরুদ্ধ-যুক্তি হল, তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় চিন আন্দোলনটাকে তৈরি করেছে, তাহলেও কি ভারত তার শিক্ষাব্যবস্থায় ত্রুটিগুলোকে অস্বীকার করতে পারে? যদি পাকিস্তান এই মিছিলের পিছনে থাকে, তাহলেও কি ভারতের যে সন্তানেরা চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করল, তাদের প্রতি অপরাধ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করতে পারে? চিন নাহয় টাকা দিয়ে এই ছেলেমেয়েদের সংঘবদ্ধ করল, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও কি চিন লিক করিয়েছে, এবং যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের গলায় দড়ি কি চিন এসে পরিয়ে দিয়ে গেছে?

কিন্তু গোটাটাই যদি চিনের চক্রান্ত হয়ে থাকে? এই উদ্ভট চক্রান্ত-তত্ত্ব আওড়ানোর ও হাওয়ায় ভাসানোর মূল উদ্দেশ্য দুটো। এক, বোঝানো: এই রাজত্ব এত সুষ্ঠুভাবে চলছে যে এখানে কোনও প্রতিবাদ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গজাতেই পারে না। যেখানে কোনও ভুল নেই, অভাব, অন্যায় নেই, সেখানে বিরোধিতা হবে কীসের ভিত্তিতে? তাই অবশ্যই পুরো ক্রোধটাই বানানো, পুরো সমস্যাটাই পরিকল্পিত, এবং গনগনে কথাগুলো অন্য কারও বলে দেওয়া।

চতুর্থ প্রশ্ন, এই জয় থেকে কী শিক্ষা সংগ্রহযোগ্য? এক, আজকের দিনকালে, সফল হতে গেলে আন্দোলনের লাগাতার প্রচারের জন্য মূলস্রোতের গণমাধ্যমকে পাশে পাওয়ার দরকারই নেই। সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনকারীর পক্ষে ভাবনা-জোয়ার এলে, বাপ-বাপ বলে মূলস্রোতের মিডিয়া তার কোঁচা ধরে ঝুলে পড়বে। এমনকী গোড়ায় সরকারের হয়ে নির্লজ্জ প্রচার (বা, আন্দোলনটার উল্লেখই না করে চরম উপেক্ষা প্রদর্শন) করলেও, পরের দিকে সামাজিক মাধ্যমে বিপুল গণসমর্থন আন্দাজ করে, হেঁ-হেঁ রবে দ্রোহ-কর্তাদেরই ভজবে। তাই হবু-লড়াইকে সামাজিক মাধ্যমে শনশনিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দুই, এবং এটা একটা প্রায়-উদ্ভট নীতিবাক্য: যদি প্রশাসনকে ভয় না-পাওয়া যায়, তাহলে তাদের লাঠি স্তম্ভিত হয়ে শূন্যে ঝুলে থাকে। যদি পুলিশ তাড়া করলে সেই দৌড়কে বিশ্লেষণ করে ফিটনেস অ্যাপ দিয়ে দেখানো যায় পুলিশ আনফিট, যদি প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিলে সেই ছবি স্থির করে প্রধানমন্ত্রীর কপালে কাটাকুটি খেলা যায়, যদি জলকামানের ধারায় স্নান করতে করতে নাচা যায়, তাহলে ক্ষমতার চোয়াল লক হয়ে যায়, কারণ তারা ধমক-চমক দিয়ে কী করবে, যদি বিরুদ্ধপক্ষ ভয় পেতেই না শিখে থাকে? কৌতুককে, রসিকতাকে, পাত্তাই না-দেওয়ার স্পর্ধাকে বর্ম করার এই শিক্ষা এই আন্দোলনের বড় প্রাপ্তি (স্মর্তব্য, আন্দোলনকারী দলের নামটাই নেওয়া ক্ষমতা-পান্ডার ব্যঙ্গোক্তি থেকে)। বাপ-মা যখন বকেন, এই ছেলেমেয়েদের দিকে তাকিয়ে অস্থির হয়ে বলেন, এত বড় আস্পদ্দা, আমি কথা বলছি আর তুমি মোবাইলে স্ক্রোল করছ? তখন এরা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, ‘শুনছি তো, বলে যাও না। Chill!’ এই চিল কেন, কাক-চড়াই বা পায়রা বোঝাও দায়। এবার সেই শ্রাগ-সঙ্গী মনোভঙ্গির ঘা খেয়েছে বাপের বয়সি পুলিশ, সরকার, শাসক-দলের মগজাধার।

পঞ্চম প্রশ্ন, জিনিসটা মিটে গেছে, বিজেপি তাহলে নিশ্চিন্ত? কক্ষনও নয়, কারণ এই আন্দোলন শুধুমাত্র নিট পরীক্ষার ব্যাপারে অভিযোগ হানেনি। এই যে আরশোলাদের শরিক হয়ে সহস্র মানুষ জমায়েত হয়েছে ক্ষোভ জানিয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে, এই যে লোকে উল্লাসে ফেটে পড়েছে বিহারের জনতা ব্যারিকেড নিয়ে পালিয়েছে বলে, সামাজিক মাধ্যমে সমারোহ ঘটছে মন্তব্য তর্ক ভ্লগ মিম-এর, তা শুধু এই পরীক্ষার ত্রুটির কারণে নয়। রাগটা ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিরুদ্ধে নয়, মূলত অন্যের প্রতি ধাবিত। পশ্চিমবঙ্গের আর জি কর আন্দোলনে যে প্রচণ্ড আক্রোশ ফেটে পড়েছিল, তাকে অনেকেই চিনতে পেরেছিল শাসকদলের বিরুদ্ধে বহুদিন-সঞ্চিত ক্ষোভের প্রকাশ হিসেবে, বুঝেছিল, এটা একটামাত্র ঘটনার পরিণাম নয়। অনেকদিন ধরে অনেক কারণে রাগ জমতে থাকে, তারপর একটা বিষয়কে আশ্রয় করে তার বিস্ফোরণ হয়। তাই বিজেপি বুঝেছে (বিরোধীরাও), তাদের শাসনে অনেকেই প্রভূত অখুশি, এবং এই আন্দোলনের মতো আরও বহু আন্দোলন ঘনাচ্ছে বনে-বনে, গগনে-গগনে বিলক্ষণ দেয়া ডাকছে। যে-কোনও প্রশ্নের উত্তরে ‘মুসলমান খারাপ’ আবৃত্তি করে গেলেই লোকে তুষ্ট হচ্ছে না। এবার বিরোধীরাও এর সুযোগ নেবে, এবং বিজেপি আগাম সতর্ক হয়ে ঘুঁটি সাজাবে। ফলে, সামনে ঘনঘটাময় দিন। তা ‘অচ্ছে’ কি না, বলা শক্ত।